বাঙ্গালি মুসলমান না পেরেছে মুসলমান হতে না পেরেছে বাঙ্গালি হতে। এ মন্তব্য দেখলে ক্ষেপে যাবেন অনেকেই। তেড়ে আসবেন আমাকে কতল করতে। নাস্তিক-নাফরমান-বেশরিয়তি-বেহায়া-নাপাক- দজ্জাল মহিলা বলতেও ছাড়বেন না নিশ্চয়েই।

ওই কথাটি (বাঙ্গালি মুসলমান না পেরেছে মুসলমান হতে না পেরেছে বাঙ্গালি হতে) কেন বলেছি সে প্রসঙ্গেই এ কথা বলা। নাচাগানাও চায় এই বাঙ্গালী মুসলমান, আবার এরই পাশাপাশি পাকি-শিল্পীদের কাওয়ালী সন্ধ্যা বা রাতেও আয়োজনও করতে চায়। তার মানে না ঘরকা না ঘাটকা অবস্থা।

বাংলাদেশের মুসলমান পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নতুন বছরে সেই “মঙ্গল” না “আনন্দ” আবারো সেই বিতর্কে-বিবাদে মেতেছে। কারণ “মঙ্গল” নাকি হিন্দু শব্দ। তাই এই ইসলামী দেশে “ মঙ্গল শোভাযাত্রা” করা হারাম। নাপাক। তার চেয়ে “আনন্দ” শব্দটিতে বোধ হয় কিছুটা ‘পাক’ পেয়েছেন এসব পাকিস্তানপ্রেমী মুসলমানেরা। তার চেয়ে একবারে আরবী ভাষায় ‘ফারাহ’ বলে দিলেইতো পারতেন এসব পাকি-ইসলামপন্থীরা।

বড্ড বেশি বেকায়দায় আছে পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনটি। কারণ তাকে মঙ্গলে না আনন্দে পালন করা হবে তা নিয়ে এই বঙ্গীয় পাকি-মুসলিমরা ইতিমধ্যেই বেশ বাহাসে লিপ্ত হয়েছেন।

এসব দেখে পহেলা বৈশাখ যেনো আড়ালে হাসছে মিটি মিটি। আচ্ছা একটু সাধারণভাবেই যদি আমরা চিন্তা করি যে আমরা একজন মুসলমান অপর একজন মুসলমানকে দেখলে কি বলে সম্বোধন করি? যেটি বলা হয় বা বলি তা হলো- ‘আসসালামু আলাইকুম, ওয়া রাহমাতুল্লাহি, ওয়া বারাকাতুহু।’ এর অর্থ হলো: আপনার উপর শান্তি, আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক।

আবার এই এই সালামের জবাবে আমরা যেটি বলে থাকি তাহলো-‘ ওয়া আলাইকুমুস সালাম, ওয়া রাহমাতুল্লাহি, ওয়া বারাকাতুহু। এর অর্থ হলো –‘আপনার উপরেও শান্তি, আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক।’

তার মানে কি দাঁড়ালো? এই যে সালাম দেয়া ও এর প্রতি উত্তরের মধ্যে অপরের প্রতি শান্তি-রহমত-বরকত বর্ষিত হওয়ার ইচ্ছে পোষণ করা হয়েছে। একে অপরের ভালো চেয়েছেন মানে মঙ্গল চেয়েছেন। তো এই ‘মঙ্গল’ ই কিনা আমাদের বঙ্গীয় পাকি-মুসলিমদের কাছে হিন্দুয়ানী শব্দ হয়ে গেলো?!

আরবী একটি ভাষা, বাংলা একটি ভাষা। পবিত্র কোরআন শরীফ যদি এই বাংলাদেশে নাজিল হতো তাহলে নিশ্চয়ই তা বাংলা ভাষায় প্রকাশ হতো।

তো সেই ভাষাটিকেই এ দেশের কিছু মানুষ মুসলমানী করিয়ে ফেলতে চাইছেন। রাষ্ট্রটিতে যেমন তারা করেছেন। আরে ভাইলোগ- ভাষাতো ভাষাই। এর আবার মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান আছে নাকি ?

সেই পাকিস্তান আমল থেকেই এদেশে বাংলা সংস্কৃতি-ভাষার ওপর আক্রমণ এসেছিল। বাঙ্গালি বার বারই তা রুখে দাঁড়িয়েছিল। প্রবল প্রতিবাদ-প্রতিরোধ করেছিল। এই বাংলা ভাষা, মায়ের ভাষাকে রক্ষার জন্য বুকের তাজা রক্ত দিয়েছিল রাজপথে। কিন্তু পিছপা হয়নি মায়ের ভাষাকে রক্ষার জন্য।

তখনও কিন্তু পাকিস্তানীরা নানাভাবেই বাংলা ভাষাকে হিন্দুয়ানী ভাষা বলে বাঙ্গালীকে দমন করতে চেয়েছিল। কিন্তু পারেনি। কারণ বাঙ্গালী মুসলমান-হিন্দুসহ আপামর বাঙ্গালী তখন অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ ছিল।

সেই পাকিস্তান আমলে পহেলা বৈশাখ ও বাংলা সংস্কৃতি নিয়ে কত ধরনের ষড়যন্ত্র যে পাকিস্তান ও এদেশীয় পাকি তাবেদাররা করেছিল তার ইয়াত্তা নেই।

পাকিস্তান আমলে (১৯৪৭-১৯৭১) বাংলা নতুন বছর বা পহেলা বৈশাখ উদযাপন ছিল পূর্ব বাংলার বাঙ্গালিদের জন্য সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের অন্যতম হাতিয়ার।

পাকিস্তানি শাসকরা বাংলা নববর্ষ উদযাপনকে “অ-ইসলামিক” বা ইসলামের পরিপন্থী আখ্যা দিয়ে তা দমনের চেষ্টা করেছিল।

ঐ সময়ে পাকিস্তানি শাসকরা বাঙ্গালিদের দমাতে যেসব ঘৃণ্য পদক্ষেপগুলো নিয়েছিলো তা একটু দেখা যাক। এর মধ্যে ছিল চরমভাবে সাংস্কৃতিক বিরোধিতা।

পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাংলা সংস্কৃতিকে ‘হিন্দুয়ানি’ বা ‘অ-ইসলামিক’ বলে অপপ্রচার চালাত এবং পহেলা বৈশাখ উদযাপনকে চরমভাবে নিরুৎসাহিত করত।

রবীন্দ্রনাথকে হিন্দু আখ্যা দিয়ে রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করার মধ্য দিয়ে সংগীতকে ইসলামী ভাবধারায় পরিচালিত করার নানা অপচেষ্টা চালিয়েছিল।

নববর্ষের উৎসবগুলোতে রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া পাকিস্তানি সরকার নিষিদ্ধ করেছিল, কারণ তারা রবীন্দ্রসংগীতকে বাঙ্গালি সংস্কৃতির প্রতীক মনে করত।

সাংস্কৃতিক চর্চায় বাধা দিয়ে বাঙ্গালিকে নিজস্ব সাংস্কৃতিক বলয় থেকে দূরে রাখার জন্যও নানা প্রচেষ্টা পাকিদের।

সেই পাকিস্তান আমলেই ছায়ানট ১৯৬৭ সালে রমনার বটমূলে বর্ষবরণ শুরু করলে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ তা ভালোভাবে নেয়নি এবং নানাভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল।
তবে এসব নিষেধাজ্ঞার প্রবল প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে ওঠে বাঙ্গালিরা।

এসব বাধা ও নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে বাঙ্গালিরা আরও জোরালোভাবে পহেলা বৈশাখ পালন শুরু করে। এটি তাদের স্বাধিকার আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে।

আমরা সে সময়কার ইতিহাস বিশ্লেষণ করে যা দেখি, তা হলো- ১৯৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট সরকারের আমলে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক পহেলা বৈশাখে সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছিলেন।

কিন্তু তা আর সহ্য হয়নি পাকিস্তান সরকারের। তাই পাকিস্তানি সরকার পরে তা বাতিল করে দেয় এবং সামরিক আইন জারি করে।

সংক্ষেপে বলতে গেলে পাকিস্তানি শাসকরা বাংলা নববর্ষকে ‘ইসলামের পরিপন্থী’ দাবি করে বন্ধ করতে চাইলেও, বাঙ্গালিরা এটিকে তাদের সাংস্কৃতিক ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ধারণ করেছিল।

যার ফলশ্রুতিতে নানা আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাঙ্গালির চূড়ান্ত বিপ্লব ১৯৭১ সালে। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাযুদ্ধ। যেটিকে ঠেকানোর কোন কিছুই ছিলনা।

যে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙ্গালি ছিনিয়ে এনেছিল একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশকে। লাল-সবুজের একটি পতাকা আর বিশ্ব মানচিত্রে একটি রাষ্ট্র। কিন্তু ষড়যন্ত্র থেমে থাকেনি কখনো।

মীরজাফর-ঘষেটি বেগমদের ষড়যন্ত্র চলতেই থাকে যুগে যুগে। একাত্তরের স্বাধীনতার পরও নানা ষড়যন্ত্র, হত্যা , অপপ্রচার করে বাঙ্গালিকে দমিয়ে রাখার নানা আয়োজন চলতে থাকে। এ দেশটিকে পদানত করে রাখতে কত কিছুই না হয়েছে।

বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে যে সীমাহীন গভীর ষড়যন্ত্রের শুরু হয়েছিল তা এখনো চলমান। বরং আরো বেড়েছে।

এই ষড়যন্ত্রে আমেরিকান ডিপষ্টেট, আর নোবেলে কিনে নেওয়া “নোবেল লরিয়েট” সুদী মহাজন ড. ইউনুসের ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ সহ নানা কিছুই অব্যাহত রয়েছে।

ইউনুস রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় নেই ঠিকই, কিন্তু তার বশংবদ মানে তার এসোসিয়েটসরা রয়ে গেছে।

সেই নোবেল লরিয়েটের আমলে ২০২৫ এর ১৪ এপ্রিল মানে বাংলা নববর্ষ উদযাপন নিয়ে এদেশের পাকি মুসলমানরা আবার তাদের সেই ইসলামি চেতনায় চেতিত হয়ে উঠলেন হুক্কাহুয়া রবে।

ইউনুসশাহী ‘ ইংরেজদের ডিভাইড এ্যন্ড রুল’ চালু করেছিলেন এই পহেলা বৈশাখ পালন নিয়ে। এটি যে সব দেশবাসীর মঙ্গল কামনায় করা হচ্ছিল তা তাদের সহ্য হয়নি।

কারণ ইউনুসীয় গংতো এ জাতির, এ দেশের মঙ্গলের জন্য ক্ষমতা দখল করেনি।করেছিল নিজেদের আখের গোছাতে।

যে বাঙ্গালি এই দিনটিতে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একতাবদ্ধ হতো শুভেচ্ছা-ভালোবাসা জানাতে, সবার মঙ্গল কামনায় সেটিকে ভেঙ্গে দিতে চেয়েছে। শুধু চায়নি, তারা ভাঙতে সক্ষমও হয়েছে।

‘ইউনুসীয়-জামায়াত ‘পাক মুসলিমদের কাছে তাই “মঙ্গল” শব্দটি হিন্দুয়ানী শব্দ ও সংস্কৃতি মনে হয়েছে। পাঠক একটু সেই পাকিস্তান আমলের সময়কালের কথা স্মরণ করুন।

প্রচন্ড মিল রয়েছে তাদের গৃহীত পদক্ষেপের মধ্যে। হয়তো আর কয়েকটি দিন যদি থাকতে পারতো ইউনুস গং ক্ষমতায় তাহলে এই বাংলাদেশকে আবার হয়তো “ পূর্ব পাকিস্তান” ঘোষণা করে ফেলা হতো কোন একদিন।

কারণ পাকিস্তানের সাথে যে দহরম-মহরম ও সামরিক আদান-প্রদানসহ নানা ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছিল তাতে এটি মনে করার যথেষ্ট যৌক্তিক কারণ রয়েছে।

আমরা দেখলাম- ২০২৫ সালের ১৪ এপ্রিল “মঙ্গল শোভাযাত্রা” র নাম বদলে এর নাম দেয়া হলো “আনন্দ শোভাযাত্রা”। কি হাস্যকর বিষয়! ভাবুনতো একবার।

যেখানে ইসলামী কায়দায় সালাম দেয়া ও এর প্রতি উত্তরের মধ্যেই শান্তিকামনা ও মঙ্গল কামনার বিষয়টি স্পষ্ট রয়েছে সেখানে এই মঙ্গলের মধ্যেই কিনা পাকি বাঙ্গু মোমিনরা হিন্দুয়ানী খুঁজে পেয়েছে। ফলে চারুকলা থেকে “মঙ্গল শোভাযাত্রা”র বদলে আনন্দ শোভাযাত্রা বের করতে বাধ্য করেছিল।

তখন এদেশের কিছু মুসলিমরা মিঁউ মিঁউ শব্দে মনে হয় কিছুটা অসম্মতি জানিয়েছিল। কিন্তু সেই পাকিস্তান আমলে যেমনভাবে মেরুদন্ড সোজা করে দৃঢ়চেতা মনোবল আর প্রতিবাদী চেতনায় রুখে দাঁড়িয়েছিল বাঙ্গালি মুসলমানরা তা কিন্তু গত ২০২৫ এ করেনি।

এর কারণ হিসেবে আমার মনে হয়েছে- আসলেই এ দেশের অধিকাংশ মুসলমান বাঙ্গালী মুসলিমতো নয়ই বরং তারা পাকি-মুসলিমই রয়ে গেছে।

এরা মন-মানসিকতায় সত্যিকার বাঙ্গালি হতে পারেনি। এদের দিলে এখনো সেই ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ রয়ে গেছে।

এজন্যই বলছিলাম যে- এরা না পেরেছে বাঙ্গালি হতে, না পেরেছে মুসলমান হতে। কারন এদের কাছে বাঙ্গালি হওয়ার চেয়ে মুসলমান হওয়াটা বোধ হয় বেশি ফরজের কাজ। আসলে এ বঙ্গের মুসলমানরা বাঙ্গালিই হতে চায়নি। বরং পাকি-মুসলিমই হতে চেয়েছে।

যার ফলে পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষকে এখনো এদেশের মুসলিমরা হিন্দুদের সংস্কৃতি বা হিন্দুদের নববর্ষ হিসেবে আখ্যা দিয়ে থাকে। যদিও কিছু লোক নানা রঙের কাপড় পড়ে একটু বেড়াতে বের হয়।

কিন্তু অন্তরে ধারণ করে থাকে ইসলাম পছন্দ সংস্কৃতি। অথচ পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ বাঙ্গালির সর্বজনীন অবিচ্ছেদ্য সংস্কৃতি।

একটু খেয়াল করলেই বুঝতে পারবেন ২০২৪ এর জুলাই-আগষ্টে যে ইসলামী ধুঁয়া তুলে সামরিক-জঙ্গী ক্যু করা হলো তার মধ্যে সাংস্কৃতিক অপপ্রচার ও ভারত বিরোধীতা ও কতখানি হিন্দু বিদ্বেষ ছড়ানো হয়েছিল।

বাঙ্গালী সংস্কৃতির বিপরীতে গড়ে তোলা হলো পাকিস্তানী ধারায় কাওয়ালী সংস্কৃতি। এমনকি পাকিস্তান থেকে ইসলামী গানের শিল্পীদের এনে অনুষ্ঠান করা হলো।

যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে একসময় জ্ঞান-বিজ্ঞান ও মুক্ত বুদ্ধির চর্চার জন্য প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলা হতো সেই বিশ্ববিদ্যালয়ই হয়ে উঠলো একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন মাদ্রাসার মতো প্রতিষ্ঠানে।

যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা নিজেরাই “তুমি কে আমি কে- রাজাকার রাজাকার” শ্লোগান দিয়ে নিজেরা গর্ববোধ করতে লজ্জিত হয়না তাদেরকে নিয়ে নিশ্চয় আর নতুন করে কিছু বলার নেই।

এ প্রসঙ্গে দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ ও মুক্তচিন্তা-মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যিনি নতুন প্রজন্মকে উজ্জীবিত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করেছেন প্রফেসর ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কথিত কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী ‘আমি কে, তুমি কে; রাজাকার, রাজাকার’স্লোগান দেয়। শিক্ষার্থীদের এমন প্রতিবাদের প্রতিক্রিয়া জানানো জাফর ইকবালের একটি চিরকুট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়।

ওই চিরকুটে জাফর ইকবাল লিখেছিলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমার বিশ্ববিদ্যালয়, আমার প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়। তবে আমি মনে হয় আর কোনোদিন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে চাইবো না। ছাত্র-ছাত্রীদের দেখলেই মনে হবে, এরাই হয়তো সেই রাজাকার।

আর যে কয়দিন বেঁচে আছি, আমি কোনো রাজাকারের মুখ দেখতে চাই না। একটাই তো জীবন। সেই জীবনে আবার কেন নতুন করে রাজাকারদের দেখতে হবে?’

এতেই বোঝা যায় আমাদের কথিত এই প্রাচ্যের অক্সফোর্ড প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান কি। চব্বিশের ৫ আগষ্ট পর সেখানে কারা রাজত্ব করছে ও করছে। জামায়াত-শিবির-হিযবুত তাহরীর-কওমীদের অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে উঠেছে। এমনতরো পরিস্থিতিতে বাঙ্গালি সংস্কৃতি ও বাংলা নববর্ষ নিয়ে আর এমন নতুন কোন আশাবাদ দেখা দেয়ারতো কোন সুযোগ নেই।

কারণ এখনকার তারুণ্য ইসলামের অপব্যাখ্যার নেশায় বুঁদ হয়ে আছে। এরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অকৃত্রিম পরম বন্ধু ভারতের জাতীয় পতাকা পায়ে মারিয়ে চলে ও ছাত্র ছাত্রীদেরকে তা পায়ে মাড়াতে বাধ্য করে।

পাশাপাশি এই তারুণ্য বাংলাদেশের শত্র ও গণহত্যাকারি দেশ পাকিস্তানের পতাকা নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় মিছিলই শুধু করেনা, এরা পাকিস্তান দিবস পালন করে মহাসমারোহে।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি ক্ষমতা নেয়ার পর রাষ্ট্রীয়ভাবে কিছু রীতিনীতির পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। তবে মনে হচ্ছে বিএনপি জামায়াত-হেফাজত গংকে প্রচন্ড ভয় পাচ্ছে, যদিও সংসদে তাদের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে।

কারণ এই বিএনপি’র বিরুদ্ধেই হয়তো জামায়াত-হেফাজত-হিজবুত গং ইসলামের অবমাননার অভিযোগ আনতে পারে।
তবে এরই মধ্যে পহেলা বৈশাখ পালন নিয়ে কিছু কথা তুলেছেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী।

প্রসঙ্গত গত শতকের আশির দশকে সামরিক শাসনের অর্গল ভাঙার আহ্বানে পহেলা বৈশাখে চারুকলা থেকে যে শোভাযাত্রা বের হয়েছিল; সেটিই পরে মঙ্গল শোভাযাত্রায় রূপ নেয়।

২০১৬ সালে ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতিও পায় এ কর্মসূচি। পহেলা বৈশাখের সকালে রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সামনে থেকে জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে শুরু হত মঙ্গল শোভাযাত্রা। নানা সাজে বিভিন্ন বয়সী মানুষ তাতে অংশ নিতেন।

কিছু ধর্মীয় গোষ্ঠী মঙ্গল শোভাযাত্রার বিরোধিতা করে আসছিল আওয়ামী লীগের সময় থেকেই। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেই বিরোধিতা আরো জোরালো হয়। সেই প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালে চারুকলার শোভাযাত্রার নাম থেকে ‘মঙ্গল’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। নতুন নামকরণ হয় ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’!!?

কত বিচিত্র এই বঙ্গীয় পাক-ভূমির মুসলিম মনোজাগতিক ভাবনা। এরা বাঙ্গালি সংস্কৃতির মূল ধারাকেও সঠিকভাবে নিজের মনে করতে পারছেনা। আবার একেবারে ছাড়তেও পারছেনা। অপরদিকে জঙ্গী ইসলাম রক্ষায় ঝাঁপিয়ে পড়তে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনা।

‘আনন্দ’ কিংবা ‘মঙ্গল’ শোভাযাত্রা নাম নিয়ে বিতর্ক দেশকে আরও বিভক্ত করবে বলে মন্তব্য করেছেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী।

মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ দুপুরে সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ মন্তব্য করেন।

নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, ‘একটি প্রবণতা আছে মুক্তিযুদ্ধ বাদ দিয়ে চব্বিশকে বলার। আমরা সেটি করতে চাই না। আমরা নববর্ষ উদযাপনে মুক্তিযুদ্ধের আগেও যেতে চাই। বায়ান্ন, উনসত্তর, একাত্তর, মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধে কার কী ভূমিকা সেটি তুলে ধরতে চাই। গণতন্ত্র কীভাবে চর্চা হয়েছে সেটাও তুলে ধরতে চাই।’

যথাযোগ্য মর্যাদায় পহেলা বৈশাখের সব অনুষ্ঠান পালন করা হবে বলেও জানান অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী।’

তবে সংস্কৃতি মন্ত্রীর এ বক্তব্যের পরও বাংলা বর্ষবরণে এবারও ‘মঙ্গল’ বাদ দিয়ে ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’, চারুকলায় প্রস্তুতি শুরু হচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

চারুকলা অনুষদের ডীন অধ্যাপক আজহারুল ইসলাম বলেছেন, এবারের আয়োজন অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে। তবে ‘মঙ্গল’ বাদ দিয়ে এবারও ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ আয়োজনের মাধ্যমে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করার প্রস্তুতি শুরু করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ।

তারমানে বোঝাই যাচ্ছে- বিএনপি সরকারের সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী একধরনের কথা বলেছেন। কিন্তু তার বিরোধিতা করেছেন স্বয়ং ঢাবি’র ডীন অধ্যাপক আজহারুল ইসলাম। অথচ গত শতকের আশির দশকে সামরিক শাসনের অর্গল ভাঙার আহ্বানে পহেলা বৈশাখে চারুকলা থেকে যে শোভাযাত্রা বের হয়েছিল; সেটিই পরে মঙ্গল শোভাযাত্রায় রূপ নেয়। ২০১৬ সালে ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতিও পায় এ কর্মসূচি।

# ইশরাত জাহান: লেখিকা, প্রাবন্ধিক ও নারী অধিকার সংগঠক।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *