বিএনপি সরকার ও তার পুলিশ বাহিনী কি আমাদেরকে আবারো সেই ‘জজমিয়া নাটক’ দেখাচ্ছে রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তাঁর পরিবারের ৪ সদস্যের হত্যার ঘটনাটিকে?

পাঠক নিশ্চয়ই সেই ২০০৪ সালের ২৪ আগষ্ট রাজধানী ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভেনিউতে আওয়ামীলীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার ঘটনা ভুলে যাননি।

যেই গ্রেনেড হামলায় তৎকালীন বিএনপি সরকার, তার বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা, ইসলামী জঙ্গী গোষ্ঠী জড়িত ছিল। যদিও গত চব্বিশের আগষ্টে শেখ হাসিনার সরকার উৎখাতের পর এসব আসামীকে খালাস দেয়া হয়। যে মামলার মাষ্টারমাইন্ড হিসেবে অভিযুক্ত এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী!

তখন তারা সেই গ্রেনেড হামলার ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য নোয়াখালী জেলার সেনবাগ উপজেলার বীরকোট গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে এক নিরীহ জজ মিয়াকে ধরে এনে সে এই গ্রেনেড হামলায় জড়িত ছিল এ রকম একটি নাটক সাজিয়েছিল।

২০০৫ সালের ২৬ জুন আদালতে জজ মিয়ার একটি মিথ্যা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি (১৬৪ ধারায়) রেকর্ড করানো হয়। সিআইডির লিখে দেওয়া স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী জবানবন্দিতে তিনি বলতে বাধ্য হন যে, শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের নেতৃত্বাধীন ‘সেভেন স্টার গ্রুপ’-এর নির্দেশে মাত্র ৫,০০০ টাকার বিনিময়ে তিনি এই গ্রেনেড হামলায় অংশ নিয়েছিলেন।

তো জজমিয়ার মত রংপুর হত্যাকাণ্ডেও মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থকে দিয়ে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেওয়ানো হলো। তো বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ কি এতই বোকা যে সাজানো নাটকের জবানবন্দীতে তারা বিশ্বাস করবে?

২০০৫ সালে বিএনপি’র শিখিয়ে দেয়া জজমিয়ার জবানবন্দীও যেমন বিশ্বাস করেনি জনগণ এবারও ২০২৬ সালে এসেও বিএনপি’র আজ্ঞাবহ ক্যাডার পুলিশের শিখিয়ে দেয়া মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ’র দেয়া জবানবন্দীও বিশ্বাস করতে পারছেনা কেউ।

২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর নতুন করে মামলার তদন্ত শুরু হয়। তদন্তে জজ মিয়ার কোনো সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় দীর্ঘ প্রায় চার বছর বিনা অপরাধে জেল খাটার পর ২০০৯ সালের জুন মাসে তিনি কারাগার থেকে সম্পূর্ণ নিষ্পাপ প্রমাণিত হয়ে মুক্তি পান।

রংপুর নগরীতে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী পরিবারের ৪ জনকে নৃশংসভাবে খুন করার ঘটনায় রংপুরের করিৎকর্মা পুলিশ রবিবার মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) নামের দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশের দাবি এরা ইয়াবা আসক্ত এবং গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে বসে ইয়াবা সেবন করছিল।

তা দেখে ফেলায় প্রথমে গনপতিকে এবং পরে একে একে তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে আয়ুষ চক্রবর্তী প্রিয়মকেও হত্যা করে।

শুধু তাই নয়, মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে নানা ভয়ভীতি দেখিয়ে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীও আদায় করিয়ে নেয় তরিৎগতিতে- এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে নানা সূত্রে।

অথচ এ দুই তরুণের বিরুদ্ধে মাদকাসক্তের কোন অভিযোগ তাদের পাড়াপ্রতিবেশি কেউই করেননি এখনো।

রংপুর শহরে মাছুয়াপাড়া ওই ঘর তৈরী করতে গিয়ে গণপতি চক্রবর্তী কোন একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হুমকির শিকার হয়েছিলেন। তবে কারা তাকে হুমকি দিয়েছিল তা তিনি ভয়ে মুখ খুলতে পারেননি। কিন্তু গ্রেপ্তার হওয়া মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ যে নয় তা বোঝা গেছে এলাকাবাসীর বক্তব্যে।

হত্যাকাণ্ডের ধরন, পারিপার্শ্বিক অবস্থা দেখে প্রাথমিকভাবে সন্দেহ জাগার কারণ রয়েছে যে, শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর সহায় সম্পত্তি দখল করার জন্য এ ধরনের হত্যাকান্ড ঘটানো হতে পারে।

কিন্তু অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে এ হত্যাকান্ডের পেছনে চরমপন্থী ইসলামী জঙ্গীবাদী গোষ্ঠী নব্য জেএমবি’র সংশ্লিষ্ট থাকা বিচিত্র কিছু নয়। কারণ এর আগেও দেশের উত্তরাঞ্চলে একই নৃশংস কায়দায় এই জঙ্গী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বেশ কিছু হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটিয়েছে।

২০১৫ এবং ২০১৬ সালে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের রংপুর, দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম এবং পঞ্চগড় (ঠাকুরগাঁও সংলগ্ন অঞ্চল) জেলাগুলোতে ‘নব্য জেএমবি’ (তৎকালীন সময়ে পুলিশ একে জেএমবির একটি ধারা বললেও পরবর্তীতে এটি নব্য জেএমবি বা আইএস অনুপ্রাণিত গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত হয়) বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড ও হামলা চালিয়েছিল।

পুলিশের তৎকালীন তদন্ত প্রতিবেদন এবং গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে এই হত্যাকাণ্ডগুলোর হামলার একটি নির্দিষ্ট ‘কমন প্যাটার্ন’ বা ছক উন্মোচিত হয়েছিল।

এমন তথ্য বিভিন্ন সম্প্রচার মাধ্যমে বলেছেন বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক এসবি প্রধান মনিরুল ইসলাম, যিনি বেশ কয়েকবছর ধরে বাংলাদেশে সফলতার সঙ্গে জঙ্গীবাদ বিরোধী নানা অনুসন্ধান ও অপারেশনে যুক্ত ছিলেন।

২০১৫ সালের ৩ অক্টোবর রংপুর শহরের অদূরে কাউনিয়া উপজেলার আলুটারী গ্রামে জাপানি নাগরিক কুনিও হোশি নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)’র জঙ্গীদের খুন হন।

২০১৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি রংপুরের বিশেষ জজ আদালত এই চাঞ্চল্যকর মামলার রায় ঘোষণা করেন। বিজ্ঞ আদালত কুনিও হোশি হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকার অপরাধে জেএমবির পীরগাছা অঞ্চলের কমান্ডার মাসুদ রানা ওরফে মামুনসহ ৫ জঙ্গি সদস্যকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন।

এই হত্যাকাণ্ডের মাত্র পাঁচ দিন আগে (২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৫) ঢাকার কূটনৈতিক এলাকায় ইতালীয় নাগরিক চেজারে তাভেল্লাকে একইভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও আদালতের তদন্তে উঠে আসে যে, বাংলাদেশে বিদেশি নাগরিকদের হত্যা করে আন্তর্জাতিক মহলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা, দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করা এবং একটি চরমপন্থী মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করাই ছিল জেএমবির জঙ্গিদের মূল উদ্দেশ্য, একই বছর ১৮ নভেম্বর দিনাজপুর সরকারি কলেজের সামনে ইতালীয় নাগরিক ও চার্চের ফাদার পিয়েরো পারোলারিকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়।

তিনি গুরুতর আহত হলেও সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান।

রংপুরের কাউনিয়া উপজেলায় মধুপুর মাজারের খাদেম রহমত আলীকে ২০১৫ সালের ১০ নভেম্বর এই নব্য জেএমবির জঙ্গীরা কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করে।

পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ উপজেলার সন্তগৌড়ীয় মঠের অধ্যক্ষ ও পুরোহিত যজ্ঞেশ্বর রায়কে ২০১৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মঠের ভেতরে গলা কেটে নৃশংসভাবে খুন করে এই একই জঙ্গীগোষ্ঠী। কুড়িগ্রাম শহরের কৃষ্ণপুর চড়ুয়াপাড়ায় ধর্মান্তরিত খ্রিস্টান ও বীর মুক্তিযোদ্ধা হোসেন আলীকে ২০১৬ সালের ২২মার্চ কুপিয়ে ও গলা কেটে একই কায়দায় খুন করা হয়।

হত্যা করা হয় পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) এবং স্থানীয় ডিবির তদন্তে উত্তরাঞ্চলের এই হত্যাকাণ্ডগুলোর নেপথ্যে নব্য জেএমবির ‘উত্তরবঙ্গ সামরিক শাখা’র জড়িত থাকার প্রমাণ মেলে।

তাদের তদন্তে মূল পরিকল্পনাকারী বা মাস্টারমাইন্ড হিসেবে এই সব হামলার মূল সমন্বয়ক ছিল রাজীব গান্ধী ওরফে জাহাঙ্গীর (কুড়িগ্রামের মামলার আসামি) এবং উত্তরবঙ্গ সামরিক কমান্ডার খালেদ হাসান ওরফে বদর মামা।

রাজীব গান্ধী পরবর্তীতে ঢাকার গুলশান হোলি আর্টিজান হামলারও অন্যতম পরিকল্পনাকারী ছিল।

পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) এর একসময়ের প্রধান ছিলেন মনিরুল ইসলাম। তিনি জানিয়েছেন বিভিন্ন তদন্তে দেখা যায়, জঙ্গিরা বাংলাদেশে বসবাসরত বিদেশী নাগরিক, সংখ্যালঘু হিন্দু-খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ধর্মগুরু এবং সুফি মতাদর্শের মাজারের খাদেমদের টার্গেট করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং দেশে সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা তৈরি করা।

তিনি রংপুরের শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী পরিবারের হত্যাকান্ডের নানাবিষয়ে কথা বলতে গিয়ে এই হত্যাকান্ডের সঙ্গে নব্য জেএমবি’র জঙ্গীদের সম্পৃক্ততার বিষয়টিকেও প্রাধান্য দিয়েছেন।

তারও সন্দেহ যে এটি মূলত তাদেরই কাজ। কারন খুনের যে ধরন তাতে তাই সন্দেহ করা হচ্ছে।

এদিকে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তুলে ধরতে গিয়ে যেসব বিষয়ের অবতারণা করেছেন তাতে বেশ কিছু প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

প্রথমে ডাকাতি, পরে ইয়াবা—এটা কেন? ঘটনার প্রথমদিকে পুলিশ ডাকাতি-চাঁদাবাজির সম্ভাবনা দেখছিল। স্বজনদের পক্ষ থেকেও বাড়ি নির্মাণের সময় চাঁদা দাবির কথা এসেছে। পরে হঠাৎ খুব নির্দিষ্টভাবে বলা হলো—ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াই হত্যার কারণ।

এখানে প্রশ্ন দাঁড়ায়-তদন্তে এমন কী নতুন প্রমাণ পাওয়া গেল, যার ভিত্তিতে প্রথম ধারণা থেকে এত দ্রুত সরে গেল কেন পুলিশ? চারজনকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত এত দ্রুত কেন? পুলিশের বর্ণনা অনুযায়ী, গণপতিকে প্রথমে হত্যা করা হয়।

এরপর স্ত্রী, মেয়ে এবং ঘুমন্ত ছেলেকে হত্যা করা হয়—মূলত পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয় থেকে। আসলেই কি তাই ?

কিন্তু এখানে প্রশ্নটা হলো-একজন বৃদ্ধকে হত্যার পর দুই তরুণ কেন ঘটনাস্থল থেকে পালাল না? বরং তারা একে একে পরিবারের আরও তিনজনকে হত্যা করেছে—এটি অত্যন্ত উচ্চমাত্রার সহিংস আচরণ। এর পেছনে শুধু “বাধা দেওয়ায় রাগ” যথেষ্ট ব্যাখ্যা কি না, তদন্তে সেটা পরিষ্কার করা দরকার।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তারা এতক্ষণ বাড়িতে থাকল কেন? পুলিশের দাবি, চারজনকে হত্যার পর তারা সেখানেই গোসল করেছে, শসা-খেজুর খেয়েছে এবং ইয়াবা সেবন করেছে। তারপর ঘর এলোমেলো করেছে। এটা সত্য হলে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূত্র।

কারণ হত্যার পর সাধারণ অপরাধীর প্রথম প্রবণতা হওয়ার কথা দ্রুত পালানো।এখানে বরং দেখা যাচ্ছে—তারা যথেষ্ট সময় নিয়ে ঘটনাস্থলে থেকেছে। এটা কি অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস থেকে তারা করেছে? তাহলে নিশ্চয়ই এরা সাধারণ কোন খুনী নয়। একবারেই কুল ব্রেনের মাডারার যাদেরকে বলা হয় এরা ঠিক তাই।

মোবাইল ফোন ডিটারজেন্টের পানিতে রাখার গল্পও শুনিয়েছে পুলিশ। তারা বলছেন- আঙুলের ছাপ বা আলামত নষ্ট করার উদ্দেশ্যে দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়েছিল। তারমানে অপরাধীরা কি আগে থেকেই অপরাধের আলামত নষ্ট করার কৌশল জানত?

কিন্তু সাধারণ মাদকসেবী দুই তরুণের তাৎক্ষণিক রাগের হত্যাকাণ্ড এবং পরিকল্পিতভাবে ডিজিটাল ফরেনসিক আলামত নষ্ট করার চেষ্টা—দুটো চরিত্র একেবারে এক নয়। তাই তাদের পূর্ব অপরাধের ইতিহাস ও কারও কাছ থেকে এমন পরামর্শ পেয়েছিল কি না, সেটা খতিয়ে দেখা দরকার।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী -হত্যার পর সুযোগ পেয়ে লুট করেছে, অথবা লুট ছিল ঘটনাটাকে অন্যদিকে ঘোরানোর একটি অংশ। সম্ভাবনাটি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে এটাও এখনো প্রমাণিত নয়। তারা একটি স্বর্ণের চুড়ি আসল না নকল পরীক্ষা করতে পুড়িয়েছিল এবং পরে স্বর্ণালংকার নিয়ে যায়, বিষয়টি একেবারেই হাস্যকর।

বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল কেন এবং কারা করেছে? ঘটনার প্রথম দিকের রিপোর্টে বাড়ির বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকার কথা এসেছে। একই সময়ে বাড়িটি তালাবদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়। এটা গুরুত্বপূর্ণ ফরেনসিক প্রশ্ন- বিদ্যুৎ কে বন্ধ করেছিল এবং কখন? অভিযুক্ত দুইজন? নাকি অন্য কারো ? হত্যার আগে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে কেনো ? তাহলে এটি নিশ্চিত পরিকল্পিতভাবেই করা হয়েছে।

তবে এই হত্যাকান্ডের সঙ্গে ইসলামী জঙ্গী গোষ্ঠী নব্য জেএমবি বা আইএস জড়িত এটির যথেষ্ট সন্দেহ করার কারণ রয়েছে। বিভিন্ন তথ্য বলছে- গণপতি চক্রবর্তীর মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর পরনের পোষাক ছেঁড়া ছিল এবং তার চোয়াল ভাঙ্গা ছিল। এই ইসলামী জঙ্গীরা এ ধরনের বিকৃত যৌন প্রতিহিংসার সঙ্গে জড়িত।

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার সংবাদ সম্মেলনে ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে এমনভাবে কান্নার অভিনয় করেছেন যেন তিনি শোকে প্রচণ্ডভাবে শোকাভিভূত।

কিন্তু আপনার সেই কানানা কি ২০২৪ এর আগষ্টে আপনারই যেসব সহকর্মীকে (অন্তত সাড়ে তিন হাজার) পুড়িয়ে, গুলি করে, পিটিয়ে ছুরিকাঘাত করে পাশবিকভাবে খুন করা হয়েছে তাদের জন্য একবারও হয়নি ?

আর এই রংপুরে ৪ জনকে হত্যার ঘটনায় আপনার হৃদয় এই আবেগাক্রান্ত হয়েছে যে আপনি কান্নার অভিনয়টিও ঠিকভাবে করতে পারলেন না হে মাননীয় পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ !?

আপনার বডি ল্যাংগুয়েজই বলে দেয় আপনার সেই আবেগাক্রান্ত হওয়াটি একান্তই সেই বিএনপি-জামায়াত আমলের ‘জজমিয়া নাটক ‘ মাত্র। আর কত নাটক করবেন ?

একটি সন্দেহ বারবারই ঘুরপাক খাচ্ছে। তাহলো-গণপতি চক্রবর্তীকে সপরিবারে হত্যার উদ্দেশ্যে আসা মৌলবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীকে কোনভাবে দেখে ফেলেছিল প্রতিবেশী সিদ্ধার্থ দাস (২৩) ও মুগ্ধ দাস (১৯)। এটাই কি তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায় ?

পরিকল্পিনা অনুযায়ী তাই পুলিশ এই দুই যুবককে তুলে নিয়ে যায়। তারপর চলে নানা ভয়ভীতি যে, পুলিশের কথামতো স্বীকারোক্তি দিতে হবে, নাহলে ব্রাশফায়ার।

এদের একজনের গায়ে ছিল গেঞ্জি, কিন্তু তার গায়ে পরিয়ে দেওয়া হয় পুলিশের ব্যবহৃত একটি জামা- যা এরই মধ্যে সংবাদ মাধ্যমে এসেছে। এ নিয়েও নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধর পরিবারকে পুলিশ ভয় দেখিয়েছে, যদি তারা মুখ খোলে—তাহলে ওই নিরীহ হিন্দু ছেলে দুটোকে ক্রসফায়ার দেওয়া হবে। পুলিশ সূত্রে এই সংবাদ রংপুরের সাংবাদিকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে, কিন্তু কেউই ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না।

সম্প্রতি জাতিসংঘ সতর্ক করে দিয়েছে যে, বাংলাদেশে চরমপন্থী ইসলামী শক্তির উত্থান ঘটেছে। এই উগ্রবাদী শক্তিকে মদত দিচ্ছে বিএনপি সরকার। বিএনপি যে ইসলামী জঙ্গীবাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা তা অনেক আগে থেকেই প্রমাণিত সত্য।

রংপুরের এই গণপতি চক্রবর্তী পরিবারের ৪ জনকেই পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিয়ে কি বার্তা দিতে চাইছে খুনীরা ? এই নির্বিরোধ-শান্ত ও পরোপকারি হিন্দু পরিবারের সব সদস্যকে খুন করে তাদের সম্পত্তি আত্মসাৎ ও রংপুরসহ সারা দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের সংখ্যালঘু পরিবারের মধ্যে আতংক ছড়িয়ে দেয়াই কি উদ্দেশ্য? সে আশংকা একেবারেই অমুলক নয়।

সারা দেশের হিন্দু জনগোষ্ঠীর মধ্যে কিন্তু এমন আতংক ছড়িয়ে গেছে ইতিমধ্যেই।

দেশের উত্তরবঙ্গের অবস্থিত রংপুরের এই মর্মান্তিক হত্যাকান্ডটি একদিকে যেমন ইসলামী জঙ্গীদের আস্ফালনকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে তেমনি ব্রাহ্মনবাড়িয়া জেলার নিদারাবাদ গ্রামের নৃশংস,লোমহর্ষক ও মর্মান্তিক হত্যাকান্ডের ঘটনাকেও মনে করিয়ে দেয়।

নিদারাবাদ গ্রামের দরিদ্র শশাঙ্ক দেবনাথের পরিবারকে নিঃশেষ করে তাদের জমি দখল করতে প্রধান অভিযুক্ত তাজুল ইসলাম ( যে কীনা ‘কসাই তাজুল’ নামে কুখ্যাত ছিল) ও তার সহযোগীরা এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালায়। ১৯৮৭ সালে শশাঙ্ক দেবনাথকে প্রথমে হত্যা করে গুম করা হয়।

পরবর্তীতে ১৯৮৯ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাতে শশাঙ্কের স্ত্রী ও পাঁচ সন্তানকে নির্মমভাবে হত্যা করে লাশ টুকরো টুকরো করে ড্রামে ভরে চুন ও লবণ দিয়ে ধোপাজুড়ি বিলের পানিতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়।

সেই হত্যাকান্ডের বলি হন -শশাঙ্ক দেবনাথ (শুরুতে নিখোঁজ/হত্যা), তার স্ত্রী বিরজাবালা দেবনাথ ( ৪৫), মেয়ে নিয়তিবালা ( ১৭), মেয়ে প্রণতিবালা ( ১০), তিন ছেলে সুভাষ দেবনাথ ( ১৪), সুপ্রসন্ন দেবনাথ সুমন ( ৫) ও সুজন দেবনাথ ( ২)। কসাই তাজুল ইসলাম ছিল এই হত্যাকান্ডের মাষ্টারমাইন্ড।

সে তার অন্যতম সহযোগী বাদশা মিয়াসহ আরো কয়েকজন মিলে এই নৃশংস হত্যাকান্ড করে। এ হত্যাকান্ডের ঘটনায় নিম্ন আদালতে ৯ জনের ফাঁসি ও ২৭ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।

পরবর্তীতে উচ্চ আদালত প্রধান অভিযুক্ত তাজুল ইসলাম ও বাদশা মিয়ার ফাঁসির আদেশ এবং আরও ৮ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখেন। দীর্ঘকাল পলাতক থাকার পর তাজুল ইসলামসহ অন্যান্যদের ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়।

মানব ইতিহাসের এই লোমহর্ষক-মর্মান্তিক হত্যাকান্ড নিয়ে একটি প্রামান্যচিত্রও তৈরী হয়েছিল ‘কাঁদে নিদারাবাদ’ নামে। হয়তো কখনো কেউ তৈরী করবেন ‘কাঁদে রংপুর’ নামে কোন তথ্যচিত্র।

সেই বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলেই (২০০১-২০০৬) চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে সাধনপুরের শীলপাড়ায় বিৃদ্ধ থেকে শুরু করে দুগ্ধপোষ্য শিশুসহ ১১ জনকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল।

২০০৩ সালের ১৮ নভেম্বর রাতে দুর্বৃত্তরা তেজেন্দ্র লাল শীলের ঘরের বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে দেয় এবং গানপাউডার ছড়িয়ে আগুনে পুড়িয়ে নারী ও শিশুসহ একই পরিবারের ১১ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করে।

তখনও সরকারের পক্ষ থেকে সাফাই গাওয়া হয়েছিল ডাকাতি করতে এসে বাধা পেয়ে ডাকাতরা আগুন দিয়েছে।

কিন্তু এই হত্যাকান্ডের সঙ্গেও বাঁশখালীর তৎকালীন সাংসদ জাফরুল ইসলামের চাচাতো ভাই আমিন চেয়ারম্যান ( ইউপি চেয়ারম্যান) জড়িত থাকায় এই ‘ডাকাতি নাটক’ সাজানো হয়েছিল। এই হত্যাকান্ডের প্রায় আড়াই দশক হবে আর দুই বছর পর। কিন্তু সেই হত্যাকান্ডের কোন বিচার হয়নি। এটি অবশ্য নিশ্চিত করে বলা যায়- এ মামলার কোন বিচার হবেনা।

তো বাংলাদেশে কি শুধু ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের এমন হত্যাকাণ্ড নিয়ে কিছুদিন লেখালেখি বা আহাজারিই চলতে থাকবে? আর সেই সাথে নীরবে চলবে দেশত্যাগ? একসময়ে হবে ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিন্দু শূন্য বাংলাদেশ? যেখানে শুধুই বিচরণ হবে ইসলামী জঙ্গী শরিয়তপন্থীদের? সেই বাংলাদেশ ( দুঃখিত বাংলাস্তান) কি খুব বেশি দূরে?

# রাকীব হুসেইন: লেখক, প্রাবন্ধিক।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *