চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম বন্দরের সংবেদনশীল স্থাপনা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ছবি-ভিডিও ধারণ এবং অনুমতি ছাড়া তা প্রচারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

বিষয়টা অত্যন্ত ঘোর প্যাঁচ না হয়ে গেলো না? সমালোচনা তর্ক বিতর্ক হচ্ছে এই অনুমতির বিষয়টা নিয়ে।

রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট সংবেদনশীল স্থান, তথ্য, নকশা, ছবি বা অন্যান্য বিষয়ের অননুমোদিত ধারণ, প্রকাশ বা প্রচার আইনত অপরাধ হয় যখন সেটি গুপ্তচরবৃত্তিতে হয়।

সাংবাদিকতা তো গুপ্তচরবৃত্তি নয়।

তাহলে কি সাংবাদিকদের গড়পড়তা গুপ্তচর বলে আখ্যায়িত করা হল? প্রশ্ন উঠছে।

আইনের ৩ এর গ ধারায় বলা হয়েছে—”গ) কোনো গোপন সরকারি সংকেত বা পাসওয়ার্ড, অথবা কোনো নকশা, পরিকল্পনা, মডেল, বস্তু, নোট, অন্য কোনো নথি বা তথ্য সংগ্রহ, ধারণ, লিপিবদ্ধ, প্রকাশ বা অন্য কোনো ব্যক্তির কাছে সরবরাহ করে, যা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে শত্রুর কাজে লাগতে পারে, লাগার সম্ভাবনা রয়েছে বা শত্রুর কাজে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে তৈরি/সংগ্রহ করা হয়েছে— তাহলে তিনি এই ধারার অধীনে একটি অপরাধ করেছেন বলে গণ্য হবেন।”

প্রশ্ন হলো—চট্টগ্রাম বন্দরের কোথায় মনে হলো যে সাংবাদিকরা কোনো ‘বাইরের শত্রু রাষ্ট্রের’ কাছে তথ্য পাচার করছেন?

এখন তো কোনো অনিয়মের ছবি উঠবে না, তাই না?

বন্দরের অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ব্যর্থতা, কনটেইনার গায়েব হওয়ার ঘটনা নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করলেই সেটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে কাজ হিসেবে বিবেচিত হবে? শাস্তি হবে হয়তো তাঁর।

এই বিজ্ঞপ্তি মূলত এমন একটি সময়ে দেওয়া হয়েছে, যখন চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে নানা আন্দোলন, অনিয়ম, দুর্নীতি, কনটেইনার গায়েব এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

অনুমতি ছাড়া তথ্য সংগ্রহ বা প্রকাশ করা হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সতর্কতা দেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রধান সামুদ্রিক প্রবেশদ্বার এবং আমদানি-রফতানি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও জাতীয় নিরাপত্তা বিধিমালা অনুসরণ করে পরিচালিত এই বন্দর ‘ক’ শ্রেণির কেপিআই হওয়ায় এর নিরাপত্তা ও সংবেদনশীল স্থাপনার সুরক্ষা জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।

আইএসপিএস অনুসরণকারী বন্দর হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দর ‘জিরো অবজারভেশন’ অর্জন করেছে বলেও উল্লেখ করা হয়।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২২-এর ১২ ধারা অনুযায়ী বন্দরের সীমানার সব স্থান ও স্থাপনা সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে বিবেচিত। পাশাপাশি অফিসিয়াল সিক্রেট অ্যাক্ট, ১৯২৩ অনুযায়ী সংবেদনশীল স্থান, তথ্য, নকশা বা ছবি অনুমতি ছাড়া ধারণ ও প্রচার আইনত দণ্ডনীয় হতে পারে।

তাই কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, নজরদারি, প্রবেশ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, জাহাজ ও কার্গো ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য সংবেদনশীল স্থাপনার ছবি, ভিডিও বা স্কেচ ধারণ ও প্রচার থেকে সবাইকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সাংবাদিকরা প্রশ্ন করছেন: “নিরাপত্তার নামে যদি প্রশ্ন করা নিষিদ্ধ হয়, ছবি তোলা নিষিদ্ধ হয়, তথ্য সংগ্রহ নিয়ন্ত্রণ করা হয় এবং সংবাদ প্রকাশের আগে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিতে হয়, তাহলে সেটি শুধু বন্দরের নিরাপত্তার বিষয় থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে স্বাধীন সাংবাদিকতার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার প্রশ্ন”।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *