বিশ্বের কোনো দেশের উন্নয়ন কখনও কোনো সরকারপ্রধানের বাপের টাকায় হয় না। বাংলাদেশেও হয়নি। আওয়ামী লীগের আমলে যে এত এত উন্নয়ন হয়েছে তার কোনোটিই শেখ হাসিনার বাপের টাকায় হয়নি। জনগণের টাকায় হয়েছে।
কিন্তু সেই জনগণের টাকা কখন, কোথায়, কীভাবে, কতটুকু ব্যয় করতে হবে সে পরিকল্পনার জন্য একজন শেখ হাসিনার দরকার হয়।
এমন এক রাষ্ট্রনায়কের দরকার হয় যিনি দেশ ও জাতিকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেন, স্বপ্ন দেখান এবং সে স্বপ্ন বাস্তবায়নও করতে পারেন। এমনটিই বলছিলেন কবি-সাংবাদিক কামরুল হাসান।
তিনি বললেন, একজন নেতার আন্তরিকতা, দূরদর্শিতা ও যোগ্যতা একটি জাতিকে কোথায় পৌঁছাতে পারে তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তো বাংলাদেশ।
অনেকে বিতর্ক করবে, অস্বীকার করবে, কিন্তু ‘তুমি যেখান থেকে দেখো না কেন সূর্য তো একটাই’ সত্যিই তাই।
মূলত তিনি রূপপুরে রাশিয়ার সহযোগিতায় পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রর ব্যাপারে নানা সমালোচকের বক্তব্যে এ কথাগুলো বলছিলেন। অবশ্য তার কথাগুলো অন্য সব উন্নয়নের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
জঙ্গী-সামরিক ক্যু করে উৎখাত করা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশ থেকে বিতারিত করার পর এখন কিন্তু দেশের মানুষজন ঠিকই বুঝতে পারছেন যে শেখ হাসিনা কি করে গিয়েছিলেন দেশের সাধারণ নাগরিকদের জন্য।

তবে আওয়ামীলীগের কিছু তাবেদার নেতার মত করে না বললেও বলতে হয়, শেখ হাসিনা স্বপ্নেই শুধু দেখাননি, স্বপ্নের বাস্তবায়নও করেছেন।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে “বালিশ কান্ড” নিয়ে অনেক প্রতিবেদন হয়েছে। তাতে প্রচুর নয় ছয়ের কথা বলা হয়েছে- এটি অবিশ্বাস করার উপায় নেই। কিন্তু এই যে গত ২০২৪ এর ৫ আগষ্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গোয়েবলসীয় কায়দায় যে প্রপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছিল ও এখনো হচ্ছে যে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যরা এই প্রকল্প থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার পাচার করেছেন অবৈধভাবে।
সে অপপ্রচারতো মেটিকুলাস ডিজাইনার ড. মুহাম্মদ ইউনুস ও তার বশংবদেরা করেছেন। এমনকি বিএনপিও করেছে ও করছে। তারাতো পারলে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে আরো নানা অপপ্রচারে নামতে চায়।
কিন্তু এখন যখন দেখলো যে, বাংলাদেশে নিযুক্ত রাশিয়ান রাষ্ট্রদূত সরাসরি বলে দিলেন যে, কোন ধরনের অবৈধ লেনদেন হয়নি। এমনকি তিনি এও বললেন যে, যদি আরো বেশি অপপ্রচার চলে তাহলে তারা আন্তর্জাতিক আদালতে যেতে বাধ্য হবেন।

সেখানে গিয়ে প্রমাণ করবেন বিষয়টি। এখন দেখি অনেকটা চুপ সমালোচকরা।
ড. ইউনুসের অপপ্রচার এমনই ছিল যে- শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যরা বাংলাদেশের সব টাকা নিয়ে চলে গেছেন।
তো জনাব ইউনুস আপনিতো দেড় বছর ক্ষমতায় ছিলেন, তখন সেসব অবৈধ কাজের, দুর্নীতির প্রমাণ করতে পেরেছেন? পারেননি। না পারলে অযথা চিল্লিয়েছিলেন কেন?
কারণ আপনার যে পাহাড়সম দুর্নীতির প্রমাণ শেখ হাসিনার আমলে আদালত দিয়েছিল। আরও কিছু চলমান ছিল। কিন্তু হে নো-বেল সাহেব আপনি নিজেই কোন এক্সিকিউটিভ পাওয়ারে (!) তা বাতিল করে দিলেন? লজ্জা করেনা আপনার হে নো-বেল লরিয়েট সাহেব?
অবশ্য সেটি যদি থাকতো তাহলে নিশ্চয়ই আপনি এতদিন এত রঙ তামাশা করতেন না জাতির সাথে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বাস্তবায়নের পেছনে ড. ওয়াজেদ মিয়ার অবদান যেনো ভুলে না যায় জাতি।
এ প্রসঙ্গে বলতে চাই আরেকজনের ভাষায় এভাবে- ইতিহাস বড় নির্মম, আবার ইতিহাসই সবচেয়ে নির্ভুল বিচারক।
আজ যখন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র-এর গম্বুজ আকাশ ছোঁয়ার গল্প লিখছে, তখন আমাদের ফিরে তাকাতেই হয়—এই স্বপ্ন কি হঠাৎ জন্ম নিয়েছে? না, এই স্বপ্নের শেকড় অনেক গভীরে প্রোথিত।

১৯৬১ সালে ২৬০ একর জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে যে স্বপ্নের বীজ বপন করা হয়েছিল, সেটি ছিল একটি আত্মনির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন থমকে যায় বৈষম্যের দেয়ালে—পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর পরিকল্পিত অবহেলায়।
১৯৬৩ সালে অনুমোদিত রিয়্যাক্টরটি কৌশলে সরিয়ে নেওয়া হয় করাচি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র-এ। বাঙালির অর্থে বরাদ্দ, অথচ আলো জ্বলে অন্য ভূখণ্ডে—এ যেন এক নিঃশব্দ লুণ্ঠন। এরপর আসে ১৯৭১।
স্বাধীনতা আসে, স্বপ্ন আবার জেগে ওঠে। শেখ মুজিবুর রহমান বুঝেছিলেন—শিল্পায়ন ছাড়া মুক্তি নেই। তাই ১৯৭৩-৭৪ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
কিন্তু ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সে স্বপ্ন চুরমার করে দিলো পাক আইএসআই -আমেরিকান সিআই চক্রের নীল নকশায়। সেদিন শুধু একজন নেতাকে নয়, একটি জাতির সম্ভাবনাকেও থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। দীর্ঘ সময় ধরে রূপপুর হয়ে ওঠে ধুলোমাখা এক ফাইল—স্বপ্ন থাকে, কিন্তু গতি থাকে না।
এই অন্ধকার সময়েই নীরবে লড়াই চালিয়ে যান একজন মানুষ। তিনি ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া। তিনি রাজনীতিবিদ ছিলেন না, ছিলেন একজন বিজ্ঞানী। কিন্তু তার লড়াই ছিল ভবিষ্যতের জন্য। তার মেন্টর ড. উসমানী-এর স্বপ্নকে তিনি কারিগরি ভিত্তিতে রূপ দেন। পরমাণু শক্তি কমিশনের দায়িত্বে থেকে তিনি রক্ষা করেন সেই জমি, সেই পরিকল্পনা, সেই সম্ভাবনা।
তিনি জানতেন—“জমি হারালে স্বপ্নও হারাবে।” বছরের পর বছর তিনি গবেষণা করেছেন, নথি তৈরি করেছেন, একটি রোডম্যাপ তৈরি করে গেছেন— যা পরবর্তীতে হয়ে ওঠে বাস্তবায়নের মূল ভিত্তি।
২০০৯ সালে যখন শেখ হাসিনা এই প্রকল্পের দায়িত্ব নেন, তখন তাকে শূন্য থেকে শুরু করতে হয়নি। কারণ ভিত্তিটা তৈরি করে দিয়েছিলেন একজন নীরব যোদ্ধা।
আজ রূপপুর শুধু একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নয়— এটি একটি জাতির দীর্ঘ সংগ্রাম, অবিচার পেরিয়ে উঠে দাঁড়ানোর গল্প। এটি ধৈর্য, মেধা ও দেশপ্রেমের এক জীবন্ত প্রতীক। যখন এই কেন্দ্রের প্রতিটি ইউনিট চালু হবে, আর বাংলার ঘরে ঘরে আলো জ্বলবে— সেই আলোর ভেতর লুকিয়ে থাকবে এক বিজ্ঞানীর নিরলস পরিশ্রম।

ইতিহাস কাউকে ভুলে না। সময়মতো সে তার প্রাপ্য সম্মান ফিরিয়ে দেয়। এটাই একজন নীরব নায়কের প্রতি জাতির শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধা।
নথিপত্র ঘাঁটতে গিয়ে সেই স্বাধীনতা-মুক্তিযুদ্ধপূর্ব দৈনিক ইত্তেফাকের সংবাদের দিকে চোখ গেল। এই সংবাদটি মূলত বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময়ে (সম্ভবত ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে) রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাস্তবায়নের দাবির প্রেক্ষাপটে তৈরী করা হয়েছিল।
তাতে হেডিং ছিল- “রূপপুর প্রকল্প লইয়া অনেক খেলা হইয়াছে, আর নয়—এবার বাস্তবায়িত করুন: রাজশাহীর বিরাট জনসভায় শেখ মুজিবের দাবী। ১৯৭০ সালের ৩০ জানুয়ারি ইত্তেফাক পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল নিউজটি।
সাংবাদিক হামিদ উল্লাহ মন্তব্য করলেন এভাবে– “আমরা ৫ আগস্টের পর থেকে ইনুচের আইয়ামে জাহেলিয়াতে ছিলাম। তিনি এমন সব চুক্তি করে গেছেন, আগামীতে বাংলাদেশ আর কখনোই (কোনো সরকার) আরেকটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র করতে পারবে না। করতে চাইলে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি লাগবে। আগামী দিনগুলো বাংলাদেশ তাদের ভাগাড়ে পরিণত হবে।
চব্বিশের কথিত ছাত্র-গণ অভ্যুত্থানের ব্যাপারে বলতে গিয়ে তিনি বলেন- তোরা সবাই মিলে আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটাইলি। তোমাদের আন্দোলনের ফসল সরকার এখন শেখ হাসিনার ভালো মন্দের বিচার করুক, দুর্নীতির বিচার করুক, গর্ভবতী পুলিশ নারী সদস্যকে পুড়িয়ে মারার বিচার করুক।

দেড় বছরের আইয়ামে জাহেলিয়াতে কোথাকার পথের ছেলেরা কোটি কোটি টাকা চাঁদা নিয়ে এখন গা ঢাকা দিয়েছে।বাংলাদেশটা হয়ে উঠেছিল তাদের খেলার পুতুল। আল্লাহ সেসব জালিমদের হাত থেকে আমাদের বাঁচিয়েছে।”
তবে আশঙ্কার কথা হলো এই রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রটিও কিন্তু ইসলামী জঙ্গীদের নাশকতার নীলনকশায় রয়েছে বলে পুলিশ সদর দপ্তরের এক জরুরী গোপনীয় নোটিশে হুঁশিয়ারি করা হয়েছে।

আসলে বিষয়টি হয়েছে- যারে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা বলে বাংলায় একটি প্রবাদ আছে।এখানেও বিষয়টি হয়েছে তাই। শেখ হাসিনা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, আওয়ামীলীগ, ভারত-হিন্দু জনগোষ্ঠী, শেখ হাসিনা ও তার সরকারের যারা বন্ধু ছিল তাদেরকেও দেখতে পারেনা এদেশের কিছু বক-মোল্লারা, সেইসাথে কিছু বাম লালবদর।
এরা নানা সময়েই নানা অপযুক্তি খাঁড়া করাতে চায়। কিন্তু সেসব অপপ্রচার আসলে আর কোন কাজে লাগেনা। কিন্তু গোয়েবলসীয় কায়দায় তারা সেই ভাঙ্গা রেকর্ড বাজাতেই থাকে।
তো “ফ্যাসিবাদী হাসিনা”র সব প্রকল্পই যেহেতু খারাপ তাহলে সব প্রকল্পগুলো ধ্বংস করে ফেলা হোক। কারণ সেগুলোতো ফ্যাসিবাদের চিহ্ন বহন করছে। তো কবে ধ্বংস করা হবে সেসব সে অপেক্ষায় রইলাম।
তাই বলি আর কত অপপ্রচার? আর কত অপবাদ? সত্য প্রকাশিত হলে তখন কি লজ্জায় মুখ ঢাকার পরিস্থিতি থাকবে?
# রাকীব হুসেইন: লেখক, প্রাবন্ধিক।
