সিলেট: বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য নৌকাবাইচ চায় না মৌলবাদী গোষ্ঠী। তাই এ নিয়ে এখন তোলপাড় শুরু করেছে।

সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার লাউতা ইউনিয়নের সুনাই নদীতে আয়োজিত নৌকাবাইচ বন্ধ করার দাবি জানায়।

এবং এই বিষয়ে সমাধান হয়েছে। সমাধান না বলা উচিৎ সমঝোতা।

সমঝোতার অন্যতম শর্ত হিসেবে আগামী বছর থেকে সুনাই নদীতে নৌকাবাইচ আয়োজন হবে না। আয়োজন না করার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন লাউতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দেলওয়ার হোসেন।

এর ফলে পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী আগামী ২৮ আগস্ট সুনাই নদীতে বাহাদুরপুর গাংপার যুব সমাজের উদ্যোগে নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে। আয়োজকদের পক্ষ থেকেও প্রতিযোগিতা যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।

শনিবার (২২ আগস্ট) এশার নামাজের পর বারইগ্রাম বাজারের পূবালী ব্যাংক পিএলসি’র নিচতলায় এই বিষয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে লাউতা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের যুবক, মুরব্বি, জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অংশ নেন।

এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান লেখক তসলিমা নাসরিন।

ফেসবুকে তিনি লিখেছেন:

“প্রশ্ন হলো দেশ চালাচ্ছে কে? নির্বাচিত সরকার, না ধর্মীয় মব?

নৌকাবাইচ বাংলাদেশের শত বছরের লোকজ সংস্কৃতি। বাউল গান বাংলার সংস্কৃতি। নাচ, গান, নাটক, কনসার্ট মানুষের আনন্দ ও সৃষ্টিশীলতার অংশ। মেয়েদের খেলাধুলা তাদের মৌলিক স্বাধীনতার অংশ। অথচ একের পর এক ক্ষেত্রে জিহাদিরা হুমকি দিচ্ছে, আর প্রশাসন সেই হুমকির সামনে মাথা নোয়াচ্ছে।

তারেক রহমানের সরকার যদি জিহাদিদের চাপে মানুষের সাংস্কৃতিক ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা রক্ষা করতে না পারে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে—সরকারের হাতে ক্ষমতা আছে, নাকি ক্ষমতা চলে গেছে উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীর হাতে?

আর এদের নৈতিকতার দাবিটাও দেখার মতো। মেয়েরা মাঠে খেললে আপত্তি, গান হলে আপত্তি, নাচ হলে আপত্তি, বাউল হলে আপত্তি। অথচ মাদ্রাসায় শিশুদের ওপর প্রায় প্রতিদিন যৌন নির্যাতন ঘটছে, এতে আপত্তি নেই।

সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন কেউ নিজের ধর্মীয় বিধান অন্য মানুষের জীবনের ওপর চাপিয়ে দিতে চায়। আপনি গান শুনবেন না—শুনবেন না। কিন্তু অন্যের গান বন্ধ করার অধিকার আপনার নেই। আপনি নাচবেন না—নাচবেন না। অন্যের নাচ বন্ধ করার অধিকার আপনার নেই।

আপনি আপনার মেয়েকে খেলতে দেবেন না—সেটিও অন্যায়; কিন্তু গোটা দেশের মেয়েদের খেলা বন্ধ করার অধিকার তো আরও নেই।

একটি সভ্য রাষ্ট্রের কাজ মবের ধর্মীয় অনুভূতি পাহারা দেওয়া নয়; নাগরিকের স্বাধীনতা পাহারা দেওয়া।

আজ নৌকাবাইচ বন্ধ হচ্ছে, কাল গান বন্ধ হবে, পরশু নাটক, তারপর মেয়েদের খেলাধুলা, তারপর মেয়েদের শিক্ষা ও চাকরি। ধর্মীয় উগ্রবাদকে একবার রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করার অধিকার দিলে তার দাবি কখনও একটি জায়গায় থামে না।

বাংলাদেশকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—দেশটি কি নাগরিকের হবে, নাকি মবের? সংস্কৃতির হবে, নাকি নিষেধাজ্ঞার? স্বাধীন মানুষের হবে, নাকি ধর্মীয় শাসনের”?

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *