ঢাকা: হত্যাকে কেন ভক্তির ভাষা হিসেবে শেখানো হলো? মূলত ঈদে কোরবানি নিয়েই প্রশ্ন করলেন লেখক তসলিমা নাসরিন।
হিংস্রতা, মনুষ্যত্ব এইসব নিয়ে বেশ লম্বা চওড়া আলোচনা করেছেন তিনি।
ফেসবুকে তসলিমা লিখেছেন:
“সপ্তম শতাব্দির পৃথিবী ছিল হিংস্র, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, উপজাতীয়। মানুষ নিজের হাতে পশু জবাই করতো, রক্ত ঝরাতো, যুদ্ধ করতো, দাস রাখতো। খাদ্য সংগ্রহ, ধর্মীয় আচার, সামাজিক ক্ষমতা—সবকিছুর সঙ্গেই জড়িয়ে ছিল প্রাণী হত্যা।
সেই সময়ের মানুষ বিজ্ঞান জানতো না, পুষ্টিবিদ্যা জানতো না, প্রাণীর অনুভূতি নিয়ে ভাবতো না। তারা ভাবতো, দেবতা খুশি করতে রক্ত চাই।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—আমরা কি এখনও সপ্তম শতাব্দিতে বাস করছি?
একবিংশ শতাব্দিতে মানুষ মহাকাশে যাচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বানাচ্ছে, অঙ্গ প্রতিস্থাপন করছে, প্রাণীর আবেগ ও বোধ নিয়ে গবেষণা করছে। আমরা জানি—গরু, মোষ, ছাগল, ভেড়া ব্যথা পায়, ভয় পায়, মৃত্যুভয় অনুভব করে। জবাইয়ের আগে প্রাণীদের আতঙ্ক, পালাতে চাওয়া, কাঁপতে থাকা—এসব আর অজানা নয়।
তবু কোটি কোটি মানুষ এখনও ধর্মীয় কর্তব্যের নামে নিজের হাতে প্রাণী হত্যা করে, এবং সেটিকে পবিত্র বলে উদ্যাপন করে।
তসলিমার প্রশ্ন ‘কেন’?
তসলিমা নাসরিন আরো লেখেন, “একটি সভ্য সমাজ কি এমন একটি প্রথাকে প্রশ্ন করবে না, যেখানে শিশুরা ছুরি হাতে নিয়ে প্রাণী হত্যা স্বচক্ষে দেখে, হত্যার উৎসব দেখে, রক্তাক্ত মাঠ, উঠোন, রাস্তাঘাট দেখে, দেখে বড় হয়, যেখানে করুণা নয়, হত্যাকেই ভক্তির ভাষা হিসেবে শেখানো হয়”?
অনেকে বলবেন, “মানুষ তো প্রতিদিনই মাংস খায়।” সত্যি। শিল্পায়িত মাংসশিল্প বা লাইভস্টক নিয়েও গুরুতর নৈতিক প্রশ্ন আছে। কিন্তু খাবারের জন্য প্রাণী ব্যবহারের সমালোচনা আর ধর্মীয় নির্দেশে হত্যা উদ্যাপনের সমালোচনা এক জিনিস নয়। কোরবানিতে হত্যা কেবল খাদ্যগ্রহণ নয়, এটি প্রতীকী আনুগত্যের প্রকাশ—ভগবান, ঈশ্বর,বা আল্লাহর প্রতি অনুগত হওয়ার জন্য প্রাণী হত্যা।
কিন্তু নৈতিকতার বিবর্তন কি আমাদের অন্য প্রশ্ন করতে শেখায় না?
আল্লাহ যদি সর্বশক্তিমান ও সর্বকরুণাময় হন, তবে তাঁর সন্তুষ্টির জন্য রক্ত কেন প্রয়োজন? করুণা, দয়া, মানবসেবা, প্রাণীসেবা, ক্ষুধার্তকে খাদ্য দেওয়া, তৃষ্ণার্তকে জল দেওয়া, গৃহহীনকে গৃহ দেওয়া কি কম পবিত্র?
ইতিহাসে বহু ধর্মীয় আচার বদলেছে। মানুষ আর দেবতার উদ্দেশে মানুষ বলি দেয় না। ডাইনি পোড়ানো বন্ধ হয়েছে। দাসপ্রথাকে একসময় ধর্ম সমর্থন করেছিল—আজ সব ধর্মের মানুষ একে অমানবিক বলে মানে। সভ্যতা এগোয় পুরোনো প্রথাকে ভেঙে, অন্ধ আনুগত্যকে চিরবিদেয় জানিয়ে।
তাহলে প্রাণী হত্যাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ধর্মীয় আচার কেন সমালোচনার ঊর্ধ্বে থাকবে?
কোরবানির সমালোচনা করলে সঙ্গে সঙ্গে কিছু লোক বলে ওঠে—“ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে।” কিন্তু কোনও প্রথা সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। মানবসভ্যতার অগ্রগতি ঘটেছে প্রশ্ন করার সাহস থেকে। ধর্মীয় অনুভূতির অস্তিত্ব কোনও ধারণাকে নৈতিক পরীক্ষার বাইরে নিয়ে যায় না।
হয়তো একদিন মানুষ এমন এক পৃথিবীতে পৌঁছাবে, যেখানে ধর্ম মানে হবে সহমর্মিতা, হত্যা নয়; যেখানে উৎসব মানে হবে জীবন উদ্যাপন, রক্তপাত নয়; যেখানে মানুষ নিজের আধ্যাত্মিকতা প্রমাণ করবে দুর্বল প্রাণীর গলা কেটে নয়, বরং তাদের প্রতি ভালবাসা দেখিয়ে। অথবা হয়তো একদিন মানুষ এমন এক পৃথিবীতে বাস করবে, যে পৃথিবীতে ধর্ম নামক কোনও রূপকথার অস্তিত্ব থাকবে না।
সেই দিন আসতে দেরি হবে জানি। কিন্তু সভ্যতার ইতিহাস বলে—বর্বরতা চিরস্থায়ী নয়। প্রশ্ন হলো, আ্মরা কোন পাশে দাঁড়াবো—ধর্মসূত্রে পাওয়া রক্তাক্ত আচারগুলোর পাশে, নাকি মানবিকতার ক্রমবিবর্তনের পাশে”?
