প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান বিএনপি সরকার দেশে একটি ‘রংধনু সমাজ’ বা ‘রেইনবো নেশন’ গড়ার কথা বলছে।

তা সেই প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে তার নেতৃত্বাধীন প্রভাবশালী মন্ত্রীরাও বলে থাকেন বিভিন্ন সভা-সমাবেশে। বিশেষ করে যখন ধর্মীয় সংখ্যালঘু বা জাতিগত সংখ্যালঘুদের সমাবেশে গিয়ে বক্তব্য দেন।

তো সেই ‘রংধনু সমাজ’ বা ‘রেইনবো নেশন’ বলতে তারা কি বুঝিয়েছেন? যতটুকু বুঝি তারা এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যহীন সমাজের কথা বলেছেন, যেখানে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, শ্রেণি বা পাহাড়ি-সমতল নির্বিশেষে দেশের সব মানুষ মিলে শান্তিতে বসবাস করবে।

এর মধ্যে যেসব বৈশিষ্ট্য রয়েছে তা হলো:

১) সব মানুষের অন্তর্ভুক্তি: যাতে বোঝানো হয়েছে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান তথা সব সম্প্রদায়ের এবং পাহাড়ি ও সমতলের সব জাতিগোষ্ঠীর সমান অধিকার ও অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা।

২) প্রতিহিংসার রাজনীতি বর্জন: এতে বলা হয়েছে প্রতিশোধ বা প্রতিহিংসার রাজনীতির পরিবর্তে পারস্পরিক সমঝোতা, সংলাপ ও ঐকমত্যের মাধ্যমে একটি আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা।

এবং সামাজিক ঐক্য বজায় রাখা : যেমন রংধনুর বিভিন্ন রঙ একসঙ্গে মিশে সুন্দর রূপ সৃষ্টি করে, তেমনি দেশের সব মত ও পথের মানুষকে এক কাতারে এনে একটি সম্প্রীতিমূলক সমাজ গঠন করা।

খুবই ভালো কথা।বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেই অবৈধ ইউনুস সরকারের আমল থেকে নিষিদ্ধ আওয়ামীলীগ।

আর এই দলটির অনুপস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই বিএনপি’র ওই ‘রেইনবো নেশন’-এ বিশ্বাস করে এদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও জাতিগত সংখ্যালঘুরা কিন্তু বিএনপিকে ভোট দিয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে।

অন্তত জামাত-হেফাজত-এনসিপিসহ ইসলামী দলগুলোর সমন্বয়ে একটি জঙ্গী জোট যাতে ক্ষমতায় আসতে না পারে সেজন্য।

কারণ এই সংখ্যালঘুরা জানে একাত্তরের ঘাতক-দালাল-নারী ধর্ষণকারি দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে চরম সাম্প্রদায়িক জঙ্গী জোট ক্ষমতায় আসলে তাদের (সংখ্যালঘু) পরিণতি হবে ভয়াবহ।

এমনিতেই দ্বিতীয় শ্রেণী তারও নীচে সংখ্যালঘুদের অবস্থান এই দেশে। তার ওপর যদি জামায়াত জঙ্গী জোট ক্ষমতায় আসতো তাহলে যে কি ভয়াবহ পরিণতি হতো তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।

ফলে তারা বিএনপির ওপর আস্থা রাখতে চেয়েছে।কিন্তু তাতে কি স্বস্তিতে আছে সংখ্যালঘুরা? মূলত ওই রেইনবো নেশনের গালভরা বুলি দিয়ে ভোট আদায় করা একটি কৌশল ছিল বিএনপির- এমনটাই মনে করছেন অনেকে।বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে বিএনপি তাদের রেইনবো নেশনের যে থিওরি দিয়েছে জাতির কাছে তার প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে কি বিএনপি আগামী ২৩ তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে একজন যোগ্য সংখ্যালঘু নাগরিককে রাষ্ট্রপতি করবেন?

সেই সাহস কি বিএনপি’র আছে? সাহস বলছি এ কারণে রাষ্ট্রপতি হচ্ছে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ। সেই পদটিতে কি একজন ধর্মীয় বা জাতিগত সংখ্যালঘু নাগরিককে নির্বাচিত করা এতটাই দুঃসাহসের বিষয় বিএনপি’র জন্য?

বিএনপির কিন্তু সংসদে প্রচুর সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। এমনকি সংবিধান সংশোধন করার ক্ষমতাও তাদের এককভাবে রয়েছে।

রাষ্ট্রপতির পদটি সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ ঠিকই, কিন্তু বাংলাদেশের সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায়তো প্রধানমন্ত্রীর মতের বাইরে গিয়ে রাষ্ট্রপতির তেমন কিছুই করার নেই।

এটি অনেকটা আলংকারিক পদ, যদিও সেই পদটিকে আমরা ‘মহামান্য রাষ্ট্রপতি’বলে সম্মান দেখাই কাগজে কলমে। আসলে বাস্তবেতো তার লেশমাত্র নেই।অনেকটা এমন যে, রাখতে হয় তাই রাখা আরকি!

স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে আওয়ামীলীগের সময়ে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিন গত ২৪ জুলাই পদত্যাগ করার পর থেকে জল্পনা কল্পনা চলছে কে হবেন ২৩ তম রাষ্ট্রপতি।আসলে যে তাকে ওই পদ থেকে সরে যেতে বলেছে বিএনপি সরকার সেটিতো আর নতুন করে বলে দেয়ার অপেক্ষা রাখেনা।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিদের পরিণতি নিয়ে পরবর্তীতে লেখার ইচ্ছে আছে, সময়-সুযোগ করে।

রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পীকার অবসরপ্রাপ্ত মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম) রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন।

২৬ জুলাই আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান চট্টগ্রামে আইনজীবীদের এক সমাবেশে গিয়েছিলেন। সেখানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানিয়েছেন, “সংবিধানের ১২৩ এর (২) অনুচ্ছেদ অনুসারে ৯০ দিনের মধ্যে হওয়ার কথা, যেদিন পদত্যাগ করেছেন ওইদিন হতে।”

বিএনপি সরকার মানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতিমধ্যেই ঠিক করে রেখেছেন যে কাকে তিনি রাষ্ট্রপতি বানাবেন। আসলে এটি তো সংসদ নেতার ওপরই নির্ভর করছে সবকিছু, কারণ নিয়মানুযায়ী তার কথার বাইরে গিয়ে তার দলের কারোই অন্য কাউকে ভোট দেয়ার ক্ষমতা নেই।

তা শুধু তারেক জিয়ার ক্ষেত্রে নয়, যখনই যিনি প্রধানমন্ত্রী বা সংসদীয় নেতা ছিলেন বাংলাদেশের সংসদীয় পদ্ধতির সরকারের সময় তখন তাই হয়েছে।

যে প্রসঙ্গে কথা বলছিলাম-মানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদে একজন ধর্মীয় বা জাতিগত সংখ্যালঘু নাগরিককে মনোনয়ন ও তাকে রাষ্ট্রের প্রধানতম সাংবিধানিক পদটিতে বসানো নিয়ে।

বিএনপি যে বলে-মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান তথা সব সম্প্রদায়ের এবং পাহাড়ি ও সমতলের সব জাতিগোষ্ঠীর সমান অধিকার ও অংশীদারত্ব নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে তারা একটি ‘রেইনবো নেশন’ গড়ে তুলবে।

তাহলে বিএনপির কাছে এখন কিন্তু সেই বড় সুযোগ এসেছে।সেই সাথে কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়ারও বিষয় এটি।

কারণ যে দেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম সেদেশে এমন একটি সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য বুকের বড় পাটা লাগে। আসলে বিএনপির সেই বুকের পাটা আছে কিনা সেটিও দেখার বিষয়। বুকের পাটার চেয়ে বড় বিষয় হলো সদিচ্ছা। আসলে দেখতে হবে বিএনপি’র সদিচ্ছা আছে না নেই?

কারণ বিএনপি নিজেকে ‘রংধনু জাতি’ গঠনের প্রবক্তা হিসেবে যদি দাবি করে থাকে তাহলে এক্ষেত্রে তাদেরকে সেই সদিচ্ছার প্রমাণ দেখাতে হবে।

এজন্য অবশ্য হিম্মত বলে একটি শব্দ আছে, সেই হিম্মতটি আদৌ রয়েছে এমনটি দেখাতে হবে বিএনপি ও তারেক রহমানকে। কিন্তু সেই হিম্মতের বড় অভাব রয়েছে তাদের তা এই অল্প কয়েকদিনেই বোঝা গেছে।

আমরা দেখলাম পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে মন্ত্রিত্ব পাওয়ার সাড়ে তিন মাস বা প্রায় ১০৩ দিনের মাথায় পদত্যাগ করেছেন।

২০২৬ সালের ১ জুন তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। আসলে সবই ছিল তার বিরুদ্ধে একটি ষড়যন্ত্রের অংশ।

কারণ তিনি পাহাড়ি আদিবাসীদের সমস্যাসমুহ সমাধানে আন্তরিক ছিলেন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের অনেকটাই পক্ষে ছিলেন।অথচ তার পিতাও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ট ছিলেন।কিন্তু এসবের কোন কিছুই কাজে লাগেনি।

তো এই যখন অবস্থা সামান্য একজন মন্ত্রীর ক্ষেত্রে সেখানে রাষ্ট্রপতির মতো অত্যন্ত গুরুত্ববহনকারি একটি সাংবিধানিক পদে বিএনপি বা তারেক রহমান কতটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন সেটি বোঝা যায়।

তবে এটি যদি বিএনপি মানে তারেক রহমান সাহস করে করতে পারেন তাহলে তা হবে বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অনন্যসাধারণ দৃষ্টান্ত।

কারণ যে আওয়ামীলীগ নিজেদেরকে সবসময় ধর্মনিরপেক্ষ-সংখ্যালঘু বান্ধব রাজনৈতিক দল হিসেবে দাবি করেছে তারাও কিন্তু রাষ্ট্রপতির মত সবচেয়ে সম্মানিত সাংবিধানিক পদে সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর কাউকে বসানোর মনমানসিকতা দেখাতে পারেনি।

যদিও আওয়ামীলীগের মধ্যে বা তাদের মতের মিল হয় এমন যোগ্য ব্যক্তি কিন্তু ছিল বা রয়েছে এখনো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে।এক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বা এস কে সিনহাকে নিয়ে আওয়ামীলীগ আমলেই যতসব কাণ্ড ঘটানো হলো তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।

শুধু তাই নয়, প্রবীণ রাজনীতিবিদ, ঝানু পার্লামেন্টেরিয়ান ও সাবেক রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে নিয়ে আওয়ামীলীগ যে নোংরা খেলাটি খেললো তাতো নিশ্চয় দেশবাসী ভুলে যায়নি।

অথচ তার মত একজন রাজনীতিবিদকে আওয়ামীলীগ রাষ্ট্রপতি পদে সম্মানিত করার চিন্তাও করেনি।রাষ্ট্রপতি পদেতো দূরের কথা মন্ত্রীত্বই কেড়ে নেয়া হলো তার কাছ থেকে নানা ষড়যন্ত্র করে।

অথচ বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের কাছে নানা কারণে আওয়ামীলীগ একটি ভরসার রাজনৈতিক দল ছিল বা এখনো হয়তো আছে। কারণ সেই আমলে অন্তত সংখ্যালঘুরা তাদের নিজস্ব যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পেয়েছে। পদোন্নতিও হয়েছে মোটামুটিভাবে অনেকের।

কিন্তু সেই আওয়ামীলীগ দলটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে একজন যোগ্য সংখ্যালঘু নাগরিককে বাছাই করতে পারেনি।অথচ যে ভারতকে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে অজ্ঞতাবশত চিহ্নিত করে থাকে সেই ভারতেই মুসলিম রাষ্ট্রপতি ছিলেন তিনজন।

ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের সুবাদে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে উচ্চতম পদে যারা আসীন হয়েছেন তারা হলেন-

ড. জাকির হুসেইন, যিনি প্রথম মুসলিম রাষ্ট্রপতি।তিনি ১৯৬৭ সালের ১৩ মে থেকে ১৯৬৯ সালের ৩ মে মৃত্যুর আগ অবধি এই পদে ছিলেন।

দ্বিতীয় মুসলিম রাষ্ট্রপতি ড. ফখরুদ্দিন আলি আহমেদ ১৯৭৪ সালের ২৪ আগষ্ট থেকে ১৯৭৭ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুর আগে পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে ছিলেন।

অপরদিকে প্রথম শিখ রাষ্ট্রপতি জ্ঞানী জাইল সিং ১৯৮২ সালের ২৫ জুলাই থেকে ১৯৮৭ সালের ২৫ জুলাই পাঁচ বছর রাষ্ট্রপতি ছিলেন।

বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী, অত্যন্ত সজ্জন ও জ্ঞানী রাষ্ট্রপতি ড. এ.পি.জে. আব্দুল কালাম ছিলেন তৃতীয় মুসলিম রাষ্ট্রপতি। যার মেয়াদ ছিল ২৫ জুলাই ২০০২ থেকে ২৫ জুলাই ২০০৭।

কে. আর. নারায়াণন দলিত বা প্রান্তিক সম্প্রদায় থেকে এবং বর্তমান রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু আদিবাসী সম্প্রদায় থেকে নির্বাচিত হয়েছেন।

কে. আর. নারায়াণন ১৯৯৭ সালের ২৫ জুলাই থেকে ২০০২ সালের ২৫ জুলাই অবধি রাষ্ট্রপতি ছিলেন। আর এখনকার রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু ২০২২ সালের ২৫ জুলাই থেকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন সম্মানের সাথে।

এই যখন ভারতের অবস্থা তখন বাংলাদেশে গত ৫৫ বছরের ইতিহাসে তা ভাবতেও পারেনি এখানকার নাগরিকগণ।

রাজনৈতিক দলগুলো ও রাজনীতিবিদগণও কখনো হয়তো ভাবেননি এ ব্যাপারে। এখনকার ‘রংধনু সমাজ’ গঠনের স্বপ্ন দেখানো রাজনৈতিক দল বিএনপি ও তার নেতা তারেক রহমান কি তাদের দলের পুরনো ভুল ইতিহাস ভুলে নতুন করে ভাবতে পারবেন?

এই বিষয়ে লেখাটি মূলত একটি টেষ্টকেইস মাত্র।কারণ বাংলাদেশের মত আমাদের এই দেশে এমন ভাবনা ভাবার মানুষও নেই।

কারণ এটিকে সবাই একটি অলীক কল্পনা হিসেবেই চিহ্নিত করবে। তারপরও একটি ভাবনা, একটি চিন্তার উন্মোচন শুরু হলে মন্দ কি !

# নুরুল ইসলাম আনসারি: লেখক, প্রাবন্ধিক।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *