ঢাকা: বাংলা সাহিত্যের একজন লেখক তসলিমা নাসরিন। নিজেকে বাঙালি লেখক হিসেবেই পরিচয় দেন।

ফেসবুকে তুলে ধরেছেন দেশভাগসহ অনেক কথাই। আমরা হুবহু তুলে ধরছি:

“আমি নিজেকে বাঙালি লেখক বলি, বাংলাদেশি লেখক বলি না। কারণ আমার লেখক-পরিচয়ের মূল আমার ভাষা, আমার জন্মরাষ্ট্র নয়।

বাংলা ভাষার ইতিহাস হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম ১৯৭১ সালে। রাষ্ট্রটির জন্মের বহু শতাব্দী আগে বাংলা ভাষা ছিল, বাংলা সাহিত্য ছিল, বাঙালি ছিল।

রাজ্য ভেঙেছে, সাম্রাজ্য ভেঙেছে, দেশ ভাগ হয়েছে, নতুন রাষ্ট্র তৈরি হয়েছে—কিন্তু বাংলা ভাষা তার নিজের ধারায় বয়ে চলেছে। রাষ্ট্রের সীমানা রাজনৈতিক; ভাষার সীমানা তার চেয়ে অনেক বড়।

আমার জন্ম বাংলাদেশে—এটি আমার জীবনের একটি সত্য, এবং আমি তা অস্বীকার করি না। কিন্তু জন্মস্থান আর সাহিত্যিক পরিচয় এক জিনিস নয়।

একজন লেখক কোথায় জন্মেছেন, সেটি তাঁর জীবনীসংক্রান্ত তথ্য; তিনি কোন ভাষায় ভাবেন, কোন ভাষায় লেখেন, কোন ভাষার সাহিত্য নির্মাণ করেন, সেটিই তাঁর লেখক-পরিচয়ের গভীরতম ভিত্তি। জন্মস্থান একটি তথ্য, লেখক-পরিচয় একটি সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল পরিচয়।

সাহিত্যকে আমরা ভাষা দিয়েই চিনি। বলি বাংলা সাহিত্য, ইংরেজি সাহিত্য, ফরাসি সাহিত্য, স্প্যানিশ সাহিত্য। বাংলা সাহিত্য কোনও রাষ্ট্রের জন্মের সঙ্গে জন্ম নেয়নি। চর্যাপদ, মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব পদাবলি থেকে বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ—এই সাহিত্যধারা বহু শতাব্দী ধরে প্রবাহিত। ১৯৪৭-এর দেশভাগ বা ১৯৭১ সালে একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম সেই ধারাকে দু’টুকরো করে দিতে পারে না। আমি সেই বাংলা সাহিত্যেরই একজন লেখক।

আমি বাংলায় ভাবি, বাংলায় লিখি। আমার আনন্দ, ক্রোধ, প্রেম, প্রতিবাদ, নির্বাসন, স্মৃতি—সবকিছুর ভাষা বাংলা। আমার বই বাংলাদেশে পড়া হয়, পশ্চিমবঙ্গে পড়া হয়, পৃথিবীর যেখানে বাঙালি আছেন সেখানেই পড়া হয়। আমার লেখা সীমান্ত পার হওয়ার সময় পাসপোর্ট দেখায় না।

রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণ—তাঁদের আমরা বাংলা সাহিত্যের লেখক হিসেবেই দেখি। তাঁদের জন্মস্থান, নাগরিকত্ব, এমনকি তাঁদের জীবদ্দশার রাজনৈতিক মানচিত্রও এক ছিল না। কিন্তু তাঁদের মিলিয়েছে বাংলা ভাষা। রাষ্ট্রের মানচিত্র বদলায়, ভাষার ইতিহাস থেকে যায়।

আমার নিজের জীবনেই দেশ, ঠিকানা, ভিসা, পাসপোর্ট—অনেক কিছু বদলেছে। নির্বাসনে আমাকে এক দেশ থেকে আরেক দেশে যেতে হয়েছে। কিন্তু একটি জিনিস বদলায়নি—আমার ভাষা।

দেশ থেকে মানুষকে তাড়ানো যায়, বাড়ি থেকে তাড়ানো যায়, একটি শহরের দরজা তার জন্য বন্ধ করা যায়; কিন্তু তার মাতৃভাষা যদি তার ভেতরে বেঁচে থাকে, তাকে সেই ভাষা থেকে নির্বাসিত করা যায় না।

রাজনৈতিক ভূগোল থেকে নির্বাসিত হয়েও মানুষ তার ভাষার ভূগোলে বাস করতে পারে। একজন লেখকের ক্ষেত্রে এই ভাষার ভূগোলই হয়তো তার সবচেয়ে স্থায়ী দেশ।
এই কারণেই ‘বাংলাদেশি লেখক’ পরিচয়টি আমার কাছে অসম্পূর্ণ মনে হয়। শব্দটি আমাকে একটি রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে আবদ্ধ করে। এমনও মনে হতে পারে, একজন ‘বাংলাদেশি লেখক’ যেন বাংলাদেশের প্রতিনিধি।

কিন্তু লেখক কোনও রাষ্ট্রের প্রতিনিধি নন, কোনও সরকারেরও নন, কোনও জাতীয় মতাদর্শের মুখপাত্রও নন। তিনি তাঁর জন্মরাষ্ট্রের সমালোচক হতে পারেন, সেই রাষ্ট্রের দ্বারা নির্যাতিত হতে পারেন, এমনকি সেই রাষ্ট্র থেকে নির্বাসিতও হতে পারেন। জন্মভূমি আর রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব এক জিনিস নয়।

বাংলাদেশে জন্মেছি বলে প্রয়োজন হলে আমাকে ‘বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া লেখক’ বলা যেতে পারে। সেটি একটি সত্য। কিন্তু আমার সাহিত্যিক পরিচয়কে যদি একটি শব্দে বলতে হয়, আমি বলব—বাঙালি লেখক।

‘বাঙালি’ পরিচয় আমাকে একটি রাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে না। বাংলা বাংলাদেশেরও, পশ্চিমবঙ্গেরও, ত্রিপুরারও, আসামের বাঙালিরও, পৃথিবীর সমস্ত বাংলাভাষী মানুষেরও। ঢাকা আর কলকাতার মাঝখানে রাজনৈতিক সীমান্ত আছে; বাংলা ভাষার মাঝখানে নেই। একই কবিতা, একই উপন্যাস, একই গান সীমান্তের দুই পাশের মানুষকে স্পর্শ করে।

বাঙালি পরিচয় কোনও একটি ধর্মের পরিচয়ও নয়। বাঙালি হিন্দু হতে পারে, মুসলমান হতে পারে, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, নাস্তিক—যে কেউ হতে পারে। বাঙালিত্বের প্রধান বন্ধন ভাষা ও সংস্কৃতি। তাই এই পরিচয় আমার কাছে রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের চেয়ে বিস্তৃত, ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে মুক্ত।

আমি কোনও দেশের সাহিত্যকে ছোট করে এই কথা বলি না। বরং বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যকে আলাদা আলাদা খোপে দেখার চেয়ে আমি বৃহত্তর বাংলা সাহিত্যকেই আমার সাহিত্যিক উত্তরাধিকার বলে মনে করি। সেই সাহিত্য কোনও রাষ্ট্রের একার নয়।

মানুষের পরিচয়েরও অনেক স্তর থাকে। জন্মপরিচয় এক জিনিস, নাগরিক পরিচয় আরেক, সাংস্কৃতিক পরিচয় আরেক, সাহিত্যিক পরিচয় আরেক। এই পরিচয়গুলোকে এক করে দেখার কোনও কারণ নেই।

বাংলাদেশ আমার জন্মস্থান। বাংলা আমার সাহিত্যিক জন্মভূমি।
আমি বাংলাদেশে জন্মেছি—এ আমার জন্মের ইতিহাস।
আমি বাংলায় লিখি—এ আমার লেখক হওয়ার ইতিহাস।

বাংলাদেশ আমাকে জন্ম দিয়েছে, কিন্তু বাংলা ভাষা আমাকে লেখক করেছে।

তাই আমি নিজেকে বাঙালি লেখক বলি কোনও দেশকে অস্বীকার করার জন্য নয়; আমার আরও বড়, আরও পুরোনো, আরও গভীর পরিচয়টিকে স্বীকার করার জন্য। আমি বাংলা ভাষার লেখক। আমি বাঙালি লেখক”।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *