প্রতিমুহূর্তেই বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে রাজনীতি ও বাংলাদেশের নাগরিকদের জীবনযাত্রা। কখন যে কি ঘটবে বা ঘটতে যাচ্ছে তার কোন কিছুই কেউ ধারণা বা অনুমানও করতে পারছেন না।
নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে নাগরিকদের মধ্যে। রাজনীতি সচেতন ব্যক্তিরাও নানা কথা বলছেন, মন্তব্য করছেন। কিন্তু কেউই কোন গন্তব্য খুঁজে পাচ্ছেন না।অথৈ সমুদ্রে দিকহারা জাহাজের মত এখন বাংলাদেশ।
নেহায়েত ভাগ্যের ওপর যেভাবে দিকহারা জাহাজের ক্যাপ্টেন ছেড়ে দিয়ে শুধু ভেসে থাকার চেষ্টা করেন তেমনি বাংলাদেশের অবস্থাও অনেকটা।
বাংলাদেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামীলীগের সভানেত্রী ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তাঁর দলের অধিকাংশ নেতাকর্মী দেশছাড়া। দলটিই নিষিদ্ধ এখন বাংলাদেশে। অথচ এই দলটির নেতৃত্বেই বাংলাদেশ নামে রাষ্ট্রটির জন্ম হয়েছিল।
আওয়ামীলীগ ও এর সহযোগী সংগঠনসমূহের হাজার হাজার নেতাকর্মী কারাগারে।আবার অনেকে পলাতক।যারা আছেন দেশে তাঁরাও এখনকার জঙ্গী ইউনুস সরকারের নানামুখী রোষানলে পড়ে অনেকটা দিশেহারা।
দলীয় কোন নির্দেশনা নেই তাদের কাছে। খুব সহসা দলকে সংগঠিত করে আন্দোলনের মাধ্যমে এই অবৈধ-অগণতান্ত্রিক ইউনুস সরকারকে ক্ষমতা থেকে যে সরানো যাবে তারও তেমন কোন আলামত দেখা যাচ্ছেনা। তবে আওয়ামীলীগ ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির কমবেশি আন্দোলনতো চলছেই দেশে ও বিদেশে।

আওয়ামীলীগের অফিসিয়াল অনুপস্থিতিতে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপি’র ওপর ভরসা করে করছিল দেশের নাগরিকরা। কিন্তু সেখানেও চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
দলটির চেয়ারপারসন তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। তাঁর পরিস্থিতি এতটাই সংকটাপন্ন যে তাতে আর আশা করছেন না দলের নেতাকর্মীরা।যে কোন মুহূর্তে হয়তো তাঁর নাই হয়ে যাওয়ার খবরটিও আসতে পারে- এমন আশংকাই করা হচ্ছে সব মহল থেকে।
কিন্তু সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি’র চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার এমনতরো সংকটকালীন অবস্থায়ও তাঁর একমাত্র জীবিত পুত্র তারেক রহমানও মায়ের পাশে এসে দাঁড়াতে পারছেন না। এর চেয়ে কষ্টের আর কিছু নেই এ পৃথিবীতে।

তিনি সেই যে ২০০৮ সালে লন্ডনে পালিয়ে গেলেন, তারপর থেকে আর বাংলাদেশমুখো হননি। বৃটেনে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রাপ্ত বাংলাদেশের পাসপোর্ট বিহীন তারেক জিয়া আদৌ দেশে ফিরতে পারবেন কি পারবেন না তাও একেবারেই অনিশ্চিত।
অথচ গত চব্বিশের ৫ আগষ্টের পর থেকে তারেক রহমান ও বিএনপি নেতাকর্মীদের আচার-আচরণ ও কথাবার্তায় মনে হয়েছিল তিনি যে কোনদিন দেশে ফিরে দলটির নেতৃত্ব দেবেন।
বাংলাদেশের রাজনীতি ও ক্ষমতার অবৈধভাবে ব্যবহারকারী তারেক রহমান একসময়ে রাজধানী ঢাকায় “ হাওয়া ভবন” কে গড়ে তুলেছিলেন “বিকল্প ক্ষমতার” কেন্দ্রবিন্দুতে।হেন কোন কাজ-অকাজ নেই যা হাওয়া ভবন থেকে হতোনা।
তখন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া হলেও অলিখিতভাবে ক্ষমতা পরিচালিত হতো এই হাওয়া ভবন থেকে।প্রশাসন ও তার দলের নেতাকর্মীরা সবাই এই হাওয়া ভবনের কাছে ও তারেক জিয়ার কাছে অনেকটাই জিম্মি ছিলেন এটি নিশ্চয়ই এদেশের জনগণ ভুলে যাননি।
অথচ সেই প্রবল-পরাক্রমশালী তারেক রহমান বা তারেক জিয়া ২০০৭ এর ওয়ান ইলেভেনের সময় “ভেজা বিড়াল’ এ পরিণত হতে বাধ্য হন। বাংলাদেশে ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতা নেওয়া সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে দুর্নীতির অভিযোগে আটক হয়ে আঠারো মাস কারাগারে থাকার পর ২০০৮ সালের তেসরা সেপ্টেম্বর মুক্তি পেয়েছিলেন তারেক রহমান। এরপরে ২০০৮ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর লন্ডনের উদ্দেশে পরিবারের সদস্যদেরকে সাথে নিয়ে ঢাকা ছেড়েছিলেন তিনি।
বিএনপির প্রয়াত নেতা মওদুদ আহমদ তার ‘কারাগারে কেমন ছিলাম (২০০৭-২০০৮)’ বইতে লিখেছেন, “এমনও হতে পারে তিনি (খালেদা জিয়া) জেনারেলদের সাথে এই সমঝোতা করেছিলেন যে, তারেক রহমান আপাতত নিজেকে রাজনীতিতে জড়াবেন না এবং এ মর্মে তারেক রহমান কোনো সম্মতিপত্রে স্বাক্ষরও দিয়ে থাকতে পারেন।”
২০১৮ সালের ২৪শে এপ্রিল বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রথমবারের মতো স্বীকার করেন যে ২০১২ সালে তারেক রহমান ব্রিটেনে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছিলেন এবং এক বছরের মধ্যেই সেটি গৃহীত হয়েছে।
দীর্ঘসময় ধরে বিএনপি নেতাদের অভিযোগ ছিল যে আওয়ামী লীগ সরকারের ‘মিথ্যা মামলা ও বাধার’ কারণেই মি. রহমান দেশে ফিরতে পারছেন না। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ই অগাস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ১৫ মাস পেরিয়ে গেলেও তিনি দেশে ফিরছেন না কেন- এই প্রশ্ন ও কৌতূহল ক্রমশ জোরালো হচ্ছিলো। এ ব্যাপারে দলটির কোন নেতাই মুখ খুলছেন না।
তবে এরই মধ্যে বেগম জিয়া জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে চলে যাওয়ার পর বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান তাঁর ফেইসবুকে লিখেছেন- “এমন সঙ্কটকালে মায়ের স্নেহ স্পর্শ পাবার তীব্র আকাঙ্খা যে কোন সন্তানের মত আমারও রয়েছে। কিন্তু অন্য আর সকলের মত এটা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমার একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়।
স্পর্শকাতর এই বিষয়টি বিস্তারিত বর্ণনার অবকাশও সীমিত। রাজনৈতিক বাস্তবতার এই পরিস্থিতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে উপনীত হওয়া মাত্রই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে আমার সুদীর্ঘ উদ্বিগ্ন প্রতিক্ষার অবসান ঘটবে বলেই আমাদের পরিবার আশাবাদী।”
তার মানে একসময়কার প্রবল পরাক্রমশালী তারেক রহমান বাংলাদেশে আদৌ ফিরতে পারছেন কিনা সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে যা তার বক্তব্য থেকেই বোঝা যাচ্ছে।
এরই মধ্যে অবশ্য পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেছেন, গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে দেখার জন্য তার ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফিরতে চাইলে তাকে ‘ওয়ান টাইম পাস’ দেবে সরকার। বিবিসি বাংলা সার্ভিসের নিউজ অনুয়ায়ী এ তথ্যই জানা গেছে।
রোববার জাতীয় প্রেসক্লাবে এক আলোচনা সভায় এ কথা জানিয়েছেন। তারেক রহমান রহমান যদি দেশে ফিরতে চান তাহলে কূটনৈতিক প্রক্রিয়াটি কী হবে? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এ কথা বলেন।
তৌহিদ হোসেন বলেন, “এটার নিয়ম হচ্ছে যে, কারো যদি পাসপোর্ট না থাকে বা মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যায়, তখন কেউ যদি (দেশে) আসতে চান, তাহলে তাকে আমরা ‘ওয়ান টাইম পাস’ একটা দিয়ে দেই, একবার দেশে আসার জন্য।”

“এটা দিতে একদিন লাগে। কাজেই উনি যদি আজকে বলেন যে, উনি আসবেন, তাহলে কালকে এটা দিয়ে, পরশু দিন উনি প্লেনে উঠতে পারবেন, এটাতে অসুবিধা নেই।”
আসলে এই “ওয়ান টাই পাস” যে সত্যিকার অর্থে কি সেটাই প্রশ্ন। এটি দিয়ে কি তিনি শুধু আসতেই পারবেন ? এটি দিয়ে দেশ থেকে ফিরে যাওয়ার কোন উপায় কি আদৌ আছে ?
যে তারেক রহমান সব সময় তার বক্তব্যে বলে থাকেন- “ সবার আগে দেশ” সেই রহমান সাহেব কেন এতদিনেও সেই “ সবার আগে দেশ” এ আসছেন না তা নিশ্চয়ই দেশবাসী প্রশ্ন করার অধিকার রাখেন।এমনকি মায়ের একমাত্র জীবিত সন্তান হিসেবেও তারতো দায়িত্ব রয়েছে।
সেই অনুষ্ঠানে এছাড়া সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার একমাত্র জীবিত সন্তান তারেক রহমানের ফেসবুকে দেওয়া স্ট্যাটাস বা স্পর্শকাতর বিষয় সম্পর্কে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, “এটা উনি বলেছেন, যেটা আমরা পত্রিকাতে দেখেছি। আমি এটুকু বলতে পারি যে, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বিধিনিষেধ নেই।”
তিনি আরো জানান, খালেদা জিয়াকে এই মুহূর্তে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার অবস্থা নেই এবং অবস্থার উন্নতি হলে পরিবার বা দল চাইলে সহযোগিতা করবে সরকার।
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলেই কিন্তু শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য ২০০৪ সালের ২৪ আগষ্ট ঢাকায় বঙ্গবন্ধু এভেনিউতে আওয়ামীলীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা করা হয়েছিল। যে হামলায় অন্ততপক্ষে ২৪ নেতাকর্মী নিহত হয়েছিলেন।
আহত হয়েছিলেন অসংখ্য নেতাকর্মী। কিন্তু তখন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের পক্ষ থেকে এর জন্য উল্টো আওয়ামীলীগ ও তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকেই দোষারোপ করা হয়েছিল।

এমনকি তখনকার প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এমনও বলেছিলেন যে, শেখ হাসিনাই নাকি তার ভ্যানিটি ব্যাগে করে গ্রেনেড নিয়ে গিয়েছিলেন !!!
তারপরের ঘটনা নিশ্চয় দেশবাসীর অজানা নয়। জজমিয়া নাটক থেকে নানা কিছুর অবতারণা করেছিল বেগম জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার।পরবর্তীতে নানা তদন্তে এই গ্রেনেড হামলার পরিকল্পক হিসেবে বিএনপি’র এখনকার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক জিয়া ও তার সহযোগীদের নাম উঠে আসে।
কেউ কেউ হয়তো বলবেন, এখন সেসব বিষয়ে আলোচনা কেন ? হ্যাঁ তাতো বটেই। একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও ২০০৪ সালে সংসদে বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হসিনার প্রাণনাশের চেষ্টা করবেন। গ্রেনেড হামলাকারিদের গ্রেপ্তার না করে উল্টো তার বিরুদ্ধেই ঘৃণ্য অপপ্রচার চালাবেন। কিন্তু সে বিষয়গুলো বলা যাবেনা? ওই যে কথায় বলে- “পাপ নাকি বাপকেও ছাড়েনা।”
নাহলে এজন মায়ের জন্ম মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে তাঁর একমাত্র পুত্র আসতে পারছেন না মায়ের শয্যাপাশে এর চেয়ে নিশ্চয়ই কষ্টের ও বেদনার কিছু হতে পারেনা।
যে বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছিলাম যে দেশ এখন দিকহারা জাহাজ এর মত ভাসছে, সেখানেই ফিরে যাই।আওয়ামীলীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপি কিন্তু দেশকে একটি রাজনৈতিক-গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে ফিরিয়ে আনার আন্দোলন গড়ে তুলতে পারতো।
কিন্তু সে জায়গায় তারা চরমভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে ও দিচ্ছে।এই দলটির নেতারা হয়তো ভেবেছিলেন, আওয়ামীলীগকে দেশ থেকে হটানো গেছে। শেখ হাসিনাকেও ক্ষমতাচ্যুত করে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে ভারতে।
সুতরাং তারাই নিশ্চিত ক্ষমতার অধিকারি হচ্ছেন।কিন্তু সেখানে যে মেটিকুলাস ডিজাইনার আন্তর্জাতিক প্রতারক ড. মুহম্মদ ইউনুস ও তার অন্যতম সহযোগী জামায়াতে ইসলামীসহ তাদের কিছু সহযোগী জোট রয়েছে। তারা যে চরমভাবে ষড়যন্ত্র করছে দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ না ফেরার জন্য সেটি আর বুঝতে পারেনি বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। ফলে অনিশ্চিত গন্তব্যের পথে বাংলাদেশ।
# ইশরাত জাহান: লেখিকা, প্রাবন্ধিক ও নারী সংগঠক।
