১২ ফেব্রুয়ারি যতই ঘনিয়ে আসছে ততই বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ এমনকি বিভিন্ন সংস্থারও সন্দেহ ঘনীভূত হচ্ছে ।
কারণ এরই মধ্যে প্রতিনিয়ত দেশে যেসব ঘটনা-অঘটন হচ্ছে তাতে কোনভাবেই স্বস্তিতে নেই জনগণ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে নানামুখী সংশয় দানা বাঁধছে ক্রমশ।
এরই মধ্যে গত ৬ ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং অফিসার এক অফিস আদেশে অনিবার্য কারণ দেখিয়ে আগামী ১২ তারিখের নির্বাচনের ব্যালট পেপারসহ অন্যান্য সরঞ্জাম পাঠানো স্থগিত করা হলো।
নিঃশ্বাস বন্ধ করে দেয়া যেন পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন এক দেশের অধিবাসী আমরা।
এদিকে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অন্তর্ভূক্তিমূলক বলে মনে করছে না বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
বিভিন্ন জরিপ ও তথ্য বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি জানিয়েছে, একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর মতামত ও অংশগ্রহণ উপেক্ষা করা হলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
নির্বাচনি এলাকায় ‘সবুজ টেকসই অর্থনীতি’র চালচিত্র ও প্রত্যাশা: প্রার্থী ও ভোটার জরিপের ফলাফল’ শীর্ষক এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে শনিবার গবেষণা সংস্থাটি এসব কথা জানায়।
ব্রিফিংয়ে সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, “অধিকাংশ জরিপে পতিত দলের ভোটারদেরকে এবারের নির্বাচনে নির্ণায়ক ফ্যাক্টর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। “একটি বৃহৎ অংশের ভোটারকে তার চাহিদামতো তাকে ভোট করতে দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না” বলেন তিনি। তারা এটিকে দ্বিদলীয় মানে বিএনপি ও জামায়াতের নির্বাচন বলেও আখ্যায়িত করেছে।
এই যে সিপিডি’র মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এমন সন্দেহের কথা উত্থাপন করা হলো তাতে সেই কথাই মনে পড়ে- অতঃপর তাহার কোন কোন অবদানকে তোমরা অস্বীকার করবে ?
গবেষণা সংস্থা সিপিডি নিশ্চয়ই মাঠ থেকে সংগ্রহ করা তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতেই এমন মন্তব্য করেছেন।
ইলেকশন মানে সিলেকশন যখন দরজায় শুধু কড়া নাড়ছে নয় যখন দরজা ভেঙ্গে ফেলার দশা হয়েছে তখন কেন হঠাৎ এমন মন্তব্য করলো সেটিও ভেবে দেখার অবকাশ রয়েছে বৈকি।
কারণ এ প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে দেশের বড় বড় সুশীল কারিগররাই জড়িত রয়েছেন। আর সেসব কারিগররা পশ্চিমা বিশ্বের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ীই চলেন যতদূর জানি। এই সুশীলীয় গ্রুপে প্রথম আলো-ডেইলি স্টার গ্রুপও রয়েছে।
এরা যখন কোন কথা বলে বা মন্তব্য করে তখন ভেবে নিতে হয় ‘ডাল মে কুছ কালা হ্যায়।’ এ কথাটি শুধু আমার কথা নয়। এটি বাংলাদেশের সচেতন মানুষের আশংকা এবং তা বেশ আগে থেকেই।
গাজীপুরের জেলা প্রশাসক তথা রিটার্নিং অফিসারের অফিস আদেশটিও নানা সন্দেহের উদ্রেক করেছে। প্রশাসনের অন্দরমহলে ১২ ফেব্রুয়ারিকে ঘিরে যে নানা ইঞ্জিনিয়ারিং ঘুরপাক খাচ্ছে তা রাজনৈতিক দলগুলোও জানে।

কিন্তু এখন তারা সেই ইঞ্জিনিয়ারিং নিজেদের পক্ষে নেয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের কিছু বয়ান শুনলে অনেক কিছুই বোঝা যাবে।
যেমন, ‘নির্বাচনে জয়লাভ করলে জামাতের সঙ্গে ঐক্যের সরকার গঠন করবে না বিএনপি– বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে তারেক রহমান।’ ‘ নির্বাচন নিয়ে নানামুখী ষড়যন্ত্র হচ্ছে– ঠাকুরগাঁওয়ের জনসভায় তারেক রহমান।’ ‘ নির্বাচন নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং এর আশঙ্কা আছে– ঢাকার শান্তিবাগে নির্বাচনী প্রচারণায় এনসিপি নেতা নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী।’ ‘ কোনো মুসলমানের জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দেওয়া জায়েজ হবে না, হারাম। – হেফাজতে ইসলামের আমির মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী’।
তো কি বুঝলেন এসব নেতাদের বক্তব্য থেকে? নতুন করে কিছু বলার নেই এসব নেতাদের বক্তব্য ও সন্দেহ থেকে।
সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী ও ঠাকুরগাঁও-১ আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য রমেশ চন্দ্র সেন গতরাতে কারা হেফাজতে মারা গেছেন।

মারা গেছেন নয়-আসলে তাঁকে কৌশলে খুন করা হয়েছে কারা হেফাজতের নামে। এই সজ্জন মানুষটি তাঁর এলাকার পাঁচ পাঁচ বারের সংসদ সদস্য। তিনি কি এমনিতেই হয়েছিলেন সংসদ সদস্য? এলাকার লোকজন যদি না তাঁকে ভোট দিয়ে সংসদ সদস্য বানাতেন ?
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বার বারই তাঁর কাছে পরাজিত হয়েছেন। তাই চব্বিশের ৫ আগষ্টের পর সে পরাজয়ের গ্লানির প্রতিশোধ নিতে রমেশ চন্দ্র সেন এর মতো মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামীলীগ নেতাকে কারাগারে পাঠানোর মত ষড়যন্ত্র করেছিলেন।
দেশের একটি মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী , ২০২৪ এর জুলাই জঙ্গী ক্যু এর পর ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত মাসে ১১২ জন কারা হেফাজতে মারা গেছেন। সংস্থাটি জানিয়েছে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত মারা গেছেন ৯৫ জন।
এই মৃতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী রয়েছেন।
বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী কারা হেফাজতে মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনা তদন্তযোগ্য, সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ্য রয়েছে — রাষ্ট্র কাউকে হেফাজতে রাখলে তার জীবন ও মানবিক মর্যাদা রক্ষায় বাধ্য। কিন্তু যে রাষ্ট্রটি একটি ইসলামী জঙ্গী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে সেখানে কোন আইনতো চলেনা আর।
ইউনুস গং যা করবে তাই যেন আইন হয়ে গেছে এখন।
বীর মুক্তিযোদ্ধা সজ্জন রাজনীতিবিদ রমেশ চন্দ্র সেনকে মেরে ফেলার পর একটি ছবি ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। তা হলো তাঁর হাত বাঁধা একটি ছবি।
আসলে পুরো দেশের হাত-পা তো এই মুক্তিযোদ্ধা সাংসদ রমেশ চন্দ্র সেন এর মত বাঁধা।
এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে হাত বেঁধে নিয়ে গিয়েছিল ঢাকা থেকে যাওয়া পুলিশের স্পেশাল একটি টীম। কার ও কাদের চক্রান্তে সেদিন তাঁর মত একজন বয়োবৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধা ও সাধাসিধে মানুষকে বেঁধে নেয়া হয়েছিল সে হিসেব নিশ্চয়েই একদিন নেয়া হবে।
এই আসনটিকে একান্তভাবে নিজের করে পেতে উদগ্রীব বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাই তিনি রমেশ চন্দ্র সেনের মরদেহ দেখতে গেছেন।
সহানুভূতি জানাতে, সেখানকার হিন্দু সম্প্রদায়ের সহানুভূতি আদায় করতে।
এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে। একজন মন্তব্য করেছেন এভাবে- “ তবে প্রয়াত রমেশ চন্দ্র সেনের স্ত্রী অঞ্জলি সেন কিন্তু ফখরুলের মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দেয়নি।

রমেশ সেনের মৃত্যুতে মির্জা ফখরুলকে কেন টেনেছি কয়েকজন সে প্রশ্ন করেছে। তারা জানে না সরকার পতনের ১২ দিনের মাথায় কেন ঢাকা থেকে টিম গিয়ে রমেশ সেনকে গ্রেপ্তার করতে হলো।
ঠাকুরগাঁওয়ে রমেশ সেন তার অতি সাধারণ বাড়িতেই ছিলেন। জেলা পুলিশ যথেষ্ট ছিলো তাকে গ্রেপ্তারের জন্য। তা হয়নি।
লোকাল পুলিশকে বিশ্বাস না করে ঢাকা থেকে টিম পাঠিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়। যাকে দিয়ে করা হয় তাকে এখনও পুরস্কৃত করা হচ্ছে। এসব করিয়েছে মির্জা গং।
রাজাকারের দুই ছেলে ফখরুল ও ফয়সাল। আমি শুধু এই মির্জা গংয়ের শেষ দেখার আগ্রহ প্রকাশ করেছি। ইতিমধ্যে তা দেখছিও। বৃদ্ধ ফখরুল নিজ দলে মাথার মুকুট না হয়ে বোঝা আর ফয়সাল নিজ দলের কর্মীদের দ্বারা ঠাকুরগাঁওয়েই আক্রমণের শিকার হয়েছে।
রমেশ সেনকে জেলে হত্যা করা হয়েছে। এই হত্যার দায় মির্জা পরিবারের। এই পরিবার একাত্তরে দেশবিরোধী ছিলো। জেলের মধ্যে মানুষ হত্যা করে এই পরিবার আজ মানবতাবিরোধী।
হিন্দু জনগোষ্ঠীর ভোট পাবার লোভে মির্জা ফখরুলের হাতজোড় করে রমেশ সেনের বাড়িতে যাওয়া দেখে আমরা ভুলবো না। আমরা ঘটনা জানি। সত্য জানি। ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ জানে। মানুষ এসব ভুলবে না”।
গত চব্বিশের ৫ আগষ্টের পর সারা দেশের জেল থেকে ৭ শতাধিক জঙ্গি ও পরবর্তীতে বাংলাদেশের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের এক এক করে জেল থেকে ছেড়ে দিয়ে জনপ্রিয় মানুষদের জেলে ঢুকানো হয়েছে।
সর্বশেষ এই রাজনৈতিক প্রতিহিংসা দেখেছিলেন ছাত্রলীগের নেতা সাদ্দামকে বিনা অপরাধে কারাগারে ঢুকিয়ে তার মৃত সন্তান ও মৃত স্ত্রীকে জেলখানায় হাজিরা দিতে। হ্যাঁ , এটাই আজকের ইউনুস-বিএনপি ও জামায়াতের অভিশপ্ত বাংলাদেশ।
সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নূরুল মজিদ হুমায়ূন এর হত্যার কথা নিশ্চয়ই ভুলে যাননি আপনারা। হাসপাতালের বিছানায় অসুস্থ মানুষটার হাতে হাতকড়া পড়িয়ে রেখেছিল এই জঙ্গী ইউনূস সরকার।
বীর মুক্তিযোদ্ধা মতিয়া চৌধুরীর মরদেহ কবর দিতে যারা বাঁধা দিয়েছে , তাঁর জানাযায় যারা বাঁধার সৃষ্টি করেছে , বীর মুক্তিযোদ্ধা মইনুদ্দিন খান বাদলের কবরে যারা আগুন দিয়েছে তাদের কোনদিনও ক্ষমা হবে না। এসব হত্যা-অপরাধের বিচার একদিন বাংলার মাটিতেই হবে।
বিএনপি ও জামায়াতের রাজনৈতিক খায়েশ মেটাতে আসাদুজ্জামান নূর ও খ্যাতিমান কলামিস্ট বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহরিয়ার কবিরকে বিনা বিচারে দিনের পর দিন জেলখানায় আটকে রাখা হয়েছে। সাংবাদিক শ্যামল দত্ত, মোজাম্মেল বাবু, ফারজানা রুপা-শাকিল আহমদ সহ আরো অনেক সাংবাদিক বিনা বিচারে জেলখানায় ধুঁকে ধুঁকে প্রহর গুনছেন। সংসারত্যাগী সাধু চিন্ময় দাস এখনো বিনাবিচারে কারাগারে।


রমেশ চন্দ্র সেন একজন সৎ রাজনীতিবীদ ছিলেন। দীর্ঘ ৬০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে তার কোন দুর্নীতির চিহ্ন নেই। ছাত্রজীবন থেকেই বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশকে ভালোবাসাই যেন কাল হয়ে দাঁড়ালো উনার জন্য।
ইচ্ছে করলে তিনি দেশের বাইরে পালিয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু সৎ ও সাহসী এই রাজনীতিবিদ তা করেননি। ২০২৪ সালের ১৬ আগষ্ট ঠাকুরগাঁও নিজ বাসা থেকে এই জনপ্রিয় সংসদ সদস্যকে গ্রেফতার করে বিনাবিচারে জেলে দেওয়া হয়।
রহস্যজনক মৃত্যু বলে নুরুল মজিদ হুমায়ূনের মতো রমেশ চন্দ্র সেনকেও পরিকল্পিত হত্যা করেছে বিএনপি ও জামায়াতের ইউনূস সরকার।
কবি নবারুণ ভট্টাচার্য লিখেছিলেন, “এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না।” কেন লিখেছিলেন জানিনা। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে তিনি ভুল লিখেছিলেন। তার কাছে ক্ষমা চেয়ে বলছি হে কবি দেখে যান-“এই মৃত্যু উপত্যকাই আমার দেশ”।
#ইশরাত জাহান: লেখিকা, প্রাবন্ধিক ও নারী নেত্রী।
