ভেবেছিলাম দেশের রাজনীতি নিয়ে কিছু লিখবো। কিন্তু কয়েকটি খবরের দিকে চোখ পড়ে যাওয়ায় সেদিকে না গিয়ে একটি ভিন্ন বিষয়েই আলোচনা করতে চাই।
শনিবার একটি সংবাদ মাধ্যমের অনলাইনে যে নিউজটি চোখে পড়লো তা হলো- চট্টগ্রাম থেকে প্রশিক্ষণ শেষে রাতে কুমিল্লার বাসায় ফিরছিলেন বুলেট বৈরাগী (৩৫) নামে এক কাস্টমস কর্মকর্তা। কাছাকাছি স্থানে পৌঁছে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথাও বলেছিলেন তিনি। এরপরই হঠাৎ তার মুঠোফোন বন্ধ।
২৫ এপ্রিল সকালে মহাসড়কের পাশে পাওয়া যায় তার মরদেহ। মুখমণ্ডল ছিল রক্তাক্ত। নিহত বুলেট বৈরাগীর বাড়ি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়।

তিনি ছিলেন কাস্টমস, এক্সসাইজ ও ভ্যাট বিভাগে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা। চাকরির জন্য তিনি কুমিল্লার রাজাগঞ্জ পানপট্টি এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। তার ৯ মাস বয়সী একটি মেয়ে আছে।

আরেকটি খবর এর মাত্র সপ্তাহখানেক আগে। মানে ১৯ এপ্রিলের ঘটনার। কক্সবাজারের খুরুশকুল এলাকার পাহাড়ে এক সাধুকে অপহরণ করে মেরে ঝুলিয়ে রেখেছিল গাছে। শুধু তাই নয় তাকে পুড়িয়ে চরম নৃশংসতার পরিচয় দিয়েছে হত্যাকারীরা। অথচ সেখানকার একটি মন্দিরের সেবায়েত ছিলেন এই নয়ন সাধু।

১৯ এপ্রিল ডেকে নিয়ে যায় সেই হত্যাকারীরা। তারপর থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। তার পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় জিডি করবার পর ২২ এপ্রিল সকালে স্থানীয় জনগণ সাধুর ঝুলন্ত ও পুড়িয়ে দেওয়া মরদেহ উদ্ধার করে। মন্দিরের একজন সেবায়েত এই নয়ন সাধু ।
তার কি শত্রুতা থাকতে পারে যে তাঁকে এমন পৈশাচিকভাবে হত্যা করতে হলো!? জানি এর কোন উত্তর কারো কাছে নেই।
এই যে উপরের দুটি হত্যাকান্ডের কথা উল্লেখ করলাম তারা দুজনেই হিন্দু বা সনাতন ধর্মীয় অনুসারি।
এদেরকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার মধ্য দিয়ে আসলে কি মেসেজ দিতে চায় বাংলাদেশের সমাজ-রাজনীতিবিদ ও সরকার সেটিই জিজ্ঞাস্য এখন।
বাংলাদেশ ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন হওয়ার পর থেকে কখনো কি হিন্দুরা নিরাপদ ছিল এই দেশে? তা সে যেই সরকারের সময়েই হোক না কেন।
কমবেশি সকসময়েই অত্যাচারিত-নিষ্পেষিত-বিতারিত ছিল, এখনো তাই। নিহত কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীর মা নীলিমা বৈরাগী জানান, বুলেট বৈরাগী তার একমাত্র ছেলে। তিনি ৪১তম বিসিএসে নন-ক্যাডার পদে কাস্টমস কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পান।
৪৪তম বনিয়াদি প্রশিক্ষণে অংশ নিতে ১১ এপ্রিল চট্টগ্রাম যান বুলেট বৈরাগী। গত ২৪ এপ্রিল শুক্রবার প্রশিক্ষণ শেষে রাত ১১টার দিকে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী একটি বাসে ওঠেন তিনি। সর্বশেষ রাত ২টা ২৫ মিনিটের দিকে পরিবারের সঙ্গে তার কথা হয়। তখন জানিয়েছিলেন, তিনি কুমিল্লার পদুয়ার বাজার এলাকায় নেমে রাজগঞ্জ পানপট্টির বাসায় ফিরবেন।
মা নীলিমা বলেছেন-‘আমার ছেলে বাস থেকে পদুয়ার বাজারে নামার কথা। কিন্তু কোটবাড়ীতে লাশ পাওয়া গেছে, সেখানে তার যাওয়ার কথা না। এটি পরিকল্পিত হত্যাকান্ড বলেই তার অভিযোগ।

পরিবারের দাবি, রাত আড়াইটার পর তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে কয়েকবার কথা বলে অজ্ঞাতরা। এর পর থেকে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
তবে এটি বোঝা যায় যে, বাংলাদেশকে হিন্দু শূন্য করার নানামুখী নীলনকশা চলছে। কিন্তু এই চক্রান্ত এদেশের হিন্দুরা বুঝতে পারছেন না। তারা এখনো মন্দির উদ্বোধন , আর সেটি উদ্বোধন করাচ্ছেন সরকারের মন্ত্রীদের দিয়ে।

কোন মসজিদ উদ্বোধন করতে কি বাংলাদেশে কোন সরকারের আমলে কোন হিন্দু মন্ত্রীকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল? একটু ভাবুনতো বিষয়টি। একটু অবাক হচ্ছেন এমন কথা বলছি বলে?
আসলে আমরা মোসলমানরা চাই –হিন্দুরা আমাদের কাছে সবসময় নত হয়ে থাকবে, আমরা যা বলবো তাই শুনতে হবে।
আমরা চাইবো হিন্দুরা ধর্মনিরপেক্ষ থাকুক, ক্ষতি নাই। কিন্তু আমাকে সাচ্চা মুসলমান হতে হবে। সে আমার সাথে বসে গরুর গোস্ত খেয়ে অসাম্প্রদায়িকতার পরিচয় দেবে, কিন্তু ভুলেও আমাকে পাঁঠা খাওয়ার বা শুকর খাওয়ার কথা উচ্চারণও করতে পারবেনা।
আর এই উপমহাদেশে গরু-শুকর যেন ধর্ম রক্ষার মাপকাঠি হয়ে গেছে। আরে এটি তো একধরনের খাদ্যাভ্যাস, স্বাস্থ্যসম্মত ব্যাপার হতে পারে। রুচি-অরুচির বিষয় হতে পারে।
এসব দেখে এক বিক্ষুব্ধ সচেতন নাগরিকের মন্তব্য ছিল এমন- “বাংলাদেশী হিন্দুদের জীবনে একটা সরকারি চাকুরির মোহ যায়নি! তোমাদের জীবনের এতো রিক্স নিয়ে বাংলাদেশের একটা সরকারী চাকুরী কেন করতে হবে ওহে মূর্খ হিন্দু?
তোমার জীবন মূল্যহীন তুমি কি জানো না? তোমাকে শুধুমাত্র একজন সংখ্যালঘু কাফের হিন্দু হওয়ার অপরাধে আত্মাহুতি দিতে হবে শান্তির দূতদের হাতে! পারলে চাকুরীর মায়া ত্যাগ করে সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ দেশটির মায়া কাটাও।
তোমার বাঁচার আশা নেই! কারণ তুমি এক গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার। অন্তত ১০০০ বছরের গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার! তোমার ভূমি যতদিন তোমার না হবে, তোমার দেশ যতদিন তোমার না হবে ততদিন তোমারদেরকে জীবন হারাতে হবে!
তুমি যতই চাকুরি করো, বাংলাদেশ তোমাকে কখনোই নিরাপদ রাখেনি আর রাখবেও না! তোমার এতো পরিশ্রম, এতো তিতিক্ষা, এতো সংগ্রাম সব শেষ হলেও বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের কিছুই আসে যায় না।
তোমার সুন্দর জীবন, বিবাহিত জীবন, সংসার সবই নিঃশেষ হলেও বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের কিছুই আসে যায় না। তোমার জীবনের মূল্য নেই। তোমরা এখনো মোহাবিষ্ট রয়েছো। তোমরা যতই বাংলাদেশকে ভালোবাসো বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও তাঁর পরিচালকরা আর তার সংখ্যাগরিষ্ট শান্তিপ্রিয় জনগন তা বিশ্বাস করেনা।
তাই তোমার পালানো উচিত! তুমি আমি সবাই শূন্য হলে তারা শান্তিতে বসবাস করতে পারবে। আমি ও তুমি যদি থাকি ততদিন তারা নিজের কালচার সঠিকভাবে পালন করতে পারেনা। তোমাকে আমাকে নিয়ে তাদেরকে অতিরিক্ত প্রেসার নিতে হয়।
আজকে সরকারী কর্মকর্তা (কাস্টমস) হতভাগ্য বুলেট বৈরাগীকে বাংলাদেশে জীবন হারাতে হলো। এতো প্রতিনিয়ত হিন্দু গণহত্যা চলছে!

হিন্দু তুমি অন্তত ১০ টি করে সন্তান নাও ; কারণ তোমার ৯ টি সন্তানকে হত্যা করতে করতে ওরা ক্লান্ত হয়ে পড়বে তবুও তোমার ১টি সন্তান অন্তত বেঁচে থাক।”
সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত স্বদেশ
‘মব’- হাম-রুবেলার মতোই একটা সংক্রমক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। মুশকিল হলো, হামের টিকা আছে, বিদেশ থেকে আমদানি করা যায়। কিন্তু বিদেশে ‘মব মহামারী’ না থাকায় তারা মবের টিকা আবিষ্কার করেনি। তাহলে মব বন্ধের উপায় কি? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যতই বলুন, পুলিশ দিয়ে মব বন্ধ করা যাবে না। এর জন্য টিকাই লাগবে।
দেশটাকে মবের মুল্লুক বানিয়েছেন নো-বেল কাকা। ভাতিজার ঘাড়ে এই দায় চেপেছে উত্তরাধিকার সূত্রে। এখন মনে হয়, মব বন্ধে সরকারের উচিত একটা বৈজ্ঞানিক কনফারেন্স ডাকা।
সেখানে আলোচনা-পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ করে দেশের তাবৎ বৈজ্ঞানিকদের মবের টিকা আবিষ্কারে নিয়োজিত করা যেতে পারে।
এই যে রাজশাহীতে দলবল নিয়ে হামলা করে কলেজ শিক্ষিকাকে জুতাপেটা করলেন বিএনপি নেতা, এই সিস্টেমও নো-বেল কাকার প্ররোচণায় শুরু হয়েছিল।

অপকর্ম করার পর নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করলেই বিএনপির দুগ্ধ স্নান হয়ে যায় না। কারণ, এভাবে লোম বাছতে বাছতে কম্বলই উজাড় যাবে। সমস্যা সমাধানে টিকার ব্যবস্থা করতেই হবে।
যতদিন মবের টিকা আবিষ্কার না হয়- ততদিন পাগলা কুত্তার টিকা ট্রাই করে দেখতে পারেন।
মানবাধিকার সংগঠক-সাংবাদিকরা বিনাবিচারে কারাগারে ধুঁকছেন। সাজানো খুনের মামলায় দেড় বছরের বেশি সময় ধরে কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে বন্দি করে রাখা হয়েছে সিনিয়র সাংবাদিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত, একাত্তর টিভির নির্বাহী কর্মকর্তা মোজাম্মেল বাবু, মানবাধিকার সংগঠক, লেখক সাংবাদিক ও গবেষক শাহরিয়ার কবির, একাত্তর টিভির জনপ্রিয় সাংবাদিক ফারজানা রূপা-শাকিল দম্পতিকে।
এই সাংবাদিকদের রাজনৈতিক মতাদর্শ ও তৎকালীন সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকতে পারে। যদিও নিশ্চিত করে জানি, শেখ হাসিনার সরকার বা দলের সঙ্গে তাদের সরাসরি কোনো সম্পৃক্ততা নেই। বরং তারা অনেক সময় সমালোচনাই করেছেন সরকারের বিভিন্ন কাজের।
তাহলে কী অপরাধে দেড়টি বছর ধরে তারা দুঃসহ জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন? কোনো বিচার নেই, জামিন নেই; তাহলে কোন প্রতিহিংসার শিকার তারা? এর কোনো জবাবও নেই।
প্রশ্ন এবং বিতর্ক থাকলেও এই সরকার একটা নির্বাচন নামের একটি পদ্ধতির মধ্য দিয়েইতো ক্ষমতায় এসেছে। প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকারের মন্ত্রীরা গণতন্ত্র ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার সুরক্ষার শপথ নিয়ে গদিতে বসেছেন। তাহলে এই যে নিরপরাধ সাংবাদিকরা ন্যায় বিচার ও মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন- এর দায় কি বর্তমান সরকারের নয় ? দেশে কি কোনো জবাবদিহিতা নেই ?
আমাদের প্রত্যাশা, সরকার অবিলম্বে আটক সাংবাদিকদের মুক্তি দেবে এবং সারাদেশে কয়েকশ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে দায়ের করা সাজানো খুনের মামলাসহ অন্যান্য মামলা প্রত্যাহার করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় যে শপথ নিয়েছে- তা রক্ষা করে সদিচ্ছার প্রমাণ দেবে।
জ্বালানি তেলের সংকট, দামও বেড়েছে। গ্যাসের সংকট, দাম বেড়েছে। বিদ্যুতের সংকট, লোডশেডিংয়ে দুর্ভোগ। নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। আইনশৃঙ্খলার অবনতি। চাঁদাবাজি বেড়েছে। দখলবাজি বেড়েছে। মজুতদারি বেড়েছে। মানবাধিকার ও ন্যায়ের অঙ্গীকার প্রশ্নবিদ্ধ। পরমত সহিষ্ণুতা প্রশ্নবিদ্ধ।
মাননীয়, ক্ষণিকের জন্য আয়নার সামনে দাঁড়ান। কী দেখছেন? কাকে দেখছেন? সেই আপনিইতো? নাকি অন্য কারো চেহারা? নিজেকে আপনি কোন চেহারায় দেখতে চান?
# ইশরাত জাহান: লেখিকা, প্রাবন্ধিক ও নারী অধিকার সংগঠক।
