আহা! সেই চব্বিশের জুলাই-আগষ্টে কত পিরীত, কত বন্ধুত্ব, কত ভালোবাসা!

আমেরিকান ডিট ষ্টেট ও ড. ইউনুসের মেটিকুলাস ডিজাইনে ইসলামী জঙ্গীদের তৈরি কথিত বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাথে বিএনপি নেতাকর্মীদের।কিন্তু তা আর বন্ধুত্বে থাকেনি।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি ক্ষমতার পালাবদলে বিএনপি এখন ক্ষমতায়।আর জামায়াত ও তাদের বাই প্রোডাক্ট সেই বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রুপান্তরিত রাজনৈতিক দল এনসিপি এখন সংসদে বিরোধী দলে।

বিএনপিও যেমন নানা বাক্যবাণে বিদ্ধ করছে এদেরকে, এরাও কম যায়না।দেশের নানা জায়গায় এদের মধ্যে বিরোধ লেগেই আছে।ক্ষমতার কাছে সেই চব্বিশের আগষ্টের পিরীতির মধুচন্দ্রিমা শেষ হয়ে গেছে।

তবে এবার সেই বিরোধ প্রকাশ্যে বিক্ষোভে এমনকি মারামারির অবস্থায় গিয়ে ঠেকেছে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে।সেখানে বিএনপি আর এনসিপি এখন মুখোমুখি অবস্থানে। যে কোন সময় বেঁধে যেতে পারে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ।পিরীতি শেষ। এখন চাই ক্ষমতা।

আদালতের এক আদেশে এখন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে রয়েছেন বিএনপি নেতা ডা. শাহাদাত হোসেন।স্বাভাবিকভাবেই নগরীর দায়িত্ব তাঁর।

চব্বিশের সেই জুলাই-আগষ্টে নগরীর দেয়াল ও নানা স্থাপনায় যেসব গ্রাফিতি আঁকা হয়েছিল সেগুলো রংহীন হয়ে পড়েছে। আবার কোন কোন সংগঠন সেগুলোর ওপর পোষ্টার সেঁটেছে।

এনসিপির অভিযোগ এসব করাচ্ছেন মেয়র শাহাদাত।তারা মেয়রকে “অবৈধ” মেয়র হিসেবে অভিযুক্ত করছেন। তার অপসারণও দাবি করছে।

সংবাদমাধ্যমে দেখলাম এ নিয়ে গত ১৭ ও ১৮ মে চট্টগ্রাম নগরীতে বেশ উত্তেজনাকর পরিস্থিতি।১৭ মে রাতে তো বিএনপি-এনসিপি মারমুখী অবস্থানে চলে গেয়েছিল।পুলিশ মধ্যস্থতা করে কোনভাবে সামাল দিয়েছে।এনসিপি’র অভিযোগের প্রতি উত্তরে মেয়র শাহাদাত উল্টো অভিযোগ করেছেন- এনসিপি ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চাইছে।

সংবাদমাধ্যমের খবর ও চট্টগ্রামে অবস্থানরত কয়েকজনের কাছ থেকে যা জানতে পারলাম তা হলো- চব্বিশের জুলাই-আগষ্টে আওয়ামীলীগ সরকারের বিরুদ্ধে যে ইসলামী জঙ্গী ষড়যন্ত্র হয়েছিল তাতে বিএনপি-জামায়াত-নিষিদ্ধ ঘোষিত ইসলামী চরমপন্থী সংগঠন হিযবুত তাহরীরসহ ডান-বাম (আমেরিকার টাকাখোর)অনেক রাজনৈতিক দল এক হয়েছিল।

এই কথিত আন্দোলনের সময় নগরীর বিভিন্ন দেয়ালে ও স্থাপনায় যেসব গ্রাফিতি আঁকা হয়েছিল। সম্প্রতি সেগুলো ‘মুছে ফেলার অভিযোগ’ ও ‘অভিযোগ অস্বীকার নিয়ে’ বিএনপি ও এনসিপি রাজনৈতিকভাবে পরস্পরবিরোধী মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। এ নিয়ে গত রবিবার ১৭ মে থেকে সোমবার ১৮ মে নগরীতে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ উত্তেজনা প্রশমনে ১৮ মে সকাল থেকে নগরীর জিইসি মোড় হতে দেওয়ানহাট মোড় পর্যন্ত সবধরনের সভা-সমাবেশ, মিছিল ইত্যাদি নিষিদ্ধ করেছিল।

তবে সোমবার সন্ধ্যায় আরেকটি আদেশে প্রত্যাহার করে নেয়।তবে এরই মধ্যে এনসিপির কিছু লোক সিএমপি’র এই আদেশ বলবৎ থাকার সময় সিডিএ এ্যভেনুতে নতুন করে গ্রাফিতি আঁকা ও সমাবেশ করার চেষ্টা করে।

এসময় পুলিশ তাদের বাধা দিলে কিছুটা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিলে। এনসিপির উশৃঙ্খল বেয়াদপ মহিলা ক্যাডাররা পুলিশের ওপরও রং ছুড়ে মারে ১৮ মে দুপুরে।

নগরীর বিভিন্ন স্থানে এই গ্রাফিতি মোছা বা তা ঢেকে দেয়া নিয়ে এনসিপি’র নেতাকর্মীরা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাতকে দায়ী করে তাকে অবৈধ মেয়র হিসেবে অভিযুক্ত করে সমাবেশ করে ও নানা উত্তেজনাকর বক্তব্য দেয়। এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন বিএনপি দলীয় নেতাকর্মীরা।

তারাও রবিবার রাতেই নগরীতে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল করে।সেই সমাবেশ ও মিছিলে মেয়র ডা. শাহাদাতও বক্তব্য রাখেন।
রবিবার (১৭ মে) রাতে টাইগারপাসে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান কার্যালয় এলাকায় ফ্লাইওভারের পিলারে আঁকা গ্রাফিতি মুছে ফেলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও এনসিপির নেতাকর্মীরা মুখোমুখি অবস্থান নেয়।

এ সময় উভয়পক্ষ পাল্টাপাল্টি স্লোগান দিলে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে মেয়র ডা. শাহাদাত ও পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

এর আগে এনসিপি ফেইসবুকে ষ্ট্যাটাস দিয়ে নগরীর লালখানবাজারে সমবেত হওয়ার আহ্বান জানালে এনসিপির কিছু লোকজন সেখানে জড়ো হয়ে সমাবেশ করে।

সেই সমাবেশে নগর এনসিপির আহ্বায়ক মীর মোহাম্মদ শোয়াইব, সদস্যসচিব আরিফ মঈনুদ্দিন ও জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব নিজাম উদ্দিন প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

আরিফ মঈনুদ্দিন অভিযোগ করে বলেন, ডা. শাহাদাত মেয়র হওয়ার পর থেকে নগরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। জলাবদ্ধতায় মানুষ দুর্ভোগে পড়লেও সমস্যার সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না।

এর মধ্যে জুলাই আন্দোলনের স্মৃতিবাহী গ্রাফিতি মুছে সেখানে ‘বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন’ লেখা হয়েছে। আমরা মেয়রকে বলব, আপনার মেয়াদ শেষ, দয়া করে পদ ছাড়ুন।সমাবেশ থেকে কেউ কেউ মেয়রকে ‘অবৈধ’ বলেও শ্লোগান দেয়।

মূলত এ থেকেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে। গত রবিবার রাতে এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণে সোমবার সকালে সিএমপি’র নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও এনসিপি’র কিছু লোকজন জড়ো হয়ে টাইগারপাস এলাকাতে সমাবেশ ও গ্রাফিতি আঁকার চেষ্টা করে।

তবে বিএনপিসহ অনেকে এটিকে একধরনের রাজনৈতিক স্ট্যানবাজি বলে অভিহিত করেছেন।অনেকেই বলেছেন,যেখানে সভা-সমাবেশ, জমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়েছে, পাশাপাশি মেয়রও বরেছেন পরিকল্পিতভাবে আবারো সুন্দর করে গ্রাফিতি আঁকা হবে সেখানে এই ধরনের কাজ উদ্দ্যেশ্যপ্রণোদিত ও সমাজে শান্তি শৃঙ্খলা বিনষ্টের অপচেষ্টা মাত্র।

এদিকে সোমবার (১৮ মে) নগরীর টাইগারপাসস্থ চসিক কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে মেয়র শাহাদাত গ্রাফিতি মুছে ফেলার অভিযোগকে “ডাহা মিথ্যা” ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মন্তব্য করেন।

তিনি অভিযোগ করেন- ‘আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে একটি মহল “ঘোলা পানিতে মাছ শিকার” করার চেষ্টা করছে। জুলাই আন্দোলনের গ্রাফিতি মুছে ফেলার জন্য আমি কখনো কোনো নির্দেশ দিইনি এবং ভবিষ্যতেও দেব না।’

তিনি বলেন, ‘নগরীর সৌন্দর্যবর্ধনের অংশ হিসেবে চসিকের পরিচ্ছন্নতা বিভাগ নিয়মিতভাবে নির্দিষ্ট সময় পরপর বিভিন্ন পিলার ও দেয়াল থেকে পোস্টার-ব্যানার অপসারণ ও রং করার কাজ করে থাকে।

টাইগারপাসসহ যেসব স্থানে রং করা হয়েছে, সেখানে মূলত পোস্টার দিয়ে ঢাকা ছিল এবং দৃশ্যমান কোনো গ্রাফিতি ছিল না।

শহীদ ওয়াসিম আকরাম চসিক মেয়রের অনুসারী থাকার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘জুলাই-আগস্টের চেতনার বিরুদ্ধে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। আমি নিজে দীর্ঘ ১৭ বছর রাজপথে আন্দোলন করেছি। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে চট্টগ্রামে প্রথম শহীদ ওয়াসিম আকরাম আমারই অনুসারী ছিল।’

গ্রাফিতি আঁকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কেউ চাইলে আর্ট কলেজের শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করে শৈল্পিক ও মানসম্মত গ্রাফিতি করতে পারে। এ ধরনের উদ্যোগে তিনি ব্যক্তিগতভাবে কিংবা সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে অর্থায়ন করা হবে। অপরিচ্ছন্ন হাতের লেখার চেয়ে পরিকল্পিত ও শৈল্পিক গ্রাফিতি শহরের সৌন্দর্য ও ভাবমূর্তি রক্ষা করবে।’

এনসিপির সাম্প্রতিক বক্তব্য ও কর্মসূচির বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মেয়র বলেন, “সামনের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটা ফায়দা লুটার জন্য এবং ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করার জন্যই তারা এই কাজ করছে। আদালতের নির্দেশে আইনগতভাবে তিনি বৈধ মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং বর্তমান আইনি কাঠামো অনুযায়ী তার মেয়াদ ২০২৯ সাল পর্যন্ত। তবু আমি দ্রুত একটি অবাধ, সুষ্ঠু, প্রতিযোগিতামূলক ও উৎসবমুখর নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছি।’

লালখান বাজার এলাকায় গত রাতে সৃষ্ট উত্তেজনাকর পরিস্থিতির প্রসঙ্গে মেয়র বলেন, ‘সংঘর্ষ এড়াতে তিনি নিজেই ঘটনাস্থলে গিয়ে কর্মীদের সরিয়ে নিয়ে আসেন। এই শহরটা সবার। আমরা একটি নিরাপদ ও সুন্দর শহর গড়তে চাই। সাংঘর্ষিক কোনো কিছুর জন্য আমরা আগ্রহী নই।’

২০২৪ এর জুলাই-আগষ্টে তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপি-জামায়াত ও সেসময়কার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন(যা পরে এনসিপিতে রূপান্তরিত হয়)একসাথে আন্দোলন করেছিল। কিন্তু পরে নানা সময়ে এনসিপি ও বিএনপি’র মধ্যে নানা বিষয়ে বিরোধ দেখা দেয়।

তবে চট্টগ্রামে এখন যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে তাতে এই দ্বন্দ্ব আরো তীব্র হওয়ার আশংকা করছেন কেউ কেউ।

তারমানে জামায়াত-হিযবুত-এনসিপি নামক জঙ্গীদের সঙ্গে অনেকটা মধ্যপন্থা হিসেবে পরিচিত হতে চাওয়া বিএনপি’র মধ্যে সংঘাত যেন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে।

বিএনপি’র নেতাকর্মীরা এতটাই ক্ষুব্ধ যে চট্টগ্রামে যে কোন সময় এই বিরোধ রক্তক্ষয়ী সংঘাতে রূপ নিতে পারে। এনসিপি’র পেছনে জামায়াত-হিযবুতের মত ইসলামী জঙ্গী দলগুলোও ইন্ধন যোগাচ্ছে এমনটাই জানা গেলো। উগ্র ইসলামী ফ্যাসিজম ছড়াতে চাইছে তারা।

#রাকীব হুসেইন: লেখক, প্রাবন্ধিক।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *