কুখ্যাত নরঘাতক গোলাম আযম মরেছে অনেক আগে। কিন্তু সেই যে পাকিস্তানী প্রেতাত্মা গোলামের বাচ্চা গোলাম তাকে এই বাঙ্গালী ভুলতে পারেনি।

তার এতসব জারজ সন্তান জামায়াত-শিবিরের পঙ্গপাল থাকা সত্ত্বেও এই বাংলাতেই তার পোষ্টারে জুতা নিক্ষেপ ও ব্যাঙ্গাত্মক ছবি এঁকে ঘৃণা জানাচ্ছে এ প্রজন্মেরই ছাত্ররা।

আবার সেটি ঘটেছে গত ৬ এপ্রিল জামায়াত-শিবিরের অত্যন্ত শক্তিশালী ঘাঁটি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েই। ছোট্ট একটি সংবাদ। কিন্তু সেই ছোট্ট সংবাদটিই অনেক গুরুত্ব বহন করে।

কারণ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে স্বাধীনতাবিরোধী-মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী জামায়াত-শিবিরের মিনি ক্যান্টনমেন্টও বলা হয়ে থাকে। আর ঠিক সেখানেই কিনা এই ঘৃণিত জামায়াতের একসময়কার উজিরে আযম গোলাম আযমের ছবিযুক্ত পোষ্টারে জুতা দিয়ে তাকেই অপমান!! পাঠক কেমন একটু অবাক হলেন নাকি!? অবশ্য হবারই কথা।

এখানকার ছাত্র সংসদ তাদের দখলে। প্রশাসনও তাদের আজ্ঞাবহ। তাদের কথার বাইরে , তাদের ইশারা ছাড়া সেখানে গাছের পাতাটি নড়ার জো নেই। অথচ সেখানেই হঠাৎ এই পরিবেশে ঘটে গেলো এমন ঘটনা।

স্বাভাবিকভাবেই এটি জামায়াত-শিবিরের আস্তানায় ঢিল ছোড়ার মতো ঘটনা বটে। এ নিয়ে এই উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীটি তেমন উচ্চবাচ্য না করলেও তারা খুঁজে বের করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে কে সেই তষ্কর যার এত বড় বুকের পাটা যে তাদের একসময়কার আমীরে জামায়াতকে অপমান করে!

এ নিয়ে একধরনের হৈ চৈ পড়ে গেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে।

বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে যেটি জানা গেলো তা হলো- চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক ও প্রয়াত আমীর গোলাম আযমকে নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক পোস্টার লাগানো হয়েছে।

সোমবার (৬ এপ্রিল) সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলচত্বর–সংলগ্ন ওয়াশরুম এবং কলা ঝুপড়ির দেয়ালে এসব পোস্টার দেখা যায়। পোস্টারে গোলাম আযমের মুখে জুতার চিহ্ন এঁকে তার নীচে লিখে দেয়া হয়েছে –‘আমাকে জুতা মারুন।’

কার বা কাদের এতবড় দুঃসাহস যে এমন দুঃসাহস দেখায় বা এমন বেয়াদপি করে তাদের প্রয়াত নেতাকে নিয়ে?

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চাকসুর এজিএস ও ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আইয়ুবুর রহমান সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ‘গোলাম আযম তো ঘৃণিত ব্যক্তি। সেই ঘৃণার জায়গা থেকেই হয়তো কোনো শিক্ষার্থী পোস্টার লাগিয়েছে। তবে এই পোস্টার লাগানোর বিষয়টিকে তেমন বড় করে দেখার সুযোগ আছে বলে মনে করিনা। কারণ আমার কাছে মনে হচ্ছে না, এটি রাজনৈতিকভাবে উস্কানিমূলক। তিনি তো কোনো মহান ব্যক্তিত্ব নন যে তার পোস্টার লাগানো যাবে না।’

তারমানে বোঝা যাচ্ছে বাংলাদেশ বিরোধী ও বাংলাদেশের শত্রু হিসেবে এই গোলামের পুত গোলাম এখনো চরমভাবে ঘৃণিত বর্তমান প্রজন্মের কাছে। যদিও গত চব্বিশের জুলাই-আগষ্টে কথিত ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলন বা মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের চরম আস্ফালনের মধ্যেও বাংলাদেশ বিরোধীরা দেশি-বিদেশী আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারকে পতন ঘটাতে সক্ষম হয়েছিল।

আমেরিকার ডিপষ্টেট ও তাদের একনিষ্ঠ এজেন্ট ড. ইউনুসের মেটিকুলাস ডিজাইনে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি জামায়াত- হিজবুতসহ অন্য উগ্র ইসলামী অপশক্তির জোটের ষড়যন্ত্রে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মূলধারার শক্তি যথেষ্ট বেকায়দায় পড়েছে। অবশ্য সে অবস্থা এখনো অব্যাহত আছে।

কিন্তু তাই বলে বঙ্গবন্ধু-আওয়ামীলীগ ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি যে একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে তা কিন্তু নয়। তারই প্রেক্ষিতে এমন প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের আগ্নেয়গিরির সংকেত দেখা যাচ্ছে।

এমন ক্ষোভ কিন্তু সারা দেশেই কমবেশি বিরাজ করছে। শুধু সংগঠিত-সুচিন্তিত গঠনমূলক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষা।
তবে জামায়াতের ছাত্র শাখা ইসলামী ছাত্র শিবিরের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ( চবি) শাখা এ বিষয়টি নিয়ে খুব বেশি প্রতিক্রিয়া দেখাতে চাইছেনা।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমকে চবি শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ পারভেজ বলেছেন , ‘গত ৫ এপ্রিল রাতেই কয়েকজন পোস্ট করেছে দেখলাম। আর ৬ এপ্রিল পোস্টার দেখলাম। বিষয়টি হচ্ছে, ক্যাম্পাসকে অস্থিতিশীল করার জন্য কেউ হয়তো এটি করছে। তারা চাইছে আমরা যেন প্রতিক্রিয়া দেখাই। তারা ফাঁদ পাতার চেষ্টা করছে। তবে আমরা সেই ফাঁদে পা দেব না।’

মোহাম্মদ পারভেজ বলেন, ‘এসব বিষয় তো মীমাংসিত। তাদের আদালতে নেওয়া হয়েছে, বিচার হয়েছে। যারা বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি করেছে, তারাই তো আর দেশে নেই।’

শিবির এজন্য সরাসরি আওয়ামীলীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের নাম উল্লেখ না করলেও সেদিকেই ইঙ্গিত করেছ। তবে তারা তক্কে তক্কে আছে এই ব্যঙ্গাত্মক পোষ্টার কারা লাগিয়েছে তা খুঁজে বের করার জন্য।

এ বিষয়ে চাকসুর জিএস সাঈদ বিন হাবিব সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘পোস্টারের বিষয়টিকে স্বাভাবিক হিসেবেই দেখছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিন্নমতাদর্শের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করেন। এর মাধ্যমে এটুকু প্রমাণ হয় যে চাকসু পরিচালিত হওয়ার পর এবং চাকসুতে ইসলামী ছাত্রশিবির নেতৃত্ব দেওয়ার পর কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের ওপর কোনো ধরনের চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে না। সব মতের মানুষ তাদের মতাদর্শ প্রচার করবে—এটা তাদের বিষয়। আমরা এটিকে স্বাভাবিক হিসেবেই দেখছি।’

শিবিরের এই চরম শীতলতা বা অত্যন্ত শান্ত ব্যবহার কিন্তু বড় কোন প্রতিশোধের ইঙ্গিত দিচ্ছে। কারণ এদের অতীত ইতিহাস যারা জানেন তারাই শুধু বুঝতে পারবেন মুক্তিযুদ্ধের সময়কালের আলবদর বাহিনীর এখনকার সংগঠন ছাত্রশিবিরের আচরণ সম্পর্কে।

তবে চবি প্রক্টর হোসেন শহীদ সহরাওয়ার্দী বলেছেন , ‘দুষ্কৃতিকারীরা গোলাম আযমের ব্যঙ্গাত্মক ছবি টাঙিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। তবে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ স্থিতিশীল রাখতে সর্বোচ্চ সক্রিয় আছি।’

তবে এদেশবাসী নিশ্চয়ই ১৯৮১ সালের ১ জানুয়ারি এই ঘৃণিত গোলাম আযমকে ঢাকার বায়তুল মোকাররম মসজিদের সামনে বিক্ষুব্ধ জনতার জুতানিক্ষেপ ও শারিরীক লাঞ্ছনার ঘটনা ভুলে যাননি।

যেই রাজাকারের বাচ্চারা গত চব্বিশ-পঁচিশে “গোলামের আজমের বাংলা” বলে শ্লোগান দিয়েছে ,তাদের ইতিহাস মনে রাখা দরকার।

মনে রাখা দরকার গোলামদেরকে এই বাংলায় জুতাপেটা করা হয়েছিলো। ইতিহাস কখনো জিজ্ঞেস করে না, গোলাম আযমকে যখন বায়তুল মোকাররমে জুতাপেটা করা হয়, তখন কি সে এর আগে মসজিদে ঢুকে নামাজ পড়েছিল। ইতিহাস শুধু জানায় যে বায়তুল মোকারমে তাকে জুতাপেটা করা হয়েছিল।

ইতিহাস কখনো জিজ্ঞেস করে না, নিজামীকে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জুতা পেটা করা হয়, তার আগে সে তো সিনেট ভবনে ঢুকে চা বিস্কুট খেলো,তখন কেউ কিছু বলল না কেন? ইতিহাস শুধু লিখে রাখে যে নিজামীকে জুতাপেটা করা হয়েছে।

গোলাম আযম আর নিজামিকে পৃথক পৃথক সময়ে জুতাপেটার ঘটনাটি নিয়ে সবিস্তারেই ছাপা হয়েছিল সংবাদমাধ্যমগুলোতে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার কয়েকদিন আগে দেশ ছেড়ে যাওয়া গোলাম আযম ১৯৭৮ সালে ফিরলেও দলীয় অনুষ্ঠানের বাইরে সেদিনই সে প্রকাশ্য কোনো অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন।

এখনকার নবীন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পিতা “জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে এই একাত্তরের নরঘাতক গোলাম আযমকে দেশে ফিরিয়ে আনার পর ওইটাই ছিল তার প্রথম কোন পাবলিক অনুষ্ঠানে যোগদান। সেটি ছিল ফিলিস্তিনে দুই বাংলাদেশী মারা যাওয়ার পর তাদের মরদেহ দেশে আনার পর বায়তুল মোকাররম মসজিদ প্রাঙ্গনে তাদের নামাজে জানাযা ছিল সেদিন।

সেই অনুষ্ঠানে গোলাম আজম যোগ দিয়ে নিজের অবস্থানটি দেখতে চেয়েছিলেন। মানুষ তাকে কীভাবে নেয়, তার একটা টেস্ট কেইসও ছিল ওই দিন।”

কিন্তু এই বাংলার বিক্ষুব্ধ মানুষ যে তাকে চরমভাবে ঘৃণা করে সেটি প্রমাণ হয়ে গেলো।

তখনকার পত্রিকাতে সেই ঘটনার বর্ণনাকারী ও বিক্ষুব্ধ এক ব্যক্তি নিজেও গোলাম আযমকে জুতাপেটা করেছিলেন।

তার ভাষায়, “গোলাম আযম আসার পরই আমাদের মধ্যে একটা গুঞ্জন তৈরি হলো। তার আসাটা আমরা মেনে নিতে পারিনি।”

“বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করা একজন মানুষ এভাবে আমাদের সঙ্গে এক কাতারে দাঁড়িয়ে জানাজা পড়বে, আমাদের সমাজে মিশে যাবে, এটা আমাদের ভাবতেও অবাক লাগছিল।”

“কয়েক মিনিটের মধ্যেই জানাজা শেষ হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে গাড়িতে ওঠার জন্য এগিয়ে আসেন গোলাম আযম। আমার থেকে তখন ১০-১২ ফুট দূরে। হঠাৎ আমার পায়ের স্যান্ডেল হাতে উঠে এল। এগিয়ে গিয়ে পরপর দুটো আঘাত করলাম। প্রথমটা লাগলো কপালে, দ্বিতীয়টা চোয়ালে।”

এরপর গোলাম আযমের সঙ্গে থাকা অন্যরা তাকে আড়াল করে গাড়িতে তুলে সেখান থেকে সরে পড়ে বলে জানান ওই ব্যক্তি।

তিনি জানান, ওই ঘটনার মাত্র দুটি ছবি তুলেছিলেন তখন দৈনিক সংবাদে কাজ করা রশীদ তালুকদার। একটি ছবি পরদিন সংবাদে ছাপা হয়েছিল।

কেন জুতা মারতে গেলেন- জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, “চরম ঘৃণা থেকেই তাকে মেরেছিলাম। একজন স্বাধীনতাবিরোধী, একজন দেশদ্রোহী, যারা নেতৃত্ব অসংখ্য মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, তিনি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াবেন- এটা কি মেনে নেয়া যায়?”

পরদিন তখনকার প্রায় সব পত্রিকাতেই সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছিল। সংবাদে জুতোপেটার ছবিও ছাপা হয়েছিল। একাধিক ছাত্র সংগঠন এ ঘটনা নিয়ে বিবৃতিও দিয়েছিল।”

তখন বেশ কিছুদিন ধরেই সংবাদপত্রে কলাম লেখকদের লেখনিতে তা উঠে এসেছিল ।

তারমানে দাঁড়ালো- এদেশের মানুষ একাত্তরের খুনী-রাজাকার-আলবদর-আলশামসদের কখনো মেনে নেয়নি। নেবেনা। আর এসব খুনী সংগঠনের মূল রাজনৈতিক দল হলো জামায়াতে ইসলামী।আর বাংলাদেশে তাদের প্রথম আমীর হলো এই গোলাম আযম।

তার প্রতি তখনকার মুক্তিযোদ্ধাসহ মুক্তিকামী বাঙ্গালির যেমন চরম ঘৃণা-ক্ষোভ ছিল এখনকার প্রজন্মের মধ্যেও একই ধরনের ঘৃণা-ক্ষোভ রয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাবিরোধীদের প্রতি এই ঘৃণা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। এটিকে যতই মুছে দেয়ার চেষ্টা করা হোকনা কেন তা সম্ভব নয়। ফিনিক্স পাখির মতো ঠিকই জেগে উঠবে মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী শক্তি। শুধু সময়ের অপেক্ষা।

# ইশরাত জাহান: লেখিকা, প্রাবন্ধিক ও নারী অধিকার সংগঠক।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *