ঢাকা: একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর। বাঙালি জাতির সবচেয়ে গৌরবের দিন।

যেদিন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছিল, সেদিন রেসকোর্স ময়দানে লাখো মানুষের সামনে বিজয়ী বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল।

আর সেই বীরত্ব, বিজয়ের স্মৃতি বহন করে আসছে প্রতি বছরের কুচকাওয়াজ। কিন্তু টানা দুই বছর ধরে কুচকাওয়াজ বাতিল করা হয়েছে।

এবারো হবে না কুচকাওয়াজ। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জানিয়েছেন, এবারও জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে কুচকাওয়াজ হবে না।

আসলে এই সরকারের কাছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর বিজয়ের গৌরব বলে কিছু নেই। এই সিদ্ধান্ত তারই প্রমাণ।

আসলে কাঁচা ভাষায় বললে, এই সরকার পাকিস্তানের আশীর্বাদপুষ্ট, তাই তাদের জন্য ১৬ ডিসেম্বর একটি বিব্রতকর দিন। বিজয় দিবস উদযাপন করতে গেলে তাদের প্রভুদের অসম্মান করা হয়।
লেখক তসলিমা নাসরিন ফেসবুকে তাঁর আগের লেখা একটি পোস্ট ফের শেয়ার করেছেন।

লিখেছেন: ১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ন’মাস যুদ্ধ করে জিতেছিল পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ। ভারত সাহায্য করেছিল যুদ্ধে জিততে। ওই সাহায্যটা না করলে বাংলাদেশের পক্ষে যুদ্ধে জেতা সম্ভব হত বলে আমার মনে হয় না।

বাংলাদেশের জন্ম আমাদের বুঝিয়েছিল, ভারত ভাগ যাঁরা করেছিলেন, দূরদৃষ্টির তাঁদের খুব অভাব ছিল।

তাঁরা ভেবেছিলেন ‘মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই, হোক না তারা বাস করছে হাজার মাইল দূরে, হোক না তাদের ভাষা আর সংস্কৃতি আলাদা, যেহেতু ধর্মটা এক, বিরোধটা হবে না।’ ভুল ভাবনা।

ভারত ভাগ হওয়ার পর পরই বিরোধ শুরু হয়ে গেল। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী শোষণ করতে শুরু করলো পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানদের। নিজেদের ভাষাও চাপিয়ে দিতে চাইলো।

আরবের ধনী মুসলমানরা যেমন এশিয়া বা আফ্রিকার গরীব মুসলমানদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে, মানুষ বলে মনে করে না, পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকরা ঠিক তেমন করতো, বাঙালিদের মানুষ বলে মনে করতো না।

পূর্ব পাকিস্তান ফসল ফলাতো, খেতো পশ্চিম পাকিস্তান। পুবের ব্যবসাটা বাণিজ্যটা ফলটা সুফলটা পশ্চিমের পেটে। এ ক’দিন আর সয়! মুসলমানে মুসলমানে যুদ্ধ হল। শেষে, বাঙালি একটা দেশ পেলো।

ভীষণ আবেগে দেশটাকে একেবারে ধর্মনিরপেক্ষ, সমাজতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক ইত্যাদি চমৎকার শব্দে ভূষিত করলো। ক’জন মানুষ ওই শব্দগুলোর মানে বুঝতো তখন? এখনই বা কতজন বোঝে? বোঝেনি বলেই তো চল্লিশ বছরের মধ্যেই দেশটা একটা ছোটখাটো পাকিস্তান হয়ে বসে আছে।

তসলিমা প্রশ্ন তুলেছেন, বিজয় উৎসব করার বাংলাদেশের কোনও প্রয়োজন আছে কি? আমার কিন্তু মনে হয় না। আসলে ঠিক কিসের বিরুদ্ধে বিজয়? পাকিস্তান আর বাংলাদেশের নীতি আর আদর্শ তো এক!

সত্যিকার বিরোধ বলে কি কিছু আছে আর? পাকিস্তানের ওপর নয়, বরং বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষের রাগ একাত্তরের মিত্রশক্তি ভারতের ওপর।

বিজয় দিবস করে খামোকাই নিজের সঙ্গে প্রতারণা না করলেই কি নয়! ১৬ ডিসেম্বরে নয়, বাংলাদেশ বরং ১৪ই আগস্টে উৎসব করুক। পাকিস্তানের জন্মোৎসব করুক ঘটা করে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *