ঢাকা: বাংলাদেশকে আধুনিক এবং সভ্য রাষ্ট্র হতে হলে ঠিক কী করতে হবে, কোন পথে চলতে হবে- সে বিষয়ে অনেক কথাই লিখেছেন এবং বলেওছেন নির্বাসিত লেখক তসলিমা নাসরিন।

তিনি নারীবাদী লেখক তো বটেই, তেমনি দেশ থেকে বিতাড়িত হলেও দেশের কথা চিন্তা করেন। এবং ভালোটা কামনা করেন।

কয়েকটি পথ বলেছেন, যে পথে চললে বাংলাদেশ সভ্য হতে পারে:

“বাংলাদেশকে যদি সত্যিই একটি আধুনিক ও সভ্য রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাই, তবে শুধু সরকার বদলালেই হবে না; সমাজের ভিত্তিগত কাঠামোয় র‍্যাডিকাল পরিবর্তন আনতে হবে। যে সমাজে কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িকতা, নারীবিদ্বেষ, অন্ধ আনুগত্য এবং দুর্নীতি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে লালিত হয়, সেই সমাজকে এগিয়ে নিতে হলে চিন্তার জগতে বিপ্লব ঘটাতে হবে”।

এক দুই করে পরিষ্কার বুঝিয়ে দিয়েছেন তিনি:

১ প্রথমত, রাষ্ট্র ও রাজনীতিকে সম্পূর্ণ ধর্মমুক্ত করতে হবে। ধর্ম হবে ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয়, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বা রাজনৈতিক সংগঠনের ভিত্তি নয়। কোনও রাজনৈতিক দল, নির্বাচনী প্রচারণা বা রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে ধর্মকে ব্যবহার করা যাবে না।

রাষ্ট্র, আইন, শিক্ষা ও প্রশাসন পরিচালিত হবে যুক্তি, বিজ্ঞান, মানবাধিকার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে।মাদ্রাসা, মসজিদ, ধর্মীয় রাজনৈতিক প্রচারণা, ওয়াজ মাহফিল কিংবা জনপরিসরে ধর্মীয় আধিপত্যের পরিবর্তে ব্যক্তিগত পরিসরে ধর্মচর্চাকে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। মানুষের স্বাধীনতা থাকবে যে যার বিশ্বাস পালন করার, কিন্তু সেই বিশ্বাস যেন শিক্ষা, আইন, রাজনীতি বা সামাজিক নীতিনির্ধারণকে নিয়ন্ত্রণ না করে।

২ দ্বিতীয়ত, জ্ঞান ও সংস্কৃতিকে সমাজের কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে। প্রতিটি পাড়ায় একটি করে আধুনিক পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি পাড়ায় সাংস্কৃতিক কেন্দ্র থাকতে হবে, যেখানে গান, নাটক, সাহিত্য, চিত্রকলা, বিজ্ঞানচর্চা ও মুক্তবুদ্ধির আলোচনা হবে।

প্রতিটি শহরে কমপক্ষে ৭টি থিয়েটার অডিটোরিয়াম, ৭টি সিনেমা হল, ৭টি পোয়েট্রি ক্লাব এবং ৭টি বিজ্ঞান একাডেমি থাকতে হবে। যে সমাজে বইয়ের চেয়ে ধর্মীয় বক্তার কদর বেশি, সেই সমাজ কখনও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ হতে পারে না।

৩ তৃতীয়ত, শিক্ষাব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ধর্মমুক্ত এবং বৈজ্ঞানিক করতে হবে। সব স্কুল ও কলেজ হবে কো-এডুকেশন এবং সেক্যুলার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় পোশাক বা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভাজনের পরিবর্তে নাগরিক পরিচয়কে গুরুত্ব দিতে হবে।

শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের বয়সোপযোগী যৌনতা শিক্ষা দিতে হবে। শরীরের পরিবর্তন, প্রজনন, সম্মতি, ব্যক্তিগত সীমানা, নিরাপদ সম্পর্ক, লিঙ্গসমতা এবং যৌনস্বাস্থ্য সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ও তথ্যভিত্তিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে।

অজ্ঞতা, ভয় ও কুসংস্কারের পরিবর্তে জ্ঞান ও সচেতনতার ভিত্তিতে নতুন প্রজন্মকে গড়ে তুলতে হবে।

শিক্ষার্থীদের দর্শন, যুক্তিবাদ, মানববাদ, সংশয়বাদ, নাস্তিকতা, আস্তিকতা এবং পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্ম ও মতাদর্শ সম্পর্কে সমানভাবে জানার সুযোগ থাকতে হবে।

জন্মসূত্রে বাবা-মায়ের বিশ্বাস উত্তরাধিকার হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার বদলে প্রত্যেক মানুষ প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর নিজের বিশ্বাস নিজে বেছে নেওয়ার অধিকার পাবে। একই সঙ্গে নারী-পুরুষ সমতা, মানবাধিকার, বাকস্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সম্পর্কে বাধ্যতামূলক শিক্ষা থাকতে হবে।

৪ চতুর্থত, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িকতা, নারীবিদ্বেষ, সহিংসতা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে বিচারব্যবস্থা হতে হবে সম্পূর্ণ স্বাধীন, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ। আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য না হলে সভ্যতা কেবল একটি মুখোশ হয়ে থাকে।

একটি সভ্য দেশ তৈরি হয় না শুধু উঁচু দালান, মেট্রোরেল বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে। একটি সভ্য দেশ তৈরি হয় তখনই, যখন মানুষ যুক্তিকে অন্ধ বিশ্বাসের ওপরে স্থান দেয়, জ্ঞানকে কুসংস্কারের ওপরে স্থান দেয়, মানবতাকে ধর্মীয় পরিচয়ের ওপরে স্থান দেয়, এবং স্বাধীন চিন্তাকে ভয় না পেয়ে স্বাগত জানায়। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎও সেদিকেই এগোতে হবে—যদি আমরা সত্যিই একটি আধুনিক, মুক্ত ও মানবিক সমাজ চাই।

৫ পঞ্চমত, নারী-পুরুষের পূর্ণ সমতা নিশ্চিত করতে হবে। নারীদের জন্য আলাদা নিয়ম, আলাদা নৈতিকতা, আলাদা পোশাকবিধি—এসব বৈষম্যমূলক ধারণা বাতিল করতে হবে।

সমান কাজের জন্য সমান মজুরি, সম্পত্তিতে সমান অধিকার, বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদে সমান অধিকার, সন্তান প্রতিপালনে সমান দায়িত্ব ও অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। নারীকে মানুষের আগে নারী হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে দেখতে শিখতে হবে সমাজকে।

৬ ষষ্ঠত, শিশুরা কোনও ধর্ম, জাতি বা রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে জন্মায় না। জন্মের পর থেকেই তাদের মস্তিষ্কে পরিচয়ের দেয়াল তুলে দেওয়া হয়। শিশুদের স্বাধীন চিন্তার অধিকার দিতে হবে। তাদের প্রশ্ন করতে শেখাতে হবে, মুখস্থ করতে নয়। যে শিশু প্রশ্ন করতে শেখে, সে বড় হয়ে অন্ধ অনুসারী হয় না।

৭ সপ্তমত, বিজ্ঞানমনস্কতা ও সমালোচনামূলক চিন্তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে উৎসাহিত করতে হবে। বিজ্ঞান উৎসব, বইমেলা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, গবেষণা অনুদান এবং জনপ্রিয় বিজ্ঞানচর্চাকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে। অলৌকিকতা, কুসংস্কার, ভণ্ডামি ও প্রতারণার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।

৮ অষ্টমত, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিকে বিলাসিতা নয়, সামাজিক প্রয়োজন হিসেবে দেখতে হবে। গান, নাটক, চলচ্চিত্র, সাহিত্য, চিত্রকলা, নৃত্য—এসব মানুষের মনুষ্যত্ব গড়ে তোলে। যে সমাজ শিল্পকে ভয় পায়, প্রশ্নকে ভয় পায়, বইকে ভয় পায়, সে সমাজ শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতাকেও ভয় পায়।

৯ নবমত, রাষ্ট্রের সব আইন ধর্মনিরপেক্ষ ও মানবাধিকারভিত্তিক হতে হবে। কোনও ধর্মগ্রন্থ নয়, সংবিধান এবং সর্বজনীন মানবাধিকার হবে আইন প্রণয়নের ভিত্তি। নাগরিকের অধিকার নির্ধারিত হবে তার মানবিক মর্যাদার ভিত্তিতে, ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়।

১০ দশমত, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরেও গণতন্ত্র থাকতে হবে। পরিবারতন্ত্র, ব্যক্তিপূজা এবং অন্ধ দলীয় আনুগত্য গণতন্ত্রকে দুর্বল করে। নেতৃত্ব আসবে যোগ্যতা, সততা এবং জনগণের সমর্থনের ভিত্তিতে।

১১ একাদশত, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করতে হবে। কোনও নাগরিক যেন ধর্ম, জাতিসত্তা, ভাষা, লিঙ্গ বা মতাদর্শের কারণে বৈষম্যের শিকার না হন। সভ্য সমাজের পরিচয় সংখ্যাগরিষ্ঠের ক্ষমতায় নয়, সংখ্যালঘুর নিরাপত্তায়।

১২ দ্বাদশত, মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। মানুষ যেন সরকার, ধর্ম, সমাজ, সংস্কৃতি—সবকিছুর সমালোচনা করতে পারে নিঃশঙ্কচিত্তে। যে সমাজ সমালোচনাকে শত্রু মনে করে, সে সমাজ কখনও উন্নত হতে পারে না।

১৩ ত্রয়োদশত, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, পরিবার পরিকল্পনা এবং নারীর অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা জাতীয় অগ্রাধিকার হতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, নারীর শিক্ষা ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেলে জন্মহার স্বাভাবিকভাবেই কমে এবং সমাজে দারিদ্র্য, শিশুবিবাহ ও বৈষম্য হ্রাস পায়। একটি আধুনিক রাষ্ট্রের জন্য পরিকল্পিত জনসংখ্যা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন অপরিহার্য।

১৪ চতুর্দশত, সভ্যতার মানদণ্ড শুধু মানুষের উন্নয়ন নয়, প্রকৃতির প্রতিও দায়িত্বশীলতা। নদী, বন, জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা রাষ্ট্রের মৌলিক কর্তব্য হতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য বাংলাদেশ রেখে যাওয়া একটি নৈতিক দায়িত্ব।

বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থে সভ্য, আধুনিক ও মানবিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে হলে কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়, চিন্তার বিপ্লব প্রয়োজন। ধর্মীয় উন্মাদনার জায়গায় যুক্তি, কুসংস্কারের জায়গায় বিজ্ঞান, নারীবিদ্বেষের জায়গায় সমতা, ঘৃণার জায়গায় মানবতা, এবং অন্ধ আনুগত্যের জায়গায় স্বাধীন চিন্তা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সভ্যতা শুরু হয় মানুষের মনের ভেতরে; রাষ্ট্র তার পরের ধাপ।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *