ঢাকা: দীর্ঘ প্রায় ১৯ বছর পর ফের ভারতের কলকাতায় পা রাখতে চলেছেন লেখক তসলিমা নাসরিন। আগামি ১ আগস্ট কলকাতার রবীন্দ্র সদনে মৌলবাদবিরোধী কবি-সাহিত্যিকদের উদ্যোগে আয়োজিত একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন তিনি।

যেমন এই দেশ থেকে নির্বাসিত হয়েছেন, তেমনি পশ্চিমবঙ্গ থেকেও ছিলেন নির্বাসনে। সেই নির্বাসন জীবন কাটলো অবশেষে।

২০০৪ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত কলকাতায় বসবাস করলেও, ২০০৭ সালে উগ্রপন্থী সংগঠনগুলির বিক্ষোভ ও হিংসাত্মক আন্দোলনের জেরে তাঁকে রাতারাতি ভারতের এই রাজ্য ছাড়তে হয়।

সেই সময় তাঁর বিতর্কিত বই ‘দ্বিখণ্ডিত’ নিষিদ্ধ করেছিল তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকার।

তাঁর কলকাতায় ফেরার নিয়ে ইতিমধ্যে রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে।

এই আবহেই সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি দীর্ঘ পোস্ট করে নানা বিতর্কের জবাব দিয়েছেন তসলিমা নাসরিন।

তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, তাঁর এই সফরের আয়োজন করেছে ‘সেকুলার মিশন’ নামে একটি সংগঠন এবং রাজ্য সরকার শুধুমাত্র নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছে।

তসলিমা লিখেছেন, “আমাকে কলকাতায় আমন্ত্রণ জানিয়েছে ‘সেকুলার মিশন’ নামে একটি সংগঠন। সংগঠনটির কর্ণধার একজন প্রগতিশীল মুসলমান, ওসমান গণি মল্লিক। আমাকে কি বিজেপি কলকাতায় নিয়ে যাচ্ছে? না। আমাকে কি পশ্চিমবঙ্গ সরকার নিয়ে যাচ্ছে? না।

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচিত সরকার শুধু আমার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করছে। আমি যে রাজ্যেই যাই, সেখানে যে রাজনৈতিক দলেরই সরকার থাকুক না কেন, সেই সরকারই আমার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে। এটাই স্বাভাবিক প্রশাসনিক দায়িত্ব।

কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের কিছু বাম নেতা আমাকে দোষ দিচ্ছেন, আমি কেন কলকাতায় যাচ্ছি! তাঁরা আমাকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে তাড়িয়েছিলেন; এখন আমি সেই রাজ্যে পা রাখা মানেই নাকি আমি হিন্দুত্ববাদী, আমি বিজেপি, আরএসএস।

আমি সিপিআইএম সরকারের আমন্ত্রণে বহুবার কেরালায় গিয়েছি। সেখানকার বাম নেতারা আমাকে সংবর্ধনা দিয়েছেন, সম্মান জানিয়েছেন, আমার জন্য জেড প্লাস নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছেন।

তখন কলকাতার এই বাম নেতারা কি আমাকে ‘বামপন্থী’ বলে গালি দিয়েছিলেন, নাকি আনন্দে চুমু খেয়েছিলেন? তখন তো তাঁরা দিব্যি চোখ বন্ধ করে রেখেছিলেন। আমার বেলায় তাঁদের চোখ কখনও খোলে কি?

আমার কলকাতায় যাওয়া নিয়ে এই মিথ্যে প্রচার কেন? ১৮ বছর ৮ মাস ১০ দিন পর মাত্র দু’দিনের জন্য কলকাতায় যাচ্ছি—তাতেই তাঁদের গায়ে জ্বালা ধরছে!

বামফ্রন্ট সরকার আমাকে কলকাতা থেকে তাড়িয়েছিল। পরবর্তী তৃণমূল সরকারও আমাকে পশ্চিমবঙ্গে ঢুকতে দেয়নি। শুধু তা-ই নয়, আমার লেখা মেগাসিরিয়ালের টেলিভিশন সম্প্রচার বন্ধ করেছে, আমার বইয়ের প্রকাশ অনুষ্ঠান বাতিল করেছে।

তখন বাংলার তথাকথিত প্রগতিশীলেরা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে একটি শব্দও খরচ করেছিলেন? করেননি।

আসলে আমরা যারা মুসলিম সমাজকে অন্ধকার থেকে আলোয় আনতে চাই, মুসলিমদের শিক্ষিত ও বিজ্ঞানমনস্ক করতে চাই, ধর্মান্ধতা, অজ্ঞতা ও বর্বরতা থেকে মুক্ত করতে চাই, নারীর সমানাধিকার ও মানবাধিকার চাই, বৈষম্যমূলক ইসলামী আইনের বদলে সমানাধিকারের ভিত্তিতে প্রণীত আধুনিক আইন প্রতিষ্ঠা করতে চাই—বাম নেতাদের অনেকেই তা সহ্য করতে পারেন না।

তাঁরা চান মুসলিম সমাজ চোদ্দশো বছর আগের নারীবিদ্বেষী, ধর্মান্ধ ও অসহিষ্ণু সমাজ হিসেবেই পড়ে থাকুক। মুসলিম সমাজের সংস্কার যাঁরা চান, তাঁদের তাঁরা শত্রু মনে করেন; এবং আমরা সকলেই জানি ইসলামী মৌলবাদীদের তুষ্ট করতে তাঁদের কোনও দ্বিধা নেই।

এই কারণেই আমার পশ্চিমবঙ্গে ফেরা নিয়ে তাঁদের এত রাগ, এত ক্ষোভ, এত মিথ্যে প্রচার।

এই বামরা কি কোনও দিন মানুষ হবেন না? আর কত দিন তাঁরা প্রগতিশীলতার মুখোশ পরে জিহাদিদের ভাষায় কথা বলে যাবেন?
কিছু বাম আঁতেলকে দেখছি আমার বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করতে। বাংলাদেশি জিহাদিদের মতো তাঁরা বলছেন, আমি নাকি সাহিত্য রচনা করতে জানি না, আমার বইগুলো নাকি থার্ড ক্লাস। যে করেই হোক, আমার কিছু একটা দোষ তাঁদের খুঁজে বের করতেই হবে”।

আরো বলেন তিনি, “ধরে নিলাম, তাঁদের কথাই সত্য—আমি ভালো সাহিত্যিক নই, আমার সব বইই থার্ড ক্লাস। তাই বলে কি আমার মাথার মূল্য ঘোষণা করা যুক্তিযুক্ত? আমাকে দেশ থেকে বিতাড়িত করা, এমনকি গোটা বাংলা থেকে নির্বাসিত করা বৈধ?

একজন লেখকের সাহিত্যমানের বিচার করবেন পাঠক ও সময়। কিন্তু লেখাটি উৎকৃষ্ট হোক বা নিকৃষ্ট—তার জন্য লেখককে হত্যার হুমকি দেওয়া বা নির্বাসনে পাঠানো কোনও সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

মুক্তচিন্তা, উদারতা ও সহিষ্ণুতা—এসবকে এই বাম আঁতেলরা নিজেদের ধারেকাছেও ঘেঁষতে দেন না। আসলে আমার একটিই দোষ—তাঁরা ইসলামকে শান্তির ধর্ম বলে বিশ্বাস করেন, আমি করি না। ইসলামের সমালোচনা করার অধিকারকে তাঁরা বাক্‌স্বাধীনতা বলে মানতে পারেন না। তাঁদের যাবতীয় উদারতা ইসলামের দরজায় এসে শেষ হয়ে যায়।”

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *