বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যাকারি-গণহারে নারীধর্ষণকারীর দল জামায়াতে ইসলামীর ক্যাডার সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের মানে ডাকসুর জবরদখলকারি।

এই ছাত্র শিবির পাকি আমলে মানে পাকিস্তান আমলে ছিল ইসলামী ছাত্র সংঘ। বাংলাদেশ আমলে ১৯৭৭ সালে সেই ছাত্রসংঘই আবার নতুন রুপে আবির্ভূত হয় ইসলামী ছাত্র শিবির নামে।
তার মানে যেই ছাত্রসংঘ পাকি বীর্যে জন্ম হয়েছে তারই উত্তরসুরী এই ইসলামী ছাত্র শিবির। যেই ছাত্রসংঘ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ছিল কুখ্যাত আলবদর বাহিনী।
তো এই পাকিবীর্যের কুসন্তানরা কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নার জন্মবার্ষিকী পালন করবে, তাদের পাকিস্তানী জাতির পিতার ছবি পরম শ্রদ্ধার সাথে ডাকসুতে টানিয়ে রাখবে। এতে কি সত্যিই অবাক হওয়ার কিছু আছে ?
আপনারা কেউ কেউ হয়তো একটু বাংলাদেশপ্রেমী হয়ে উঠেছেন , কিছুটা মানসিক কষ্ট পেয়েছেন। তবে সত্যি বলতে কি খুব বেশি কষ্ট হয়েছে আপনাদের? খুব বেশি ক্ষুব্ধ হয়েছেন?
আসলে আমরা এই বাংলাদেশে থুঁড়ি বাংলাস্তানের অধিকাংশ মানুষই মানসিকভাবে পাকিপন্থী। তাই যদি না হবে তাহলে ২০২৪ এর জুলাই-আগষ্টে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশা নির্বিশেষে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ-মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে এইভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন কেন?
ব্যক্তি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনেক সীমাবদ্ধতা, দোষ থাকতে পারে ও আছে। দল হিসেবে আওয়ামীরীগেরও সেই অনেক দোষ আছে। কিন্তু একটিবারের জন্য আপনাদের মাথায় ঢুকলোনা যে, আওয়ামীলীগ যদি দেশ পরিচালনায় না থাকে তাহলে কারা দেশটি পরিচালনা করবে?
তো শেখ হাসিনা ও আওয়ামীলীগকেতো তাড়ালেন দেশ থেকে দুই বছরের বেশি হলো। তো আপনারা বেশ ভালো আছেন নিশ্চয়ই হে দেশবাসী যারা সেই “ইসলামী জঙ্গী-সেনা ক্যু” এর মধ্য দিয়ে দেশকে “ফ্যাসিবাদ” মুক্ত করেছিলেন !?
কোত্থেকে এক সুদখোর জিঘাংসাপরায়ণ ইউনুসকে কাকুতি মিনতি করে ফ্রান্স না কোত্থেকে উড়িয়ে এনে বসালেন সিংহাসনে। দুই বছরে দেশটাকে একেবারে সোনা দিয়ে মুড়িয়ে দিয়েছেনা আপনাদেরকে?
সারা বিশ্বের মধ্যে এক নম্বর দেশে-জাতিতে পরিণত করেছেনা এই বদমায়েশ ইউনুস ? তা কি বুঝতে পেরেছেন আপনারা যে দেশ আর দেশ নেই। সবকিছুর জন্য এমনকি অঅটার যে রুটিটি খাবেন সেটির জন্যও শ্যামচাচা মানে মার্কিনীদের দয়া দাক্ষিণ্যের জন্য চাতক পাখির মত বসে থাকতে হবে আপনাদের । এবার বোঝেন পাক-মার্কিন পীরিত কেমন লাগে!
যে আটার কেজি কিনেছেন ৪৫ টাকা থেকে ৫০ টাকায়, সেই আটার কেজি মাত্রতো ৬৫ টাকায় হোলো। অন্য কিছুর কথা বলতে গেলে অঅবার লেখাটি বাজার দরের লিষ্টি হয়ে যাবে। তাও অনেকে হয়তো বলছেন অহংকার করে আমরা দেশি জিনিস খাইনা। একেবারে আমেরিকার জিনিস খাই! হায়রে বাঙালি কবে আর মানুষ হবি তোরা! বন্দর নিয়ে নিয়েছে বলতে গেলে।
কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন্স কতটুকু এখনও বাংলাদেশের আছে সেটাই ভাবছি মাঝেমধ্যে। তো সেখানে যেতে যদি ভিসা সিষ্টেম করে দিতো তাহলেও মন্দ হতোনা। কয়েকদিন আগে দেখলাম থাইল্যান্ডের সমুদ্র উপকূলে এক বিশাল মার্কিন রণতরী ভিড়েছে নারী প্রমোদের জন্য।
তো সেন্টমার্টিন বা কক্সবাজারও যে অদূর ভবিষ্যতে হবেনা তার গ্যারান্টি কোথায়? অবশ্য গত চব্বিশের কথিত আন্দোলনের অনেক নারী যোদ্ধারা হয়তো মুখিয়ে আছে একটু যদি মার্কিনী স্বাদ পাওয়া যায়, কতই না মধুর!
তো এর জন্য ঢাবি’র মোনামি, জামায়াত-এনসিপির আরো কারা কারা নিশ্চয়ই একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকবেন। দুঃখিত এভাবে লেখার জন্য। যেহেতু মূল বিষয় পাকিস্তানে জিন্নাহ, ঢাবি ও ডাকসু, জাতির পিতা। তাই প্রসঙ্গক্রমেই এসব চলে এসেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস বাংলাদেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও স্বাধীনতাসংগ্রামের আন্দোলনের সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ের প্রতিটি স্বৈরাচারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানের সূতিকাগার এই ডাকসু।
তবে সম্প্রতি ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ডাকসু সংগ্রহশালার সংস্কার ও পুনর্গঠনকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক সামনে এসেছে, তা দেশের ছাত্র রাজনীতি এবং বৃহত্তর জাতীয় অঙ্গনে এক চরম অস্বস্তি ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
দীর্ঘ সময় পর উন্মুক্ত হওয়া এই সংগ্রহশালা থেকে বাঙালি জাতির স্বাধীনতাসংগ্রামের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গৌরবোজ্জ্বল ও একক প্রতিকৃতি সরিয়ে সেখানে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি যুক্ত করা হয়।
এই ঘটনাটি ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত প্রাঙ্গণে গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক সংঘাতের জন্ম দিয়েছে, যার ফলে এক বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী ডাকসুতে গিয়ে জিন্নাহর ছবি ভেঙে ও ছিঁড়ে ফেলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
ডাকসুর বর্তমান সংস্কার প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি বা পেপার কাটিং প্রদর্শন করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে জিন্নাহর দেওয়া সেই কুখ্যাত ভাষণের ছবি—যেখানে তিনি দম্ভোক্তি করেছিলেন যে ‘কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’।

এ ছাড়া ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের দলগত ছবি এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচন সংক্রান্ত সংবাদপত্রের কাটিং রাখা হয়েছিল।
বর্তমান ইসলামী ছাত্রশিবিরের নিয়ন্ত্রণাধীন ও সমর্থিত ডাকসু নেতৃত্বের পক্ষ থেকে সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ এবং অন্যান্য দায়িত্বশীলরা দাবি করেন, জিন্নাহর ছবিকে গৌরবান্বিত করার জন্য নয়, বরং ইতিহাসের তথ্যচিত্র তুলে ধরার স্বার্থেই এটি করা হয়েছে এবং ছবির নিচে তাঁর বাংলা ভাষা-বিরোধী অবস্থানের বিবরণী দেওয়া হয়েছিল। এটি আসলে এখন সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের মুখে পড়ে একধরনের সাফাই গাইছে।
যা শুধু শিবির নয় তাদের পিতৃসংগঠন জামায়াতে ইসলামীর নেতারাও গত সোমবার থেকে তোতাপাখির মত বুলি আওড়াতে শুরু করেছে।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থী ও আপামর বিক্ষুব্ধ নাগরিকদের মতে, যে ব্যক্তি বাঙালির রক্তের বিনিময়ে অর্জিত রাষ্ট্রভাষার ওপর প্রথম আঘাত হেনেছিলেন এবং ১৯৪৮ সালে কার্জন হলে ছাত্রদের প্রতিবাদের মুখে দাঁড়িয়ে স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁর প্রতিকৃতি কোনোভাবেই ডাকসুর মতো স্বাধীনতাকামী ছাত্র সংসদের দেয়ালে স্থান পেতে পারে না।
ফলশ্রুতিতে, ডাকসুর সাবেক ভিপি প্রার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী আবু তৈয়ব হাবিলদার ক্ষোভ ও ঘৃণায় জিন্নাহর ছবিগুলো ছিঁড়ে ও ভেঙে ফেলেন।

এর প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এবং প্রগতিশীল বিভিন্ন বামপন্থী ছাত্র সংগঠন জিন্নাহর ছবি টানানোর তীব্র নিন্দা জানায় এবং এটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী বলে অভিহিত করে। তাকে সাধুবাদ জানাতেই হবে।
প্রশ্ন উঠেছে, ডাকসু সংগ্রহশালায় বাঙালি জাতির দীর্ঘ সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি ও ইতিহাসের রূপায়ণ নিয়ে। সংগ্রহশালার বর্তমান রূপটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, সেখানে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান কিংবা ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের বর্ণনায় বঙ্গবন্ধুর কোনো একক বা গৌরবোজ্জ্বল প্রতিকৃতি রাখা হয়নি। ডাকসুর বর্তমান প্রতিনিধিদের দাবি, তাঁরা ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় ৭ মার্চের ভাষণের একটি কাঠের আর্টওয়ার্ক এবং ছয় দফার ঘটনার সংযুক্তি ঘটিয়েছেন এবং ১৯৭৪ সালের ব্যক্তিগত কিছু পারিবারিক সংবাদ বা বাকশাল আমলের সংবাদচিত্র রেখেছেন।
কিন্তু বাংলাদেশের স্থপতি এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রধান প্রেরণা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর যে সুউচ্চ অবস্থান, তাকে সচেতনভাবে সংকুচিত করার একটি স্পষ্ট চেষ্টা দৃশ্যমান।
এই পাকি বীর্যের উত্তরাধিকারের দল কোনভাবেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে মেনে নিতে পারবেনা, এটিতো জানা কথা। কিন্তু তাই বলে কি তাদের সবকিছুকে মেনে নিতে হবে ? এমন প্রশ্নটিই হয়তো কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে এরমধ্যে যারা প্রতিবাদ করেছেন। বিক্ষোভ করেছেন। দেখলাম কোন কোন সংগঠন “একাত্তরের হাতিয়ার গর্জে উঠুক আরেকবার”-এরকম শ্লোগানও দিয়েছে এই কুলাঙ্গার কায়েদে আযম ও তার বীর্যে জন্ম নেয়া পাকি মনোভাবাপন্ন এদেশীয় কুলাঙ্গারদের বিরুদ্ধে।

একইভাবে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের মহানায়ক মাস্টারদা সূর্যসেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, ভাষা শহীদদের স্মৃতি এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের খ্যাতনামা শহীদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথাকে যেভাবে মূল্যায়িত করার কথা ছিল, তার পরিবর্তে ইতিহাসের অন্য ধারার দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া হয়েছে বলে সমালোচকেরা অভিযোগ করছেন।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম অত্যাচার, বর্বর নির্যাতন এবং গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী হত্যার সেই কলঙ্কিত ইতিহাস কিংবা একাত্তরের ১৬ই ডিসেম্বর ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে যৌথবাহিনীর কাছে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের যে অনন্য ঐতিহাসিক ছবি—যা বাঙালির চিরকালীন বিজয়ের প্রতীক—সেগুলোর যথাযথ ও প্রভাববিস্তারকারী প্রদর্শনীর প্রচণ্ড ঘাটতি রয়েছে।
কারণ এসব দেখালেতো পাকপন্থীদের কলিজায় প্রচণ্ড আঘাত লাগে।
এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি প্রগতিশীল আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু এবং শহীদ মধুদার স্মৃতিবিজড়িত ইতিহাসকে এখানে যেভাবে প্রান্তিক করে রাখা হয়েছে, তা ডাকসুর চিরচেনা সাংস্কৃতিক ও অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্যের সঙ্গে প্রচন্ড সাংঘর্ষিক।
একাত্তরের শহীদ বুদ্ধিজীবী—যারা বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষক ও আলোকবর্তিকা ছিলেন—তাদের ত্যাগের মহিমা এই নতুন সংগ্রহশালায় অনেকটাই গুরুত্বহীন করে ফেলার অভিযোগ উঠেছে।

আমরা গত চব্বিশের “ইসলামী জঙ্গী-সেনা ক্যু” এর পর কি দেখলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ সারা দেশে? আমার যদি ভুল না হয়ে থাকে তাহলে এটুকু বলতে পারি- গত ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে নবাব সলিমুল্লাহ একাডেমির উদ্যোগে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ৭৬তম মৃত্যুবার্ষিকী পালন করেছিল পাকিস্তানীরা ( পাকিস্তানী বলছি এজন্য যে, এরা বাঙ্গালী বলার অধিকার রাখেনা)।

অত্যন্ত লজ্জাস্কর যে সেই অনুষ্ঠানে উর্দু গান ও কবিতা পরিবেশনের মাধ্যমে জিন্নাহর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়, যা স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও ধিক্কারজনক ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
যে জিন্নাহর হাত ধরে এই অঞ্চলের মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল শোষণের দীর্ঘ শৃঙ্খল, তাকে স্বাধীন দেশে স্মরণ করা চরম আত্মঘাতী মানসিকতার প্রমাণ।
বাঙালি জাতি কখনো ইতিহাস ভোলে না। ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে এবং ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে জিন্নাহ দম্ভভরে ঘোষণা করেছিলেন—”Urdu and only Urdu shall be the state language of Pakistan” (উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা)। সেই দিনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অকুতোভয় ছাত্রসমাজ তাঁর মুখের ওপর ‘নো, নো’ বলে প্রতিবাদ জানিয়েছিল।
বাঙালির মুখের ভাষাকে কেড়ে নেওয়ার যে নীল নকশা জিন্নাহ এঁকেছিলেন, তার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির রক্তপাত। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারের রক্তের বিনিময়ে যে ভাষার মর্যাদা রক্ষা করতে হয়েছিল, সেই ভাষার শত্রু জিন্নাহকে আজ স্বাধীন বাংলায় একদল তস্কর ‘জাতির পিতা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে, যা পুরো জাতির জন্য এক চরম দুর্ভাগ্যের বিষয়।
আমরা কি এতই সস্তা আবেগের জাতি যে একাত্তরের সেই নারকীয় দিনগুলোর কথা ভুলে যাব ? ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এই দেশের বুকে যে বর্বরতম গণহত্যা চালিয়েছিল, তার বীজ রোপিত হয়েছিল জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্ব এবং পূর্ব পাকিস্তানকে একটি উপনিবেশ হিসেবে দেখার মানসিকতার মধ্য দিয়ে। ৯টি মাস ধরে বাংলার প্রতিটি ইঞ্চি মাটি রঞ্জিত হয়েছিল সাধারণ মানুষের রক্তে।
মা-বোনদের ওপর চালানো হয়েছিল অমানুষিক নির্যাতন ও ধর্ষণ। জিন্নাহর তৈরি করা রাষ্ট্রকাঠামো এবং তার উত্তরসূরিরাই বাংলার বুক খালি করে মেধা খালাস করতে বুদ্বিজীবী হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল।
আজ যারা জিন্নাহর অবদানের দোহাই দিয়ে তার গুণকীর্তন করছে, তারা আসলে একাত্তরের সেই নরপশুদের বর্বরতাকেই পরোক্ষভাবে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে। জিন্নাহ কোনোদিনই বাঙালিদের আপন ভাবেননি, বরং তার কাছে এই অঞ্চলের মানুষ ছিল দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক।

নিজেদের বীরত্ব ও পূর্বপুরুষদের আত্মত্যাগের ইতিহাস ভুলে গিয়ে যারা আজ জিন্নাহকে অন্তরে লালন করছে, তারা মূলত মীর জাফরেরই আধুনিক সংস্করণ। শোষকের প্রতি এই অন্ধ আনুগত্য একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের মেরুদণ্ডহীনতারই বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।
বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের অস্তিত্বের সাথে যে নামটি অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে, তা হলো মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা, স্বাধীনতার স্থপতি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জিন্নাহর চাপিয়ে দেওয়া বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে যিনি টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত সমগ্র বাঙালি জাতিকে এক সুতোয় গেঁথেছিলেন, তিনি হলেন বঙ্গবন্ধু। তাঁর ৭ই মার্চের বজ্রকণ্ঠই ছিল বাঙালির মুক্তির মহামন্ত্র।
বঙ্গবন্ধুকে অস্বীকার করে বা তাঁর অবদানকে খাটো করে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের অস্তিত্ব কোনোভাবেই কল্পনা করা যায় না। কারণ, বঙ্গবন্ধু না হলে আজ আমরা এই লাল-সবুজের পতাকা পেতাম না, পেতাম না আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর অধিকার।
জিন্নাহ যেখানে বাঙালি সংস্কৃতি ও স্বাধিকারকে চরমভাবে ঘৃণা করতেন, সেখানে বঙ্গবন্ধু বাঙালিকে এনে দিয়েছিলেন নিজের একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র। তাই বঙ্গবন্ধুকে বাদ দিয়ে যারা পাকিস্তানি ভাবধারার জিন্নাহকে এই দেশের রূপকার বানাতে চায়, তারা মূলত বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকেই অস্বীকার করতে চায়।
আজকের এই ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে আমাদের গভীরভাবে আত্মোপলব্ধি করতে হবে। যে জাতি নিজের ইতিহাস ভুলে যায়, সে জাতি তার স্বাধীনতা ধরে রাখতে পারে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্তে জিন্নাহর মতো একনায়ক ও বাংলা ভাষার শত্রুর গুণগান গাওয়ার অর্থ হলো আমাদের ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধকে বুড়ো আঙুল দেখানো। এই পথভ্রষ্ট অপশক্তিকে রুখে দাঁড়ানোর সময় এখনই।
ইতিহাসকে কাটছাঁট করা কিংবা কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর নিজেদের সুবিধাজনক আদর্শ অনুযায়ী পুনর্লিখন করার চেষ্টা কখনোই দীর্ঘস্থায়ী বা গ্রহণযোগ্য হয় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চিরকালই সত্য, প্রগতি এবং স্বাধীন মতপ্রকাশের চারণভূমি। ডাকসু কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের দলীয় কার্যালয় কিংবা মতাদর্শ প্রচারের মাধ্যম নয়, এটি কোটি বাঙালির আবেগ ও স্বাধীনতা অর্জনের ঐতিহাসিক স্মারক।
বাংলা-বাঙ্গালি-বাংলাদেশ বিদ্বেষী পাকি জিন্নাহর ছবি টানানো এবং তা সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে ভেঙে ফেলার ঘটনা প্রমাণ করে যে, এ দেশের তরুণ প্রজন্ম তাদের ভাষা ও স্বাধীনতার প্রশ্নে কতটা আপসহীন।
ডাকসু সংগ্রহশালায় কোনোভাবেই ভাষা ও দেশদ্রোহী খলনায়কদের ঠাঁই হতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উচিত অবিলম্বে এই বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির মাধ্যমে বিষয়টির সুষ্ঠু মীমাংসা করা। একই সাথে মাস্টারদা সূর্যসেন, প্রীতিলতা, বঙ্গবন্ধু, শহীদ বুদ্ধিজীবী এবং একাত্তরের গৌরবোজ্জ্বল বিজয়ের অকাট্য প্রামাণ্যচিত্রসমূহ সসম্মানে পুনঃস্থাপন করে ডাকসুর প্রকৃত ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে সমুন্নত রাখা জরুরি।
গত চব্বিশে আমরা দেখেছি বেশ কিছু বামপন্থী রাজনৈতিক দল ও তাদের ছাত্রসংগঠনগুলো চরমভাবে সেই “ ইসালামী জঙ্গী-সেনা ক্যু” এর সঙ্গে ওৎপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। মনে করেছিল তারা বুঝ একটি স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়ে একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তলতে পারবে। কিন্তু সবই যে মার্কিন ডলারের ক্রিয়া ছিল তা অনেকে পরে বুঝেছে। কিন্তু ততদিনে যা সর্বনাশ হওয়ার হয়ে গিয়েছে।
তবে গত সোমবার মানে ১৫ সেপ্টেম্বর দেখলাম কিছু তরুণ-তরুণী কি বুঝে আবার মাঠে নেমেছে জিন্নাহর ছবি টানানোর প্রতিবাদে। আমি ব্যক্তিগতভাবে গত ২০১৮ সালের পর থেকে জামায়াতি আর কথিত বামপন্থী কিছু দলকে মূল্যায়ন করি ঠিক এভাবে- “ জামাতি-বামাতি” নামে। কারন এরা অনেকটা একই কাজের। ডলার পেলে এরা পারেনা হেন কোন কাজ নেই।
তবে আমাদের বিভ্রান্ত তরুণ প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস জানতে হবে এবং অন্তরে ধারণ করতে হবে একাত্তরের অবিনাশী চেতনা। কোনো তস্কর বা সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠী যেন আমাদের ত্যাগের ইতিহাসকে বিকৃত করতে না পারে, সে বিষয়ে সদাজাগ্রত থাকতে হবে।
বাংলাদেশ চিরকাল বাংলাদেশই থাকবে—যেখানে জিন্নাহর মতো শোষকদের কোনো স্থান নেই, বরং প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে চিরকাল অম্লান থাকবেন বঙ্গবন্ধু এবং ত্রিশ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগ। আমাদের শৌর্য-বীর্যের ইতিহাসকে সমুন্নত রেখে একটি প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়াই হোক আমাদের একমাত্র অঙ্গীকার।
# রাকীব হুসেইন: লেখক, প্রাবন্ধিক।
