ঢাকা: দীর্ঘ নির্বাসনের পর ভারতের কলকাতায় যাবার অনুমতি পেয়েছেন তসলিমা নাসরিন। সেখানে ফিরে পানিহাটিতে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানান তসলিমা নাসরিন।

ঐতিহাসিক এই স্থান সম্পর্কে আরও বেশি মানুষকে জানার আহ্বান জানান লেখক।

বেগম রোকেয়ার জীবন, সংগ্রাম এবং নারীশিক্ষার প্রসারে তাঁর অসামান্য অবদানের কথা স্মরণ করেন তিনি।

সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তসলিমা বলেন, “অনেকেই জানেন না যে, মৌলবাদীদের বাধার কারণে বেগম রোকেয়াকে এখানে সমাধিস্থ করা হয়েছিল। তাই এই ঐতিহাসিক স্থান সম্পর্কে আরও বেশি মানুষের জানা উচিত।”

তসলিমা সেই বিষয়টি নিয়ে আবারো একবার লিখলেন বেশ কিছু কথা। এবং নিজের মনের অনুভূতি।

ফেসবুকে তিনি লেখেন:

“কলকাতায় আমার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটি ছিল সোদপুরের পানিহাটিতে বেগম রোকেয়ার সমাধিস্থলে যাওয়া। পানিহাটি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে তাঁর স্মৃতিফলকে ফুল দিয়েছি, তাঁর মূর্তিতে মালা পরিয়েছি। মনে হচ্ছিল, প্রায় এক শতাব্দীর ব্যবধান পেরিয়ে দুই সময়ের দুই নারীর লড়াই এক অদ্ভুত জায়গায় এসে মিলেছে।

বেগম রোকেয়া নারীকে অন্ধকার থেকে আলোয় আনতে চেয়েছিলেন। মেয়েদের শিক্ষা, স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদার কথা বলেছিলেন। এই অপরাধে কলকাতার ধর্মীয় রক্ষণশীল সমাজ তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল।

১৯৩২ সালে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে কলকাতার কোনও কবরখানায় সমাহিত করতে দেওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত এক সহৃদয় ব্যক্তির উদ্যোগে শহর থেকে দূরে পানিহাটির একটি জমিতে রাতের অন্ধকারে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

চুরানব্বই বছর কেটে গেছে। পৃথিবী বদলেছে, বিজ্ঞান এগিয়েছে, নারীরা আকাশে উড়েছে, রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে। কিন্তু মৌলবাদীদের মানসিকতা এতটুকু বদলায়নি।

রোকেয়া নারীকে মানুষ হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন বলে তাঁর বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করা হয়েছিল।

আজও আমি নারীর সমানাধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং ধর্মের সমালোচনা করার স্বাধীনতার কথা বলি বলে মুসলিম মৌলবাদীরা আমার বিরুদ্ধে একই ভাষায় বিষোদ্গার করে”।

খেদ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “রোকেয়াকে মৃত্যুর পরও কলকাতায় জায়গা দিতে চায়নি তারা। আমাকে জীবিত অবস্থাতেই কোথাও জায়গা দিতে চায় না—জন্মের দেশে নয়, নির্বাচিত শহরে নয়, কোথাও নয়।

নারীরা প্রশ্ন করলে, ধর্মের অসংগতি আর ধর্মীয় বিধানের অন্যায় প্রকাশ করলে, নিজের বাকস্বাধীনতা আর মত প্রকাশের অধিকারের দাবি জানালে মৌলবাদীরা তাদের জন্য পৃথিবীর মাটিটুকুও সংকীর্ণ করে দিতে চায়”।

পাঠকরা হয়তো জানেন তসলিমা নাসরিন মরণোত্তর দেহদান করে রেখেছেন কলকাতায়।

এই বিষয়ে তিনি বলেন, “ভালোই করেছি, আমার মরণোত্তর দেহ চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণার জন্য দান করেছি। মৃত্যুর পর আমার দেহ কোথায় রাখা হবে, কোন কবরখানায় আমাকে জায়গা দেওয়া হবে—তা নিয়ে মৌলবাদীদের সিদ্ধান্ত দেওয়ার সুযোগ থাকবে না।

তা না হলে রোকেয়ার সঙ্গে যা করা হয়েছিল, আমার সঙ্গেও হয়তো তা-ই করার চেষ্টা হতো। আমার দেহ অন্তত চিকিৎসাবিজ্ঞানের কাজে লাগবে; মৌলবাদীদের অনুমতির অপেক্ষায় পড়ে থাকবে না।

রোকেয়ার স্মৃতির সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছে, তিনি শুধু অতীতের একজন মহীয়সী নারী নন; তিনি আমাদের বর্তমানও। তাঁর লড়াই শেষ হয়নি। আমরা যাঁরা আজও নারীর স্বাধীনতা, যুক্তিবোধ এবং ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলি, আমরা তাঁর অসমাপ্ত লড়াইয়েরই উত্তরসূরি”।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *