বাংলাদেশের সমসাময়িক ঘটনাবলী দেখে দেশ থেকে নির্বাসিত কবি-সাংবাদিক দাউদ হায়দারের কথা মনে পড়ে গেল।

কবিতাটি হলো-

জন্মই আমার আজন্ম পাপ, মাতৃজরায়ু থেকে নেমেই জেনেছি আমি
সন্ত্রাসের ঝাঁঝালো দিনে বিবর্ণ পত্রের মত হঠাৎ ফুৎকারে উড়ে যাই
পালাই পালাই সুদূরে..

..মরণ এসে নিয়ে যাক, নিয়ে যাক
লোকালয়ের কিসের ঠাঁই এই শত্রুর?
-বলে
প্রাসাদ প্রেমিকেরা
আমিও ভাবি তাই, ভাবি নতুন মডেলের চাকায় পিষ্ট হবো
আমার জন্যই তোমাদের এত দুঃখ
আহা দুঃখ
দুঃখরে!
আমিই পাপী, বুঝি তাই এ জন্মই আমার আজন্ম পাপ।।

কেউ কেউ হয়তো বলতে চাইবেন আলোচনায় আবার কবিতা কেন? এই কবি দাউদ হায়দার সেই যে ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ থেকে নির্বাসিত হয়েছিলেন আর ফিরতে পারেননি। অপরাধ ছিল কথিত ধর্মীয় অবমাননা।

তখন কিন্তু এ রাষ্ট্রের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আমল। তখনও সেই কথিত ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগই শুধু নয়, এক কাপড়ে বিদেশে পাঠিয়ে দেয়া হলো এই প্রথাবিরোধী কবি দাউদ হায়দারকে। মানে তাঁকে বহিষ্কার করা হলো তাঁর প্রিয় জন্মভূমি থেকে।

এ বছর ২৬ এপ্রিল তিনি জার্মানীর বার্লিনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

আরেকজন আলোচিত-মানবিক কবি-প্রাবন্ধিক তসলিমা নাসরিনও এই কথিত ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে নিজ মাতৃভূমিহারা। আর ফিরতে পারেননি তিনি। তসলিমা নাসরিন মূলত ১৯৯৪ সাল থেকে নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন, যখন তাঁর নারীবাদী ও ধর্মীয় সমালোচনামূলক লেখার কারণে সৃষ্ট বিতর্কের মুখে তিনি বাংলাদেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন।

এরপর তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, যেমন ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, এবং পরে ভারতে (২০০৪ সাল থেকে) বসবাস করেছেন, কিন্তু তাঁর নির্বাসিত জীবন এখনো চলছে।

বাংলাদেশে ইসলাম ধর্মের এত বেশি আতিসহ্য ও প্রভাব যে এখানে অতি তুচ্ছ কিছু নিয়েও এই ধর্মের অবমাননা হয়ে যায়। আসলে তাদের কাছে এই পবিত্র ধর্ম বিষয়টি এতই ঠুনকো যে সামান্য কিছু হতে না হতেই এ যেন ভেঙ্গে পড়ে।

নিজেদের ঈমান যদি ঠিক না থাকে তাহলে সেই বিষয় নিয়ে অপরকে দোষ দিয়েইতো নিজের চরম অক্ষমতা- দুর্বলতা ঢাকতে চায়।

সত্যিকার অর্থে এই অবমাননা যে কিভাবে হয় সেটাই বোধগম্য নয় আমার কাছে। কারণ নিজের বিশ্বাস নিয়েই এরা চরম দোদুল্যমানতায় থাকেন। কারণ ওই যে বললাম ঈমান ঠিক নেই। যদি তা দৃঢ় থাকতো তাহলে এই সুযোগ সন্ধানী গোষ্ঠী কথায় কথায় এই “ধর্মীয় অবমাননা” র খোঁড়া অজুহাত খুঁজতোনা।

তাদের কাছে ধর্ম কি এতই ঠুনকো যে কথায় কথায়, কারণে বা অকারণে তা অবমাননা হয়? সত্যিকার অর্থে তারা কি ধার্মিক? এই তথাকথিত ধর্মীয় বিষয় নিয়ে বাংলাদেশে স্বাধীনতা উত্তর সময় থেকে অদ্যাবধি হেন কোন অঘটনসহ অমানবিক অপকর্ম ঘটেনি?

অতি সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের ময়মনসিংহের ভালুকায় দীপু চন্দ্র দাস নামে এক পোশাক শ্রমিকের বিরুদ্ধে এই কথিত ধর্মীয় অবমাননার ভুয়া অভিযোগ তুলে যে নৃশংসতায় তাঁকে খুন করা হলো তা নিশ্চয়ই কোন সভ্য সমাজের অংশ নয়।

অবশ্য ড. ইউনুসের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ কোনভাবেই যে সভ্য সমাজের অংশ নয় তা বোঝা যাচ্ছে নানা কাজ ও আচরণে। কিন্তু ইসলামী জঙ্গী বেষ্ঠিত ইউনুসের ইন্টেরিম সরকার তাদেরকে অনেক বেশি সভ্য সরকার বলে দাবিকরে আসছে।

আমাদের দেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন গত ২১ ডিসেম্বর প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেছেন, “দীপু চন্দ্র দাস একজন বাংলাদেশি নাগরিক। একজন বাংলাদেশি নাগরিক নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন। এটার সঙ্গে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার বিষয়টি একসঙ্গে করে ফেলার কোনো মানে হয় না।”

এই বক্তব্য আমাকে গভীরভাবে বিচলিত করেছে- এমনটাই মন্তব্য করেছেন সমাজ সচেতন ব্যক্তিত্ব অজয় দত্ত। তিনি বলেছেন, হ্যাঁ, দিপু চন্দ্র দাস একজন বাংলাদেশি নাগরিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তিনি কেন মারা গেলেন? কোন অভিযোগে? কোন পরিচয়ের কারণে তাকে জনতার হাতে তুলে দেওয়া হলো? যখন কাউকে মিথ্যা ধর্ম অবমাননার তকমা লাগিয়ে হত্যা করা হয়, তখন সেটি কেবল একজন নাগরিকের মৃত্যু নয়, এটি সরাসরি সংখ্যালঘু নিরাপত্তার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

কারণ এই ধরনের অভিযোগ বাস্তবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে, তাদের কণ্ঠ রোধ করতে, ভয় দেখাতে।

সংখ্যালঘু নিরাপত্তার প্রসঙ্গ আলাদা করে ফেললে মূল বাস্তবতাই অস্বীকার করা হয়। কারণ একজন মানুষকে তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে টার্গেট করা হলে, সেটি নিছক অপরাধ থাকে না,তা হয়ে ওঠে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।

এই বক্তব্য যেন ইঙ্গিত দেয়, পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ নয়, প্রেক্ষাপটও নয়, শুধু একটি মৃত্যুকে সংখ্যায় নামিয়ে আনলেই দায়িত্ব শেষ। কিন্তু আমরা তা মেনে নিতে পারি না।

দীপু দাস কেবল একজন “নাগরিক” ছিলেন না, তিনি একজন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ, যাকে ধর্মের নামে অপবাদ দিয়ে হত্যা করা হয়েছে,এই সত্য অস্বীকার করলে ভবিষ্যতে এমন হত্যার পথ আরও প্রশস্ত হয়। আমরা বিভাজন চাই না। আমরা বিদেশে দেশকে হেয় করতে চাই না। কিন্তু সত্য আড়াল করেও রাষ্ট্র রক্ষা হয় না।

সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার প্রশ্ন আলাদা নয়, এই প্রশ্নই একটি রাষ্ট্রের নৈতিকতা ও সভ্যতার মানদণ্ড। এই সত্য স্বীকার না করা পর্যন্ত ন্যায়বিচারের পথে অগ্রগতি সম্ভব নয়।

গত ১৮ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার রাতে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে ভালুকার জামিরদিয়া পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস বিডি লিমিটেড কোম্পানির শ্রমিক দিপুকে (২৮) পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর তার লাশ গাছের ডালের সঙ্গে বেঁধে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারা হয়।

মধ্যযুগেও এ ধরনের নৃশংস-নির্মম-পৈশাচিক-চরম অমানবিক ঘটনা ঘটেছে বলে জানা নেই। হতভাগ্য-গরীব চাকরিজীবী দীপু তারাকান্দা উপজেলার মোকামিয়া কান্দা গ্রামের রবি চন্দ্র দাসের ছেলে।
দীপু দাস রাজনীতি করে ভাত খায় না, কাজ করে খায়।

মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উপার্জন করা এক শ্রমিকের নাম দীপু দাস।দীপু দাস বাংলাদেশের প্রায় ২ কোটি ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অত্যাচার ও নির্যাতনের একটি প্রতিচ্ছবি মাত্র। ২৫ বছর বয়সী দীপু দাসের অপরাধ তিনি হিন্দু।

প্রতিবন্ধী মা – বাবা , স্ত্রী সন্তানের পরিবারের মুখে আহার তুলে দেওয়া একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি দীপু।ধর্ম অবমাননার অভিযোগে হত্যা এই দেশে ধর্মীয় মৌলবাদীদের এক ভয়ানক অস্ত্র। অথচ পক্ষান্তরে ওসমান গণি হাদীরা এই মৌলবাদী জঙ্গীদের প্রতিনিধিত্ব করেছে ও করছে।

এই হাদীদের কিন্তু উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অর্থাৎ অর্থনৈতিক উৎপাদন বা অবদানের সঙ্গে জড়িত থাকার কোন প্রমান নেই। ছিল বাংলাদেশ নামক একটি রাষ্ট্র ধ্বংসের সঙ্গে জড়িত থাকার সমস্ত উপাদান।

কিন্তু সেই হাদীকে ধর্মীয়-জঙ্গীবাদের কারনে, একটি রাষ্ট্র ধ্বংসের প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বশীল ভূমিকা রাখার কারনে রাষ্ট্রীয় শহীদী মর্যাদা, বীরের মর্যাদা দেয়া হয়। আর দীপু’র ভাগ্যে জোটে কথিত ধর্মীয় অবমাননার অপমান!

এই তো আমাদের ৩০ লাখ শহীদ আর ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত স্বদেশ। আমাদের বাংলাদেশ।

সংবাদ মাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যতটুকু জেনেছি- দীপু দাসের বাবা রবিলাল দাস বলেছেন , “ওর গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।পোড়া দেহ বাইরে ফেলে রাখা হয়েছিল অনেকক্ষণ। দৃশ্যটা ছিল বিভীষিকাময়।”

যারা দীপু দাসকে হত্যা করেছে এরা জামায়াত শিবির, হেফাজত , ইনকিলাব মঞ্চ ও জাতীয় নাটক পার্টি এনসিপির উগ্র মৌলবাদী মতাদর্শের অনুসারী। ওসমান হাদী এই জঙ্গিবাদী আদর্শ নিজের মনের মধ্যে লালন করতেন।

মানুষ কীভাবে পশু হয় তা জানতে হলে ওসমান হাদীর ইতিহাস জানতে হবে। মানুষের মত দেখতে হলেও মানুষ যে মানুষ হয় না , এসব বুঝতে বিবেক লাগে। যাদের বিবেক নেই তাদের নরপিশাচ হাদীকে চেনার কথা নয়।

দীপু দাস নিজের পরিবারের সদস্যদের মুখে আহার তুলে দিতে ময়মনসিংহ শহরের পাইওনিয়ার নিট কম্পোজিট কারখানায় কাজ করতেন। অপরদিকে হাদী নিজের পেট ভরার জন্য পুঁজি হিসেবে গ্রহণ করেছেন ধর্মীয় রাজনীতি নামক ধান্দাবাজির শিল্পকে।

২০২৪ সালে গদি দখল করে মানুষ হত্যা ও লুটতরাজ করার জন্য প্রধান উপদেষ্টা ইউনুস জার্মানির হিটলারের আদলে জামায়াত শিবির নামক এক গেস্টাপো বাহিনী গড়ে তুলেছেন।

জার্মানির নাৎসি বাহিনীর আদলে তিনি বানিয়েছেন এনসিপি ইনকিলাব মঞ্চ। ইউনূসের অনুসারী ইনকিলাব মঞ্চের নেতা হচ্ছেন ওসমান গণি।নাম পাল্টে রেখেছেন ওসমান হাদী।

বাংলাদেশ দেখে এখন আর বাংলাদেশ মনে হয় না। এটা যেন জঙ্গি পাকিস্তানের আদলে গড়ে তোলা সেই পূর্ব পাকিস্তান। এই ইনকিলাব মঞ্চ হাদীর মৃত্যুকে পুঁজি করে ছায়ানট ও উদীচী কার্যালয়ে আগুন দিয়েছে। ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বরে বঙ্গবন্ধু যাদুঘরসহ ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর কার্যালয়ে আগুন দিয়েছে, ভাংচুর ও লুটপাট করেছে।

তথাকথিত জঙ্গি মিনি পাকিস্তান ও সোমালিয়ার মত দুর্ভিক্ষ ও জঙ্গিদেশে পরিণত হয়ে যাওয়া বাংলাদেশে ওসমান হাদী ও তার অনুসারীদের জন্য যেন সাত খুন মাফ। এদের অপরাধের কোন বিচার নেই!

এমনকি বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুলের ইসলামের কবরের পাশে হাদীর কবর! এসব শুনে ও দেখে এখনও আমি খিল খিল করে হাসছি।

চট্টগ্রামের রাউজানে বিগত কয়েকদিন ধরে, ঘরের দরজার বাইরে তালা দিয়ে গভীর রাতে রাউজানে সংখ্যালঘুদের বাড়ীতে অগ্নিসংযোগ করে যাচ্ছে কিছু সংখ্যক দুষ্কৃতিকারী।

রাউজানের পৌর এলাকা, চিকদাইর, সুলতানপুর, ডাবুয়া,গুজরা সহ হিন্দু বাড়ী,বড়ুয়া বাড়ী,ধর্মীয় উপাসনালয়ে ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বসত বাড়ীতে রাতের আধারে পরিকল্পিত ভাবে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। আগুন দেয়ার সময় তাদের মৃত্যু নিশ্চিত করতে বাহির থেকে দরজা তালাবন্ধ করে দেয়া হচ্ছে অথবা শিকল দিয়ে দেয়া হচ্ছে যাতে ঘর হতে কেউ বের হতে না পারে যা অত্যন্ত অমানবিক।

এমন ঘটনা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানাচ্ছে। রাত হলে সংখ্যালঘু পরিবারগুলো মধ্যে নেমে আসছে চরম আতংক ও মৃত্যুভীতি। আগুনে পুড়ে সহায় সম্বলহীন পরিবারগুলো মানবেতর দিন যাপন করে যাচ্ছে।

দুষ্কৃতিকারীদের এহেন কর্মকাণ্ড শক্ত হাতে দমনে প্রশাসনের প্রতি জোর দাবী জানিয়েছেন রাউজানের বাসিন্দা ও চিকিৎসক অধ্যাপক জয়ব্রত দাশ।

এতসব অন্যায়-অত্যাচার-বৈষম্যের যাঁতাকলে পিষ্ঠ হতে হতে তাতেই বাধ্য হয়ে রাগে-ক্ষোভে-দুঃখে শিশির ভট্টাচার্য লেখেন- মুসলমান তুমি, পাকিস্তান চাও, চাইতেই পারো; আমি হিন্দুকে কেন কোলকাতায় ডাইরেক্ট অ্যাকশনে খুন হতে হবে?

মুসলমান তুমি, পাকিস্তান অটুট রাখতে চাও, চাইতেই পারো; ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ — একের পর এক রায়টে আমি হিন্দুকে কেন মরতে হবে? জন্মভূমি ছেড়ে কেন ভারতে রিফিউজি হতে হবে আমি হিন্দুকেই?

১৯৬৪ সালে কাশ্মীরে হজরত বাল মসজিদে ক’গাছা কুন্তল চুরি গিয়েছিল, যেতেই পারে, পূর্ব পাকিস্তানে আমি হিন্দুর উপর কেন হামলা হবে একের পর এক?

মুসলমান তুমি, স্বাধীনতা চাও, চাইতেই পারো, আমি হিন্দুকেই কেন সবার আগে মরতে হবে ১৯৭১-এ? আমারই কেন সম্ভ্রমহানি হবে? কেন ঘরবাড়ি পোড়ানো হবে প্রধানত আমারই? আমাকেই কেন সব হারিয়ে শরণার্থী হতে হবে ভারতে?

আমি হিন্দু দেশভাগও চাইনি, স্বাধীনতাও চাইনি! আমি শুধু জন্মভূমিতে শান্তিতে নিঃশ্বাস নিতে চেয়েছিলাম; শান্তি তুমি দিলে না, শেষ নিঃশ্বাসটা যদিও ফেলতে দিলে!

২০০১ সালে আওয়ামীলীগ নির্বাচনে হারবে, খেলায় হার-জিততো আছেই, আমি হিন্দু কেন আক্রান্ত হবো বার বার, প্রতিবার আওয়ামীলীগ পরাজিত হলেই?

তুমি মুসলমান, শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটাবে তুমি মেটিকুলাস ডিজাইনে। যা কিছুর উত্থান হয়, পতন তার হতেই পারে। তাই বলে আমি হিন্দুর উপর কেন হামলা হবে? আমার বাড়ি কেন পুড়ে যাবে?

কেন, কেন, কেন… এবং কেন?
এত শত অভিযোগ করছো বাংলাদেশে সংখ্যাগুরু মুসলমানের বিরুদ্ধে।তুমি কে বট হে?

আমার নাম যতন সাহা। আট বছরের ছেলের সামনে বেঘোরে পিটিয়ে মারা হয়েছিল আমাকে কয়েক বছর আগে, দূর্গাপূজার অষ্টমীর দিন। তখন অবশ্য হাসিনা সরকার ছিল। ভুলে গেছো, তাই না? ভুলে যাবার কথা!

ঠিক আছে, নাম বদলে দিলাম, আমি দীপু চন্দ্র দাস। গার্মেন্টস কর্মী। মাত্র কয়েক দিন আগে, গত ১৮ই ডিসেম্বর, ২০২৫ আমাকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছে গাছে ঝুলিয়ে।

হ্যাঁ হ্যাঁ, ফেসবুকে দেখেছি বটে। সেই তুমিই মরার পর অসীম সাহসে এত কেন কেন করছো? আচ্ছা, কী চাও বলতো তুমি আমার কাছে?

তেমন কিছু না।

আমার অল্পবয়সী বিধবা বৌ-টা, পক্ষাঘাতগ্রস্ত বাবা আর বছর খানেকের মেয়েটাকে গিয়ে বলো, মরে গিয়ে খুব ভালো আছি আমি।জ্যাকেটটা আগুনে পুড়ে গেছে, কিন্তু পৌষ মাসের এই দারুণ শীতেও একটুও ঠাণ্ডা লাগছে না আমার। ওরা যেন কিছুমাত্র চিন্তা না করে আমার জন্য।

বুঝিয়ে বলো ওদের: বাংলাদেশে যে হিন্দুরা মরে যায়, মরে গিয়ে আসলেই তারা খুব ভালো থাকে, খুব, খুউব ভালো থাকে !

তাই কবি দাউদ হায়দারের ভাষায় আবারও বলি- জন্মই আমার আজন্ম পাপ।

#রাকীব হুসেইন: লেখক, প্রাবন্ধিক।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *