উগ্র ধর্মীয় বিদ্বেষ আসলে আমাদের দেশের মুসলমানদের মন থেকে কখনো মুছে যায়নি। এটি নানা কারণে-সামাজিক প্রেক্ষাপটে ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় কিছুটা অবদমিত ছিল মাত্র।
কিন্তু সেই অবদমন আর থাকেনি। একেবারে প্রকাশ্য রূপ ধারণ করেছে। যা ছিল অন্তরে তাই বের হয়ে এসেছে একেবারে বিস্ফোরিত রূপে।
অন্য ধর্মের প্রতি, সম্প্রদায়ের প্রতি সহনশীলতাতো দূরে থাক চরম ঘৃণা-বিদ্বেষ-ক্ষোভ-হত্যা করার মানসিকতা যে মনের মধ্যে কিলবিল করছিল এতদিন তা একেবারেই প্রকাশ্যে চলে এসেছে।
মন্দ নয় এই উগ্র সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্পটি এদের মন থেকে বেরিয়ে পড়েছে। মানে অসাম্প্রদায়িকতার খোলসটি থেকে সেই আদি কদাকার চেহারাটি এবার দেখতে পেলো সবাই। মানুষ কি এমনই হয়?
এমন প্রশ্ন জাগে এসব দেখেশুনে। সব মানুষের মধ্যেই কি এই ধর্মীয়-সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা কাজ করে সুপ্তভাবে?
যা অনেকে হয়তো নানা লোকলজ্জার খাতিরে দেখাতে পারেন না। সেই লজ্জাটি এখন আর নেই। লজ্জার পর্দা বা দেয়াল সরে গেছে। ফলে দেখা যাচ্ছে কদর্য সেই রূপটি। এটিই বোধ হয় এদের আসল চেহারা।
এ যেন এক অবগুন্ঠিত সমাজ ছিল এতদিন। তবে সেই অবগুন্ঠন যে পুরোটা উন্মোচিত হয়েছে তা কিন্তু নয়। কিছুটা বোধ হয় বাকী আছে।
নাটকের শেষ অংশটুকু বোধ হয় এখনো দেখিনি আমরা। পর্দা ওঠেনি এখনো সে নাটকের, তারপর হয়তো মঞ্চস্থ হবে। জানিনা সেখানে আরো কত লুকিয়ে থাকা বীভৎসতা কত হিপোক্রেসি উন্মুক্ত হবে!
ধিক এ কথিত অসাম্প্রদায়িক সমাজ ব্যবস্থাকে! এই হিপোক্রেসি দেখে লজ্জায় মাথা হেট হতো আগে। আর এখন এদের ভয়ংকর ফ্রাঙ্কেনস্টাইল রুপ দেখে প্রাণে পানি থাকেনা। সে শুকিয়ে গেছে যেন।
তাহলে আমরা কিসের টানে, কোন অদৃশ্য মোহে উদ্বেলিত হয়ে উঠি –‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম” শুনে? সিলেটের সুনামগঞ্জের ভাটি অঞ্চলের সেই বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের সুরেলা গানটি আমরা ধারণ করতাম মনেপ্রাণে।
কিন্তু আজকে যাদের উগ্র-সাম্প্রদায়িক কদাকার রূপটি দেখছি তারা কি সত্যিই শাহ আবদুল করিমের গানের সেই মূলবাণীকে অনূধাবন বা স্মরণ করেন?
শাহ আবদুল করিম “আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম” গানটি মূলত ১৯৭৮-৭৯ সালের দিকে স্থানীয় সরকারের একটি সচেতনতামূলক প্রচারণার (ক্যাম্পেইন) অংশ হিসেবে রচনা করেছিলেন, যা পরবর্তীতে প্রচণ্ড জনপ্রিয়তা পায় বাঙ্গালী সমাজে।

সাধারণের মুখে মুখে এটি ছড়িয়ে যায়। হঠাৎ করে কেউ কেউ গুন গুন করে গেয়ে ওঠেন পুরনো স্মৃতিকে মনে করে। কিন্তু আসলেই কি তাই- সে প্রশ্নতো থেকেই যায়।
এর উত্তর খুঁজতে গেলে অনেক ইতিহাস ঘাটতে হবে। কাহিনী অনেক লম্বা হয়ে যাবে।
খুব বেশি দূরে যাবোনা। ১৯৪৭ সালকেই বিবেচনায় ধরি। সত্যিই যদি ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম ‘ হতো তাহলে কেন ভাগ হয়েছিল ভারতবর্ষ ? সেটি কি সত্যিকার অর্থে কোন রাজনৈতিক মুক্তি বা শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভাগ হয়েছিল ?
নাকি ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেছিল বেনিয়া শাসকগোষ্ঠী ইংরেজ ও তৎকালীন ভারত পাকিস্তানের রাজনীতিবিদেরা?
সে ইতিহাস আমরা সবাই কমবেশি জানি। যদি শান্তিতে থাকার জন্য ধর্মের ভিত্তিতেই দেশ ভাগ হবে তাহলে ভারতে এত সংখ্যক মুসলমান কেন রয়ে গেল? আর পাকিস্তানেই (উভয় পাকিস্তানে) বা এতসংখ্যক হিন্দুসহ অন্য ধর্মাবলম্বী রয়ে গেল?
যদিও পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে দূরত্ব কমপক্ষে এক হাজার মাইলেরও বেশি। এই যে সীমানা ভাগাভাগি এর মধ্যেও সমস্যাটিকে জিইয়ে রেখেছিল ইংরেজ ও তৎকালীন নেহেরু-জিন্নাহ ও তাদের তাবেদার কিছু গোষ্ঠী।
তা নাহলে এই বিভাজনটি দুই দেশ একেবারেই পৃথক হলে হতো। তাহলে হয়তো এতো ঝামেলা হতোনা। পাকিস্তান দুই দিকে। আর মাঝখানে ভারত । ভাগ হলেও কিন্তু পুরোপুরি সমাধান করলোনা সেই দুষ্ট রাজনৈতিক চক্র।
কারণ বিভাজন ও সমস্যা জিইয়ে না রেখে গেলে সেই কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর ঘৃণ্য রাজনীতি শেষ হয়ে যাবে। তাই এই সীমান্ত ও জনমিতির সমস্যাটিকে পৃথক সমস্যা হিসেবে রেখে দেয়া হলো।
আর সেই সমস্যাটি এখন ভোগ করছে তিন দেশের মানুষ। ভারত-বাংলাদেশ ও পাকিস্তান। অবশ্য বেশি ভুগছে বাংলাদেশের হিন্দুসহ ধর্মীয় ও জাতিগণ সংখ্যালঘুরা।
এরপরে পাকিস্তান। ভারতও ভুগছে বেশ। তবে তারা নাগরিকদের অধিকারকে শুধু সংবিধানেই সীমাবদ্ধ রাখেনি, সেটি বাস্তবে রূপ দিয়েছে।
মাঝে মধ্যে যে তার ব্যত্যয় ঘটেনা কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা নয়। তবে তা কোনভাবেই বাংলাদেশ( মানে নব্য পাকিস্তান) ও অরিজনাল পাকিস্তান( সাবেক পশ্চিম পাকিস্তান) এর মতো নয় কখনোই।
এতসব প্রসঙ্গের অবতারণা যে কারণে তাহলো বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্র-সমাজ বাস্তবতায় কি হিন্দু ধর্মীয় সংখ্যালঘুসহ অন্য ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু নাগরিকদের নির্বিঘ্নে-নিরাপদে-শান্তিতে বসবাসের কোন পরিবেশ রয়েছে?
শুধু এখনকার কেন বলছি, এটিতো সেই অনেক আগেকার সমস্যা। যা কিছুটা পর্দা বা দেয়ালঘেরা ছিল। এখন যেদি অত্যন্ত ভয়ংকরভাবে উন্মোচিত হয়েছে। এখনকার বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে “রংধনু” সমাজ গঠনের , দেশ গঠনের কথা বলছেন তা সত্যিকারভাবে তারা বাস্তবায়ন চান কিনা সেটি আগে ভেবে দেখতে হবে।
কিন্তু এবছর গত ১২ ফেব্রুয়ারিতে বিএনপির দুই তৃতীয়াংশ আসনের বেশি আসনে জিতে সরকার গঠনের পর থেকে আমরা কি সেই “রংধনু” সমাজ গঠনের কোন পদক্ষেপ দেখেছি?
এদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর কি অন্যায় অত্যাচার-বিদ্বেষ কমেছে? নাকি বেড়েছে আরো? কমেছে নাকি বেড়েছে তাতো এক গাইবান্ধায় পলাশবাড়িতে শিব ও রামের প্রতিমা নির্মাণের যে মন্দির সেটি নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখলেই বোঝা যায়। নতুন করে বলার কি অপেক্ষা রাখে?

বাংলাদেশের মূলধারার সংবাদ মাধ্যমগুলোতে এ নিয়ে গঠনমূলক অনুসন্ধানী তেমন কোন প্রতিবেদন, প্রবন্ধ চোখে পড়েনি। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেভাবে ইসলামী উগ্র সাম্প্রদায়িক হুমকি ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে তা অত্যন্ত ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
মূল ধারার সংবাদ মাধ্যমগুলোও নিজেদের অনুসন্ধানী নয় ফেইসবুকীয় বা অন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নের মধ্য রামচন্দ্রপুর গ্রামের শ্রীশ্রী রাধা গোবিন্দ ও কালী মন্দির প্রাঙ্গণে দেশের (কারো মতে এশিয়ার) বৃহত্তম ৮১ ফুট উচ্চতার একটি রামমূর্তি নির্মাণের কাজ চলছিল।
ওই একই মন্দির কমপ্লেক্সে ইতিপূর্বে একটি ৫৩ ফুট উঁচু কৃষ্ণমূর্তি এবং ২৮ ফুট উঁচু শিবমূর্তি নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছিল। তবে যা হয়েছিল তা কিন্তু মন্দিরের নিজস্ব জায়গাতেই হয়েছে। কিন্তু তা নিয়ে কিছু উগ্র ইসলামপন্থী লোকজন প্রচন্ড রকমের হিংসাত্মক আচরণ করতে থাকে। যা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
এই ইসলামপন্থীদের হুমকি ও এর পেছনে সরকারি মদদের কারণে নিজস্ব টাকায়, নিজের জমিতে ধর্ম পালনের জন্য প্রতিমা নির্মাণ বন্ধ রাখতে হয়েছে মানে সরকার বাধ্য করেছে বন্ধ করতে। তাহলে এই কি বাংলাদেশের সংবিধান?
যেখানে নাকি সব মানুষের সমান অধিকারের কথা বলা আছে ? আবার বিএনপির প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলছেন “রংধনু” সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের কথা!
এই প্রতিমাগুলো ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেয়ার আলটিমেটাম দিয়েছে কট্টরপন্থী ইসলামপন্থী দল এবং স্থানীয় ইমাম-উলেমা পরিষদ ও খেলাফত আন্দোলন।

কওমী মাদ্রাসাভিত্তিক উগ্র ইসলামী রাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ এই মূর্তি স্থাপনকে স্থানীয় শান্তি-শৃঙ্খলা বিনষ্টের অপচেষ্টা বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। এমনকি যেকোন সময়ে তা ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেয়ারও হুমকি দিচ্ছে।
সেই সাথে এই দেশ থেকে হিন্দুদেরকে বিতারণের হুমকিও দিচ্ছে। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোন কোন মোল্লা ও উগ্র সাম্প্রদায়িক তরুণ-তরুণীরা একটা দুইটা হিন্দু ধর, ধইরা ধইরা জবাই কর এমন শ্লোগানও দিচ্ছে।

শুধু তাই নয়-হিন্দুদের জায়গা এ বাংলায় হবেনা, হিন্দু যদি বাঁচতে চাও ভারতে চলে যাও, বিপ্লব বিপ্লব- ইসলামী বিপ্লব এ ধরনের শ্লোগানসহ আরো অশ্লীল ভাষায় শ্লোগান ও অঙ্গভঙ্গি দেখা গেছে ও যাচ্ছে।
ইসলামপন্থী সংগঠনগুলো ইতিমধ্যে মন্দির ভেঙ্গে ফেলার দাবিতে যে বিক্ষোভ মিছিল করেছে তাতে হিন্দু ধর্মীয় অবতার শ্রীরামচন্দ্রের ছবি জুতোপেটা করে তাদের প্রচন্ড ঘৃণা ও ক্ষোভ দেখিয়েছে।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে- এতে করে কি ধর্মীয় অবমাননা হয়নি ওইসব মুসলিম নাগরিকদের? নাকি ধর্মীয় অবমাননা শুধু হিন্দুসহ অন্য সংখ্যালঘুদের বেলায়?
রাষ্ট্র একেবারে নিশ্চুপ ভূমিকা পালন করছে এক্ষেত্রে।
বরং ওই মন্দির প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যার অবদান সবচেয়ে বেশি তার চরিত্রহননের জন্য যত ধরনের অপপ্রচার আছে তার সবই করা হচ্ছে। আর এর সবই করা হচ্ছে পুরোপুরি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়। তা যদি না হতো তাহলে আওয়ামীলীগ আমলে কখন মন্দির প্রতিষ্ঠার উদ্যোক্তা হরিদাস চন্দ্র তরণী দাস কখন র্যা বের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিল সেই তথ্য ও ভিজ্যুয়ালও প্রকাশ করা হচ্ছে নানা মাধ্যমে।
এমনকি উগ্র ইসলামপন্থীরা এই মন্দির নির্মাণের জন্য অর্থের যোগানদাতা কে বা কারা বা ভারত থেকে এর অর্থের যোগান দেয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ তুলেছে।
এমনকি মন্দিরে একসময়ে ভারতীয় সহকারি হাইকমিশনার পরিদর্শন কেন করেছেন সেখানেও নানা ষড়যন্ত্রের গন্ধ খুঁজে পেয়েছেন। কিন্তু সারা বাংলাদেশে যে কত লক্ষ সুরম্য মসজিদ নির্মিত হয়েছে তা নিয়েতো কেউ কোন প্রশ্ন তোলেনি। আর প্রশ্ন তোলার সাহসওতো কারো নেই।
আওয়ামীলীগ আমল যদি ফ্যাসিবাদী শাসনামল হয়ে থাকে তাহলে তার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও নিশ্চয়ই ফ্যাসিবাদের জননী।
তা হঠাৎ করে “কওমী জননী” কেন ফ্যাসিবাদ হয়ে উঠলো এসব কওমীপন্থী ইসলামী মোল্লাদের কাছে।
আর শেখ হাসিনার আমলে ও এরআগে আওয়ামীলীগের করা অনেক স্থাপনাইতো বিগত ইউনুস সরকারের আমলে ও এখন বিএনপি আমলেও ধ্বংস করা হচ্ছে।
তো ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বরের এতিহাসিক বাড়িটি যদি বার বার আগুনে পুড়ে আর বুলডোজার দিয়ে ধ্বংস করা হয়। অনেক সাংস্কৃতিক স্থাপনা, ম্যুরাল, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন ইত্যাদি ধ্বংস করা হয়েছে।
তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে- তো ফ্যাসিবাদী হাসিনা সারাদেশে যে ৫৬৪টি মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ করেছিল ৯ হাজার ৪৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে সেগুলোর কি হবে?
কারণ সেগুলো ফ্যাসিবাদী হাসিনার তৈরী ফ্যাসিবাদী চিহ্ন বা স্মারক হিসেবে থেকে যাচ্ছেনা? মানুষতো বলবে- শেখ হাসিনার তৈরী মডেল মসজিদ। তাহলে ফ্যাসিবাদতো রয়েই গেলো পবিত্র মসজিদের মাধ্যমে।
তো এখন আমাদের ইসলামী জেহাদী মুসলমান ভাইয়েরা কি করবেন ?
সেই ফ্যাসিবাদী মসজিদে নামাজ পড়লে তা কি কবুল করবেন আল্লাহপাক? যেহেতু ফ্যাসিবাদের স্মৃতিচিহ্ন আপনারা ধ্বংস করতে চাইছেন ও করেছেন তাহলে এই ৫৬৪টি মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের কি হবে?
এদিকে গাইবান্ধার পলাশবাড়িতে প্রতিমাসহ মন্দির গুড়িয়ে দেয়ার হুমকি ও হিন্দুদের অবতার রামের প্রতিকৃতিতে জুতা মারার কারণে স্বাভাবিকভাবেই হিন্দু সম্প্রদায়ের নাগরিকদের মধ্যে আতংক বিরাজ করছে।

তারাও নিজেদের সাধ্যমতো ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান রক্ষা ও হিন্দুদের নিরাপত্তার দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করছেন।
রামমূর্তির নির্মাণকাজ বন্ধ করা এবং রামচন্দ্রের ছবি অবমাননার প্রতিবাদে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ এবং বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ দেশের বিভিন্ন জেলায় (ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুর ইত্যাদি) মশাল মিছিল, মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছে।

অধিকারের দাবি, বিক্ষোভকারীদের দাবি, এটি ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ। তাঁরা ধর্মীয় অবমাননাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীরাও এই বাধার প্রতিবাদে আন্দোলন করছেন।
এরই মধ্যে ঢাকায় হিন্দুদের বিক্ষোভ চলাকালে অ্যাডভোকেট চৈতালী চক্রবর্তী নামে একজন বিক্ষুব্ধ সনাতনী বিক্ষুব্ধ নারী কিছু সাংবাদিকের প্রশ্নোত্তরে কথাপ্রসঙ্গে বলেছেন- হিন্দুদেরকে যদি এতই অপছন্দ আর ঘৃণা হয়, সহ্য না হয় তাহলে হিন্দুদেরকে সংখ্যানুপাতে বাংলাদেশের মধ্যে একটি প্রদেশ করে দেয়া হোক।

এই মন্তব্য নিয়েতো তুলকালাম কাণ্ড ঘটে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেতো বটেই দেশের বিভিন্ন স্থানে উগ্র ইসলামপন্থীরাই শুধু নয় সাধারণ মুসলিমরাও ক্ষেপে গেছেন। চৈতালীর কথাবার্তা নাকি বিচ্ছিন্নতাবাদী কথা?
আরে ভাই তিনি( চৈতালী) তো বিক্ষুব্ধ হয়ে একটি প্রস্তাব দিয়েছেন মাত্র। তার এই বিক্ষুব্ধ হওয়াটি কি অস্বাভাবিক কিছু ? তিনিতো সরকারের কাছে আবেদন করেছেন মাত্র। মুসলমানদের যেহেতু হিন্দুদের সাথে বসবাস করতে ভালোও লাগছেনা তাই উভয় পক্ষের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় ও নিরাপদে বসবাসের জন্য বাংলাদেশের মধ্যেই একটি প্রদেশ করার অনুরোধ করেছেন মাত্র। আর এতেই তাঁকে টেনে ছিঁড়ে ফেলতে চাইছে এদেশের ইসলামী বিপ্লবীরা।
শুধু তারাই নয়- যেখানে এই অ্যাডভোকেট তার পেশাগত দায়িত্ব পালন করেন বাংলাদেশ হাইকোর্টে সেখানেই কয়েকজন উগ্র আইনজীবী তাঁকে শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্তা করেছেন।

এজন্য অবশ্য তিনি বার এসোসিয়েশনের কাছে তার নিরাপত্তা বিধানের জন্য ও দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য লিখিত অভিযোগ জানিয়েছেন।
গত চব্বিশের ৫ আগষ্টের কথিত গণঅভ্যুত্থান বা অনেকে বলে থাকেন ‘ইসলামী-সামরিক ক্যু’ এর পের থেকে আমাদের মুসলমানদের চোখের পর্দা সরে গেছে। আগে যেমন হিন্দু বন্ধু বান্ধব ছিল, তাদের সাথে ওঠাবসা ছিল। সামাজিক-রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল। সে জায়গায় চরমভাবে ভাটা পড়েছে। শুধু ভাটাই পড়েনি। সেখানে মুসলিমরা এখন হিন্দুদের প্রতি চরমভাবে ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে।
এদিকে গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে রাধাগোবিন্দ মন্দিরে ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের বিগ্রহ গুঁড়িয়ে দেয়ার হুমকি এবং সাম্প্রদায়িক শক্তির একটি মিছিলে শ্রীরাম চন্দ্রের ছবিকে জুতাপেটা করে হিন্দু ধর্মের অবমাননার করার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীষ্টান ঐক্য পরিষদ।
ঐক্য পরিষদের নেতৃবৃন্দ বলেছেন , গত কয়েকদিন ধরে দেশের চিহ্নিত একটি সাম্প্রদায়িক শক্তি পলাশবাড়ীতে ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের বিগ্রহ ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়া এবং বিভিন্ন ট্যাগ দিয়ে রাজধানীসহ সারা দেশব্যাপী সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে, যা যে কোন মুহূর্তে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার রূপ নিয়ে সারা দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এ ধরণের সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ড কোনভাবেই কারো জন্য কাম্য হতে পারে না।
এহেন পরিস্থিতিতে ঐক্য পরিষদ স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য সরকারকে এসব সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে কঠোর হস্তে দমন করার জন্য অনতিবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানাচ্ছে।
এর পাশাপাশি সকল অসাম্প্রদায়িক নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আবেদন রাখছে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্যে।
সম্ভবত গত ২৩ জুন দেখলাম পূজা উদযাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে এ বিষয়ে তাদের আবেদন নিবেদন জানিয়েছেন। কোন দাবি জানিয়েছেন কিনা তা অবশ্য জানা নেই।

কারণ হিন্দুদের অবতার রামচন্দ্রের প্রতিকৃতিকে জুতা দিয়ে অপমানকে এই নেতারা ধর্মীয় অবমাননা হিসেবে উল্লেখ করে দোষীদের বিরুদ্ধে মামলা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন কিনা সেটাও জানা নেই আমার।
তবে আমার মনে হয়না এসব নেতৃবৃন্দের সে সৎসাহস নেই। তাদের জন্য করুণা হওয়া ছাড়া আর কিছুই নেই।
ওই যে বলছিলাম বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের সেই বিখ্যাত গান- “আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম”!
শাহ আবদুল করিমের প্রতি শ্রদ্ধা ভালোবাসা-আবেগ সবকিছু রেখেই আমি বলি- আসলে এখানকার হিন্দুরা কখনোই সুন্দর দিন কাটাতে পারেননি। তাই যদি হতো-তাহলে ৪৭ এ ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ হতোনা, গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং হতোনা, নোয়াখালীর গান্ধি আশ্রম ঘিরে হিন্দুদের ওপর অত্যাচার খুন নেমে আসতোনা, বরিশালে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস হতোনা, ১৯৬৫ তে আবারো হিন্দু-মুসলিম সমস্যা হতোনা।
বাংলাদেশে তথা পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দুদেরকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের সম্পত্তি শত্রুসম্পত্তি করা হতোনা। যে শত্রু সম্পত্তির যন্ত্রনা এখনো ভোগ করছেন হিন্দুরা।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে দেশ স্বাধীন হলেও গত ৫৫ বছরে এত হিন্দুকে দেশত্যাগে বাধ্য করতেন না আমাদের মুসলিম ভাইয়েরা নানাভাবে। এতবছরে বাংলাদেশে হিন্দুর সংখ্যা কমতে কমতে পৌনে দুই কোটি বা দুই কোটিতে নেমে আসতোনা। বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায় চরম আতংকগ্রস্ত তাদের জীবন নিয়ে।
তো ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’ বলে নষ্টালজিক বানানোর কোন প্রয়োজন নেই। এর সবই হলো- কতগুলো হিপেক্রেসী।
# ইশরাত জাহান: লেখিকা, প্রাবন্ধিক ও নারী অধিকার সংগঠক।
