শুধু বাংলাদেশ নয়; আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ঝড় তুলছে রোহিঙ্গা ইস্যু। আজ থেকে প্রায় ১০ বছর আগে  ২০১৭ সালে আগস্টের শেষ দিক থেকে  এ পর্যন্ত মিয়ানমারের আরাকান প্রদেশে রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর ওপর নির্বিচারে হত্যা-নির্যাতন-অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে ও ঘটেছে।

ফলে সে  দেশ থেকে বিতাড়ণের কারণে বাংলাদেশের ভেতরে সে সময়েই ৫ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ ঘটেছে।

মিয়ানমারের সামরিক জান্তা এই রোহিঙ্গাদের ওপর  যে মর্মান্তিক নির্যাতন-নিপীড়ন করেছে তাতে চরম মানবিক   বিপর্যয় ঘটেছে সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।

কিন্তু এই রোহিঙ্গাদের মানবিকতা-জাতিগত-ধর্মীয় ইস্যুকে নিয়ে চলছে নানা ধরনের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বাণিজ্য।

আর এ বাণিজ্যকে হাতিয়ার করে নানা গোষ্ঠী তাদের স্বার্থ হাসিলে নেমেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমেরিকা-জাতিসংঘ-পাকিস্তান-তুরস্কসহ বিভিন্ন সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠী।

বাংলাদেশে এই রোহিঙ্গা ইস্যুটিকে কাজে লাগিয়ে এর থেকে সবচেয়ে বেশি ফায়দা লুটছে জামায়াতে ইসলামী।

সেই ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে আসা  ৫ লাখসহ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আগে থেকে  অবস্থান করা আরো প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা মিলে ১৫ লাখ রোহিঙ্গার যে বিশাল বোঝা বাংলাদেশের ওপর চেপেছে তাতে আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক, পরিবেশ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি চরম হুমকির মুখে পড়েছে।

এর পাশাপাশি রোহিঙ্গা উগ্রবাদী জঙ্গি গোষ্ঠীর সঙ্গে বাংলাদেশের ও আন্তর্জাতিক ইসলামী জঙ্গি সংগঠনের সংশ্রবে আবারো জঙ্গি উত্থানের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

আর এই ইস্যুর সঙ্গে যোগ দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামীসহ তাদের সহযোগী ইসলামী জঙ্গী রাজনৈতিক সংগঠনগুলো।

এর ফলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তাই শুধু হুমকির মুখে নয়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোও সংকটে পড়ছে ও পড়বে।

বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক, নৃতাত্ত্বিক গবেষক, সামাজিক গবেষণাবিষয়ক অধ্যাপক, মিয়ানমারে বাংলাদেশের সাবেক ঊর্ধ্বতন কূটনীতিকসহ বিভিন্ন জনের সঙ্গে আলাপে এসব বিষয়ই উঠে এসেছে।

সেই সঙ্গে এ লেখকের নিজস্ব অনুসন্ধানেও বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে রোহিঙ্গা জঙ্গিগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার ব্যাপারে কিছু তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে।

রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে নিবিড়ভাবে কাজ করা বিশ্লেষকরা বলছেন- যদি সরকারের নীতি-নির্ধারকরা এ ব্যাপারে পদক্ষেপ না নেন তাহলে বাংলাদেশের জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন।

মিয়ানমারে ১৯৯৮ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের হেড অব মিশন ছিলেন মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) মো. এমদাদুল ইসলাম।

একাধারে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তাবিষয়ক বিশ্লেষক এবং অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে দেখেছেন রোহিঙ্গা সংকটকে।

বাংলাদেশের ঘাড়ে যে ১৫ লাখ রোহিঙ্গার বোঝা চেপেছে তাতে দেশের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি হুমকিতে পড়েছে।

পাশাপাশি রোহিঙ্গা উগ্রবাদীদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের সংশ্লিষ্টতায় জঙ্গিবাদ উত্থানের আশঙ্কা রয়েছে।

আলাপকালে মেজর এমদাদ বলেন, প্রায় ১০ বছর আগে জাতিসংঘের কফি আনান কমিশন তার চূড়ান্ত রিপোর্টে বলেছে, অবিলম্বে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান করা না হলে তা ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।

পাশাপাশি তারা সাবধান বাণীও উচ্চারণ করেছেন এভাবে- ‘এই জনগোষ্ঠী রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে অবহেলিত থাকলে উত্তর রাখাইন স্টেট অচিরেই জঙ্গি তথা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর জন্য সন্ত্রাসের বীজ বপনের এক উর্বর ভূমিতে পরিণত হবে’।

সেনাবাহিনীর সাবেক এই মেজর এমদাদ বলেন, এসব কারণ এবং বাংলাদেশে কয়েকটি উগ্রবাদী রাজনৈতিক দল এসব দেশহারা রোহিঙ্গাদের নানাভাবে প্রলুব্ধ করে তাদের ব্যবহার করে অরাজকতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করবে, যেমনটি অতীতে করেছে।

তিনি প্রসঙ্গক্রমে বলেছেন-২০১২ সালে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের কারণে ‘রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি’ নামে যে স্ফুলিঙ্গটি তৈরি হয়েছে তার বিস্তার ঘটা অস্বাভাবিক নয়।

এমনিতেই দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইসহ বিভিন্ন ইসলামিক দেশের সহায়তায় রোহিঙ্গা জঙ্গিগোষ্ঠীর যে আন্তর্জাতিক চক্র গড়ে উঠেছে, তাতে বাংলাদেশের প্রগতিশীল-গণতান্ত্রিক-মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের জন্য নিরাপত্তা হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শুধু তাই নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জন্যও নিরাপত্তা হুমকি হয়ে দাঁড়াবে যদি এ সংকটের সমাধান করা না হয়।

তিনি বলেন, ভূ-কৌশলগত সুবিধা অর্জনের জন্য তৃতীয় শক্তির ইন্ধনও বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্কের অবনতি ঘটাতে সচেষ্ট হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন- মিয়ানমারের ওপর দিয়েই বাংলাদেশ চীন এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে স্থল যোগাযোগের মাধ্যমে বাণিজ্য প্রসারে উদ্যোগী হতে পারে।

সাবেক কুটনীতিক মেজর এমদাদ স্পষ্ট করেই বললেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তাকে অবশ্যই মানবিকতার উর্ধ্বে স্থান দিতে হবে।

কারণ আমাদের অস্তিত্বই যদি সংকটে পড়ে তাহলে আমরা সেই মানবিকতা দেখানোর সুযোগ কই পাব? মানবিক বিষয়টিকে যেমন গুরুত্ব দিতে হবে তেমনি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় আনতে হবে সরকারকে।

তিনি আরো বলেন, মিয়ানমার কিন্তু কূটনৈতিকভাবে বেশ এগিয়ে গেছে। কারণ তারা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের দুই শক্তিশালী দেশকে পক্ষে নিতে সক্ষম হয়েছে এরই মধ্যে।

তাই বাংলাদেশকেও অত্যন্ত কৌশলে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে আন্তজাতিক অঙ্গন থেকে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে তারা বাংলাদেশ থেকে এই রোহিঙ্গা নাগরিকদের তাদের দেশে অনতিবিলম্বে ফিরিয়ে নেয়। তবে মিয়ানমারকে উত্তেজিত করে নয়, তা অবশ্যই কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে করতে হবে।

জাতিগত সংঘাত বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের এই নানাবিধ সমস্যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন ড. রাহমান নাসির উদ্দিন। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক। বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান এই অধ্যাপক।

কিছুদিন আগে তার সঙ্গে এ বিষয়ে আলাপকালে এই  শিক্ষবিদ-গবেষক বলেন, বাংলাদেশ সরকার যেভাবে উদার মানবিকতার পরিচয় দিয়েছে তা অবশ্যই প্রশংসনীয়।

তবে বিভিন্ন সংবাদপত্রের সূত্রমতে, এবারের নিধনযজ্ঞ থেকে বাঁচতে যে লাখ লাখ রোহিঙ্গা ইতোমধ্যে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে তার মধ্যে কিছু ‘সশস্ত্র সন্ত্রাসী’ থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

তা ছাড়া, সৌদি প্রবাসী ২০ জন রোহিঙ্গার সমন্বয়ে গঠিত সৌদি আরবভিত্তিক ‘হারাকা আল ইয়াকিন’র পৃষ্ঠপোষকতায় আরাকানের কিছু রোহিঙ্গা তরুণকে সংগঠিত করে এআরএসএ বা আরসা গঠন করা হয়েছে বলে ২০১৬ সালের ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তা ছাড়া আরসার সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন  র্যাডিক্যাল গ্রপের কোনো ধরনের প্রত্যক্ষ সংযোগের কথা এখনো পর্যন্ত সেভাবে আলোচিত না হলেও তালেবান এবং আইএস মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেয়ার হুমকি দিয়েছে।

আর আরসার নেতৃত্বদানকারী আতাউল্লাহ পাকিস্তানের করাচিতে বেড়ে ওঠা একজন হিসেবে আরসার সঙ্গে পাকিস্তানি লস্কর-ই-তায়েবাসহ অন্য সংগঠনগুলোর একটা যোগাযোগ স্থাপন করাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

যেহেতু মিয়ানমারে সংগঠিত হওয়া, নতুন সদস্য সংগ্রহ করা, ট্রেনিং দেয়া এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা কিছুটা কষ্টসাধ্য সেহেতু বাংলাদেশকে আরসার কর্মকাণ্ড পরিচালনার স্থান হিসেবে ব্যবহার করার একটা আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না।

মাঝে মধ্যে বান্দরবানের গহীন অরণ্যে সন্ত্রাসী গ্রুপের ট্রেনিংয়ের খবর পাওয়া যায়। বিগত আওয়ামীলীগ আমলে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রেইড দিয়ে নানা ট্রেনিং সামগ্রীসহ অস্ত্র এবং গোলাবারুদ উদ্ধার করেছিল।

কিন্তু ২০২৪ এর ৫ আগষ্ট শেখ হাসিনা সরকারকে উৎখাতের পর থেকে এই রোহিঙ্গাদেরকে বরং বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নানাভাবেই জামাই আদর করছে। তাদেরকে নানা ধরনের আর্থিক ও সামরিক সহায়তা দেয়া হয়েছে ও হচ্ছে।

অপরদিকে এই রোহিঙ্গা  আশ্রয়প্রার্থী শরণার্থীদের সঙ্গে এরকম কিছু লোক ঢুকে পড়ে এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে সেটা অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য একটা বিরাট হুমকি হিসেবে কাজ করছে।

তাছাড়া, রোহিঙ্গাদের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে স্থানীয় অনেকে উগ্রবাদী  সংগঠন তাদের নানা লোভ দেখিয়ে দলে ভেড়াচ্ছে ।

যেহেতু তারা বেঁচে থাকার জন্য যে কোনো কিছু করতে প্রস্তুত থাকে, তাদের এ অসহায়ত্বকে পুঁজি করে অনেকেই তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত করতে পারে।

সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বাইরেও রয়েছে বিভিন্ন ধরনের মানবিক নিরাপত্তার ঝুঁকি, মানব পাচারের ঝুঁকি, খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি এবং স্বাস্থ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি।

এই রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে নানা সময়ে আলাপ হয়েছে  চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক হোসাইন কবিরের সঙ্গে।

আলাপকালে তিনি  বলেছেন, আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে, এ রোহিঙ্গা ইস্যুর সঙ্গে নানামুখী অপরাজনীতি, সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ফায়দা হাসিলের অভিপ্রায় রয়েছে।

পাশাপাশি  ভূ-রাজনীতির কূটচাল, জঙ্গিপনা, নানামুখী অপরাধ অপতৎপরতার অভিপ্রায়সহ বহুবিধ এজেন্ডা এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।

তিনি বলেন, মিয়ানমারের জান্তা নিয়ন্ত্রিত সরকার কর্তৃক সৃষ্ট মিয়ানমারের বিশাল সমস্যার বোঝা আজ বাংলাদেশের কাঁধে, যে সমস্যার অংশীদার কোনোভাবে বাংলাদেশ নয়।

কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গা-ইস্যুতে বাংলাদেশকে ক্রমশ একটি পক্ষ বানাতে চাইছে, অংশীদার করতে চাইছে। এ চাওয়াতে অশনি সংকেতের পূর্বাভাস সচেতন মহলের টের পাওয়ার কথা।

আর দেশের তেঁতুলবাজরা  (কওমী মাদ্রাসাভিত্তিক জঙ্গী সংগঠন হেফাজতে ইসলামী ) বুঝে না বুঝে মুসলিম তবকের দোহাই দিয়ে কার্যত আন্তর্জাতিক অভিপ্রায় ও মিয়ানমারের অভিপ্রায়ের ষোলকলা কিছুটা হলেও পূর্ণ করে দিচ্ছে।

বিভিন্ন তথ্যানুসন্ধান, প্রশাসনের সাবেক ও বর্তমান বেশ কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপকালে তারা জানিয়েছেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে সে সুযোগেই মিয়ানমার থেকে দলে দলে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের পথটি সুগম হয়।

১৯৭৮ সালে সে সময়ের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক লে: জে: জিয়াউর রহমান সরকার মুসলিম বিশ্বে নিজের জনপ্রিয়তা বাড়াতে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সামরিক সরকারের স্বীকৃতি আদায়ের জন্য রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশে বাংলাদেশের সীমান্ত খুলে দেয়।

সে সময়ে বার্মা থেকে পালিয়ে আসা দুই থেকে আড়াই লাখ রোহিঙ্গা তখন বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে।

আর সেই সুযোগটিকে সবচেয়ে বেশি কাজে লাগায়  জামায়াতে ইসলামীর নেতা একাত্তরের নরঘাতক মীর কাসেম আলী, (যাকে আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আদালতের আদেশে ফাঁসি দেয়া হয়)।

এই মীর কাসেম আলী ইসলামের নাম বিক্রি করে, রোহিঙ্গা মুসলিমদের করুণ দুরাবস্থাকে পুঁজি করেছেন।

তিনি সৌদি আরবভিত্তিক  সাহায্য সংস্থা রাবেতা আল ইসলামীর বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর হয়ে এসব রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।

শুধু তাই নয়, এই রাবেতা আল ইসলামী তখন থেকে বাংলাদেশে বিশেষ করে কক্সবাজার, রাঙ্গামাটিতে রোহিঙ্গা জঙ্গি, জামায়াত-শিবিরসহ অন্যান্য ইসলামী জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ ও আশ্রয়ের অন্যতম ঘাঁটি হয়ে উঠেছিল।

আর প্রশাসনিকভাবে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ওমর ফারুক (পরবর্তী সময়ে বিএনপি-জামায়াত জোট আমলে স্বরাষ্ট্র সচিব) এই রোহিঙ্গাদের যা যা সাহায্য প্রয়োজন তার সবকিছুই করেছিলেন।

প্রশাসনের তৎকালিন লোকজনের মাধ্যমে জানা যায় সে সময় এই চতুর ওমর ফারুক রোহিঙ্গাদেরকে বাংলাদেশে স্বাগত জানিয়েছেন এভাবে- “আহলান সাহলান, আমার মুসলিম ব্রাদারগণ আপনারা আসুন, আমরাতো আপনাদের অপেক্ষাতেই রয়েছি।”

এই রোহিঙ্গা মুসলিমদেরকে  কক্সবাজার, বান্দরবান, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নামে-বেনামে  জায়গা-জমি ক্রয় এবং ব্যবসা-বাণিজ্য করতে যত ধরনের প্রশাসনিক সুবিধা প্রয়োজন তার সবই দিয়েছিলেন এই ওমর ফারুক।

রোহিঙ্গাদের চেহারা ও ভাষা দক্ষিণ চট্টগ্রামের লোকদের সঙ্গে অনেকটা মিল থাকায় এবং এসব রোহিঙ্গার অনেক আত্মীয়স্বজন আগে থেকে এসব এলাকায় বাস করায় তারাই তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে।

তবে যে হারে এবং যে কৌশলে রোহিঙ্গাদের পাহাড়ি অঞ্চলে বিশেষ করে আদিবাসীদের জায়গায় বসতি স্থাপনের সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে তাতে করে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের সঙ্গে এসব অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের সংঘাত অনিবার্য।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আদিবাসী কয়েকজন সংবাদকর্মী ও এলাকার অধিবাসীরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, এমনিতেই পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের সঙ্গে সেটেলার বাঙালিদের এক ধরনের দ্বন্দ্ব-সংঘাত লেগে আছে।

তার ওপর এসব অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গারা যদি আরো অধিক হারে আদিবাসীদের জায়গা-জমিতে দখল নিয়ে বসে তাহলে আবার আদিবাসীদের সঙ্গে এসব রোহিঙ্গার এক ধরনের নতুন সংঘাত সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।

# রাকীব হুসেইন: লেখক, প্রাবন্ধিক।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *