একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক মর্যাদা বহুলাংশে নির্ভর করে তার বাস্তবসম্মত পররাষ্ট্রনীতি এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের ওপর।
আবেগ, অন্ধ আদর্শিক অবস্থান কিংবা ভূ-রাজনৈতিক পরাশক্তিগুলোর মনস্তাত্ত্বিক চাপের কাছে নতিস্বীকার করে যদি কোনো রাষ্ট্র তার জাতীয় স্বার্থকে বিসর্জন দেয়, তবে তার মাশুল দিতে হয় পরবর্তী প্রজন্মকে।
বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক ইতিহাসে জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী এমন দুটি প্রধান ঘটনা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এর প্রথমটি হলো, নব্বইয়ের দশকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বিনামূল্যে সাবমেরিন ক্যাবল সংযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
আর দ্বিতীয়টি হলো, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নয়া দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৮তম ব্রিকস (BRICS) শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ সেশনে বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের না যাওয়ার হঠকারী সিদ্ধান্ত।

দুটি ব্যবস্থাপনাই বাংলাদেশের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিকে কীভাবে খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে, তা গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে।
সাবমেরিন ক্যাবলের ঐতিহাসিক ভুল করে তথাকথিত ‘তথ্য পাচার’-এর মিথ কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে দেশটিকে। ১৯৯২-৯৩ সালের দিকে আন্তর্জাতিক কনসোর্টিয়াম সাউথ ইস্ট এশিয়া-মিডল ইস্ট-ওয়েস্টার্ন ইউরোপ ২ (SEA-ME-WE 2) এর পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে সাবমেরিন ক্যাবল সংযোগ দেওয়ার ঐতিহাসিক প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু তৎকালীন বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এক রহস্যজনক ও আধুনিক বিজ্ঞানবিমুখতার কারণে সেই প্রস্তাব নাকচ করে দেন।
তখন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের যুক্তি ছিল—বঙ্গোপসাগরের তলদেশ দিয়ে এই ক্যাবল সংযোগ নিলে “দেশের গোপন তথ্য পাচার হয়ে যাবে।”
তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে এমন খোঁড়া যুক্তি শুধু যে বাংলাদেশকে তথ্য-প্রযুক্তির মহাসড়ক থেকে এক দশক পিছিয়ে দিয়েছিল তা-ই নয়, বরং রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অপূরণীয় ক্ষতিসাধন করেছিল।
পরবর্তীতে বিশ্ব যখন দ্রুতগতির ইন্টারনেটের যুগে প্রবেশ করে এবং ডিজিটাল কানেক্টিভিটি ছাড়া অর্থনীতি প্রায় অচল হয়ে পড়ে, তখন বাংলাদেশ সরকার নিজের ভুল বুঝতে বাধ্য হয়।
কিন্তু ততদিনে যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে গেছে। আরো ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য পরবর্তীতে ২০০৬ সালে অত্যন্ত উচ্চমূল্যে এবং বিপুল পরিমাণ মূলধন বিনিয়োগ করে বাংলাদেশকে SEA-ME-WE 4 কনসোর্টিয়ামের সদস্যপদ কিনে আন্তর্জাতিক তথ্য মহাসড়কে যুক্ত হতে হয়।
যে প্রযুক্তি বিনামূল্যে পাওয়ার সুযোগ ছিল, তা শুধুমাত্র অদূরদর্শী রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে কিনতে হয়েছিল, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল বাংলাদেশের উদীয়মান আইসিটি সেক্টর। শুধু আইসিটি সেক্টর কেন এর বিরুপ প্রভাব পড়েছে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর।
কিন্তু ওই যে কথায় বলেনা- ‘গাধা পানি খায় ঘোলা করে’। আমাদের দেশে বিএনপি’র অবস্থাও হয়েছে তাই। এদের নেতৃত্বাধীন সরকার আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের কোনো উপকার করতে পেরেছে এমন কোন নজির নেই। এরা শুধু ফাউল স্লোগান দেয়- দেশ গড়েছেন শহীদ জিয়া, নেত্রী মোদের খালেদা জিয়া।
আর এখন হচ্ছে সবার আগে বাংলাদেশ, রংধনুর বাংলাদেশ। স্লোগান সর্বস্ব দল একটি।
ব্রিকস সম্মেলন বর্জনের মধ্য দিয়ে নতুনরূপে ভূ-রাজনৈতিক অদূরদর্শিতার পুনরাবৃত্তির জন্ম দিলো বাংলাদেশের বিএনপি সরকার।
ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেওয়ার এক প্রকট দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। নয়া দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়ার জন্য বিমসটেক (BIMSTEC) এর বর্তমান চেয়ারপারসন হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।

কিন্তু বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সরকারের পক্ষ থেকে অত্যন্ত দায়সারাভাবে জানানো হয় যে, তারেক রহমানকে সরাসরি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমন্ত্রণ না জানিয়ে বিমসটেক চেয়ার হিসেবে আমন্ত্রণ জানানোয় এবং আমন্ত্রণ প্রক্রিয়ায় ত্রুটি থাকার অজুহাতে তিনি এই সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন না।
এই সিদ্ধান্তটি আপাতদৃষ্টিতে রাজনৈতিক ‘বাহাদুরি’ বা আত্মমর্যাদার চাদরে ঢাকার চেষ্টা করা হলেও, তা গভীর কূটনৈতিক ব্যর্থতা ও বিচ্ছিন্নতারই বহিঃপ্রকাশ। বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্রিকস (রাশিয়া, চীন, ভারত, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং পরবর্তীতে যুক্ত হওয়া ইরান, মিশর, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইথিওপিয়া) এখন একক পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।
বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ এবং বিশ্ব বাণিজ্যের ২৬ শতাংশ নিয়ন্ত্রণকারী এই জোটের সম্মেলনে যোগ না দিয়ে বাংলাদেশ প্রকারান্তরে নিজেকে একটি বিশাল অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক থেকে বঞ্চিত করল।
এই বিশাল অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজণৈতিক জোটে যোগ না দিয়ে নিজের পায়েই নিজে কুড়োল মারলো বাংলাদেশ। কি এমন মানসম্মান যেতো এই ব্রিকস সমোলনে যোগ দিলে হে মহামান্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আপনার?
ছিলেন তো লন্ডনে পলাতক ১৬ বছর, রাজনৈতিক আশ্রয়ে। তাও আবার গিয়েছিলেন এক এগারোর ফখরুদ্দিন-মাইনুদ্দিন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সেনা কর্তাদের কাছে ‘ আর রাজনীতি করিব না’ এই দাসখত দিয়ে। তো দাসখত দেয়া হে চরম বুদ্ধিমান রাজনীতিবিদ জনাব তারেক রহমান কি এমন মান সম্মান আছে আপনার শুনি একটু!
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে কার কুযুক্তিতে ব্রিকস বর্জন? মার্কিন তোষণ নাকি অভ্যন্তরীণ চাপ? তারেক রহমানের এই সম্মেলনে না যাওয়ার পেছনে কূটনৈতিক মহলে একাধিক গুরুতর প্রশ্ন ও তত্ত্বের জন্ম দিয়েছে :

১. মার্কিন প্রশাসনকে সন্তুষ্ট করার নীতি: ২০২৪ এর আগষ্টে “ইসলামী জঙ্গী-সেনা ক্যু” এর মাধ্যমে বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদলের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একান্ত আজ্ঞাবহ ছিল সেই সুদী মহাজন ড. ইউনুস ও তার বশংবদ সরকার।
তো এবছর ১২ জানুয়ারির কথিত ইলেকশনের মধ্য দিয়ে দুই তৃতীয়াংশ ভোটের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপি’র প্রদানমন্ত্রী তারেক রহমানও কিন্তু সেই মার্কিন তোষণ নীতিই অবলম্বন করছেন। কারণ, না হলে যে কোন সময় তার চেয়ারটি উল্টে যেতে পারে তা তিনি বেশ ভালো করেই জানেন।

কিন্তু ভারতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে না গিয়ে সস্তা হেডাম দেখালো ( এমন শব্দ ব্যবহারে ক্ষমাপ্রার্থী)।
যেই মার্কিনীরা একাত্তর সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে চরম বিরোধীতা করেছে, হানাদার পাকিস্তানীদের সাহায্য করেছে, এমনকি বাংলাদেশ স্বাধীন না হওয়ার জন্য মার্কিন রণতরী সপ্তম নৌবহর পাঠিয়েছিল সেই মার্কিনীদের সাথেই বাইচান্স সেক্টর কমান্ডরের পুত্র সম্পর্ক উন্নয়নে ব্যতিব্যস্ত ?!
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছ থেকে অভিনন্দন বার্তা পাওয়ার পর থেকেই সরকারের মধ্যে ওয়াশিংটন-মুখী প্রবণতা স্পষ্ট। বোয়িং কেনার জন্য হাতেপায়ে ধরছে মার্কিনীদের।
রাশিয়া ও চীনের নেতৃত্বাধীন ব্রিকস-কে পশ্চিমারা তাদের ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে। এমতাবস্থায়, মার্কিন প্রশাসনকে খুশি রাখতে বা তাদের কোনো গোপন মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত চাপের মুখে পড়েই কি তারেক রহমান ব্রিকস সম্মেলন এড়িয়ে গেলেন? যদি এমনটি হয়ে থাকে, তবে তা বাংলাদেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে।
এর পাশাপাশি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ মৌলবাদী ও ইসলামী জোটের চাপও কাজ করছে তারেক রহমানের সরকারের ওপর। বাংলাদেশের বর্তমান অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ডানপন্থী ও ইসলামী দলগুলোর (যেমন জামায়াতে ইসলামী ও সমমনা জোট) প্রভাব ও চাপ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ভারতের মাটিতে গিয়ে কোনো আন্তর্জাতিক বা দ্বিপাক্ষিক সম্মেলনে অংশ নিলে দেশীয় রাজনীতিতে ভারত-বিরোধী কার্ড খেলা কঠিন হতে পারে—এমন সস্তা রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ এবং আভ্যন্তরীণ অংশীদারদের চাপের মুখে পড়ে কি এই জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া হলো?
অথচ আমন্ত্রণ প্রক্রিয়ার খোঁড়া অজুহাত খুঁজছে বাংলাদেশ সরকার ও তাদের বশংবদরা। এজন্য অনেকে বাহবাও দিচ্ছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাঁকে ( তারেক রহমানকে) সরকারপ্রধান হিসেবে নয়, বিমসটেক চেয়ারম্যান হিসেবে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনকার পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের অকূটনীতিক অফিসার ও নীতিনির্ধারকরা জানেনইনা যে ,কূটনীতিতে পরিচয় বা পদের চেয়ে ‘উপস্থিতি’ এবং ‘সুযোগ’ সবচেয়ে বড় বিষয়।
বহুজাতিক এই ফোরামে উপস্থিত থাকলে যেখানে বিশ্বের শীর্ষ নেতাদের সাথে বসার সুযোগ তৈরি হতো, সেখানে প্রোটোকলের দোহাই দিয়ে সরে থাকা চরম বালখিল্য কূটনীতির পরিচয়।
ভারতের সাথেও দ্বিপাক্ষিক আলোচনার সুযোগ হারালো বাংলাদেশ। সেইসাথে সম্পর্কের অচলাবস্থা ও আঞ্চলিক ক্ষতিও যে হচ্ছে ও আরো হবে তা এখনো বুঝতে পারছেনা এই মোটাবুদ্ধির কূটনীতিক-রাজনীতিকরা।
এই সম্মেলনে না যাওয়ার ফলে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক। শেখ হাসিনার সরকারকে উৎখাতের পর থেকে ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্ক ইতিহাসের অন্যতম শীতলতম পর্যায়ে রয়েছে।
এই ব্রিকস সম্মেলন হতে পারত দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বরফ গলানোর মোক্ষম সুযোগ। সেখানে উপস্থিত থাকলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে তারেক রহমানের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হতে পারত।
যা এই স্বল্পশিক্ষিত-রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ তারেক জিয়ার পক্ষে অনুধাবন করা সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশের সুজলা-সুফলা হয়ে বেঁচে থাকার সাথে জড়িয়ে আছে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি, তিস্তা নদীর পানি চুক্তি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ।
সীমান্তের নানাবিধ সমস্যা, মানবপাচার, চোরাচালান, সীমান্তহত্যাসহ নানা সংবেদনশীল ইস্যুগুলো নিয়ে টেবিল টক করার এই মোক্ষম সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেলো। আর তাতে করে ক্ষতি হলো কার? ভারতের না বাংলাদেশের?
আলোচনার সুযোগ হাতছাড়া করায় ভারতের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে। ভারতকে এড়িয়ে গিয়ে বা দিল্লির সাথে বৈরিতা বজায় রেখে বাংলাদেশ যে আঞ্চলিক রাজনীতিতে দীর্ঘ মেয়াদে লাভবান হতে পারবে না, এই সহজ সত্যটি বুঝতে বর্তমান সরকার চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
এরপরও রয়েছে রাশিয়া ও চীনের মত দুই পরাশক্তির বিরাগভাজন হওয়ার ঝুঁকি- সেটি কি একবারও ভেবে দেখেছেন অপরিপক্ক প্রধানমন্ত্রী সাবেক মিষ্টার টেন পারসেন্ট (এখন কত পার্সেন্ট তা জানা নেই) সাহেব ?
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়া ও চীনের সাথে গভীর অর্থনৈতিক ও প্রকৌশলগত অংশীদারিত্ব বজায় রেখে চলছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, কর্ণফুলী টানেল, পদ্মাসেতু রেল সংযোগসহ দেশের মেগা প্রকল্পগুলোর সিংহভাগই এই দুটি দেশের অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তায় বাস্তবায়িত হচ্ছে।
তা বোধ হয় আমাদের অপেক্ষাকৃত তরুণ প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়া ভুলে গেছেন বা তাকে ভুলিয়ে রাখা হয়েছে।
ব্রিকস সম্মেলনে অনুপস্থিত থেকে বাংলাদেশ শুধু ভারতকে নয়, বরং রাশিয়া ও চীনের মতো পরীক্ষিত অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বন্ধুদেরও একধরনের নেতিবাচক বার্তা দিল।
রাশিয়া মানে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন যদি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে মার্কিন সপ্তম নৌ বহরকে হুমকি না দিতো ও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো না দিতো তাহলে বাংলাদেশ কবে স্বাধীন হতো সে বিষয়টিও অনিশ্চিত ছিল। শুধু কি তাই ? চট্টগ্রাম বন্দর মাইনমুক্ত ও ডুবো জাহাজগুরেঅ উদ্ধার করে বন্দর সচল করে অর্থনৈতিক দ্বার খুলে দিয়েছিল এই রাশিয়া। তাও ভুলে গেছে।
রাশিয়া ও চীন যেখানে ব্রিকসের পরিধি বাড়িয়ে মার্কিন ডলারের একাধিপত্যের বাইরে একটি বিকল্প অর্থনৈতিক ব্লক তৈরি করতে চাচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের এই সম্মেলনে অংশ না নেওয়া এই পরাশক্তিগুলোর কাছে বাংলাদেশকে সম্পূর্ণভাবে “আমেরিকা-ঘেঁষা” রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করবে।
এর ফলে ভবিষ্যতে চীনের ঋণ সহায়তা, রাশিয়ার জ্বালানি সহযোগিতা কিংবা বৈশ্বিক ফোরামে এই দেশগুলোর কূটনৈতিক সমর্থন পাওয়ার পথ কঠিন হয়ে যেতে পারে।
যেখানে খাদের কিনারায় পৌঁছেছে বাংলাদেশের অর্থনীতি সেখানে বন্ধুত্বের পরিবর্তে শত্রুতা বৃদ্ধির আত্মঘাতী নীতি নিচ্ছে কাদের কুযুক্তিতে? কারণ সুদী লোভী ড. নো-বেল ইউনুসতো বাংলাদেশের অর্থনীতিকে একটি সুতোর ওপর ঝুলিয়ে দিয়ে গেছে।
এই বিএনপি সরকারের সময় এর কোন উন্নতি তো হয়নি। বরং শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দিন দিন গ্যাস-বিদ্যুৎ-জ্বালনিীর অভাবে।
বর্তমানে প্রচণ্ড রকমের একটি ভঙ্গুর অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রেমিট্যান্সের অস্থিরতা এবং ব্যাংকিং খাতের অস্থিতিশীলতা দেশের অর্থনীতিকে খাদের কিনারায় এনে দাঁড় করিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়’—এই নীতির বাস্তবায়ন ঘটিয়ে নতুন নতুন অর্থনৈতিক জোটের সাথে যুক্ত হওয়া এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের পথ সুগম করা।
অথচ, দূরদর্শী কূটনীতির অভাব এবং সস্তা অভ্যন্তরীণ রাজনীতির স্বার্থে বাংলাদেশ আজ রাশিয়া, চীন এবং ভারতের মতো প্রতিবেশীদের বিরাগভাজন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
ব্রিকসের মতো একটি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক জোটের সংযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার অর্থ হলো—ভবিষ্যতের উদীয়মান বাণিজ্য বাজার, সহজ শর্তে ঋণ প্রাপ্তির সুযোগ (যেমন নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক) এবং বহুজাতিক বিনিয়োগের দরজা নিজের হাতে বন্ধ করে দেওয়া।
১৯৯২ সালে সাবমেরিন ক্যাবল নিয়ে যে ভুলের সূচনা হয়েছিল, ২০২৬ সালের ব্রিকস সম্মেলন বর্জনের মাধ্যমে সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটল। তথাকথিত সার্বভৌমত্বের বাহাদুরি কিংবা বিদেশি প্রভুদের সন্তুষ্ট করার নীতি কখনোই একটি দেশের টেকসই অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে না।
তারেক রহমানের এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একঘরে ও কূটনৈতিকভাবে চরমভাবে পিছিয়ে দেবে। ভঙ্গুর অর্থনীতিকে সচল করতে এবং ভূ-রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকে অতিসত্বর এই ‘আইসোলেশনিস্ট’ বা বিচ্ছিন্নতাবাদী নীতি পরিহার করতে হবে।
অন্যথায়, ইতিহাসের এই ভুল সিদ্ধান্তের মাশুল হিসেবে বাঙালি জাতিকে চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও সার্বভৌমত্বের সংকটে পড়তে হবে।
# নুরুল ইসলাম আনসারি: লেখক, প্রাবন্ধিক।
