ঢাকা: নারী ক্রিকেটাররাও যদি যৌন লালসার শিকার হন, তাহলে তো নারীর টিকে থাকাই দুষ্কর।
এবার হাইকোর্ট রুল জারি করেছে।
দেশের নারী ক্রিকেটারদের জন্য একটি নিরাপদ, হয়রানিমুক্ত এবং জেন্ডার-সংবেদনশীল ক্রীড়া পরিবেশ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)-সহ সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তা ও ব্যর্থতাকে কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না মর্মে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।
সোমবার বিচারপতি আহমেদ সোহেলের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এই রুল জারি করেন।
রুল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় হাইকোর্টের রায়ের নির্দেশনার আলোকে যৌন হয়রানি বিরোধী নীতিমালা কার্যকর করতে বিসিবিকে নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
এবং বাস্তবায়ন সংক্রান্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতে বলা হয়েছে।
সাবেক জাতীয় নারী দলের অধিনায়ক জাহানারা আলম অভিযোগ করেছিলেন, দল ব্যবস্থাপনার এক সদস্যের দ্বারা তিনি যৌন নিপীড়নের শিকার হন। তার এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি তদন্ত করতে একটি কমিটি গঠন করে বিসিবি।
২০২২ সালের বিশ্বকাপের সময়ের কথা বলেছেন জাহানারা। তাঁর অভিযোগ, বাংলাদেশের মহিলাদের দলের প্রাক্তন নির্বাচক মনজুরুল ইসলাম এবং মহিলাদের ক্রিকেটের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রাক্তন কর্তা প্রয়াত তৌহিদ মেহমুদের বিরুদ্ধে।
এ ছাড়াও জাতীয় দলের প্রাক্তন কয়েক জন সাপোর্ট স্টাফ তাঁর ক্রিকেটজীবন নষ্ট করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলেও অভিযোগ করেছেন জাহানারা।
বিসিবির তৎকালীন উচ্চপদস্থ কর্তাদের জানিয়েও লাভ হয়নি বলেও জানান তিনি।
জাহানারা বলেছেন, ‘‘আমি একাধিক বার আপত্তিকর প্রস্তাব পেয়েছি। দলের মধ্যে থাকলে অনেক কিছু প্রকাশ্যে বলা যায় না। চাইলেও বলা যায় না। বিশেষ করে বিষয়টি আপনার রুটি-রুজির সঙ্গে জড়িত হলে এবং তেমন পরিচিতি না থাকলে সব সময় প্রতিবাদ করা যায় না।’’ তিনি আরও বলেছেন, ‘‘ক্রিকেটই আমার পরিবার। তাই আমার অবশ্যই কথা বলা উচিত। আরও ১০টা মেয়ের নিরাপত্তার স্বার্থে বলব। আমি নিজেকে বাঁচাতে পেরেছিলাম।
অনেকে সেটা না-ও করতে পারে। বা এই বিষয়গুলোকে ততটা গুরুত্ব দেবে না। তাতে যে যা খুশি করার সুযোগ পেয়ে যাবে। পৃথিবীতে ভাল লোক যেমন রয়েছে, তেমন খারাপ লোকও রয়েছে। আমি চাই মেয়েদের জন্য একটা নিরাপদ পরিবেশ। যাতে ওরা নিশ্চিন্তে ক্রিকেট খেলতে পারে।’’
আসলে এইসব শুধু একটা ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারি নয়— এটা বাংলাদেশ ক্রিকেটের নৈতিক পতনের প্রতিচ্ছবি।
বিসিবির উচিত ছিল অবিলম্বে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা, কিন্তু তারা বরং নীরব! এই নীরবতা মানে শুধু প্রশ্রয় নয়, এটা অপরাধেরও অংশীদারিত্ব!
নারী ক্রিকেটারদের মর্যাদা, সম্মান আর নিরাপত্তা কোথায়? আর কতদিন এই “গার্ডিয়ানদের মুখোশ” পরে চলবে এই বিকৃত মানুষগুলো?
প্রথমদিকে বিসিবি জানায়, তদন্ত কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি জাস্টিস তারিক উল হাকিম।
কমিটির অন্য সদস্যরা ছিলেন বিসিবি পরিচালক রুবাবা দৌলা এবং সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও উইমেনস স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ব্যারিস্টার সারওয়াত সিরাজ শুক্লা।
পরবর্তীতে কমিটির পরিসর বাড়িয়ে আরও দুই সদস্যকে যুক্ত করা হয়। তারা হলেন-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ও বর্তমানে বাংলাদেশ ল কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. নাইমা হক এবং সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট ব্যারিস্টার মুহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান খান।
ব্যারিস্টার সারওয়াত সিরাজ শুক্লা সোমবার ক্রিকবাজকে জানান, তদন্ত প্রতিবেদন ইতোমধ্যে বিসিবির কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।
তবে তদন্ত কমিটি গঠনের পরও বহুবার সময়সীমা বাড়িয়েছিল বিসিবি।
প্রথমবার ২ ডিসেম্বর সময় বাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে বিসিবি জানায়, জাহানারা আলম লিখিত অভিযোগ জমা দিতে আরও সময় চেয়েছিলেন। তাকে অতিরিক্ত ১৫ দিন সময় দেওয়া হয়। এরপর ২১ ডিসেম্বর বিসিবি আবার জানায়, স্বাধীন তদন্ত কমিটি ৩১ জানুয়ারির মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেবে।
এদিকে, বিসিবির নীরব ভূমিকা নিয়ে হাইকোর্ট রুল জারির কয়েক ঘণ্টা পরই এই ঘোষণা আসে। সোমবার জাহানারা আলমের অভিযোগের তদন্তে বিসিবির নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না-তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট।
বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ একটি রিট আবেদনের পর এই আদেশ দেন।
