আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাযুদ্ধে যে আলবদর বাহিনী বাঙ্গালী জাতিকে মেরুদন্ড ও বুদ্ধিহীন করার জন্য বুদ্ধিজীবী হত্যায় মেতে উঠেছিল তারা ছিল পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন। যার নাম ছিল ইসলামী ছাত্র সংঘ। এদের দিয়েই তখন গড়ে তোলা হয়েছিল কুখ্যাত আলবদর বাহিনী।
বাঙ্গালী জাতির শ্রেষ্ট সন্তান বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিল এই আলবদর বাহিনীর ক্যাডাররা। তারই বাংলাদেশী সংস্করণ হলো ইসলামী ছাত্র ছাত্র শিবির।
জামায়াতে ইসলামী মূলত তাদের এই ছাত্র শিবিরের মাধ্যমেই আজকে এমন দৃঢ় সাংগঠনিক ও ক্যাডার ভিত্তিক অবস্থায় পৌঁছেছে। বলা চলে ইসলামী ছাত্র শিবিরই জামায়াতের মূল শক্তি। এই তরুণ ক্যাডারদেরকে নানাভাবে কাজে লাগিয়েই জামায়াত তার রাজনৈতিক সাফল্য আনতে পেরেছে।
গত ২০২৪ এর ৫ আগষ্ট আওয়ামীলীগ সরকারকে দেশি-বিদেশী প্যান-ইসলামিক ক্যু এর মাধ্যমে পতন ঘটানো হয়। এই ক্যু’ এর অন্যতম সহযোগী ছিল কিন্তু ছদ্মবেশী শিবির।
যারা ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের মধ্যে গিরগিটির মত রংবদলে অবস্থান করছিল। একসময়ে ঠিকই তাদের সেই চেহারা দেখতে পেয়েছেন দেশবাসী। এরা পারেনা হেন কোন কাজ নেই।
চব্বিশের ৫ আগষ্টের পর মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষকদের অপমান করা, বিভিন্ন পদ থেকে শিক্ষকদের পদত্যাগে বাধ্য করানোর ঘৃণ্য কাজেও ছিল এই শিবির।
যে শিক্ষককে বাংলাদেশে এতদিন মা-বাবার পরেই স্থান দিতো শিক্ষার্থীরা সেই শিক্ষকদেরকেই চরমভাবে অপমানিত করেছে আওয়ামীলীগ ট্যাগ লাগিয়ে। অধিকাংশ জায়গাতেই এই কাজটি করেছে এই শিবির অত্যন্ত সুকৌশলে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েও গত ১০ জানুয়ারি এক শিক্ষকের ওপর যে নগ্ন হামলার মত ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছে শিবির তাতে তাদের স্বরূপ উন্মোচিত হয়ে গেছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেই শিবির ক্যাডাররা তাদের অস্ত্রের জোরে অনেক হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। আহত হয়েছে হাজার হাজার শিক্ষার্থী। পঙ্গুত্ব বরণ করেছে অনেকে।

এই শিবির ক্যাডাররা যে কেমন ভয়ংকর ও পৈশাচিক তা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক দুই শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকের মন্তব্য থেকেই বুঝতে পারবো।
কানাডা প্রবাসী সাংবাদিক সওগাত আলী সাগর লেখাপড়া করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি চট্টগ্রামে অবস্থান ও এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় স্বচক্ষে দেখেছেন জামায়াত-শিবিরের তান্ডব। কিভাবে তারা মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করে।
যেহেতু তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে থাকতেন তাই তার শিবির নামক একটি ফ্রাঙ্কেনষ্টাইনের সেসব নারকীয় সন্ত্রাস দেখার সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য নিশ্চয় হয়েছে। নব্বইয়ের দশকের সেসব ভয়াবহ ও জীবন হাতে নিয়ে ক্যাম্পাসে থাকা সওগাত আলী সাগর নিশ্চয়ই ভুলে যাননি সেসব ভয়াল দিনের কথা।
নারায়ে তকবির আল্লাহু আকবর শ্লোগান তুলে রোদে ঝলসে ওঠা লম্বা ধারালো কিরিচ দিয়ে জাতীয় ছাত্র সমাজের নেতা হামিদের হাত কেটে ফেলেছে। আর এ নৃশংস ঘটনা ঘটাতে পেরে তাদের যে কি বিজয়-উল্লাস নৃত্য ছিল তখন !
সে সময়ের চবি শিক্ষার্থী সওগাত আলী সাগর এই নারকীয় দৃশ্য দেখেছেন কিনা জানিনা, তবে আমি প্রত্যক্ষ্যদর্শীর এক বয়ান থেকে এসব লিখছি। যার কাছ থেকে সেই রক্ত হিমকরা লোমহর্ষক ঘটনা শুনেছি তিনিও বলতে গিয়ে বার বার শিউড়ে উঠছিলেন।
ইসলামের নামে ছাত্র রাজনীতি মানে ব্যবসা করা ক্যাডারভিত্তিক এই ছাত্র সংগঠনটির সম্পর্কে বলতে গিয়ে সাগর তাঁর ফেইসবুকে লিখেছেন-
১. চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার মব সন্ত্রাস হয়েছে। সন্ত্রাস করেছে চাকসুর পদধারী ছাত্রশিবিরের নেতা। এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও একজন শিক্ষককে নাজেহাল করেছিলো ছাত্রশিবিরের নেতা।তিনিও ডাকসুতে নির্বাচিত। দুটি ক্ষেত্রেই আওয়ামীপন্থী শিক্ষক ট্যাগ দিয়ে শিক্ষকদের গায়ে হাত তোলা হয়েছে। ব্যাপারটা এমন – যেনো আওয়ামী লীগ করলেই কারো গায়ে হাত তোলা যায়, তাঁকে পেটানো যায়, এমনকি মেরে ফেলাও যায়।
২.ডাকসু, চাকসু, রাকসু নেতারা আইন হাতে তুলে নিয়ে শিক্ষকদের নাজেহাল করে ছাত্রদের প্রতিনিধিত্বশীল প্লাটফরমটাকে ছাত্রশিবিরের অপরাধ করার প্লাটফরমে পরিণত করে ফেলেছেন।
৩.আমরা সবসময়ই বলেছি, কারো বিরুদ্ধে সুষ্পষ্ট অভিযোগ থাকলে, প্রচলিত আইনে যথাযথ কর্তৃপক্ষ তার বিচার করবে, বিচারে দোষী সাব্যস্ত হলে শাস্তি দেবে। কিন্তু কোনো সংগঠন, কোনো ব্যক্তির কাউকে নাজেহাল করার, গায়ে হাত তোলার অধিকার নেই। এটি ক্রিমিনাল অফেন্স।
ডাকসু,রাকসু এবং চাকসুর পদধারী শিবির নেতারা ক্রিমিনাল অফেন্স করেছে। তাদের শাস্তি হওয়া উচিৎ।
৪.গত বছরের ৫ আগষ্ট পরবর্তী সময়ে সারাদেশে শিক্ষকদের যখন নাজেহাল করা হচ্ছিলো, পদত্যাগে বাধ্য করা হচ্ছিলো- তখনো আমরা বলেছিলাম- এটি ক্রিমিনাল অফেন্স। এই ক্রিমিনালিটি থামান।সরকারে তাতে কর্ণপাত করেনি। সারা দেশে শিক্ষকদের কি শিবির কর্মীরাই লাঞ্চিত করেছিলো?
৫. ভোটের মাঠে একটা কথা আজকাল বলতে শুনি- জামায়াতের শাসন তো আপনারা দেখেননি- একবার সুযোগ দিন। জামায়াতের শাসন কেমন হতে পারে- তার একটা ছোটো খাটো রিহার্সাল ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা।
ছাত্র সংসদের ক্ষমতা পেয়েই যে ক্রিমিনালিটি তারা দেখাতে শুরু করেছে, রাষ্ট্রের ক্ষমতা পেলে সেটি কতো তীব্র হয়ে সারা দেশে ফিরে আসবে তার নমুনা –
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ছাত্র শিবিরের সাম্প্রতিক মব সন্ত্রাস থেকে ধারণা করতে পারেন ।’
গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জয়নাব বিনতে হোসেন—একজন নির্ভীক শিক্ষক, একজন মুক্তচিন্তার কণ্ঠস্বর।
তাঁকে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে নয়, রাজধানী ঢাকাতে হামলা করলো শিবির। এক্ষেত্রে তার রিক্সাটিকে পেছন থেকে মোটর সাইকেল দিয়ে সজোরে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে শিবির তাদের স্বার্থ উদ্ধার করেছে।
বঙ্গবন্ধু ও মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে লেখালেখি করার অপরাধে তিনি আজ স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত- শিবিরের সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার। হত্যার উদ্দেশ্যেই এই নৃশংস আক্রমণ চালানো হয়েছে, যা প্রমাণ করে—আজও এই দেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করাই একটি ‘অপরাধ’ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

শুধু সন্ত্রাসীরাই নয়, আরও বেদনাদায়ক সত্য হলো—কিছুদিন আগে স্বাধীনতাবিরোধী ও পাকিস্তানপন্থি শক্তির চাপে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাঁকে লেখালেখি নিয়ে ‘সতর্ক’ করেছিল।
আজ সেই সতর্কবার্তার ফল—শিবিরের হাতে মার খেয়ে বিপর্যস্ত এক শিক্ষক, রক্তাক্ত এক চেতনা। তাঁর অপরাধ একটাই—তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের কথা বলেন, ইতিহাসের পক্ষে দাঁড়ান।
এই দেশে যেন প্রতিদিন দুচারজন শিক্ষক অপদস্ত না হলে, জঙ্গি-তত্ত্বাবধায়ক অধ্যাপক ইউনুচদের কলিজা ঠান্ডা হয় না। শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস, মত প্রকাশে ভয়, আর স্বাধীনতার পক্ষের মানুষদের উপর হামলা—এ কোন বাংলাদেশ?
জয়নাব বিনতে হোসেনের উপর হামলা কোনো একক ঘটনা নয়; এটি মুক্তচিন্তা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উপর সরাসরি আঘাত।
আজ প্রশ্ন একটাই—আমরা কি আবার অন্ধকারের দিকেই ফিরে যাচ্ছি?
একসময়ে চট্টগ্রাম কলেজ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন সাংবাদিক শহীদুল ইসলাম বাচ্চু। এখন অবশ্য আমেরিকা প্রবাসী। যতদূর জানি তিনি দৈনিক সংবাদ, দৈনিক পূর্বকোণ, ভোরের কাগজ পত্রিকায় চাকরি করতেন।
অষ্ট্রেলিয়া প্রবাসী সাংবাদিক ফজলুল বারী সম্পাদিত প্রিয় প্রজন্ম পত্রিকাতে লেখালেখি করেছেন বাচ্চু। তিনিও এই স্বাধীনতা বিরোধী অন্ধকারের জীব ও প্রগতি বিরোধী অপশক্তি জামায়াতে ইসলামী ও শিবির ক্যাডারদের নানা ঘটনার স্বাক্ষী। তিনি একসময়ে প্রচুর লিখেছেন এই জামায়াত-শিবির সম্পর্কে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গত শনিবার (১০ জানুয়ারি) শিক্ষককে লাঞ্ছনা ও দৈহিকভাবে নির্যাতনের পর তিনিও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।
তিনি লিখেছেন-সাপ ও শিবির: চরিত্র একই, কখনও পাল্টায় না।
সাপকে আমরা ভয় পাই। জগতে যত ভয়ংকর, রক্ত হিম-করা প্রাণী রয়েছে — সাপ তার মধ্যে অন্যতম। কারণ? যতই দুধ কলা খাইয়ে রাখেন না কেন, ছোবল আপনাকে মারবেই।
শিবিরও তেমন। সাপকে যদি আপনি ভয় পান, তাহলে শিবিরকেও পেতে হবে। নইলে বিপদ। সাপের মতোই অবিকল চরিত্র। কখন যে আপনাকে ‘ছোবল’ মেরে বসে, টের পাবেন না।
ডাকসু, রাকসু, জাকসু, চাকসু’তে শিবির কিভাবে জিতেছে জানিনা। তবে একটা বিষয় গভীরভাবে বোঝার ব্যাপার আছে।
ছাত্র সংসদগুলোতে নির্বাচনের আগে ও পরে শিবিরের আচার আচরণ যদি লক্ষ্য করেন, তাহলেই শিবিরের আসল চরিত্র বুঝবেন।
নির্বাচনের আগে যে শিবিরকে আপনি দেখেছেন, তা হলো ছদ্মবেশী ও গুপ্ত সাপ তথা শিবির। আর নির্বাচনের পরে হলো আসল বা ফণা-তোলা শিবির।
দেশজুড়ে বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিবির নামক সাপের দল কিলবিল করছে এবং যাকে ইচ্ছা তাকে ছোবল মেরেই চলেছে।
এই যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে চাকসুর নির্বাচিত এক সাপ গলায় পেঁচিয়ে ধরে টানা হেঁচড়া ও অপমান করলো, আমি এতে মোটেও অবাক হইনি।
এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও অনুরূপ কুকীর্তি করেছে শ্বাপদ-শিবির।
আপনি ভাবছেন এটা বোধহয় নতুন এক উপদ্রব দেশে শুরু হলো। জ্বি না। মোটেও নতুন নয়।
শিক্ষক পেটানো, শিক্ষাঙ্গন কলুষিত ও রক্তাক্ত করার ইতিহাস শিবিরের অনেক পুরনো। কিছু ঘটনা তুলে ধরছি।
১. নিজের রুমমেটকে জবাই: আশির দশকে চট্টগ্রাম কলেজের শেরে বাংলা ছাত্রাবাসে একই রুমে থাকতো ছাত্র ইউনিয়নের শাহাদাত ও শিবিরের এক ছেলে। একদিন গভীর রাতে ঐ শিবির নামক পশুটি শাহাদাতকে ঘুমের মধ্যে হত্যা করে। আগের দিন সে রেয়াজউদ্দিন বাজার থেকে দা কিনে এনেছিলো।
২. নব্বই দশকের শুরুতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের প্যানেল শিবিরের বিরুদ্ধে জয়ী হয়। নিজেদের এই পরাজয় মেনে নিতে পারেনি শিবির। ছাত্র নেতা ফারুককে হত্যা করে। এর প্রতিবাদে সাধারণ ছাত্র ও শিক্ষকদের এক মিছিল হয়। সেই মিছিলে হামলা করে শিবির। কয়েকজন শিক্ষক আহত হন।
৩. জাতীয় ছাত্র সমাজের নেতা হামিদের সাথে ক্যাম্পাসে কোলাকুলি করে এক শিবির সাপ। কোলাকুলি শেষ হবার মিনিট ২/৩ পরে হামিদের উপর নৃশংস হামলা চালায় শিবির। হামিদের একটি হাত অপারেশনের পর কেটে ফেলতে হয়।
৪. তৎকালীন ভিসি প্রফেসর আলমগীর মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীনকে তাঁর ক্যাম্পাসের বাসভবনে অবরুদ্ধ করে রাখে শিবির নেতা কর্মীরা। কয়েকদিন বলেছিলো এই অবরোধ।
কয়লা ধুলেও ময়লা যায়না। শিবিরকে আপনি যতই ধোঁয়া মোছা করুন — ময়লা দূর হবে না। যতই আপনি স্নো পাউডার, আতর, পারফিউম মাখান না কেন — দুর্গন্ধ যাবে না।
আগামী জাতীয় নির্বাচনে স্বাধীনতা বিরোধী এই অপশক্তিকে প্রতিহত করতে হবে। নাহলে ঘোর অন্ধকার নেমে আসবে বাংলাদেশে।
# ইশরাত জাহান, প্রাবন্ধিক, লেখক ও নারী সংগঠক।
