বাংলাদেশে ইসলামী খেলাফত চালু হতে খুব বেশি সময় কি লাগবে মনে হয় আপনাদের? হঠাৎ করে এ প্রসঙ্গ কেন তুললাম সে প্রশ্ন করতে পারেন অনেকে।
সামগ্রিকভাবে যেদিকে যাচ্ছে দেশের পরিস্থিতি তাতেতো মনে হয় এই খেলাফত চালু হতে খুব বেশি দেরি লাগবেনা। কারণ এর বীজ রোপিত হয়ে গেছে অনেক আগেই। তা থেকে অঙ্কুরোদগম, চারাগাছ বড় হচ্ছে।
এখন সেই চারাগাছের পরিচর্যা করা হচ্ছে বেশ সুকৌশলে। আর এ জন্য খোদ সশস্ত্র বাহিনী থেকেই সব ধরনের সাহায্য সহযোগিতেই শুধু করা হচ্ছেনা বরং চরমভাবে উৎসাহিত ও প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে।
‘ধর্মনিরপেক্ষ আওয়ামীগের আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান বেশ বড় ধরনের ভূমিকা রাখছেন এক্ষেত্রে। অবশ্য তিনি আবার আওয়ামীলীগ সভানেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কেমন আত্মীয়!

এটি বলতে পারি এই ওয়াকার সাবেক সেনাপ্রধান বীর মুক্তিযোদ্ধা জেনারেল মোস্তাফিজুর রহমানের মেয়ের জামাতা।
জেনারেল মোস্তাফিজ তাঁর মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন ওয়াকারের কাছে। মোস্তাফিজ সাহেব আওয়ামীলীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার আত্মীয়। তো সেই আত্মীয়ের মেয়ের জামাই ওয়াকারকে সভানেত্রী সেনাপ্রধান করেছিলেন নিজের লোক হিসেবে।
অথচ যতদূর জানি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও আওয়ামীলীগের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা ওয়াকারকে সেনাপ্রধান না করার জন্য অনুরোধ করেছিলেন।
তার কারণ ছিল ওয়াকারের জামায়াতে ইসলামীর সংযোগ। দেশের ভেতরের গোয়েন্দা সংস্থাই শুধু নয়, দেশের বাইরে থেকেও কয়েকটি সংস্থা তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জামায়াত ও অন্য ইসলামী দলের সঙ্গে ওয়াকারের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি জানিয়ে এ ব্যাপারে সতর্ক করেছিলেন যতটুকু জানি।
কিন্তু সেসব আপত্তি তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে জনাব ওয়াকারকেই সেনাপ্রধান বানালেন তখনকার প্রধানমন্ত্রী।
তো তার রেজাল্ট বের হলো ২০২৪ এর ৫ আগষ্ট। ‘আমেরিকান ডিপষ্টেট’ আর সুদখোর নোবেল লরিয়েট ড. ইউনুসের ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ এর তোড়ে একটি ‘ইসলামী জঙ্গী সেনা ক্যু’ এর মাধ্যমে শেখ হাসিনার সেই চরম বিশ্বস্ত (!!) মুক্তিযোদ্ধার জামাতা ওয়াকার প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতাচ্যুতই শুধু করেরনি।
বরং তাঁকে দেশত্যাগ করতে বাধ্য করেছেন। এই ছিল আমাদের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আত্মীয় ওয়াকার উজ-জামানের বিশ্বাস ও নির্ভরতা!
কিন্তু এই যে রাজনৈতিক-সামরিক কূটনৈতিক-রাষ্ট্র পরিচালনার চরম ভুল সেটি কি আমাদের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বুঝতে পেরেছেন? এমন অনেক ভুল তো তিনি করেছেন দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে। নিজের দল আওয়ামীলীগ গঠনের ক্ষেত্রে। তা না হলে দুই বছর পার হয়ে গেলো শেখ হাসিনা সরকার ও আওয়ামীলীগকে নিষিদ্ধ করার সময়। এখনোতো আওয়ামীলীগ দাঁড়াতে পারছেনা।
সে প্রসঙ্গ না হয় আরেকদিন আলোচনা করা যাবে। এখন মূল প্রসঙ্গে আসা যাক।
আমাদের দেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সম্প্রতি ঢাকা সেনানিবাসে আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইনষ্টিটিউটের উদ্বোধন করেছেন। শুধু ঢাকায় নয় একই সাথে তিনি দেশের অন্য সেনানিবাসগুলোতেও একই ধাঁচের ইনষ্টিটিউটের উদ্বোধন করেছেন, যেগুলো তৈরী হওয়ার পথে।
এসব ইনষ্টিটিউটে নাকি সহি ইসলামের গবেষণা বা রিসার্চ হবে। কারণ তার মতে দেশে সত্যিকারভাবে ইসলাম নিয়ে কোন গবেষণা হচ্ছেনা।
এই ইনষ্টিটিউট উদ্বোধন করতে গিয়ে আমাদের এই গুপ্ত ইসলামী জঙ্গী সেনাপ্রধান ওয়াকার বলেছেন, ‘যথাযথ শিক্ষা না পেয়ে, বিদআতে ছেয়ে গেছে দেশ।’

এ ধরনের বক্তব্য আমরা অনেক শুনেছি অন্য কথিত ইসলামী নেতাদের কাছ থেকে, এখনো শুনছি প্রতিনিয়ত ওয়াজ-নসিহতের মাধ্যমে। কোন ইসলাম ব্যবসায়ী নেতা বললে এটি নিয়ে ভাবার বা উদ্বেগের বিষয় ছিলনা। কিন্তু যিনি বলেছেন তিনি সেনাবাহিনীর প্রধান।
প্রকারান্তরালে তিনি বৃহত্তম সেনাবহিনীর প্রধান হিসেবে বিমান ও নৌবাহিনীর ওপরও যথেষ্ট প্রভাব রাখেন।
আর বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীতে যে ইসলামী জঙ্গীতে ছেয়ে গেছে তাতো আর নতুন করে কিছু বলার নেই। এরই মধ্যে দেশের ও বিদেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে খবরসহ নানা বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়েছে।
তো সশস্ত্র বাহিনীর পালের গোঁদা হচ্ছেন সেনাপ্রধান। আর তিনি নিজেই সেই ইসলামী জঙ্গীবাদের বীজ বপন-চারা উৎপাদন-গাছের চারার যথেষ্ট পরিমাণ যত্ন নেওয়া থেকে তা যাতে বৃক্ষে পরিণত হতে পারে তার জন্য যারপরনাই চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
কোন ইসলামী বক্তা বললে এ নিয়ে তেমন গুরুত্ব হয়তো না দিলেও চলতো। কিন্তু কথাটি বলেছেন সেনাপ্রধান। তার এই যে ‘বিদআত’ শব্দটি উচ্চারণ তা কিন্তু অনেক সুদূরপ্রসারি একটি কুফল বয়ে আনছে আমাদের জাতির জন্য, দেশের জন্য।
তিনি বলতে চেয়েছেন, আমাদের সমাজে কোরআন-সুন্নাহর বাইরের খারাপ জিনিসে ছেয়ে গেছে। সুতরাং তা থেকে বের হতে হবে।

তিনি কি দেশকে ইরান-আফগানসহ অন্য ইসলামী দেশের ন্যায় ইসলামী কায়দায় চালাতে চাইছেন? তার মানে শরীয়া ভিত্তিক স্টাইলে চলবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ?
ইসলামী শাষণ ব্যবস্থা চাপিয়ে দিতে চাইছেন এই দেশে অত্যন্ত কৌশলে সেটি ঠিকই বোঝা যাচ্ছে। ২০২৪ এ যে কথিত ছাত্রগণআন্দোলনের নামে ক্যু করা হলো তখনই আসলে এই সেনাপ্রধান , জামায়াত ও জামাতের বি টিম ইঁচড়ে পাকা টোকাই জঙ্গী টিম, হিযবুত তাহরীর, হেফাজতে ইসলাম চেয়েছিল বাংলাদেশের নাম বদলে ইসলামিক রিপাবলিক বাংলাদেশ করে ফেলতে।
কিন্তু সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রভাবে তা করতে পারেনি বলে তাদের দুঃখের শেষ নেই।
তো তাই বলে কিন্তু এই ইসলামী সামরিক-বেসামরিক আমলা-রাজনৈতিক দলগুলো বসে নেই। তারা তাদের কাজ ঠিকই করে যাচ্ছে। ত্রয়োদশ জাতী সংসদের আসন বিন্যাস দেখলেইতো বোঝা যায় কি হতে যাচ্ছিল।
ভাগ্যিস শেষকালে এসে আওয়ামী সমর্থক নেতাকর্মী, হিন্দুসহ ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা অনিশ্চিয়তা সত্ত্বেও বিএনপিকে ভোট দিয়ে বাঁচিয়েছে দেশটিকে। নাকাওয়াস্তে হলেও সংবিধানটি রক্ষা পেলো। আর সেই জোরেই বিএনপি এখনো টিকে আছে অনেকটা ঝুলন্ত দড়ির ওপরে।
একটি বিষয়তো আমাদের মনে রাখা দরকার যে, সেনাবাহিনী বা সশস্ত্র বাহিনীর দায়িত্ব নয় উর্দি পরে বিশেষ ধর্মের নীতিজ্ঞান প্রচার করা।
একজন সেনা সদস্য কিংবা স্বয়ং সেনাপ্রধান একটি বিশেষ ধর্মের অনুরাগী, পালনকারী হতেই পারেন, সেটা তার ধর্মবিশ্বাস। কিন্তু কর্তব্য নয়।
তার কর্তব্য চাকরিরত অবস্থায় সেনা আইন মান্য করে দেশের সংবিধান কর্তৃক প্রদত্ত দায়িত্ব, তথা দেশ রক্ষা করা। সে কাজের জন্য তাদেরকে দেশের সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে রাষ্ট্র। রাষ্ট্রকে সেই অর্থের যোগান দেয় রাষ্ট্রের মালিক জনগণ এবং তাদের করের টাকা।
কিন্তু তিনি সংবিধানকে না মেনে ইসলামী হুকুমত কায়েমে নামলেন। এই যে ইসলামিক ইনষ্টিটিউট করছেন তিনি তা কাদের টাকায় হচ্ছে?
এটি নিশ্চয় তার মানে সেনাপ্রধানের পৈত্রিক সম্পত্তি থেকে ব্যয় করা হচ্ছেনা। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় ইসলামী জঙ্গীবাদ প্রচারের জন্য করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, তা করা হচ্ছে খোদ সেনাবাহিনীকে এই জঙ্গীবাদে দীক্ষিত করতে !! বাংলাদেশের আরো ৭ টি সেনানিবাসে একই ধরনের ইনষ্টিটিউট করা হচ্ছে।
এ ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে ওয়াহিদুজ্জামান নামে এক ভদ্রলোক ব্যঙ্গাত্মকভাবে বললেন-‘ ক্যাডেট কলেজগুলিকে এরকম দ্বীনি প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন করে ফেলুন তাহলেই হয়ে যায়।
নতুন করে করার দরকার কি? নাকি ব্যবসা সম্প্রসারণ। সাধারণ সোলজারদের ছেলে মেয়েরা ঐ মাদ্রাসায় পড়বে।’
এস এম নুরউন্নবী লিখেছেন-‘আগে আন্তর্জাতিক সামরিক শিক্ষা ইনিষ্টিটিউট করেন। আপনারা বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করে মেডিক্যাল, ইঞ্জিনিয়ারিং, সাধারণ বিষয়ে শিক্ষা দিচ্ছেন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করে ব্যবসা করছেন।
এখন আবার ধর্ম শিক্ষা দেয়া শুরু করেছেন। আপনাদের মূল ফোকাস হওয়া উচিৎ সামরিক শিক্ষা, সামরিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, সামরিক শিক্ষায় পারদর্শী হওয়া ; ব্যবসা করা নয়, শিক্ষা দেয়া নয়।’
এমন আরো অনেকেই এমন মন্তব্য করেছেন। তাদের মধ্যে আজাদ চৌধুরী ইসলামী শিক্ষার পক্ষে গিয়েও বললেন- “ভ্রান্ত আকিদায় মতাদর্শে ইসলামি শিক্ষা সোজা কথা মওদূদি আকিদা, ওয়াহাবি, ইবনে তায়মিয়ার আকিদা মোতাজিলা, খারেজী আকিদায় হইলে জাতি মানবে না ।”
দেশের চলমান সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইনস্টিটিউট (AIII) উদ্বোধন এবং চার খলিফার নামে সেনাবাহিনীর কিছু ইউনিটের নামকরণের মতো কিছু সিদ্ধান্ত জনসাধারণের মধ্যে নানামুখী আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তবে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের বিগত দিনের বক্তব্য, ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িকতার প্রতি সেনাবাহিনীর অবস্থান এবং বর্তমান গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে একে পাকিস্তানের সাবেক সেনাপ্রধান পারভেজ মোশাররফের আমলের উগ্র ইসলামিকীকরণের সঙ্গে তুলনা করেছেন অনেকেই। এবং সেটি করাই স্বাভাবিক।

আমরা যদি বিশ্বের অন্য ইসলামী রাষ্ট্রগুলোর দিকে তাকাই, তাহলে সেখানে কি সাধারন জনগনের ব্যক্তিস্বাধীনতা, গনতান্ত্রিক আচর আচরন, মত প্রকাশের স্বাধীনতাসহ অন্য মৌলিক মানবাধিকারের বাস্তবায়ন দেখতে পাই?
যদি না হয় তাহলে আমরা কি করে এই ওয়াকারের নেতৃত্বে বাংলাদেশে ইসলামী দলগুলোর নীলনকশা অনুযায়ী একটি ইসলামী খেলাফতের বাংলাদেশকে মেনে নেই?
আমাদের সামনে পাকিস্তান, ইরান, আফগানিস্তান, সুদান, ইয়েমেন, আলজেরিয়াসহ অঅরো কিছু মুসলিম দেশের উদাহরণ আছে। কেমন অবস্থা সেখানকার? একটু চিন্তা নয়, গভীরভাবে চিন্তা করার প্রয়োজন।
একসময়ে আধুনিক তুরস্কের জন্মদাতা কামাল আতাতুর্কের নীতি আমরা কথায় কথায় উদাহরন দিতাম। সেই আতাতুর্কের সংস্কারগুলোর মূল দর্শন ছিল ধর্মকে মানুষের সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা এবং রাষ্ট্রের কোনো কর্মকাণ্ডে ধর্মের হস্তক্ষেপ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা। এভাবেই তিনি প্রবল অভ্যন্তরীণ বাধা ও মৌলবাদী প্রতিরোধকে কঠোর হাতে দমন করে একটি আধুনিক ও ধর্মনিরপেক্ষ তুর্কি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
কিন্তু এখনকার তুরষ্ককে এই এরদোগান সরকার কি বানিয়েছেন? একটি ইসলামী সন্ত্রাসী রাষ্ট্র ছাড়া আর তো কিছু নেই সেই তুরস্কে। তারা সামরিক অস্ত্র আর ইসলামী সন্ত্রাস রপ্তানী করা ছাড়া আর কি করছে ? বাংলাদেশে সেই পাকিস্তান-তুরস্ক ভুতের মতো চেপে বসেছে।
ঠিক এই জায়গায় আমাদের সেনাপ্রধানকে ওয়াকারকে যদি কল্পনা করি তাহলে তাকে কার মতো মনে হতে পারে?
আধুনিক তুরস্কের জনক মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক না পাকিস্তানের সেই ইসলামী জঙ্গী জিনারেল জিয়া-উল-হকের?
তো এই ওয়াকার কি বাংলাদেশকে তার জঙ্গী ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে ইসলামী রহুকুমত কায়েমে নামছেন খুব শীঘ্রই?
# নুরুল ইসলাম আনসারি: লেখক, প্রাবন্ধিক।
