রংপুর: রংপুরে সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী এবং তাঁর পরিবারের বাকি তিন সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে।
এই ঘটনার বর্ণনা করেছেন মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ। ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছিল সে ব্যাপারে গণমাধ্যম কর্মীদের ব্রিফ করার সময় কান্নায় গলা বুজে আসে তাঁর।
একজন পুলিশও বিবরণ দিতে পারছেন না, আপনারা চিন্তা করুন কতটা নৃশংস আর মর্মান্তিক ঘটনাটি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা সম্পর্কে জানান তিনি।
তবে যেভাবে তিনি ঘটনার বর্ণনা করেছেন, তাতে দেশবাসীর মনে সন্দেহ জেগেছে। এই ঘটনার পেছনে শুধু কী ইয়াবা? সাম্প্রদায়িক কিছু নয়? নাকি লুকানো হচ্ছে? হত্যাকারীদের সাজানো হয়েছে? এমন প্রশ্নও উঠেছে।
শোনা যাচ্ছে, রংপুরের শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর কাছ থেকে চাঁদাও দাবি করা হয়েছিলো।
রিটায়ার্ডের পর নিজ জায়গায় একটা বিল্ডিং করতে চেয়েছিলেন।সেখানেই বিপত্তি বাঁধে। স্থানীয় কিছু লোক চাঁদা দাবি করে।
শিক্ষক কখনোই এই অন্যায় মেনে নিতে পারেন না। সেই চাঁদা না দেওয়াই কাল হলো তাঁর জন্য।ফলে তার সম্পূর্ণ পরিবারকে নৃ’শংসভাবে খু’ন হতে হলো।
অনেকে বলছেন, চাঁদা এবং সাম্প্রদায়িক এই দুটোই জড়িয়ে আছে এই ঘটনায়। কিন্তু বলা হচ্ছে অন্য কিছু।
এক পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তারদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ পাওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে রবিবার (২৩ আগস্ট) দুপুরে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ।
তিনি জানান, শুধু হত্যাই নয়; চারজনকে হত্যার পরও ঘটনাস্থলে একদম নির্বিকার ছিল অভিযুক্তরা। একদম ঠাণ্ডা মাথায় ছিলো তারা।
জানলে শিউড়ে উঠবেন, চক্রবর্তী পরিবারের চারজনকে হত্যার পর ওই বাড়িতেই গোসল, খেজুর এবং শসা খাওয়া এবং ইয়াবা সেবনের মতো চাঞ্চল্যকর তথ্যও উঠে এসেছে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে।
রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের নির্মমতার বর্ণনায় তিনি জানান, হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার দুজন হলেন নগরীর মাছুয়াপাড়ার বাসিন্দা মুগ্ধ দাস ও তার মামাতো ভাইয়ের ছেলে সিদ্ধার্থ দাস।
সিদ্ধার্থ নগরীর পিকে জুয়েলার্সে কাজ করেন। মুগ্ধ কাজ করেন সিটি বাজারের একটি মাছের দোকানে।
মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ বলেন, ‘গণপতি স্যার ছিলেন একজন সম্মানিত লোক। ওনার পরিবারের সঙ্গে কারও কলহ বিবাদ ছিল না।’
অভিযুক্তদের দেওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে পুলিশ কমিশনার জানান, বৃহস্পতিবার রাতে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ এক মাদক কারবারির কাছ থেকে ইয়াবা কেনেন।
তারপর সীমান্ত নামের স্থানীয় এক ব্যক্তির বাড়ি গিয়ে তারা ইয়াবা সেবন করেন। রাতের শেষ দিকে তারা দেবু নামের এক ব্যক্তির নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ থেকে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যান।
সেখানে ইয়াবা সেবন করতে থাকেন। সেই সময় শব্দ পেয়ে গণপতি চক্রবর্তী খালি গায়ে ও গলায় গামছা নিয়ে ছাদে বেরিয়ে আসেন। অভিযুক্তরা গামছা পেঁচিয়েই তাকে হত্যা করেন।
আচমকা কিছু শব্দ শুনে গণপতি বাবুর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ছাদে আসার সময় সিঁড়িতে তাঁকেও গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়।
এত জঘন্য ঘটনা বর্ণনা করতেও বুক কাঁপে।
পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘উনার চিৎকার-চেঁচামেচিতে উনার মেয়ে প্রাপ্তি চক্রবর্তী, বয়স ২৫, সে যখন এগিয়ে আসে, প্রাপ্তি চক্রবর্তীকে তারা খুন করে গামছা পেঁচিয়ে। খুনিদের বক্তব্যে আমি যেটা শুনলাম, প্রাপ্তি চক্রবর্তী মারা যাচ্ছিল না, প্রায় চার-পাঁচ মিনিট লাগে তার প্রাণ যাওয়ার ক্ষেত্রে। সেই সময় তারা রশি দিয়ে তার গলায় এবং মুখে পেঁচিয়ে ধরে। একটা প্যাঁচ গলার উপর দিয়ে যায়, একটা প্যাঁচ মুখের উপর দিয়ে যায়। তারা এত জোরে এই রশিটা টান দেয়, তার মুখের চোয়াল ভেঙে যায় এবং চোখটা ঠিকরে বের হয়ে যায়।’
চারজনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী। ১২ বছরের নিষ্পাপ ছেলে। তাকেও হত্যা করা হয়।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘ছোট ছেলেটা যার কথা বললে আমি আবেগপ্রবণ হয়ে যাই। রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র প্রিয়ম। আমার ছেলের বয়সী।’
‘এই প্রিয়মকে তারা গলায় কাপড় পেঁচিয়ে হত্যা করে এবং একপর্যায়ে একটি বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করে। হত্যার পর সকাল হয়ে গেলে তারা প্রিয়মের বাথরুমে গোসল করে। প্রথমে সিদ্ধার্থ গোসল করে পরে মুগ্ধ গোসল করে।’
এবং জানা যায়, গোসল শেষ করে অভিযুক্তরা ওই বাড়ির ডাইনিং টেবিলে রাখা একটি বৈয়াম থেকে খেজুর ও শসা খান। এরপর সেখানে বসেই আরও একবার ইয়াবা সেবন করেন।
এই নৃশংস হত্যার প্রমাণ লোপাট করার চেষ্টা করে তারা। নিহতদের ব্যবহার করা দুটি স্মার্টফোন থেকে ফিঙ্গারপ্রিন্ট মুছে ফেলার জন্য ডিটারজেন্ট মিশ্রিত পানিতে ফোন দুটি চুবিয়ে রাখা হয়।
