ঢাকা: পশ্চিমবঙ্গে এবার পদ্ম ফোটাল বিজেপি। ১৫ বছর পর পশ্চিমবঙ্গে পালাবদল হলো। ধস নেমেছে তৃণমূলের দূর্গে।
বিজেপির বঙ্গ বিজয় সম্পূর্ণ।বাংলার মসনদে বিজেপি। ভারতের পশ্চিমবঙ্গবাসীকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সোমবার ‘ভরসা’ দিলেন, ‘বাংলার উন্নত ভবিষ্যতের জন্য বিজেপি দিনরাত এক করে দেবে। মহিলারা সুরক্ষা পাবেন। যুবকরা কাজ পাবেন। বাইরে যাওয়া বন্ধ হবে’।
সঙ্গে তাঁর ঘোষণা, মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প চালু হবে। সেই সঙ্গে অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রীর কথায়, ‘‘এই জয়ের জন্য বিজেপির কত কর্মকর্তা প্রাণ দিয়েছেন। বিজেপির অনেক মহিলা অত্যাচার সহ্য করেছেন। আজ বাংলায় ভারতীয় জনতা পার্টির জয়ের কৃতিত্ব সেই কর্মকর্তাদের পরিবারকে সমর্পণ করছি। ৪মে-র এই সন্ধ্যা বিদায় নিচ্ছে, কিন্তু বাংলার পূণ্যভূমিতে এক নতুন সূর্যোদয় হচ্ছে। এমন এক প্রভাত যার অপেক্ষায় ছিল অনেক প্রজন্ম।’’
সিপিএম, তৃণমূল দুই আমল গেলো পশ্চিমবঙ্গে ঢুকতে পারলেন না বাংলাদেশের লেখক তসলিমা নাসরিন। জন্মদেশ থেকে নির্বাসিত, আবার পশ্চিমবঙ্গেও নির্বাসিত।
বাঙালি লেখিকা হওয়া সত্ত্বেও তিনি কেন বাংলায় তথা কলকাতায় থাকতে পারবেন না, তা নিয়ে অনেকবার প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে ঢুকতে পারেননি তসলিমা। ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পরে বেশ কয়েক বছর কলকাতায় ছিলেন। কিন্তু কলকাতায় তসলিমার বিরুদ্ধে হিংসাত্মক বিক্ষোভ ছড়ানোয় তাঁকে কলকাতা ছাড়তে ‘বাধ্য’ করা হয়েছিল।
তার পরে বেশ কয়েক বছর ভারতে থাকার অনুমতিও তিনি পাননি। পরে আবার ভারতে ফেরেন। থাকার অনুমতিও পান। কিন্তু কলকাতা তাঁর জন্য ‘দুর্গম’ই থেকে গিয়েছে।
তাঁর কথায়, ‘‘আমার কি যেতে ইচ্ছা করে না? কলকাতা বইমেলায় আমার বই বেরোয়, পাঠকেরা আমার বই কেনেন। তাঁদের মাঝে গিয়ে সময় কাটাতে আমার খুব ইচ্ছা করে। কিন্তু আমি যাওয়ার পরে যদি কেউ কিছু ঘটান, তাতে মুখ্যমন্ত্রী যদি কোনও পদক্ষেপ করেন, তা হলে কী হতে পারে, আমি নিশ্চিত নই। তাই যাচ্ছি না।’’
তসলিমা আরও বলেন, ‘‘আমি যখন কলকাতায় থাকতাম, তখন তো কোনও নিরাপত্তার প্রয়োজন হত না। কিন্তু এখন কলকাতায় আমার উপস্থিতির খবর পেলে কেউ কোনও অশান্তি করবেন কি না, তা তো বলতে পারি না। আমার জন্য কোথাও অশান্তি হোক, তা আমি চাই না।’’
সকলেই জানেন, তসলিমা নাসরিনের ‘লজ্জা’ নাটকটি নিষিদ্ধ করেছিলো পশ্চিমবঙ্গ সরকার। উত্তর ২৪ পরগনার একটি নাট্যোৎসবে নাটকটি মঞ্চস্থ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বন্ধ করে দেয় স্থানীয় পুলিশ। তসলিমা নাসরিন নিজেই এসব অভিযোগ করেছেন।
বলেন, “মমতা ব্যানার্জি আজ আমার ‘লজ্জা’ উপন্যাস অবলম্বনে বিশ্বজিৎ সিং রচিত ও পরিচালিত ‘লজ্জা’ নাটকটি পশ্চিমবঙ্গে নিষিদ্ধ করলেন। উত্তর ২৪ পরগনার গোবরডাঙ্গায় আর হুগলির পাণ্ডুয়ার নাট্য উৎসবে ‘লজ্জা’ নাটকটি মঞ্চস্থ হওয়ার কথা ছিল। দুমাস যাবৎ বিজ্ঞাপন যাচ্ছে এই উৎসবের। আর আজ বলা নেই কওয়া নেই, হঠাৎ মমতা ব্যানার্জির পুলিশ এসে জানিয়ে দিল, সব নাটক মঞ্চস্থ হবে, শুধু লজ্জা ছাড়া। নবপল্লী নাট্যসংস্থা দিল্লিতে তিনবার নাটকটি মঞ্চস্থ করেছে। তিনবারই প্রেক্ষাগৃহ পূর্ণ ছিল।”
তবে এবার তো সরকার বদল হলো। কেন্দ্রেও বিজেপি, রাজ্যেও বিজেপি। তিনি কী পারবেন যেতে এবারে?
তসলিমা ফেসবুকে লিখেছেন:
“সবাই বলছে, পশ্চিমবঙ্গ থেকে সিপিএম তসলিমাকে তাড়িয়েছে, তৃণমূল ঢুকতে দেয়নি, বিজেপি তসলিমাকে কলকাতায় আনবে। কেউ কেউ বলছে, শপথ অনুষ্ঠানেও আমাকে আমন্ত্রণ জানানো উচিত।
রেড কার্পেট বিছিয়ে দেওয়া উচিত ইত্যাদি। না, আমি বড় বড় স্বপ্ন কখনও দেখি না। মনে আছে খালেদা জিয়া আমাকে বাংলাদেশ থেকে তাড়ানোর পর লোকে বলতো,শেখ হাসিনা এলেই আমি নাকি ফিরতে পারবো।
তারপর শেখ হাসিনা এলেন, কিন্তু তিনি আমাকে ফিরতে দিলেন না দেশে। পশ্চিমবঙ্গের লোকেরাও বলতো, বাম সরকারের পতন ঘটলে অর্থাৎ সরকার বদল হলেই ফিরতে পারবো। না, ফিরতে পারিনি।
পশ্চিমবঙ্গ আমার কাছে বাংলা। বাংলাদেশ যেমন বাংলা। আমার শেকড় বাংলায়। অথচ দুই বাংলার দুয়ার আমার জন্য বহুকাল বন্ধ।
একটি তিন দশকেরও বেশি আগে বন্ধ হয়েছে, আরেকটি প্রায় দু’দশক আগে। পূর্ব বাংলার দরজা চিরকালের জন্য বন্ধ, পশ্চিম বাংলার দরজা যদি খোলা হয়, তাহলে তো কৃতার্থ হবো।
বাংলায় বাস না করতে পারলেও যেন বইমেলায় বই কিনতে, নাট্যউৎসবে নাটক দেখতে, সংগীত মেলায় গান শুনতে, বা বন্ধুদের বাড়িতে বেড়াতে যেতে পারি।
জীবন আর কতদিনের! দেখতে দেখতে তো ফুরিয়েই যাচ্ছে। দেশ হারানোর বেদনা তো পশ্চিম বাংলায় বাস করে অনেকটাই কমেছিল। এই বেদনা নিয়েই একদিন চলে যাবো, বাংলা থাকবে বাংলার মতো, হই হট্টগোলে, উৎসবে আনন্দে, শুধু বাংলার ধূলিকণাগুলো মনে রাখবে আমাকে আর আমার দীর্ঘশ্বাসকে”।
