ইসলামী জঙ্গীদের লালনকারি ও তাদের সমর্থনে বাংলাদেশের ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা ড. মুহম্মদ ইউনুস তাঁর “মেটিকুলাস ডিজাইন” এখনো সমানতালে চালিয়ে যাচ্ছেন। আর নানা কায়দায় সেই ডিজাইন বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই তিনি এখনো অবৈধভাবে বাংলাদেশের ক্ষমতা ধরে রাখতে পেরেছেন।
এজন্য অবশ্য বাংলাদেশে একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামী-হিযবুত তাহরীরসহ অন্য ইসলামী জঙ্গী সংগঠন ও সশস্ত্র বাহিনী ও সেই বাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগের একটি বড় অংশ তাঁকে বেশ সহযোগিতা করে যাচ্ছে।

অবশ্য এই ডিজাইন বাস্তবায়নে পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই ও তুরস্কের এরদোগান সরকারের হাত রয়েছে তা নানাভাবেই উঠে এসেছে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে।
বাংলাদেশে এই “মেটিকুলাস ডিজাইন” শব্দটির বহুল প্রচলনের জন্য অবশ্য শান্তিতে নোবেল সংগ্রহ করা ইউনুসের অবদান (!) সবচেয়ে বেশি। গত ২০২৪ এর ৮ আগষ্ট বিদেশ থেকে উড়ে এসে বাংলাদেশের ক্ষমতায় জুড়ে বসা এই ইউনুস যে তাঁর ক্ষমতাকে আরো দীর্ঘায়িত করতে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র পটিয়সী তা তার নানামুখী কাজ দেখলেই বোঝা যায়।
আগামী ২০২৬ এর ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও “গণভোট” করার জন্য তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে বটে কিন্তু তা যাতে না হয় সেজন্য অত্যন্ত পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের কর্মকান্ড চালানো হচ্ছে।
একেক সময় একেক নাটক বা সিনেমা হাজির করানো হচ্ছে জাতির সামনে। আর আমরা হুজুগে জাতি তাতেই মেতে থাকি। কয়েকদিন আগে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সংকটাপন্ন অবস্থা নিয়ে নাটক মঞ্চস্থ করা হলো। তবে সে নাটকের সমাপ্তি এখনো হয়নি। সেটির কিছুটা বিরতি চলছে।
সিনেমার পর্দায় যেমন আগে আমরা দেখতে পেতাম কিছুক্ষণ পর্দা সচল থাকার পর হঠাৎ বেল বেজে উঠতো আর পর্দায় ভেসে উঠতো “বিরতি”। ঠিক তেমনিই চলছে বাংলাদেশের রাজনীতি। অবশ্য সে রাজনীতি আপন গতিতে চলছেনা, চাবি দিয়ে ঘুরানো হচ্ছে।
ইন্টেরিম প্রধান ড. ইউনুস, তাঁর পারিষদগণসহ বিএনপি- জামায়াত- এনসিপিসহ সবারই অভিযোগ নির্বাচনকে বানচাল করতে হাদী’র ওপর হামলা করা হয়েছে। একে অপরকে দোষারোপের প্রতিযোগিতা এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে।
নির্বাচন যদি না হয় তাহলে কিন্তু আখেরে ফায়দা লুটবে ইউনুস নেতৃত্বাধীন ইন্টেরিম ও জামায়াতে ইসলামী। কারণ জামায়াতে ইসলামী এরই মধ্যে বলতে গেলে প্রশাসনের বিভিন্ন জায়গা শুধু দখল করেনি, তারাই নিয়ন্ত্রণ করছে অত্যন্ত কৌশলে।
সুতরাং তারা কেন ভোটের পক্ষে থাকবে? দেশের মধ্যে এমন অরাজক-নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে “নির্বাচনের পরিবেশ নেই” বলে নির্বাচন না দিয়ে ক্ষমতাকে আরো দীর্ঘায়িত করার ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ করছে ইউনুস।
খালেদা প্রসঙ্গ আপাতত চলে গেছে কিছুটা অন্তরালে। এজন্য হাজির করা হয়েছে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যাচেষ্টার বিষয়টিকে।
শুক্রবার ( ১২ ডিসেম্বর) এমনভাবে তাকে দিনদুপুরে গুলি করানো হয়েছে যে সারাদেশের জনগণের দৃষ্টি চলে গেছে সেদিকে।এমন সুকৌশলে ঘটনাটি ঘটানো হয়েছে যে যাতে করে একটি প্রচন্ড ধোঁয়াশা তেরী করা যায়। টার্গেট কিন্তু বিএনপি ও আওয়ামীলীগ। আওয়ামীলীগতো প্রকাশ্যে অনুপস্থিত দেশে।
সুতরাং এক্ষেত্রে ঢাকা-৮ সংসদীয় আসনে বিএনপি প্রার্থী মির্জা আব্বাস ও বিএনপিকে বেকায়দায় ফেলানোর চেষ্টা চলছে। এরই পাশাপাশি চলছে আওয়ামীলীগ ও ভারত বিরোধিতা।
কারণ হাদি তাঁর ইনকিলাব মঞ্চ থেকে বার বারই আওয়ামীলীগ-শেখ হাসিনা ও ভারতকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করে মাঠ গরম রাখতো। এটি আসলে অনেকটা রাস্তার ফুটপাথে দাঁড়িয়ে যেমন ক্যানভাসাররা নানা ধরনের প্রলোভন ও রসাত্মমূলক কথা বলে পথচারিদের দৃষ্টি কাড়ার চেষ্টা করে থাকে ঠিক তেমনই এই হাদী ও ইনকিলাব মঞ্চের কাজ।
তবে এই হাদীকে কিন্তু জামায়াতে ইসলামী নানাভাবেই প্রেট্রোনাইজ করেছে। তাদের কাজে লাগিয়েছে। কিন্তু যখন দেখলো যে সেই হাদী তাদের জন্য কিছুটা সমস্যার সৃষ্টি করছে ঠিক সেই মোক্ষম সময়ে তাকে সরিয়ে দিতেও দ্বিধা করেনি।

আসলে এটিই জামায়াতের নীতি।
ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েমকে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা- ৮ আসন থেকে দাঁড় করাতে চায়। সেক্ষেত্রে এই পক্ষের ভোট কাটবে হাদী। তাই তাকে সরিয়ে দিয়ে হলেও সাদিক কায়েমের রাস্তা পরিষ্কারের প্ল্যান করেছে সেনা গোয়েন্দা সংস্থা ও জামায়াত।
তারই নীলনকশা অনুযায়ী গত শুক্রবার ( ১২ ডিসেম্বর) হাদীকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্য মেটিকুলাস ডিজাইন অনুযায়ী কাজ হয়েছে।
ঘটনাক্রম একটু বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায় বিষয়টি। ঘটনার পর পরই ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে অভ্যুত্থানের ডাক দিয়ে প্রমাণ করেছে ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় জামায়াতে ইসলামী তার ‘আপন মায়ের পেটের ভাই’কেও এক বিন্দু ছাড় দেয়নি, দেবেওনা।
কিন্তু হাদী ‘নেপথ্য কারিগর’ হিসাবে যাকে অভিযুক্ত করে নানা শ্লোগান ও বক্তব্য দেয়া হয়েছে, সেই মির্জা আব্বাস হাসপাতালে হাদীকে দেখতে দিয়ে অপমানিত হওয়ায় প্রমাণ হয়েছে বিএনপিকে শিগগিরই লীগের কাতারে ঠেলে দেবে ইন্টেরিমের ‘আসল’ স্টেকহোল্ডাররা। কারা সেই স্টেকহোল্ডার?
অবশ্যই জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি’র মত দল ও একই মতের লোকজন। কারণ গত চব্বিশের কথিত জুলাই অভ্যুত্থান ও এর সঙ্গে জড়িতদের প্রতি সাধারণ জনগণের আস্থা অনেকটাই কমে গিয়েছে। তাই সেই কথিত জুলাই স্পিরিটকে ধরে রাখারও একটি চেষ্টা করেছে জামায়াত ও ইউনুস সরকার।
অথচ দোষটি দেয়া হলো বিএনপি-আওয়ামীলীগ ও ভারতের ওপর। কিন্তু আওয়ামীলীগ এখন মাঠ ছাড়া, লীগের যদি ঐ ক্ষমতা থাকতো, হাদিরে গুলি করবে, তাইলে, লীগ এতক্ষণে ইউনুসের দপ্তর ‘যমুনা’ দখল করে ফেলতো।
ঢাকা-৮ এ হাদীর প্রতিদ্বন্দ্বী কে? সাদিক কায়েম আর মির্জা আব্বাস! হাদীর উপর গুলি চালানোতে আংগুল কার দিকে সবচেয়ে বেশি উঠছে? মির্জা আব্বাসের উপর। তাহলে ঠিক এই মুহুর্তে যদি ভোট হয়, কার কাছে ভোট যাবে, সাদিক কায়েম আর মির্জা আব্বাসের মধ্যে? ঠিক ধরসেন, “সাদিক কায়েমের ব্যালটে”।
যেই সাদিক কায়েম বছরের পর বছর লীগের লুংগীর তলায় শিবির করতে পারে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে গণঅভ্যুত্থান করছে বলেই, হাদীকে অন্যদের থেকে আলাদা মনে করে ফ্লোর দেবে এটা ভাবাটাও তো বোকামী। নির্বাচনের মাঠে হাদী কিন্তু সাদিক কায়েমের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে যেতো।

সত্যিকার অর্থেই জামায়াত- শিবিরের এমন সুচতুর বুদ্ধির ধার কাছে কেউ নেই। আওয়ামীলীগতো নেই জামায়াত-.শিবির খুব ভালো মতো জানে, জড়ায় ধইরা বুকে টাইনা নিয়ে ছুড়িটা পিঠে কেমন মারতে হয়। এক্ষেত্রে ঠিক তাই করেছে এরা।
যে মাসুদের ছবি-ভিডিও শিবির নেতা ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমের সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভেসে বেড়াচ্ছে তাতে তো আর নতুন করে বলে দেয়ার অপেক্ষা রাখেনা।
দেশী- বিদেশী সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলো “হাদী” বা “মাসুদ” ধরণের “রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত” দেরকে নানাভাবে-নানা আঙ্গিকে মজুত রাখে সবসময় তাদের (জামায়াতের) প্রয়োজনে।
“প্রাক্তন ছাত্রলীগ ” এর ব্যানারে হাসনাত-সার্জিস-ফরহাদ-সাদিকদের মতো “সুতো” যেমন এই “সংস্থা” গুলোরই হাতে, তেমনি “হাদী” “মাসুদ” দের সুতোও। ” মেটিকুলাস ডিজাইন ” এ বিরাজনীতিকরণের ফর্মুলা-২ বাস্তবায়ন হচ্ছে। পরের করনীয়গুলো সম্পর্কেও তাদের জানা। ব্যানার কিন্তু ” “প্রাক্তন ছাত্রলীগ ” অথবা “র”ই হবে।
কিছুদিন আগে রাজধানীর “আদাবরের ডাকাতি” ঘটনার পরে আটক অস্ত্রধারী “মাসুদ” কে জামিন করিয়েছে কারা ? জামিনের পরে মাসুদকে “হাদী” গংএর সঙ্গে ভিড়িয়েছে কারা? রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও বিরাজনীতিকরণের লক্ষ্য পূরণ করতে জামায়াত ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো হয়তো আরো অনেক ডিজাইন করে রেখেছে।
হাদীকে ওপর হামলাকারিকে গ্রেপ্তারে ইতিমধ্যেই ৫০ লাখ টাকা ঘোষণা করা হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। তার মানে কি হামলাকারিকে আড়াল করে ফেলা হয়েছে ইতিমধ্যেই!

গত চব্বিশের কথিত জুলাই অভ্যুত্থানের পেছনে অন্যতম ক্রীড়ানক আদিলুর রহমান। তার একটি মানবাধিকার ব্যবসার দোকান রয়েছে “ অধিকার “ নামে।আদিলুর রহমান আবার ইউনুস ইন্টেরিমের অন্যতম উপদেষ্টা।
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে গুলির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন অধিকার। আজ শনিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শরিফ ওসমান হাদির ওপর হামলা আসন্ন নির্বাচনকে বানচাল করার একটি হীন চেষ্টা।
হামলার সঙ্গে জড়িত সব অভিযুক্তকে দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তার এবং ঘটনার একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
এই আদিলুরের “অধিকার” যদি কিছু বলে তার পেছনে অবশ্যই কিছু কারণ থাকে। এক্ষেত্রেও তাই। গত চব্বিশের কথিত গণ অভ্যুত্থানে আদিলুরের এই অধিকারের মাধ্যমেও শত শত কোটি টাকা বিলিবন্টন হয়েছে এই “জঙ্গী ক্যু” এর স্টেকহোল্ডারদের কাছে।
মেটিকুলাস ডিজাইনে অংশ হিসেবে ইউনুসের নির্দেশ অনুযায়ী ইতিমধ্যে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা আবার অপারেশন ডেভিল হান্ট চালু করার ঘোষণা দিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে আওয়ামীলীগ সমর্থকদেরই যে শুধু ধরা হবে, কারাগারে পাঠানো হবে তা কিন্তু নয়, বিএনপি’র লোকজনও বাদ না পড়ার সম্ভাবনা আছে।
এমনিতেই আওয়ামীলীগ সমর্থিত লোকজন আওয়ামীলীগকে ছাড়া ভোটে অংশ নেবেনা। তার উপর এই অবৈধ সরকারের অধীনে নির্বাচন যে কেমন নির্বাচন হবে( যদি তা হয়) তাও লোকজন বুঝে নিয়েছে।
কয়েকদিন আগে মুহাম্মদ ইউনুস বলেছিলেন, একটি ঐতিহাসিক- অভূতপূর্ব নির্বাচন হবে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ের এইসব আলামত জানিয়ে দিচ্ছে গত সতের মাসের নৈরাজ্য-জঙ্গী সন্ত্রাস এখন সেকেন্ড গিয়ারে বুস্টআপ হয়েছে। সামনের দিনগুলোতে যা জনগণের জন্য একই সঙ্গে শঙ্কার এবং চরম অনিশ্চয়তার দুঃসহ দিন হিসেবে আসছে।
# রাকীব হুসেইন: লেখক, প্রাবন্ধিক।
