মঙ্গলে আপত্তি, আনন্দেও আপত্তি। আবার সবশেষ বৈশাখী’তেও আপত্তি জানাবে হয়তো। কারণ এর সব নামেই ‘হিন্দুয়ানী’ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে প্রচন্ডভাবে।
তা এই নব্য মুসলিম পাকিস্তানীদের (অবশ্য মননে অনেক পুরনো পাকিস্তানী) অনেক আগে থেকেই প্রচন্ড আপত্তি ছিল চৈত্র সংক্রান্তি বা বাংলা বছরের শেষ দিনটি পালন নিয়ে। সেই সাথে নতুন বাংলা বছরের প্রথম দিন বা পহেলা বৈশাখ পালন নিয়ে।
বাংলা সংস্কৃতিকেই এই অন্ধকারাচ্ছন্ন গোষ্ঠী মনে করে হিন্দুদের সংস্কৃতি। আর তাতেই তাদের যত ভয়।

বাংলাদেশে ভারত বিরোধিতাও একই রকম চলছে। আসলে এই ভারত বিরোধিতা এসেছে মূলত ধর্মীয় সংকীর্ণতা থেকে। এখানে সেই ধর্মীয় বিরোধের জের ধরে পুরনো দেশবিভাগ অনেক বেশি খোঁচা দেয় এ বঙ্গের মুসলমানদের।
সব মুসলমানদের মধ্যে অবশ্য তা কাজ করেনা। তবে যারা বাঙ্গালি সংস্কৃতিকে লালন- পালন করতে চায় তাদের স্বর এতটাই ক্ষীণ যে ইসলামী জোশের কাছে তা একেবারেই তালপাতার সেপাই।
এই সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদী মোল্লাগোষ্ঠী মনে করে বাঙ্গালি মানেই হিন্দু। আর তাদের সংস্কৃতি হচ্ছে হিন্দুয়ানী। সুতরাং এই হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি বন্ধের জন্য তাদের ইমানী জোশ সবসময়েই চেতিত হয়ে ওঠে।
যদিও ভারতের চাল-ডাল-পেঁয়াজ-শাড়ি-কাপড়সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিষ ছাড়া তাদের একটি দিনও চলেনা। শুধু কি তাই ? হিন্দী ছবি না দেখলেতো তাদের ঘুমও হয়না ঠিকমতো। আর সেই সাথে মুম্বাই নায়িকাদের দেখলে তাদেরতো তখন দিলে কেমন কেমন জানি লাগে ( ধকধক করে ওঠে)।
চিকিৎসার জন্য এরা ভারতীয় ভিসা পেতে কতজনকে যে হাতেপায়ে ধরে তার কোন ইয়াত্তা নেই। বিগত ২৪ ও ২৫ সালেও ভারতের সেভেন সিস্টার্স দখল করার হুমকি দিয়েছিল এনসিপি’র কিশোর গ্যাং নেতা সারজিস আলম ও তার গ্যাংয়ের লোকজন।
সে সময়তো তারা যে কোন সময়েই উত্তর-পূব ভারতের সেভেন সিস্টার্স হিসেবে পরিচিত ত্রিপুরা, আসাম, মনিপুর, নাগাল্যান্ডসহ সাতটি রাজ্য দখল করার দিবাস্বপ্নে বিভোর ছিল।
কিন্তু সম্প্রতি বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখলাম সেই ইসলাম পছন্দ ও চরম ভারত বিরোধী সারজিস আলমের (কেউ কেউ তাকে সারভিস আলমও বলেন) পিতা নাকি চিকিৎসার জন্য ভারতে গেছেন।

কিন্তু তারাই তো সেই চব্বিশ-পঁচিশে গলা ফাটানো চিৎকার করেছিল.. হেই দিল্লী না ঢাকা, গোলামী না বিপ্লবসহ নানা শ্লোগানে।

আহা সে কি চিৎকার আর দেশপ্রেম তাদের!! তো এই টোকাই সারভিস আলমের আব্বাজান যে হিন্দুদের দেশ ভারতে গেলেন চিকিৎসার জন্য তা কোন তরিকায় পড়ে কেউ একটু বুঝিয়ে বলবেন আমাকে মেহেরবানী করে? নাকি এখন তাদের কাছে ভারত মেহেরবান! ভারত মেহেরবান! মোদিজি মেহেরবান! মোদিজি মেহেরবান!!
আসলে আমার কাছে মনে হয়েছে বা এখনো আমি দৃঢ়ভাবে মনে করি- আসলে এরা সব কিছুই বোঝে, কিন্তু তাদেরতো ওই ভারত বিরোধিতা ছাড়া, ইসলামকে পূঁজি করে তা নিয়ে ব্যবসা করা ছাড়া আর কোন রাজনৈতিক পূঁজি নেই।

কারণ সেই পাকিস্তান আমল থেকে সেই পাকি মুসলমানসহ ভারতীয় মুসলিমরাও হিন্দু বিরোধিতায় ছিল চরমে। এদের কাছে রাজনীতির মাঠে টিকে থাকার মূল অস্ত্রই হচ্ছে হিন্দু বিরোধিতা ও ভারত বিরোধিতা। এর বাইরে আর কিছুই চোখে পড়েনি আমার কাছে।
তো সেই বাঙ্গালি সংস্কৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পারস্পরিক সম্প্রীতিতে-বন্ধুত্বে-ভালোবাসায় চৈত্র সংক্রান্তি ও তারপরদিন পহেলা বৈশাখ পালন। এতো সেই চিরায়ত বাঙ্গালির আত্মপরিচয়কে অনুসন্ধান।
সেই অনুসন্ধানকেই বড় ভয় এসব পাকি মুসলমানদের। এরাই বার বার বাঙ্গালিকে বিভক্ত করেছে। বিভেদ বাড়িয়েছে। ধর্মীয় সংকীর্ণতা বাড়িয়েছে। কেউ কেউ হয়তো বলবেন যে, বাঙ্গালি যদি এক থাকে তাহলে এত বিভেদ তারা তৈরী করতে পারবেনা।
কিন্তু সমস্যাতো সেখানেই।
কারণ বাঙ্গালি মুসলমান যতটা না বাঙ্গালি তার চেয়ে বেশি মুসলমান হয়ে উঠতে চেয়েছে। জাতিগত পরিচয়ের চেয়ে তখন তার কাছে ধর্মীয় পরিচয় বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। কখনো কখনো সেই বিভেদ-ধর্মীয় সংকীর্ণতা কম ছিল।
কিন্তু সেটি মজ্জাগত হয়ে গিয়েছিল অনেক আগেই। ফলে যতই জাতিগত পরিচয় সামনে আসুক না কেন বাঙ্গালি মুসলমান তাতে প্রথমে মুসলমান ভেবেছে। তারপরে বাঙ্গালি ভেবেছে।
অনেকে গোস্বা করতে পারেন, কিন্তু আমাদের অধিকাংশ মুসলমান এমনটি নয় তা কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন কেউ?
কারণ আমাদের এই বঙ্গে তো মুজতবা আলী, ওয়াহিদুল হক, প্রফেসর আনিসুজ্জামান , আবদুল গাফফার চৌধুরী, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, সুফিয়া কামাল খুব বেশি জন্মাননি।
আর ঠিক এজন্যই দেশের উচ্চতর আদালতে পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রাসহ বৈশাখ পালন বন্ধ করার জন্য রিট করা হয়। রবিবার মানে ৫ এপ্রিল সেই রিট করা হয়েছে। এটিই বাংলাদেশ।

একাত্তর সালে এই বাংলাদেশের জন্যই কি বাঙ্গালি অকাতরের প্রাণ দিয়েছিল?! তা ভাবতেই ঘেন্নায়-কষ্টে গা রি রি করে ওঠে? তখন ভাবি- এই কি আমার সোনার বাংলা?
পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রাসহ সবকিছু বন্ধের দাবিতে যে রিট করা হয়েছে তাতে বলা হয়েছে- দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর ইমান, ধর্মীয় স্বাধীনতা, সাংবিধানিক অধিকার এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সেই আশঙ্কা থেকেই বাংলা বর্ষবরণে পহেলা বৈশাখের ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ বন্ধে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেছেন এক আইনজীবী।
৫ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান এ রিট আবেদন দায়ের করেন। রিটে সংস্কৃতি, ধর্ম ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, ঢাকা জেলা প্রশাসক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিনকে বিবাদী করা হয়েছে।

রিট আবেদনে বলা হয়, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা কোনো প্রাচীন বাঙালি ঐতিহ্য নয়; বরং এটি ১৯৮৯ সালে ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ নামে শুরু হওয়া একটি ‘নবসৃষ্ট ও কৃত্রিম’ কার্যক্রম, যা পরে নাম পরিবর্তন করে পহেলা বৈশাখের মূল সংস্কৃতির সঙ্গে কৌশলে যুক্ত করা হয়েছে।’
এতে বলা হয়, ‘পাখি, মাছ ও পশুর বিশালাকৃতির প্রতিকৃতি বহন করে ‘মঙ্গল’ বা ‘কল্যাণ’ প্রার্থনা করা ইসলামী আকিদা ও ঈমানের সম্পূর্ণ পরিপন্থি। কারণ মুসলমান কেবলমাত্র আল্লাহর কাছেই মঙ্গল বা কল্যাণ প্রার্থনা করতে পারে।’

আবেদনে বলা হয়, ‘মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ঈমান আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার পাশাপাশি দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, জননিরাপত্তা এবং জাতীয় স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়েছে।’
এতে পহেলা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজন, প্রচার, অনুমোদন বা যেকোনোভাবে পরিচালনা থেকে বিবাদীদের বিরত রাখার নির্দেশনাও চাওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত শতকের আশির দশকে সামরিক শাসনের অর্গল ভাঙার আহ্বানে পহেলা বৈশাখে চারুকলা থেকে যে শোভাযাত্রা বের হয়েছিল; সেটিই পরে মঙ্গল শোভাযাত্রায় রূপ নেয়।
২০১৬ সালে ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতিও পায় এ কর্মসূচি।কিছু ধর্মীয় গোষ্ঠী মঙ্গল শোভাযাত্রার বিরোধিতা করে আসছিল আওয়ামী লীগের সময় থেকেই।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেই বিরোধিতা আরও জোরালো হয়। সেই প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালে চারুকলার শোভাযাত্রার নাম থেকে ‘মঙ্গল’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। নতুন নামকরণ হয় ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’।

এবার বাংলা নববর্ষ-১৪৩৩ উদযাপনের কর্মসূচি ঠিক করতে ৩০ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে সভা হয়।
সভার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ বিভাগ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, নববর্ষ উপলক্ষে ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ সকাল ৯টায় চারুকলা অনুষদ থেকে শুরু হবে।
রাজু ভাস্কর্য, দোয়েল চত্বর, বাংলা একাডেমি হয়ে শোভাযাত্রাটি পুনরায় চারুকলা অনুষদে এসে শেষ হবে। তবে আনন্দ শোভাযাত্রা নাকি মঙ্গল শোভাযাত্রা হবে, তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়।
এরই মধ্যে হেফাজতে ইসলামী চরম হুমকি দেয় সরকারকে এই বৈশাখ উদযাপন নিয়ে। এরপরই গত ৩১ মার্চ সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন করে আনন্দ শোভাযাত্রা করার ‘প্রয়োজন ছিল না’। তার এ বক্তব্য নিয়েও সোশ্যাল মিডিয়ায় তর্ক-বিতর্ক চলে।
সেই প্রেক্ষাপটে এবার সংস্কৃতিমন্ত্রী স্পষ্ট করেন, শোভাযাত্রার নাম হবে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’।

অনেকে অবশ্য সন্দেহ পোষণ করে বলেছেন- যত কিছুই হচ্ছে তার সবকিছুই সরকারের বিভিন্ন সংস্থা থেকে অত্যন্ত কৌশলে বিভিণ্ন সংগঠন ও ব্যক্তিকে দিয়ে করানো হচ্ছে। যেটি অতীতেও হয়েছে। এক্ষেত্রে কোথায় যেন একটি চরম মিল রয়েছে। ওই যে কথায় বলে- ‘সব রসুনের এক গোয়া।‘
এমনতরো পরিস্থিতিতে প্রবাসী বাঙ্গালি শৈবাল তালুকদার তার প্রতিবাদী কন্ঠে বলেছেন- ‘ এই শোভাযাত্রা হিন্দুয়ানি নয়, আবহমান বাংলার ভূমিপুত্রদের পলিমাটির সংস্কৃতির ধারক বাহক।
আপনারা যারা মরু আরবের ফানা ফিল্লাহ্ “তৌহিদী জৌনতা” বালকদের পায়ু মৈথুন, নাবালিকা বিবাহ এবং ধর্ষণ এবং মাদ্রাসায় শিশু প্রহার জায়েজ চান, খিলাফত চান, মঙ্গল শোভায়াত্রা সহ্য করতে পারেননা, তারা দয়া করে আফগানিস্তান, পাকিস্তান, সিরিয়া, মরু আরবে চলে যান।
আমার মাটি আমার মা
পাকিস্তান হবে না
আমার মাটি আমার মা
খিলাফতের হবে না।
সাংবাদিক শিউলী শবনম মন্তব্য করেছেন- ‘এতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েও যখন কোনো সরকার শক্ত মেরুদণ্ড নিয়ে দাঁড়াতে পারে না! তখন এভাবেই ধর্মীয় জুজুর ভয় নিয়ে রাষ্ট্র চলবে।
কারণ, ধর্ম ক্ষমতা টিকিয়ে রাখে। মানুষের কল্যাণ হোক না হোক, ইতিহাস ঐতিহ্যের নিকুচি হোক, কার তাতে কী! হেফাজত আর জামায়াতই মিলেমিশে রাষ্ট্র চালাক।’
পহেলা বৈশাখের দিন শোভাযাত্রার নাম কি হবে তা নিয়ে ইসলামি মৌলবাদীদের যে হুংকার ও সরকারের পশ্চাদাপসারন ঘটছে তা দেখে সাংবাদিক-প্রাবন্ধিক হাসান নাসির ক্ষোভে মন্তব্য করেছেন এভাবে- ‘এই যে বর্ষবরণে “মঙ্গল শোভাযাত্রা” বাদ দিয়ে আনন্দ বা বৈশাখী শোভাযাত্রা করবেন, সেই ‘বৈশাখী’ শব্দটিও তো হিন্দুয়ানি।
বাংলা ভাষাটাই হিন্দুয়ানি। এই ভাষাটা পুরোপুরি বাদ দেওয়া যায় না?
আমরা যে ভাষায় বলি, পড়ি ও লিখি তারমধ্যে কিছু আরবি, ফার্সি এবং উর্দু শব্দ ঢুকে পড়েছে। এগুলো ঠিক আছে।
এই শব্দগুলো রেখে কিছু যুক্ত করে আমরা কি নতুন কিসিমের একটা ভাষা চালু করতে পারি না ?’
এদিকে মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তনের ঘোষণায় উদীচী নামের সাংস্কৃতিক সংগঠনটি ক্ষোভ প্রকাশ করে একটি বিবৃতি দিয়েছে।
এতে তারা বলেছে-
‘ আমরা গভীর উদ্বেগ ও তীব্র ক্ষোভের সঙ্গে লক্ষ্য করছি যে, বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় আবারও নতুন নামকরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মঙ্গল শোভাযাত্রা যা কেবল একটি নাম নয়, বরং আমাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং বাঙালির সার্বজনীন ঐক্যের এক শক্তিশালী প্রতীক,তাকে বারবার পরিবর্তনের এই প্রবণতা আমাদের সংস্কৃতির ওপর এক ধরনের অযাচিত ও অগ্রহণযোগ্য হস্তক্ষেপ।
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহমুদ সেলিম এবং সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, আমরা বর্তমান সরকার ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কাছে জোরালোভাবে দাবি জানাচ্ছি- “মঙ্গল শোভাযাত্রা” নামটি অবিলম্বে পুনর্বহাল করতে।
একইসঙ্গে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠীর চাপের কাছে নতি স্বীকারের প্রবণতা বন্ধ করতে হবে।
তারা বলেন, গত শতকের আশির দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল প্রেক্ষাপটে যে শোভাযাত্রার সূচনা, তা সময়ের প্রবাহে “মঙ্গল শোভাযাত্রা” হিসেবে দেশ-বিদেশে স্বীকৃতি লাভ করে।
২০১৬ সালে ইউনেস্কো-এর স্বীকৃতি এই আয়োজনকে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে। সেই ঐতিহ্যের নাম পরিবর্তন কিংবা মুছে ফেলার চেষ্টা ইতিহাস, সংগ্রাম এবং সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতাকে অস্বীকার করার শামিল।
আমরা সুস্পষ্টভাবে বলতে চাই সংস্কৃতি কখনোই রাজনৈতিক সুবিধাবাদ, মতাদর্শিক চাপ কিংবা ধর্মীয় সংকীর্ণতার কাছে নতজানু হতে পারে না।
“মঙ্গল” শব্দটি এই শোভাযাত্রার অশুভের বিরুদ্ধে শুভের জয়, বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য এবং মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। এই শব্দটি অপসারণের অর্থ সাংস্কৃতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেওয়া।
বাংলাদেশের সংস্কৃতি তার বহুত্ববাদ, সহনশীলতা এবং মুক্তচিন্তার জন্যই বিশ্বে সমাদৃত। সেই চেতনাকে অক্ষুণ্ণ রাখা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব। ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির এই ধারাবাহিকতা রক্ষা করা শুধু সাংস্কৃতিক দায়িত্ব নয় এটি আমাদের অস্তিত্ব ও পরিচয়ের প্রশ্ন ।’
সবচেয়ে যে বিষয়টি মজার লেগেছে তা হলো, একজন লিখেছেন-‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ থেকে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ বেশি আপত্তিকর। বৈশাখ শব্দটাই এসেছে বিশাখা নক্ষত্র থেকে।
‘বিশাখা হইতে নাম হইল বৈশাখ
আরম্ভিলা গ্রীষ্মকাল, প্রখর নিদাঘ
এই মাস হইতে বঙ্গে বর্ষ শুরু হয়
সিদ্ধিদাতা গজানন গণেশ কৃপায়’।
হিন্দু পুরাণমতে বিশাখা হচ্ছে দক্ষরাজের কন্যা ও ব্রহ্মার নাতনি।
মঙ্গল তাও পুরুষ ছিল, কিন্তু বিশাখা তো নারী। এখন কি হবে!!
# রাকীব হুসেইন, লেখক, প্রাবন্ধিক।
