বহুল প্রচারিত প্রথম আলো গত ১৮ জানুয়ারি পত্রিকার মূল শিরোনাম দেখে একটু অবাকই হয়েছি। শিরোনামটি ছিল-“পেশার স্বার্থে সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ থাকা সময়ের দাবি”।
শান্তির দূত ড. ইউনুসের ঘোর সমর্থক এ পত্রিকাটি হঠাৎ করে এমন আওয়াজ তুলতে শুরু করেছে কেন সেটাই এখন প্রশ্ন।
এ পত্রিকাটির সিস্টার বা ব্রাদার গ্রুপ ইংরেজি পত্রিকা ডেইলি স্টার গত ১৭ জানুয়ারি তাদের অনলাইন সংস্করণে আরেক কাঠি ওপরে উঠে শিরোনাম করেছে- `Independent journalism is guaranteed by constitution, not a privilege: Mahfuz Anam’ (স্বাধীন সাংবাদিকতা সংবিধান দ্বারা নিশ্চিত, বিশেষাধিকার নয়: মাহফুজ আনাম)।
সাংবাদিকদের ঐক্য আর স্বাধীন সাংবাদিকতা – এ বিষয়ে বেশ ভালো ছবক দিয়েছেন এ দুটি পত্রিকার সম্পাদকদ্বয়। অবশ্য এর সবই তাঁরা করেছেন ‘গণমাধ্যম সম্মিলন ২০২৬’ এর মাধ্যমে।
গত ১৭ জানুয়ারি শনিবার সকালে রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে এ সম্মিলন অনুষ্ঠিত হয়।

এই ‘গণমাধ্যম সম্মিলন ২০২৬’ নিয়ে প্রথম আলো তাদের নিউজে লিখেছে- মতপ্রকাশ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর সংগঠিত হামলার প্রতিবাদ এবং স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও সাহসী সাংবাদিকতার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান জানাতে এ সম্মিলনের আয়োজন করে নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) ও সম্পাদক পরিষদ।
তবে যেটি জানা গেছে, তা হলো নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) ও সম্পাদক পরিষদ এর পেছনে এই দুই পত্রিকার ( প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার) সম্পাদকদ্বয়ের ইন্ধন কাজ করেছে সবচেয়ে বেশি। ওই সংগঠন দুটিকে তারাই পেট্রোনাইজ করেছে। ফায়দা হাসিল করতে চান তারা এ সংগঠন দুটিকে ব্যবহার করে।
কিন্তু এই সমাবেশে একবারও জঙ্গী ইউনুস সরকারের আমলে হয়রানীমূলকভাবে সম্পাদক, সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার, হামলা মামলা ও বিনাবিচারে মাসের পর মাস কারাগারে আটকে রেখে নির্যাতন করার বিরুদ্ধে এবং তাদেরকে রেহাই দেয়ার একটি বাক্যও উচ্চারণ করেননি এই দুই সম্পাদক।
যদি বলতেন তাহলেতো তা ছাপা হতো তাদের সম্পাদিত পত্রিকাতে। তা কিন্তু চোখে পড়েনি। তাহলে এরা কোন ধরনের ঐক্য আর স্বাধীন সাংবাদিকতা চাইছেন?

এই সমাবেশে ডেইলি স্টার পত্রিকার প্রকাশক-সম্পাদক মাহফুজ আনাম “জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নতুনভাবে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার সুযোগ এসেছে” উল্লেখ করে বলেন, ‘জবাবদিহিমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠা করার সময় এসেছে।’
একইভাবে সাংবাদিকতার একটা নতুন গণতান্ত্রিক, বলিষ্ঠ ন্যায়পরায়ণ, এথিক্যাল জার্নালিজম করার একটা সময় এসেছে।
সাংবাদিকতা পেশাকে আরও বেশি জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
সম্পাদকদের ভূমিকা প্রসঙ্গে মাহফুজ আনাম বলেন, সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠান ও সম্পাদকের আচরণ সরাসরি প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রভাবিত করে।
কোনো সম্পাদক নৈতিকতার বিচ্যুতি ঘটালে শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো প্রতিষ্ঠান এবং পেশাটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাঁর মতে, সম্পাদকের নৈতিক দায় অন্য যেকোনো পেশার তুলনায় বেশি।
হায়রে মাহফুজ সাহেব এখনো আপনি-আপনারা ‘জঙ্গী-সেনা ক্যু’ কে গণ-অভ্যুত্থান বলবেন? আবার বলছেন গনতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, জবাবদিহিমুলক সমাজ ও এথিক্যাল জার্নালিজম করার সময় এসেছে!
এতই যদি পেয়ে থাকেন তাহলে আবার এই কথিত ‘গণমাধ্যম সম্মিলন ২০২৬’ কেন করলেন আপনারা ? এর কোন জবাব আছে আপনাদের কাছে ?
প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, “যে মতের, যে চিন্তার, যে ভাবনার, যে আদর্শের হোক না কেন, সংবাদপত্র, সাংবাদিকতা এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ইত্যাদি বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে, সমঝোতা থাকতে হবে এবং সবার পাশে দাঁড়াতে হবে ।”
আমার নিজের অভিমত জানানোর চেয়ে এ ব্যাপারে পাঠক, সাংবাদিক, সাংবাদিকতার শিক্ষক ও বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার নাগরিকদের প্রতিক্রিয়া অনেক বেশি যুক্তিযুক্ত মনে করছি।
সাংবাদিক শংকর মৈত্র তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেছেন-“পেশার স্বার্থে সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ থাকা সময়ের দাবি।” এটা কোন সময়? এখন এটার প্রয়োজন পড়লো কেনো?
ইউনুস স্যারের আমলে গণমাধ্যম সবচেয়ে স্বাধীন আপনারাইতো বলেছিলেন। স্যার যাতে পদত্যাগ না করেন, মি.মাহফুজ আনাম তাঁর ডেইলি স্টারে কতো কাকুতি মিনতি করে কলাম লিখেছিলেন। পড়েছিতো।
এখন কেনো তাদের মনে হচ্ছে, সব সাংবাদিককে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে?
তাদের অফিসে তো ‘সাংবাদিক ইউনিয়ন’ করতে দেন না। ভোট চাইতে গেলে অফিসে ঢুকতে দেন না।সাংবাদিক নেতাদের বাটপার, অপেশাদার বলেন।
এখন কেনো ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কথা বলছেন? নিজেদের ঘরে আগুন লেগেছে বলে?

সাংবাদিকরা ঐক্যবদ্ধই আছে। আমরা ঐক্যবদ্ধ। আপনারা সরকারের, রাজনৈতিক দলের দালালী ছাড়েন। নেতাদের তোষামোদ বন্ধ করুন। গোয়েন্দাসংস্থার দালালী ছাড়ে। গোয়েন্দা সংস্থার পাঠানো নিউজ ছাপা বন্ধ করুন।
মি. মাহফুজ আনাম ওয়ান ইলেভেনের সময় যা করেছিলেন সেটা যেনো আর না হয়। মেরুদণ্ড সোজা করে সাংবাদিকতা করতে দিন। যা সত্য তা লিখতে দিন। দেখবেন সাংবাদিকতা জেগে উঠবে।
আমাদের খেটে খাওয়া রিপোর্টাররা শুধু রিপোর্ট করতে চায়। তাদের সঙ্গে কথা বলে দেখুন। কিন্তু আপনারা নিউজ গলাটিপে হত্যা করেন। তাদের মুক্ত করে দিন, দেখবেন সাধারণ মানুষও আপনাদের পাশে দাঁড়াবে।
দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার ও সাংবাদিক ইউনিয়ন নেতা কুদ্দুস আফ্রাদ অনেকটা রাগত স্বরেই বলছেন—“করপোরেট ও দালাল সাংবাদিকতার জনকরা অন্যদের ছবক দিল- দালালী সাংবাদিকতা ছাড়তে।
সরকারের পরোক্ষ অর্থ সহযোগিতায় সম্মিলনের নামে যাত্রাপালার গীত শোনানোর আয়োজন হয়েছিল শনিবার ঢাকায়।
শতাধিক সাংবাদিকের নামে খুনের মিথ্যা মামলা, ১০ জনেরও বেশি সাংবাদিক মিথ্যা খুনের মামলায় জেলবন্দি, শত-শত সাংবাদিককে জোরপূর্বক চাকরিচ্যুতি, সরকারের সূর্য সৈনিকদের হাতে শত-শত সাংবাদিক নির্যাতিত- এ সব বিষয়ে যাত্রাপালায় কোনও গীত কারও মুখে শুনলাম না। এরা নাকি করবে স্বাধীন সাংবাদিকতা!”
মুফদি আহমদ বললেন- “সাধারণ সাংবাদিকরা ঐক্যবদ্ধ। যারা দালালি, দলদাস, ক্ষমতার সুবিধাভোগী নয় তারা ঐক্যবদ্ধ। যারা দালালি করেন, করেছেন,করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা দালালি ছাড়েন, সাংবাদিকতা ভাল চলবে। অনৈক্য বলে যা ভাবেন তা থাকবে না।
যেখানে সাংবাদিকদের নামে ফরমায়েশি হত্যা মামলা, কারাগারে বন্দী কয়েক সাংবাদিক সেসব বিষয় গণমাধ্যম সম্মিলনীতে স্থান পায়নি। তাহলে এই সম্মিলনীও কি ফরমায়েশি। যদি তাই হয়, সেখানে স্বাধীন সাংবাদিকতা, মুক্ত গণমাধ্যম প্রত্যাশা করেন কি করে?”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক কাবেরী গায়েন ডেইলি স্টার সম্পাদক-প্রকাশক মাহফুজ আনামের উদ্দেশ্যে মন্তব্য করেছেন এই বলে- ‘It’s too late, dear Editor! It’s even too late to take it as ‘better late than never.’ Your statement history itself contradicts your claim now. But, good luck!
(অনেক দেরি হয়ে গেছে, প্রিয় সম্পাদক! ‘কখনো না হওয়ার চেয়ে দেরি ভালো’ বলে ভাবলে আরও অনেক দেরি হয়ে যাবে। আপনার বিবৃতির ইতিহাস নিজেই এখন আপনার দাবির বিরোধিতা করে। কিন্তু, শুভকামনা!)
এর পাশাপাশি এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, “এই কথাটা উনি সামরিক তত্ত্বাবধায়ক আমলে বলেননি। লীগ আমলেও এভাবে বলেননি, কৌশল করেছেন। ৫ই আগস্টের পরে তো ন্যাক্কারজনক গোপালগঞ্জ স্টোরি ছাপিয়েছেন, যা ক্ষমার অযোগ্য। এখন এসব কা’কে উদ্দেশ্য করে কী বলছেন, কে জানে? সময় গেলে সাধন হয় না। ক্ষতি অনেক হয়ে গেছে।”
গত বছর ২২ ডিসেম্বর একটি ‘আহারে ভোল পাল্টানো সাংবাদিক-মালিক সম্পাদক মাহফুজ-মতি!’– এই শিরোনামে একটি লেখা লিখেছিলাম। দেশে-বিদেশে স্বনামধন্য এই দু’জন সম্পাদককে নিয়ে কিছু লিখতে হবে তা ভাবিনি। কিন্তু বাধ্য হলাম।
তবে সেদিন মানে ১৭ জানুয়ারি ‘গণমাধ্যম সম্মিলন ২০২৬’ এ ঢাকার বাইরে থেকে বক্তব্য দেয়া এক সাংবাদিকতো সেই ভরা মজলিশে ফাঁস করে দিলেন যে প্রেসক্লাবের সাথে জড়িত না হওয়ার জন্য মতিউর রহমান বলে দিয়েছিলেন তাদের। তখন আসলে মতিউর রহমানের প্রতিক্রিয়া কি হয়েছিল তা একটু জানতে পারলে ভালো হতো।
প্রথম আলোর ঢাকা অফিস ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় চাকরি করেন এমন বেশ কয়েকজন সাংবাদিকের সাথে নানা সময়েই কথা হয়। তারাও জানিয়েছেন যে, সাংবাদিক ইউনিয়ন, প্রেসক্লাব বা সাংবাদিকদের কোন সংগঠনের সঙ্গে জড়িত না থাকার জন্য তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
সাংবাদিক ইউনিয়ন সাংবাদিকদের অধিকার আদায়েই শুধু আন্দোলন করেনা, স্বাধীনভাবে সাংবাদিকতা করার পরিবেশ সৃষ্টির জন্যও সোচ্চার। কিন্তু মতিউর রহমান এই ইউনিয়নের নামই শুনতে পারেন না। প্রথম আলোতে সাংবাদিক ইউনিয়ন করা যায় না।
আবার এই সম্পাদক গত ১৭ জানুয়ারি সাংবাদিকদের ঐক্যের জন্য কাকুতি-মিনতি করেছেন। ভাবতেই অবাক লাগে।
তবে আমরা সেই এক এগারোর পরে বায়তুল মোকারমের সাবেক খতিব ওবায়দুল হকের কাছে নতজানু হয়ে প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানের নতজানু হয়ে ক্ষমা চাওয়াও দেখেছি।
মাহফুজ আনামও এক এগারোর সময় সেনা গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই এর প্রেসক্রিপশন অনুয়ায়ী আওয়ামীলীগ ও বিএনপি নেতা-নেত্রীদের বিরুদ্ধে এই মাহফুজ-মতি গং প্রচুর কুৎসা রটানো নিউজ করিয়েছে।
যা এখনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তবে এরা দুজনেই ক্ষমা চাইতে ওস্তাদ। আবার পরক্ষনেই উল্টে যায়।তবে তাদের আওয়ামী বিরোধীতা ও শেখ হাসিনা বিরোধীতা কোনভাবেই কমেনি, বরং আগের চেয়ে আরো বেড়েছে। তাদের মূল টার্গেট সাংবাদিকদের ঐক্য বা স্বাধীন সাংবাদিকতো নয়- শেখ হাসিনা ও আওয়ামীলীগ এদের মূল টার্গেট।
# ইশরাত জাহান: লেখিকা, প্রাবন্ধিক, নারী সংগঠক।
