ঢাকা: ইসলাম ধর্মে এত অবমাননার মামলা কেন? ধর্ম কি এতোই ঠুনকো যে কথার কথায়ও অবমাননা হয়!? মানে কেউ কথা বললেই অবমাননা হয়ে যায়।
কোরানে যা আছে, সেটা বলে ব্যাখ্যা করতে গেলেও বলে ধর্ম অবমাননা। অথচ আছে কোরানেই। কী অবস্থা! তাহলে বোঝা যায়, কোরানের সত্য হজম করতে পারে না বান্দারা!
একজন শিক্ষককে অপদস্থ করে জোর করে তাঁর চাকুরি থেকে পদত্যাগ করানো হয়েছে। তিনি নাকি ধর্ম অবমাননা করেছেন! হায়রে ধর্ম!
শিক্ষক মিঠু মণ্ডল কি বলেছিলেন?
পরীক্ষায় সিলেবাস থেকে কি আসতে পারে ছাত্ররা জানতে চাওয়ায় উত্তর দেন মিঠু মন্ডল “স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাও জানে না আমি কিভাবে বলবো কি আসবে পরীক্ষায়” তাতেই ধর্ম অবমাননার অভিযোগ!!
পিঞ্জুরী ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ের কম্পিউটার ল্যাব অপারেটর মিঠু মন্ডলকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে আটক করা হয়েছে এবং চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।

ধর্ম কী ওরা জানে?
মানুষের অন্তর্নিহিত দেবত্বের প্রকাশ সাধনই হলো ধর্ম। প্রকৃত ধর্ম পালন করা মানুষ সহজ, নম্র হয়।
ধর্ম হচ্ছে সেই বস্তু যা পশুত্ব থেকে মনুষ্যত্ব,আর মনুষ্যত্ব থেকে দেবত্বে উন্নীত করে।
কিন্তু এই দেশে ধর্মান্ধ মৌলবাদীরা ধর্মকেই টেনে মনুষ্যত্ব থেকে পশুত্বের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ধর্ম করে এরা কী শিখছে? হত্যা, মারপিট, দাঙ্গা! ধর্ম কি তাই শেখায় নাকি?
শিক্ষক গৌরাঙ্গ সরকার কি বলেছিলেন?
সাতক্ষীরা জেলার স্কুল শিক্ষক গৌরাঙ্গ সরকার, ক্লাসে পড়াতে গিয়ে ছাত্রদের প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন “উচ্চ শব্দে মাইকে আজান দেয়ায় অনেকের অসুবিধা হয়, মন্দিরের মাইকে উচ্চ শব্দে বাজনা বাজালেও অসুবিধা হয়”। একজন শিক্ষক ছাত্রদের সঠিক শিক্ষাই দেবেন!
আসলে তিনি ভুলে গিয়েছিলেন এটা ইউরোপ আমেরিকা নয়, এটা বাংলাদেশ, তিনি এমন কথা বলতে পারেন না এখানে! জবাই যে করা হয়নি সেটাই তো আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া।
ফলাফল -ধর্ম অবমাননার অভিযোগে চাকরিচ্যুত ও এরেস্ট করা হয়েছে তাঁকে।
নিজেই বিচার করে দেখুন তাদের আসল অপরাধ কি?

মোদ্দাকথা বাংলাদেশকে পুরোপুরি হিন্দু শূন্য করার মহা পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের ধর্মান্ধ মৌলবাদীরা। আর বিশ্বের সমস্ত মানবতাবাদীরা তাদের কান আছে কিন্তু তারা কিছু শুনতে পাচ্ছে না। তাদের চোখও আছে তবুও তারা দেখতে পাচ্ছে না। আর সরকার তো সরকারই। তালে তাল দিয়ে যাচ্ছে!
মিঠু মণ্ডল, গৌরাঙ্গ সরকারদের এই ঘটনাগুলোর প্রতিবাদ আগেই করেছেন লেখক তসলিমা নাসরিন।
তবে এবার যেটা করলেন, একদম খোলা চিঠি দিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে!
আমরা হুবহু তাঁর লেখা চিঠিটি তুলে ধরলাম:
“মাননীয় তারেক রহমান,
আপনি বলেছিলেন, বাংলাদেশে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হবে। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি, হিন্দুদের ওপর আবারও হামলা চলছে, তাদের জমি দখল করা হচ্ছে, এবং গুজবের ভিত্তিতে তাদের জীবন ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে।
আজ সাতক্ষীরার স্কুলশিক্ষক গৌরাঙ্গ সরকার, গোপালগঞ্জের স্কুলের কম্পিউটার ল্যাব অপারেটর মিঠু মণ্ডল, গৌরীপুর কলেজের শাওন চন্দ্র দাসের বিরুদ্ধে “ইসলাম অবমাননা”-র অভিযোগ তুলে হিন্দুবিদ্বেষী উগ্রবাদীরা হামলা চালিয়েছে।
পুলিশ এসে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে বরং আক্রান্ত মানুষকেই গ্রেফতার করেছে। জেল থেকে বেরিয়ে তাঁরা কী করবেন? চাকরি হারিয়ে, সামাজিকভাবে একঘরে হয়ে, চরম নিরাপত্তাহীন অবস্থায় কীভাবে বাঁচবেন? শেষ পর্যন্ত কি তাঁদেরও দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য করা হবে?
এর আগেও রসরাজ দাস, টিটু রায়, উৎসব মণ্ডল, দীপু দাস এবং আরও বহু হিন্দুর জীবন ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। “ধর্ম অবমাননা”-র গুজব ছড়িয়ে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে।
ঘরবাড়ি পোড়ানো হয়েছে, মন্দির ভাঙা হয়েছে, ভিকটিমকে জেলে পাঠানো হয়েছে, দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে হিন্দুশূন্য করার এক ভয়ংকর ষড়যন্ত্রের অংশ।
আপনার কাছে প্রশ্ন—হিন্দুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ পর্যন্ত কী কী কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে? হিন্দুবিদ্বেষ ছড়িয়ে যারা মব সন্ত্রাস চালায়, তাদের বিরুদ্ধে কি আদৌ কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? কেন এই সাম্প্রদায়িক নোংরা রাজনীতি বন্ধ করার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না?
বাংলাদেশকে যারা ধীরে ধীরে হিন্দুশূন্য রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র যদি দৃঢ় অবস্থান না নেয়, তবে সেই নীরবতা তাদেরই উৎসাহ জোগায়। গণতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো বাকস্বাধীনতা। অথচ আজ দেশে বাকস্বাধীনতা নেই বললেই চলে।
“ধর্ম অবমাননা”র অভিযোগ এখন ভিন্নমত দমন, সংখ্যালঘু নিপীড়ন এবং সামাজিক সন্ত্রাসের অস্ত্র হয়ে উঠেছে।
আপনি যদি সত্যিই বিশ্বাস করেন যে বাংলাদেশ সবার দেশ, তবে সেই বিশ্বাসের প্রমাণ কাজে দেখান। সংখ্যালঘু নাগরিকদের নিরাপত্তা দিন, বাকস্বাধীনতা রক্ষা করুন, এবং ধর্মের নামে চলা উন্মাদনা ও মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিন।
আমি নির্বাসন জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছি। আপনার মা আমাকে দেশছাড়া করেছিলেন। তারপর দীর্ঘ একত্রিশ বছর—না আপনার মা, না শেখ হাসিনা, না মুহম্মদ ইউনুস—কেউ আমাকে দেশে ফিরতে দেননি। আপনিও হয়তো দেবেন না। আমি তাই দেশে ফেরার দাবি জানাচ্ছি না। শুধু এই কথাটি মনে করিয়ে দিতে চাই—বাংলাদেশ যতটুকু আপনার, ততটুকুই আমার।
ইতি তসলিমা”
