আবারো সেই ২০০৪ সালের শেষের দিকের মত অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে এই নির্বাচিত বিএনপি সরকারের আমলে।

সে সময় যেমন অবৈধ ইউনুস সরকার ও তার দোসর ইসলামী জঙ্গী গোষ্ঠী ও সামরিক বাহিনীর যৌথ প্রযোজনায় দেশে ইসলামী বিপ্লবের একটি জোশ তৈরী করেছিল এখনো তেমন অবস্থা তৈরী করা হয়েছে।

কিন্তু সরকার রহস্যজনকভাবে নীরব ভূমিকা পালন করছে।আসলে ঠিক কি করতে চাইছে সরকার তা বোঝা যাচ্ছেনা।প্রকারান্তরে কি সরকারের প্রচ্ছন্ন কোন ইঙ্গিতে এসব হচ্ছে নাকি প্রশাসন এসব ইসলামী জঙ্গীদের কাছে বন্দী হয়ে আছে সে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

হঠাৎ করেই যেন বদলে গেছে দেশের দৃশ্যপট! ঢাকা, চট্টগ্রাম, সাভার, পাবনা, যশোর কিংবা মাদারীপুর—দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে রাস্তার পাশে, ফ্লাইওভারে কিংবা মোটোরসাইকেল র্যা লীতে শোভা পাচ্ছে কালেমা লেখা হাজার হাজার সাদা আর কালো রঙের পতাকা।

সাদামাটা চোখে এগুলোকে ধর্মীয় বাণী বা কালেমা খচিত পতাকা মনে হলেও, এই পতাকার হঠাৎ আধিক্য এবং এর পেছনের অপশক্তির উৎস নিয়ে এখন তোলপাড় শুরু হয়েছে দেশের মধ্যে।

এমনকি সরকারি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যেও।কিন্তু এসব পতাকা উত্তোলনকারি বা প্রকাশ্যে ইসলামী জোশে মিছিলকারিদের বিরুদ্ধে কোন আইনিী পদক্ষেপের কতঅ জানা যায়নি।

বিভিন্ন সূত্র থেকে যেটি জানা যায় তা হলো- ঘটনার সূত্রপাত মূলত একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আহ্বান থেকে।

ইসলামী উগ্রপন্থী কওমী মাদ্রাসা ভিত্তিক হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সাবেক এক নেতার যুক্তি ছিল—দেশে বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের মতো ভিনদেশী পতাকা ওড়ানো যদি বৈধ হতে পারে, তবে নিজস্ব ইসলামী সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে এই পতাকা কেন নয়?

সেই কাউন্টার ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবেই আর একজন ব্যক্তি দ্বারা ‘সাদক্বাহ প্রজেক্ট’-এর নামে একাই প্রায় ১০ হাজার কালেমা খচিত পতাকা সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

তবে শুধু ঘোষণা দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি এ গোষ্ঠী। সারা দেশের আনাচে কানাচে কালেমা লেখা সাদা ও কালো দুই ধরনের পতাকাতে ছেয়ে গেছে বাংলাদেশ। বিশাল বিশাল র্যা লী, তাও অঅবার অনেক ক্ষেত্রে মোটর সাইকেল ও গাড়ি নিয়ে র্যা লী হয়েছে।

 

তবে এসব পতাকায় ছেয়ে যাওয়া ও র্যা লীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যেও কিছুটা উদ্বেগ দেখা গেছে।কারণ হিসেবে জানা গেলো-এই সাদা ও কালো রঙের পতাকার ভিজ্যুয়াল বা কাঠামোগত মিল রয়েছে আল কায়েদা, আইএস (Islamic State) কিংবা তালেবানের মতো বৈশ্বিক কিছু উগ্রপন্থী সংগঠনের পতাকার সাথে।

আমার নিজস্ব পর্যবেক্ষণ-সাম্প্রতিক সময়ে মানে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরেও ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় হুবহু এই ধরনের সাদা ও কালো পতাকা নিয়ে মিছিল হয়েছিল।

যার নেপথ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থী সংগঠন ‘হিযবুত তাহরীর’ ও হেফাজতে ইসলামীর লোকজন জড়িত ছিল।তখনতো দেশে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী জামায়াতে ইসলামী, হিযবুত তাহরীর, হেফাজতে ইসলামী, হরকাতল জেহাদ(হুজি)সহ অঅরো অনেক ইসলামী চরমপন্থীদের রমরমা অবস্থা বিরাজ করছিল।

তখনতো দেশে শেখ হাসিনা-আওয়ামীলীগ-ভারত ও হিন্দু বিরোধী অবস্থান তুঙ্গে ছিল।সেবারও যেভাবে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের আবেগকে পুঁজি করে এসব সংগঠন এই কালেমা খচিত পতাকা মিছিল করেছিল, এবারও তাই করেছে।

তবে এবার বিএনপি সরকারের আমলেই কোনো নিষিদ্ধ সংগঠন ইসলামের ধুয়া তুলে ঘোলাপানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করছে কিনা সেটাও ভাবিয়ে তুলছে অনেককে।

তবে আগে যেমন তরিৎ ব্যবস্থা নেয়া হতো, এবার কিন্তু তা দেখা যাচ্ছেনা।আগে মানে বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের আমলের কথা বলছি।বিগত ইউনুস সরকারের আমলের কথা নয়।

পুলিশের গোয়েন্দা টীম ও সামরিক গোয়েন্দা টীম এখন শুধু তথ্য সংগ্রহের কাজে আছে, তাও অনেকটা ঢিমেতালে।কারন হলো- এসব সংস্থার মধ্যেই ইসলামী জঙ্গীদের আস্তানা রয়েছে।

কয়েকদিন আগেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেনাবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ দেখলাম। অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করলাম সেখানে শ্লোগান হচ্ছে-‘ নারায়ে তকবীর, আল্লাহু আকবর’।

বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর কোন প্রশিক্ষণে এমন স্লোগান আগে কেউ কখনো শুনেছে বলে জানা নেই। তাহলে কি সশস্ত্র বাহিনীকেও সেই ইসলামী জঙ্গী ভাবধারায় তৈরী করা হচ্ছে?

যদি তাই হয় তাহলে যে এ জাতির কপালে আরো দুঃখ আছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।কারণ এই যে কালেমা লেখা পতাকা সম্বলিত মিছিল, দেশের বিভিন্ন সড়কে সাদা ও কালো রঙের পতাকা উত্তোলন এসব নিশ্চয়ই পশ্চিমা উদারপন্থী দেশগুলো ভালোভাবে নেবেনা।

কারণ তারা এরই মধ্যে এধরনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে যারা যুক্ত সেই ইসলামী চরমপন্থীদেরকে তাদের দেশে নিষিদ্ধ করেছে।

তাই বাংলাদেশেও যখন এই অবস্থা চলছে সেক্ষেত্রে বাংলাদেশও যে তাদের কালো তালিকাভুক্ত হবেনা তার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারেনা।

বিভিন্ন জনের সঙ্গে আলাপ করে যা বুঝতে পারলাম -অনেকেই মনে করতে পারেন, মুসলিম দেশগুলোতে হয়তো এই ধরনের পতাকা প্রদর্শন খুবই সাধারণ বিষয়। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো!

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো উগ্রবাদের প্রতীক ব্যবহারের ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অবলম্বন করে। সৌদি আরবে উগ্রপন্থী দলের লোগো বা পতাকা প্রদর্শন বা সোশ্যাল মিডিয়ায় সহানুভূতি প্রকাশের শাস্তি ৫ থেকে ২০ বছরের কারাদণ্ড, এমনকি অপরাধের মাত্রাভেদে মৃত্যুদণ্ড!

সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE)ও নিষিদ্ধ সংগঠনের প্রতীক বহনের শাস্তি সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং বিপুল অঙ্কের জরিমানা।

কাতারে উগ্রবাদী উদ্দেশ্যে এসব প্রতীক ব্যবহার করলে দীর্ঘমেয়াদী জেল শেষে আজীবনের জন্য দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়।ইসলামী দেশগুলোতে যখন এই অবস্থা তখন বাংলাদেশকে(যাকে একটি মডারেট মুসলিম কান্ট্রি হিসেবে ধরা হয়) সারা বিশ্বের সরকার বা জনসাধারন কি চোখে দেখবে সেটা দেখার বাকী রয়েছে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বা বিদেশী বিনিয়োগকারীরা যখন বাংলাদেশের রাস্তায় আইএসের বা তালেবানের পতাকার আদলে তৈরি কোনো প্রতীক অবাধে উড়তে দেখচে ও দেখবে, তখন তারা দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে।

এর ফলে পর্যটন, বিদেশী বিনিয়োগ এবং কূটনৈতিক সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়।

অনেক ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলছেন- কালেমার পতাকা উড়তে দেখলে বিদেশী বিনিয়োগ কমে যাবে, ধীরে ধীরে তা নাও আসতে পারে।

জঙ্গিবাদ উত্থানের হুমকি থাকলে বিদেশীরা এদেশে টাকা কেন বিনিয়োগ করবে ?সেই ২০২৪ এর আগষ্টের পর থেকে বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণটি কত তা একটু খেয়াল করলেই বুঝতে পারবে সরকার যে বিনিয়োগের জন্য চাই স্থিতিশীল পরিস্থিতি।

জঙ্গীবাদমুক্ত একটি দেশ।কিন্তু সেই বাংলাদেশ কি আছে এখন? কিন্তু বিএনপির নেতৃত্বাধীন তারেক রহমানের সরকার চাইলে এইসব ঘটনা ঘটার ২৪ ঘন্টার মধ্যে পতাকা উড়ানোর নেপথ্যকারীরা ধরা পড়তো।

এই পতাকা উড়ানোর কারিগররা ইউনুসের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সঙ্গে মিটিং করেছিল। বিএনপি সরকার বিদেশী বিনিয়োগকারীদের কি জবাব দিবেন কালেমার পতাকা বিষয়ে?

কারণ ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে এই সংবাদ প্রচার হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ফরিদুল আলম একটি সংবাদ মাধ্যমকে এ বাপারে বলেছেন , ‘সাম্প্রতিক সময়ে যেভাবে ধর্মীয় প্রতীক ও পরিচয়কে কেন্দ্র করে প্রকাশ্য প্রচারণা, শোডাউন ও সমাবেশ হচ্ছে, তা স্বাভাবিকভাবেই নতুন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।

বিষয়টি আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অগ্রগতি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক অংশীদারত্বের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। এ অবস্থায় এমন কোনো কর্মকাণ্ড, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি নিয়ে বিভ্রান্তি বা নেতিবাচক ধারণার জন্ম দিতে পারে, তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।’

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এ অধ্যাপক আরো বলেন, ‘সমাজে বিদ্যমান বিভাজনকে কাজে লাগিয়ে কোনো গোষ্ঠী যদি অসহিষ্ণুতা বা উগ্রতার রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

বিশেষ করে যখন বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলেরও নজরে এসেছে, তখন রাষ্ট্রের অবস্থান হওয়া উচিত স্পষ্ট ও নীতিনির্ভর।

এই যে আন্তর্জাতিক ইসলামি জঙ্গী রাজনৈতিক সংগঠন ‘হিযবুত তাহরীর’ নিয়ে কথা উঠেছে তারা কিন্তু বিশ্বের অনেক দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ।

উগ্রপন্থী আদর্শ, সহিংসতায় উসকানি এবং রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে বিভিন্ন দেশ এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

বাংলাদেশ, ভারত ,পাকিস্তান, মিশর, সিরিয়া, জর্ডানসহ বেশ কয়েকটি আরব দেশ। এছাড়া রাশিয়া, উজবেকিস্তান, কাজাখস্তান ও কিরগিজস্তান।

জার্মানি, ইন্দোনেশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়াসহ অস্ট্রিয়া ও ডেনমার্কের মতো কিছু দেশ প্রকাশ্যে তাদের কার্যক্রম ও প্রতীক ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে।

তো সেই হিযবুত তাহরীর কিন্তু গত ২০২৪ এর কথিত গণঅভ্যুত্থানের সময় ও তার পরে নানা সময়েই প্রকাশে তাদের কমলা রঙের পোষ্টার-ব্যানারে ছেয়ে ফেলেছিল দেশের বিভিন্ন এলাকাতে।

সেসব পোষ্টারে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে নানা উষ্কানিমূলক বক্তব্য, ইসলামী শরীয়া ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের আহ্বান থাকতো। এ ছাড়া তাদের কালো পতাকাতে কালেমা লেখা প্রচার করে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলিমদেরকে বিপথে নেয়ার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

তো এবার দেশবাসী বুঝুক কালেমা লেখার মাহাত্ম্য কি! সেইসাথে বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছেও নিশ্চয়ই ইতিমধ্যে এ ব্যাপারে নানাদিক থেকে মেসেজ গেছে।সিদ্ধান্ত মূলত তাকেই নিতে হবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। কারণ তিনিই সরকারের প্রধান নির্বাহী।

# নুরুল ইসলাম আনসারি: লেখক, প্রাবন্ধিক।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *