দৃশত জামানত ছাড়াই ক্ষুদ্র ঋণ বা অতি উচ্চহারে সুদখোর রক্তচোষা মহাজন ড. মুহাম্মদ ইউনুস তার গ্রামীণ ব্যাংক এর মাধ্যমে গ্রামীন নারীদের চরমভাবে শোষণ করেছেন। তার এই ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে তা পরিশোধ করতে না পেরে বাংলাদেশে কত নারী যে চরমভাবে অপমানিত হয়েছে ও আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন তার কোন সঠিক পরিসংখ্যানও নেই।

তবে বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে দেখা গেছে- কোন কোন ঋণগ্রহীতার ঘরের টিন, গরু-ছাগল ইত্যাদি নিয়ে গেছেন ইউনুসের লেলিয়ে দেয়া গ্রামীণ ব্যাংকের লোকজন।

একটি মিথ তৈরী করা হয়েছে যে ইউনুস নারীদের ক্ষমতায়নের জন্য অনেক কিছু করেছেন। তার কারণেই বাংলাদেশের গ্রামীন নারীরা সম্মানিত ও অর্থনৈতিকভাবে-সামাজিকভাবে সম্মানিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। কিন্তু সেটি একেবারেই ডাহা মিথ্যে কথা।

তিনি নারীদেরকে প্রতিষ্ঠিত করার পরিবর্তে ‘নারীলিপ্সু’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। যার উদাহরণ না দিলেও দেশবাসী জানেন।

আর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জোবরা গ্রামে যে সুফিয়া বেগমকে নিয়ে এই ইউনুস তার ক্ষুদ্রঋণ মডেল ও গ্রামীণ ব্যাংক শুরু করেছিলেন সেটি অনেকটা পড়ে গেছে লোকচক্ষুর অন্তরালে। এই সুফিয়া তার কাছ থেকে লোন নিয়ে প্রচণ্ড রকমের স্বাবলম্বী হয়েছিলেন, এমনকি পাকা বাড়িও তৈরী করেছিলেন এমন একটি আষাঢ়ে গল্প কিন্তু প্রচার-প্রচারণা করতে সক্ষম হয়েছেন ইউনুস তার বশংবদ কিছু সংবাদমাধ্যম কর্মীদের মাধ্যমে। অনেক সংবাদমাধ্যম তা যাচাই বাছাই না করেই বেশ ফলাও করে প্রচার করেছিলেন।

বিশেষ করে ২০০৬ সালে শান্তিতে নোবেল পাওয়ার পরতো আর ইউনুসকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমার সেই জোবরা গ্রামে সুফিয়াদের বাড়িতে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। কিন্তু ততদিনে সুফিয়া মারা গেছেন। তার দুই কন্যার সঙ্গে ও তাদের আশপাশের গ্রামীন লোকজনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কথা বলার সুযোগ ঘটেছিল। একটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা টিভির একটি টীমও কিন্তু সেই জোবরা গ্রামে গিয়ে ইউনুসের সেই বাগাড়ম্বর ও জারিজুরি প্রকাশ করে দিয়েছিলো।

আমি মূলত গিয়েছিলাম অনেকটা কৌতুহলবশত। যেহেতু নারী অধিকার নিয়ে কিছুটা কাজ করি তাই একটু আগ্রহতো আছেই। তারমধ্যে চট্টগ্রামে হাটহাজারিতে অবস্থানরত এক পরিচিত সংবাদকর্মীর মাধ্যমে জানতে পারি যে, আসলে ইউনুসের সেই ‘সুফিয়া’ মিথটি আসলে একটি মিথ্যে প্রচারণা মাত্র। প্রথমে বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল। কারণ ততদিনে আমরা সংবাদ মাধ্যমের বদৌলতে জানতাম সুফিয়া ইউনুসের সেই জামানতবিহীন লোন নিয়ে প্রচণ্ড রকমের স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন।

এমনকি পাকা বাড়িও তৈরী করেছেন।তো সেই সংবাদকর্মীটির তথ্য প্রথমে কিছুটা সন্দেহের চোখে দেখছিলাম। তো নিজের অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য,তথ্য যাচাইয়ের জন্য একদিন চলে গেলাম চট্টগ্রামে হাটহাজারির সেই জোবরা গ্রামে।

সাথে স্থানীয় আরেকজন সংবাদকর্মীকে নিয়েছিলাম যিনি একসময়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন। চট্টগ্রামের ভাষা জানেন মানে তিনি চট্টগ্রামেরই বাসিন্দা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় এই জোবরা গ্রামে তাদের কিছু ফিল্ড স্টাডিও করেছেন। তবে হাটহাজারির সেই সংবাদকর্মীটিকে কিছুই জানাইনি, কারণ তাতে তিনি হয়তো আমাকে মিসগাইড করতে পারেন এটি মনে করে।

কারণ আগে থেকেই জানতাম, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও এর আশপাশের এলাকাগুলো জামায়াত-শিবির ও কওমী মাদ্রাসার অনুশাসনে চলে। সেখানে গিয়ে নারীদের ব্যাপারে কাজ করা অনেকটা ঝুঁকিও ছিল।

তবে আমি পর্দা না করলেও আমার ওড়নাটিকে মাথায় দিয়ে নিয়েছিলাম যাতে পর্দাপ্রথার কিছুটা হলেও রক্ষা হয় সাম্প্রদায়িক নারীবিদ্বেষী গোষ্ঠীর কাছে। অনেকটা শংকাও কাজ করছিল।

অচেনা জায়গা, আমিও অপরিচিত। আবার কিছু অতিরিক্ত বলে ফেললে রোষানলের শিকার হতে হয় এ ভয়ও কাজ করছিল।
একটি বিষয় মাথায় কাজ করছিল যে, আমাদের এই নোবেল লরিয়েট ইউনুস তার ভাষণে সবসময়ে বলে এসেছেন-তার এই ক্ষুদ্রঋণের কারণে উপকারভোগীর সংখ্যা এত পরিমাণ বেড়ে যাবে যে, একসময়ে বাংলাদেশ থেকে দারিদ্রই বিলুপ্ত হবে।

শুধু তাই নয় –“দারিদ্র্যকে আমরা যাদুঘরে পাঠাতে চাই।” এমন সব স্বপ্ন ও বাগাড়ম্বর করে পুরো জাতিকে তিনি বিভ্রান্তির ঘেরাটোপে ফেলে দিয়েছিলেন। আর তখনতো তিনি মাত্র নোবেল জয় করে ফিরেছেন। তো স্বাভাবিকভাবেই তার সেই বক্তব্যতো একেবারে শিরোধার্য।

অবিশ্বাস করার কোন যো নেই। আমি নিজেও অনেকটা কনফিউজ হয়ে গিয়েছিলাম এই মহামান্য (!!) নোবেল লরিয়েটের কথায়।

তো সেই জোবরা গ্রামে সুফিয়াদের বাড়িতে গিয়েতো আমাদের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেলো। সুফিয়া ততদিনে পরপারে। তার এক মেয়ে তখন অনেকটা অপ্রকৃতস্থ। আরেক মেয়ে কথা বলেন চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায়। আমিতো ঢাকাইয়া, তো ভরসা চট্টগ্রাম থেকে আমার সঙ্গী সংবাদকর্মীবন্ধু।

দুর্ভাগ্যবশত তাদের নাম মনে নেই এখন আর। তবে সেই ভাঙ্গাচোরা ঘরটির পাশে একটি পাকা বাড়ি দেখেছিলাম। সুফিয়ার মেয়েকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি আপনাদের ওই পাকা বাড়িতে না থেকে এই ঘরে থাকেন কেন?

এরই মধ্যে সেখানে আরো কয়েকজন প্রতিবেশি গ্রামবাসী উপস্থিত হয়েছিলেন। সুফিয়ার মেয়েতো হতবাক ও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলেন আমার প্রশ্ন শুনে। বললেন- ওটিতো দুবাইআলা অমুকের বাড়ি। সেময় প্রতিবেশি অন্যরাও তেমনটিই স্বাক্ষ্য দিলেন।

আমাদেরতো আক্কেলগুড়ুম! বলে কি? এমন সময় সেই পাকা বাড়ির লোকজনও এলেন, তারাও এর সত্যতা নিশ্চিত করলেন। আর আমরা ভাবছিলাম কি এক ভয়ংকর মিথ্যে ও প্রতারণার মধ্যে দিয়ে আমরা এই সমাজে বাস করি, যেখানে নোবেল লরিয়েট ইউনুসের সাফল্য গাওয়ার জন্য এমন প্রতারণার আশ্রয় নেয়া হয়েছে।

লোকজনতো উল্টো সাংবাদিক আর গ্রামীণ ব্যাংক-এনজিওদের নামে যাচ্ছেতাই গালিগালাজ শুরু করেছে। তাদেরকে অনেক বুঝিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করছেন আমার সেই চট্টগ্রামের সাংবাদিক বন্ধুটি যে, আমরা সাংবাদিক নই, একটু জানতে এসেছি মাত্র সত্যি ঘটনা।

ভাগ্যিস আমার কাছে আমার তৎকালীন বেসরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের একটি পরিচয়পত্র ছিল। তা দেখিয়ে তাদেরকে অনকেটা শান্ত করতে পেরেছিলাম। আর সাংবাদিক বন্ধুটিও বলছিলেন যে, তিনি এই পাশের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়েছেন, এই গ্রামে এসেছিলেন আগে তাদের পড়াশোনা সংশ্লিষ্ট কাজে। তখন তারা কিছুটা আশ্বস্ত হন।

এত কাসুন্দি ঘাটলাম এজন্য যে, বাস্তব অবস্থাটি কি ছিল সেটি বোঝানোর জন্য। নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং গ্রামীণ ব্যাংকের এই নারীর অর্থনৈতিক মুক্তির দাবিকে কেন্দ্র করে যেসব তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায় তাতে করে কোনভাবেই প্রতীয়মান হয়না যে, গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে কোন নারী স্বাবলম্বী হয়েছেন। বরং তার ঋণের বোঝা বেড়েছে।

জোবরা গ্রামের সেই সুফিয়া বেগমের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে বলে বিশ্বপ্রতারক-জোচ্চোর ড. ইউনুস ও তার অনুসারিরা দাবি করেছেন তা নিতান্তই একটি মিথ্যে প্রচারণা মাত্র।

ক্ষুদ্রঋণ আন্দোলনের আইকন বা আদর্শ রূপ হিসেবে সুফিয়া বেগমকে বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপন করা হলেও পরবর্তীতে ডেনিশ সাংবাদিক টম হাইনম্যানের তৈরি “দ্য মাইক্রো ডেট” (The Micro Debt) নামক তথ্যচিত্রে ভিন্ন চিত্র উঠে আসে।

অভিযোগ রয়েছে- যে দারিদ্র্যের ধারাবাহিকতা থেকে সুফিয়া বেগম বা তার পরিবার দীর্ঘমেয়াদে চরম দারিদ্র্য থেকে বের হতে পারেননি। ১৯৯৮ সালে সুফিয়া বেগমের মৃত্যুর পর তার সন্তানেরা চরম অভাবের মুখোমুখি হন।

মিথ্যা গৃহের প্রচারণা অভিযোগ ওঠে যে গ্রামীণ ব্যাংক ও বিদেশি গণমাধ্যমগুলো সুফিয়া বেগমের দারিদ্র্য মুক্তির প্রমাণ হিসেবে যে পাকা বাড়িটি ক্যামেরায় দেখাত, তা আসলে এক দুবাই প্রবাসীর মালিকানাধীন ছিল, সুফিয়া বেগমের নিজের নয়।

আমি জোবরা গ্রামের আরো অনেকের সঙ্গে কথা বলে যে চিত্র পেয়েছি তা হলো- অনেক ঋণগ্রহীতাই ক্ষুদ্রঋণের উচ্চ সুদের চক্রে পড়ে আরও বেশি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন এবং এই মডেল তাদের জীবনযাত্রার স্থায়ী বা মৌলিক পরিবর্তন করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়।

ক্ষুদ্রঋণকে নারীর সামাজিক ক্ষমতায়নের হাতিয়ার হিসেবে দাবি করা হলেও এর পেছনে থাকা কাঠামোগত দুর্বলতা নিয়ে সমাজবিজ্ঞানীরা সমালোচনা করে বলেছেন- এখানে মূলত পুরুষতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণই চলছে। গ্রামীণ ব্যাংক প্রধানত নারীদের ঋণ দিলেও গ্রামীণ সমাজে সেই অর্থ ব্যবহারের নিয়ন্ত্রণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পুরুষ বা পরিবারের স্বামীদের হাতে চলে যেত।

ফলে নারী কেবল কিস্তি পরিশোধের আইনি দায়বদ্ধতার শিকার হতেন, কিন্তু প্রকৃত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা পেতেন না। গ্রামীন ব্যাংকের লোভনীয় অফারে প্রলুব্ধ হয়ে লোন নেয়ার পর ব্যাংকের কিস্তি শোধ করার জন্য অন্য এনজিও বা দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে পুনরায় উচ্চ সুদে ঋণ নেওয়ার একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থায়। যাকে অর্থনীতিতে ঋণের চক্র বলা হয়।

এতে করে শুধু ওই নারীর নয়, তার পরিবার ও তার আশপাশের লোকজনের সামাজিক মর্যাদা ক্ষুন্ন হয়েছে-হচ্ছে এবং হবে প্রতিনিয়ত। কিস্তি দিতে না পারার কারণে গ্রামীণ নারীদের সামাজিকভাবে লাঞ্ছিত হতে হয়। এই চাপ যা অনেক সময় চরম মানসিক অবসাদ এবং আত্মহত্যার মতো ঘটনাতেও রূপ নিয়েছে।

কয়েকটি ছোট উদাহরণ দিলেই তা স্পষ্ট হয়ে পড়বে পাঠকদের কাছে। যদি গত কয়েকবছরের সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত এ ধরনের বেশকিছু কেইসস্টাডি আপনাদের সামনে তুলে ধরতে পারতাম তাহলে বুঝতে পারতেন যে এই সুদখোর ইউনুস আসলে ক্ষুদ্র লোনের নামে গ্রামীন নারী ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে ধ্বংস করেছে।

গ্রামীণ ব্যাংকের প্রায় ৯৭ শতাংশ ঋণগ্রহীতাই নারী। আপাতদৃষ্টিতে একে নারীর ক্ষমতায়ন মনে হলেও অনেক অর্থনীতিবিদ ও সমাজ গবেষক একে “ডেথ ট্র্যাপ” বা “মৃত্যুফাঁদ” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ক্ষুদ্রঋণের উচ্চ সুদ (যা অনেক সময় ৩০ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশ বা তার চেয়েও বেশি কার্যকর সুদে রূপ নেয়) এবং প্রতি সপ্তাহে কঠোরভাবে কিস্তি আদায়ের পদ্ধতি গ্রামীণ নারীদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে।

কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে না পেরে নারীদের সর্বস্ব হারানো এবং আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়ার বহু বাস্তব ও লোমহর্ষক উদাহরণ দেশের গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। সেখান থেকেই কিছু উদাহরণ তুলে ধরছি।
রাজশাহীর পবা উপজেলার মিনারুল ও মনিরার পারিবারিক নির্মম আত্মহত্যাকে আপনারা কি বলবেন?

২০২৫ সালে রাজশাহীর পবা উপজেলার বামনশিকড় গ্রামে গ্রামীণ ব্যাংকসহ একাধিক এনজিওর ঋণের কিস্তির চাপে মিনারুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী মনিরা খাতুন চরম দিশেহারা হয়ে পড়েন। ঋণের বোঝা সইতে না পেরে শেষ পর্যন্ত তাঁরা নিজেদের দুই সন্তানসহ বিষপান করে আত্মহত্যা করেন, যা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

২০২৪ সালে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে পুতুল বেগম আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়। যতদূর তথ্য পাওয়া যায়- ২০২৪ সালের জুলাই মাসে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের পুতুল বেগম (৫০) নামের এক নারী ঋণের কিস্তির টাকা জোগাড় করতে ব্যর্থ হন। গ্রামীণ ব্যাংকসহ কয়েকটি সংস্থা থেকে নেওয়া ঋণের ক্রমাগত চাপে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে তিনি নিজ বাড়িতে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন।

যে চট্টগ্রাম থেকে ইউনুস তার এই রক্তচোষা সুদের কারসাজি ব্যবসা শুরু করেছিলেন সেই চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলাতেই ২০২৩ সালে এমন আত্মহত্যার একটি করুন ঘটনা ঘটে। রাঙ্গুনিয়ায় এক গৃহবধূ গ্রামীণ ব্যাংক ও অন্য এনজিও থেকে প্রায় দেড় লাখ টাকা ঋণ নেন।

ঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করতে না পারায় মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের মানসিক চাপ ও লাঞ্ছনা সহ্য করতে না পেরে তিনি আত্মহননের পথ বেছে নেন।

২০১৭ সালে সিরাজগঞ্জের জরিনা খাতুনও বাধ্য হয়ে নিজের জীবন বিসর্জন দিতে বাধ্য হন। দেন। সিরাজগঞ্জের চৌহালীর জরিনা খাতুন গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণের কিস্তি দিতে না পেরে চরম দারিদ্র্যের মুখে গলায় ফাঁস দেন।

এই গ্রামীণ ব্যাংকটিকে এখন মনে করা হয় যে এটি মূলত ড.ইউনুসের মালিকানাধীন ব্যাংক। কিন্তু তা কিন্তু নয় আসলে। আগে সরকারি অংশীদারিত্ব ছিল ২৫ শতাংশ। কিন্তু বিগত ২০২৪ এর আগষ্টে ইসলামী জঙ্গী-সেনা ক্যু এর পর ইউনুসের শাসনামলে তা একেবারেই কমিয়ে আনা হয় তার ক্ষমতার জোরে।

১৯৮৩ সালে গ্রামীণ ব্যাংক যখন একটি স্বাধীন ব্যাংক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, তখন থেকেই এতে সরকারের একটি উল্লেখযোগ্য অংশীদারিত্ব ও নিয়ন্ত্রণ ছিল। পরিচালনা পর্ষদে চেয়ারম্যানসহ ৩ জন পরিচালক নিয়োগের ক্ষমতা সরকারের হাতে ছিল।

পরিচালনা পর্ষদে সরকারি পরিচালক ৩ জন থেকে কমিয়ে ১ জন করা হয়।সমালোচকদের মতে, এই পরিবর্তনের উদ্দেশ্য একটিই- ব্যাংকটির ওপর থেকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা এবং ইউনুসের নিজের একচ্ছত্র ক্ষমতা ভোগ করা।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিশ্বমঞ্চে ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে দীর্ঘদিন ধরে বেশ কিছু আকর্ষণীয় ও আশাজাগানিয়া শ্লোগান দিয়ে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। তার মধ্যে অন্যতম বিখ্যাত উক্তি ছিল—“একদিন আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দারিদ্র্য দেখতে জাদুঘরে যাবে”।

১৯৯০ ও ২০০০-এর দশক জুড়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনার, বিশেষ করে ২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার পর ওসলোর নোবেল মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি দৃঢ়ভাবে এই আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি গ্রামীণ ব্যাংককে উপস্থাপন করেছিলেন “আশার বার্তা” হিসেবে, যার লক্ষ্য ছিল গৃহহীনতা ও চরম দারিদ্র্যকে জাদুঘরে পাঠানো।

এর পাশাপাশি ‘নারীর ক্ষমতায়ন’ এবং ‘গরীবী হটাও’-এর মতো শব্দবন্ধগুলো গ্রামীণ ব্যাংকের বিপণন কৌশলের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।

দাবি করা হয়েছিল, প্রথাগত জামানতহীন এই ঋণ গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করবে এবং সমাজে তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করবে।

তবে সমালোচকদের মতে, এগুলো বহুলাংশে ‘বাগাড়ম্বর’ বা কথার কথা হিসেবেই রয়ে গেছে। বাস্তবে ক্ষুদ্রঋণ সাময়িকভাবে কিছু মানুষের সহায় হলেও সামগ্রিকভাবে একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে দীর্ঘমেয়াদী ঋণের ফাঁদে ফেলেছে।

ক্ষুদ্রঋণ সংস্থাগুলোর উচ্চ ঋণ রিকভারি রেটের (প্রায় ৯৫ শতাংশ থেকে ৯৬ শতাংশ) পেছনে লুকিয়ে আছে মাঠ পর্যায়ের এক নির্মম সত্য। ঋণ আদায়ের জন্য যে সমস্ত পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, তা অনেক ক্ষেত্রেই মানবাধিকার লঙ্ঘন করে:

১. গ্রামীণ ব্যাংকের মডেল অনুযায়ী ৫ জনের গ্রুপ তৈরি করে ঋণ দেওয়া হয়। একজন কিস্তি দিতে না পারলে বাকিদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। ফলে গ্রামের অন্য নারীরা এসে ঋণখেলাপি নারীর বাড়ি ঘেরাও করে বা লাঞ্ছিত করে।

২. কিস্তির টাকা না দিলে মাঠকর্মীরা অনেক সময় ঘরের টিন, গবাদি পশু বা রান্নার হাঁড়ি-পাতিল পর্যন্ত ধরে নিয়ে যায়।

৩. অনেক সময় ঋণ দেওয়ার নামে নারীদের কাছ থেকে অগ্রিম ব্লাঙ্ক বা ফাঁকা চেক নেওয়া হয়। কিস্তি দিতে দেরি হলে চেক ডিজনারের মামলা দিয়ে গ্রামীণ নারীদের কারাবাসের ভয় দেখানো হয়।

পাঠকদের সবিনয়ে একটু স্মরণ করিয়ে দিতে চাই—এই সুদখোর ইউনুস ২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার পর চট্টগ্রামে গঠিত ‘নোবেলজয়ী ইউনূস সুহৃদ-চট্টগ্রাম’ (বা ইউনূস সুহৃদ পরিষদ)নামে একটি সংগঠনের “পয়দা” হয়।

এটির মূল কাজ হলো- তার সম্মান রক্ষা, তার দর্শন প্রচার এবং সামাজিক ব্যবসা সংক্রান্ত কর্মকাণ্ড এগিয়ে নেওয়া।

‘ইউনূস সুহৃদ-চট্টগ্রাম’ সংগঠনের শীর্ষস্থানীয় দায়িত্বশীল ও প্রধান ব্যক্তিবর্গের মধ্যে ছিলেন–সভাপতি প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক প্রফেসর মু. সিকান্দর খান।

সাধারণ সম্পাদক ও সংগঠনটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বীর মুক্তিযোদ্ধা ও নৌ-কমান্ডো ফারুক-ই-আজম বীর প্রতীক। তিনি এই ইউনুসের তাবেদারি ও আওয়ামীলীগসহ শেখ হাসিনার বিরোধীতার “ বড় ইনা “ পেয়েছেন।

তা হলো- ২০২৪ সালে শেখ হাসিনাকে ক্যু এর মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করার পর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মুক্তিযোদ্ধা উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পান। অন্যান্য কথিত বিশিষ্ট সুহৃদ ও কর্মকর্তা হলেন-সাবেক চেম্বার প্রেসিডেন্ট আমির হুমায়ূন মাহমুদ চৌধুরী (এখনকার অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ভাই)।

চট্টগ্রামে সংবাদপত্র মালিক-সম্পাদকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সুবিধেভোগী ( সব সরকারের আমলে) দৈনিক আজাদ ‘র এম. এ মালেক, চিকিৎসক ডা. কিউএম অহিদুল আলম (প্রতিষ্ঠাতা সহ-সভাপতি), আরেক ধান্ধাবাজ সাংবাদিক ওসমান গনি মনসুর, জামায়াত শিবিরের আইনজীবী ও এলএলবি পরীক্ষায় জালিয়াতি করে পাশ করা আইনজীবী এডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান প্রমুখ।

চট্টগ্রামের আরেকজন প্রাবন্ধিক-বুদ্ধিজীবী রয়েছেন আবুল মোমেন নামে। তিনি প্রয়াত শিক্ষাবিদ আবুল ফজলের পুত্র, যেই আবুল ফজলকে বঙ্গবন্ধু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি বানিয়েছিলেন। সেই আবুল ফজল আবার বঙ্গবন্ধু হত্যার পর জিয়াউর রহমানের শিক্ষা উপদেষ্টার পদও অলংকৃত (!?) করেছিলেন।

সেই আবুল মোমেনও কিন্তু বিগত সব সরকারের আমলে সরকার থেকে নানাভাবে সুযোগ সুবিধা নিয়েছেন। তবে আওয়ামীলীগ থেকে সবচেয়ে বেশি নিয়েছেন।

চট্টগ্রামের লোকজন জানিয়েছেন, এই আবুল মোমেন সাহেব, ফুলকি নামে শিশুদের একটি স্কুল খুলে সেখান থেকে লাখ লাখ টাকা আয় করেন। ছিলেন আওয়ামীলীগ-শেখ হাসিনা বিরোধী ও গত চব্বিশের “ ইসলামী জঙ্গী-সেনা ক্যু” এর অন্যতম মিডিয়া প্রথম আলোর চট্টগ্রামের প্রধান বা আবাসিক সম্পাদক।

তবে তাকে আবার দেশের মানুষজন চেনেন প্রগতিশীল মুক্তমনা সুশীল হিসেবে। কিন্তু ফুলকি নামের যে প্রতিষ্ঠানটি রয়েছে সেটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান বা ট্রাষ্টির অধীনে হলেও মূলত আবুল মোমেনের ইশারায় ও তার কথামতো সব চলে।

তো এই আবুল মোমেন নামের বুদ্ধিজীবী ইউনুসের প্রশংসা সভায় তিনি মূলত ড. ইউনূসের অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ ও শিক্ষার দর্শন নিয়ে আলোচনা করেন। তার বক্তব্যের মূল বিষয়গুলো ছিল-দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ গঠনে ড. ইউনূস বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে যেভাবে সম্মানিত করেছেন এবং “দারিদ্র্যকে জাদুঘরে পাঠানোর” যে স্বপ্ন দেখিয়েছেন, তা কেবল ক্ষুদ্রঋণ নয়, বরং মানুষের চিন্তাভাবনার পরিবর্তনের মাধ্যমে সম্ভব।

তিনি ( মোমেন) প্রশংসা করতে গিয়ে বলেন- সামাজিক পুঁজির বিকাশ নিয়ে ড. ইউনুস গ্রামীণ ব্যাংক ও সামাজিক ব্যবসার ধারণাকে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে উল্লেখ করেন। এমনকি ড. ইউনূসের মতো আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বকে নিয়ে যেকোনো প্রকার ( আওয়ামীলীগ আমলে) রাষ্ট্রীয় হয়রানি বা অসম্মানজনক আচরণের তীব্র সমালোচনা করেন।

তার মানে দেখা যাচ্ছে মার্কিন ডিপষ্টেটের টাকা কিন্তু সমাজের বিভিন্ন স্তরে ঢুকে গেছে। এই যে ইউনুস সুহৃদ পরিষদ হিসেবে যাদের নাম বলরঅম তারাতেদা আছেনই, এর পাশাপাশি আবুল মোমেনদের মতো সম্মানিত ব্যাক্তিরাও বেশ মজা লুটেছেন।

তো ইউনুসের মত একজন বিশ্ববাটপার-বেহায়া-প্রচন্ড ক্ষমতালোভী-বাংলাদেশটিকে আমেরিকার বশংবদ একটি পরাধীন রাষ্ট্র বানানোর অন্যতম ষড়যন্ত্রকারিরা যারা অনুসারি ও প্রশংসাকারী তারা আর যাই হোক দেশপ্রেমিক হতে পারেন না।

প্রকারান্তরে ইউনুস যেমন নারী নির্যাতনকারি, নারী হত্যাকারী হিসেবে চিহ্নিত তার গ্রামীন ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণ এর মতো রক্তচোষা তেমনি তার সহায়তাকারিরাও তেমনটি হবেন এ আর নতুন কি?! তা যত বড় বুদ্ধিজীবী বা একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধাই হোন না কেন ?

# ইশরাত জাহান: লেখক, প্রাবন্ধিক ও নারী অধিকার কর্মী।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *