রোহিঙ্গারা অনেকদিন থেকেই স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আর এতে বেশ মজা করে ফায়দা লুটছে চরমপন্থী ইসলামী সংগঠনগুলো।

বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে এসব এনজিও কিছুটা রাখঢাক করে তাদের কাজ করলেও গত দুই বছর ধরে তাদের পোয়াবারো। এখন তারা কক্সবাজার-বান্দরবান অঞ্চলকে তাদের জন্য স্বাধীন ভূখণ্ড মনে করছে।

এরই মধ্যে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বাংলাদেশ সফরকালে এই রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকা ঘুরে গেছেন গত ৫ জুন তার দলবল নিয়ে।

তবে বিগত ইউনুস সরকারের সময় পাকিস্তান-তুরস্কের উচ্চতর সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা সরেজমিনে জরিপ করে গেছেন। সে অনুযায়ী এ অঞ্চলকে ঘিরে নানা নীলনকশা কাজ করছে আন্তর্জাতিক চক্র।

বাংলাদেশকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার হেডমাষ্টার এই নো-বেল লরিয়েট ইউনুস ও তার বশংবদ সরকার ও তাদের সহযোগীরা যেমন এই নীলনকশার সঙ্গে জড়িত ছিল তেমনি এখনকার তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারও একই পথে হাঁটছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও তুরষ্কের সঙ্গে সামরিক সহায়তা চুক্তি করার মধ্য দিয়ে মনে করছে ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সামরিক শক্তি প্রচণ্ডভাবে বৃদ্ধি করা যাবে তাতে।

অবশ্য বাংলাদেশে বিএনপি’র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সাবেক সামরিক কর্তা জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং তা সামরিক ছাউনি থেকেই। আর তার রাজনীতির অস্ত্র বা মূল বিষয়ই ছিল –‘ভারত বিরোধীতা’।

এই ভারত জুজুর ভয় দেখিয়ে সেই যে স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনীতি শুরু হলো তা আর শেষ করতে পারেনি এ দেশের রাজনৈতিক দলগুলো। যাক সে কথা। সে প্রসঙ্গে আরো আলোচনা করা যাবে। আমরা একটু রোহিঙ্গা প্রসঙ্গেই ফিরে যাই আপাতত।

চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের কয়েকজন সাংবাদিক ও কক্সবাজার অঞ্চলে কয়েকজন এনজিও কর্মীর সাথে আলাপকালে তারা বললেন–এখনতো যুগ চলছে পাক-তুরস্কের, যা প্রায় গত দুই বছর ধরে রমরমা অবস্থায়। কত টাকা যে আসছে। কত মাদক, অস্ত্র আর ইসলামী জঙ্গী যে তৈরী হচ্ছে এসবের মধ্য দিয়ে তার ইয়াত্তা নেই।

রোহিঙ্গারা বাঙ্গালীদেরকে উল্টো বলছে-“আমরা এখানে আছি বলে তোমরা চাকরি-বাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য করে কিছু খেতে পারছো। নাহলে তোমরা কি করতে? সুতরাং আমাদের বিরুদ্ধে তোমরা কিছু লিখবেনা বা সংবাদ দেখাবেনা এবং অন্য কোন কাজও করবেনা।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন সাংবাদিক জানিয়েছেন, এটি মূলত থ্রেট দিচ্ছে রোহিঙ্গারা বাঙ্গালীদেরকে। কারণ সংখ্যানুপাতে কক্সবাজারের অন্তত দুটি উপজেলায় বাঙ্গালীরা এখন মূলত সংখ্যালঘু নাগরিকে পরিণত হয়ে গেছে।

সে অঞ্চলটি যেকোন সময় রোহিঙ্গারা যদি বলে এটি “আমাদের স্বাধীন রোহিঙ্গা ভূমি” তাহলে সম্ভববত বাংলাদেশ সরকারেরও করার কিছু থাকবেনা। অবশ্য সরকারের ভেতরকার মনোভাবও বোধ হয় তাই যে রোহিঙ্গারা এখানেই থাকুক।

কারণ এই উছিলায়তো একটি বৃহৎ ইসলামী মিলিট্যান্ট শক্তি পাওয়া যাবে যাদেরকে ভারতের বিরুদ্ধে কাজে লাগানো যাবে- এমনটাই ভাবছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা।

কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সংকট মোকাবিলার নামে তুরস্ক, পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক ইসলামী এনজিও সরাসরি এবং স্থানীয় এনজিও’র সহায়তায় এখানে তাদের অভয়ারণ্য তৈরী করেছে ।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন (RRRC) এবং ইউএনএইচসিআর (UNHCR) এর সমন্বিত তালিকাভুক্ত সব মিলিয়ে কমপক্ষে ৩০ টি উল্লেখযোগ্য মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম প্রধান দেশের এনজিও ও সংস্থা রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে সক্রিয় রয়েছে। অবশ্য প্রত্যাবাসন কমিশন না বলে উল্টো বলা ভালো – ‘বাংলাদেশে রোহিঙ্গা স্থায়ীকরণ কমিশন’।

স্থানীয় সাংবাদিক ও কয়েকটি এনজিও সংস্থার কাছ যেসব তথ্য পাওয়া গেছে তা হলো- তুরস্কের এনজিও গুলোর মধ্যে রয়েছে -তুর্কি কোঅর্ডিনেশন অ্যান্ড কো-অপারেশন এজেন্সি (TIKA), তুর্কি রেড ক্রিসেন্ট (Turkish Red Crescent / Kızılay), ডেনিজ ফেনেরি (Deniz Feneri Association), টিডিভি (Turkish Diyanet Foundation) এবং এএফএডি (AFAD)।
মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামী দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে—কাতার চ্যারিটি (Qatar Charity), ইসলামিক রিলিফ (Islamic Relief) যুক্তরাজ্য ভিত্তিক হলেও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ইসলামী দেশ থেকে বড় অংকের তহবিল সংগ্রহ করে স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তার নাম দিয়ে কাজ করে থাকে।

কুয়েত সোসাইটি ফর রিলিফ (Kuwait Society for Relief), মুসলিম এইড (Muslim Aid) মধ্যপ্রাচ্যের অনুদানে পরিচালিত যারা ইউকে বেইসড একটি সংগঠন।

কিছু এনজিও ইউকে ভিত্তিক হলেও এরা ইসলামী দেশগুলো থেকে মোটা অংকের সাহায্য পেয়ে থাকে এবং নানারকম ত্রাণ, সামাজিক-শিক্ষা-চিকিৎসা-স্যানিটেশনের নামে মূলত ইসলামী জঙ্গী তৈরীর জন্য কাজ করে থাকে।

অপরদিকে পাকিস্তানের আল-খিদমত ফাউন্ডেশন (Al-Khidmat Foundation): খাদ্য, সুপেয় পানি ও জরুরি ওষুধ সরবরাহের নামে কি করছে তা কিন্তু বাংলাদেশ এনজিও ব্যুরো কখনোই খোঁজ নেয়নি।

মূলত রোহিঙ্গারা শিক্ষা এবং সচেতনতার দিক থেকে একেবারে পিছিয়ে পড়া একটি জাতি। তাদেরকে ব্রেইন ওয়াশ করা অতটা কঠিন নয়। সেই সুযোগটাই নিচ্ছে রোহিঙ্গা শিবিরে কাজ করা এনজিও সংস্থাগুলো। নিজেদের সেবার নামে ব্যবসা ‘জিইয়ে’ রাখতে রোহিঙ্গাদের স্বদেশে (মিয়ানমারে) ফেরত না যেতে উৎসাহিত করছে।

এমন অভিযোগ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটি ও স্থানীয় সচেতন মানুষের। এই অবস্থা চলতে থাকলে বাংলাদেশকে ‘রোহিঙ্গা’ অভিশাপ বয়ে বেড়াতে হবে বলে জানিয়েছেন তারা।

বেশ কিছু এনজিও সংস্থার অপতৎপরতা খুবই আপত্তিকর। এসব চিহ্নিত এনজিও’র কর্মকর্তারা বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদেরকে বাংলাদেশে আসার ইন্ধন দিয়েছে এবং এখন ফেরত না যেতে উৎসাহিত করছে এমন অভিযোগও আছে।

জাতিসংঘের দাতা সংস্থা থেকে শুরু করে এমন কোন এনজিও নেই যারা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন চায়। তারা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত না যেতে উৎসাহিত করছে। এরমধ্যে কিছু এনজিও’র কার্যক্রম সরাসরি দেশবিরোধী।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে কয়েকটি এনজিওর কর্তারা জানান, এনজিওগুলো রোহিঙ্গাদের না যাওয়ার বিষয়ে বেশি উৎসাহিত করে। তাদেরকে (রোহিঙ্গা) কখনোই বুঝায় না যে, এক সময় তাদেরকে স্বদেশে ফেরত যেতে হবে। স্ব-স্ব এনজিও’র উচ্চ পর্যায়ের নিদের্শনা মানতে গিয়ে স্থানীয় যারা চাকরিতে আছে, তারাও এ অপতৎপরতায় লিপ্ত হতে বাধ্য হচ্ছে।

আইনত রোহিঙ্গারা কাজ করার অধিকার না রাখলেও ভলান্টিয়ার বানিয়ে তাদেরকে এনজিও’র চাকরিতে নিচ্ছে। এরফলে রোহিঙ্গারা আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান হয়ে স্বদেশে ফেরত যেতে চায়না।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরীর মতে , দেশি-বিদেশি এনজিওদের অপতৎপরতা ও পর্দার আড়ালে যে সব কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে তা খুবই উদ্বেগজনক। তাদের কর্মকাণ্ড নজরদারিসহ মনিটরিং করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

এনজিও সংস্থাগুলো চাচ্ছে না তারা স্বদেশে ফেরত যাক। এমনকি ইউএনএইচসিআরের বিরুদ্ধেও এই অভিযোগ অহরহ রয়েছে। কারণ রোহিঙ্গারা চলে গেলে তাদের (এনজিও) ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। ব্যবসা চালু রাখার জন্য তারা চাইছে এই সমস্যা দীর্ঘমেয়াদি হউক।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট গণহত্যা তথা রোহিঙ্গা নিপীড়ন শুরু করে সেদেশের সেনাবাহিনী । তাই প্রতিবছর ২৫ আগস্টকে ‘গণহত্যা’ দিবস অ্যাখ্যায়িত করে প্রতিটি শিবিরে রোহিঙ্গারা বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে রোহিঙ্গারা। উখিয়ার স্থানীয় কয়েকজন সচেতন মানুষ জানান, বিক্ষোভের সময় ইংরেজিতে লেখা ব্যানার ও রোহিঙ্গাদের গায়ে প্রতিবাদী ভাষায় লেখা টি-শার্ট ছিল।

বেশ কয়েকটি জায়গায় টি-শার্ট ও ব্যানার একই ধরনের। এখন প্রশ্ন উঠেছে, কারা রোহিঙ্গাদের এই টি-শার্ট ও ব্যানার সরবরাহ করেছে। অঘোষিতভাবে হঠাৎ করেই রোহিঙ্গারা কিভাবে এত সংগঠিত হলো ?

এসব বিষয়ে আরও মনিটরিং দরকার। কিন্তু যাদের মনিটর করার কথা তারাই যখন মদদ যোগায় তখন সেই মনিটরের আর প্রয়োজনই বা কী?

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রোহিঙ্গারা আসার পর থেকে পেছনের সারিতে থাকা স্থানীয় এনজিওগুলোও এখন আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হয়ে গেছে। এসব এনজিও বিদেশি ডোনার এজেন্সির পরিকল্পনা ও দিকনির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে।

তারাও বিদেশি এনজিওগুলোর মত রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফেরত না যাওয়ার বিষয়ে প্রলুব্ধ করছে। আবার রোহিঙ্গাদের কেন্দ্র করে এমনও এনজিও সংস্থার আবির্ভাব হয়েছে, যেগুলোর আগে নাম পর্যন্ত শোনেনি কেউই।

এসব ভূঁইফোড় এনজিওগুলোর কার্যক্রম সবচেয়ে বেশি আপত্তিজনক। অভিযোগ আছে, হঠাৎ আবির্ভাব হওয়া এসব এনজিও রোহিঙ্গাদের মধ্যে উগ্রতা ছড়াতেও কাজ করছে।

নানামুখী অপতৎপরতা চালাচ্ছে শুরা, ইকরা, আসিয়াব, ইসলামীক রিলিফ, মুসলিম এইড ও মারসি মালয়েশিয়া, এসকেবি, আল্লামা ফয়েজুল্লাহ ফাউন্ডেশন, পালস বাংলাদেশসহ আরও কয়েকটি এনজিও সংস্থা।

রোহিঙ্গা শিবিরে সবচেয়ে বেশি অপতৎপরতা চালাচ্ছে এসকেবি (স্মল কাইন্ডনেস অব বাংলাদেশ) নামে একটি এনজিও সংস্থা। এই সংস্থার অধিকাংশই জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাবেক এবং বর্তমান দায়িত্বশীল। বর্তমানে এই সংস্থার নেতৃত্ব দেয় চট্টগ্রামের সাবেক এক শিবির নেতা।

কক্সবাজারের স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিক জানিয়েছেন- বেশ কিছু রোহিঙ্গা নানাভাবে রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে বের হয়ে বিভিন্ন এনজিও’র মাধ্যমে মালয়েশিয়া, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে চলে গেছে। শুধু তাই নয় এসব রোহিঙ্গাদের অনেকেই আবার কানাডা-অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব নিয়ে আবার বাংলাদেশে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে এনজিওর নামে নানা অপতৎপরতা চালাচ্ছে।

টেকনাফের নয়াপাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সাইফুল নামে এমন একজন রোহিঙ্গার তৎপরতা সবাইকে অবাক করেছে। তার মতো এমন আরো অনেক সাইফুল আছে যারা নানাভাবেই বিদেশে গিয়ে আবার কক্সবাজার এসে রোহিঙ্গাদেরকে মিয়ানমারে না যাওয়ার জন্য প্ররোচিতই করছেনা শুধু সেই সাথে বিভিন্ন ইসলামী জঙ্গী গ্রুপগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ করিয়ে দিচ্ছে।

স্থানীয় কিছু এনজিওর অর্থের জোগান হয় মধ্যপ্রাচ্য থেকে হুন্ডির মাধ্যমে। এছাড়াও তুর্কির বিভিন্ন এনজিও থেকেও সংস্থার অর্থের জোগান আসে।

বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থার সুপারিশের ভিত্তিতে এনজিও ব্যুরো থেকে ৪১ টি সংস্থাকে বাতিল করা হয়েছিল। তবে সে সময় নিষিদ্ধ ঘোষিত এনজিওগুলো আবার তাদের অপতৎপরতা শুরু করে গত ইউনুস সরকারের আমলে।

# রাকীব হুসেইন: লেখক, প্রাবন্ধিক।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *