আমাদের দেশের রাজনৈতিক দল, বন্দর ব্যবহারকারি ও শ্রমিক সংগঠনসহ বিভিন্ন সুশীল বিশেষজ্ঞদের নানা সময়ে তাদের অবস্থান দেখলে সত্যিই ভাবি তখন সত্যিই কি বিচিত্র এ দেশ!

কত বিচিত্র এখানকার নাগরিকদের মনমানসিকতা। এরা কখনো দেশপ্রেমিক সাজে, প্রচণ্ড বিরোধিতা করে। আবার কখনো ডলার হজম করে নিজ দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিতেও দ্বিধা করেনা।

এই যে দেশ বিকিয়ে দিচ্ছে ডলারের লোভে তখনো কিন্তু এরা কথিত দেশপ্রেমের দোহাই দিয়ে দেশের মূল ভিত্তি, মূল নীতিকেই জলাঞ্জলি দিতে কখনো দ্বিধা করেনা।

এই চরম বৈপরীত্যের মধ্য দিয়েই এসব সমাজপতি, রাজনৈতিক নেতা ও নীতিনির্ধারকরা দেশের সাধারণ মানুষের মাথায় কাঁঠাল ভেঙ্গে খাচ্ছেন।

তা সেই বন্দর হোক, বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে মিয়ানমারে কথিত মানবিক করিডোর দেয়া হোক, বাংলাদেশের পাহাড়ি কয়েকটি জেলা ও ভারতের কিছু অংশ নিয়ে পৃথক একটি খ্রীষ্টান রাষ্ট্র গঠনের ষড়যন্ত্র হোক।

পাশাপাশি বৃহত্তর কক্সবাজার ও সমুদ্র এলাকা ঘিরে আমেরিকান আধিপত্য বা তাদের ঘাঁটি হোক সবই যেন এখন সওয়া হয়ে গেছে। কোন কিছুতেই যেন আর রাজনীতিবিদদের গায়ে লাগেনা।

বরং একশ্রেণীর রাজনীতিবিদ ও কথিত চিন্তাবিদ-সুশীল সমাজের নেতারা তাদের সহায় সম্পত্তি ও বিত্ত বৈভব কেমন করে বাড়াবে সে চিন্তায় মশগুল। দেশ গোল্লায় যাক, তাতে তাদের কিছুই আসে যায় না।

অতি সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি (নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল) একটি বিদেশী প্রতিষ্ঠানকে ১৫ বছরের ইজারা দেয়া নিয়ে রাজনীতির মাঠ আবার কিছুটা উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। তবে এটিও যে খুব বেশিদিন উত্তপ্ত থাকবে তা কিন্তু নয়।

কারণ এখানেও আন্ডারহ্যান্ড ডিলিং বা অবৈধ লেনদেনের ব্যাপারটি কাজ করছে।
এনসিটি সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক আন্তর্জাতিক টার্মিনাল অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ১৫ বছরের জন্য ইজারা দেওয়ার চুক্তিটি ৮ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে।

তবে এই ডিপি ওয়ার্ল্ড এর পেছনে আমেরিকান লবি অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে কাজ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যা মূলত অন্তরালেই থাকছে আপাতত। প্রয়োজন অনুযায়ী তারা তাদের আত্মপ্রকাশ ঘটাবে। যেমনটি ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী করেছিল।

কেউ কেউ হয়তো বলবেন- কেন এই প্রতিষ্ঠানতো বিশ্বের আরো বেশ কয়েকটি দেশের বন্দরে কাজ করছে, তাদের কি কোন সমস্যা হয়েছে? অবস্থা ও পরিস্থিতি অনুযায়ী নানা কৌশলে ব্রিটিশরা যেমন কাজ করতো একসময়ে সারাবিশ্বে তেমনি আমেরিকাও পরিস্থিতি বুঝে তাদের কাজ করে থাকে।

এক্ষেত্রে আমার ১৯৯৬-২০০১ সাল মেয়াদে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় আমেরিকান প্রতিষ্ঠান এসএসএ (স্টিভিডোর সারভিসেস অব আমেরিকা) এর প্রস্তাবিত টারমিনাল তৈরী করার প্রস্তাব ও তখনকার তীব্র আন্দোলন সংগ্রামের কথা মনে পড়ে যায়।

তখন যে তীব্র আন্দোলন গড়ে উঠেছিল এখন কিন্তু তা নেই। তখন কিন্তু আওয়ামীলীগের মধ্যেও এর বিরুদ্ধে একটি অবস্থান ছিল। আর বাম-ডান-ইসলামপন্থীরাতো বিরোধী ছিলই। তখন বিরোধীতাকারিদের যুক্তি ছিল- ‘আমেরিকাকে এখানে টারমিনাল করার অনুমতি দিলে তা দেশের স্বার্থবিরোধী হবে। আমেরিকা একসময়ে বাংলাদেশকেই তাদের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করবে। সুতরাং এটি কোনভাবেই করতে দেয়া যাবেনা।’

তবে এই এসএসএ বিরোধী আন্দোলনের পেছনে অবশ্য চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও আওয়ামীলীগ নেতা এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী দৃঢ়ভাবে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

তার সেসব যুক্তি ও আন্দোলনে কিন্তু শুধু চট্টগ্রামের নাগরিকরাই নয় সারাদেশের লোকজনই সাড়া দিয়েছিল।

রাজনীতিবিদগণও সাড়া দিয়েছিলেন, পক্ষে ছিলেন দলমত নির্বিশেষে।

এমনকি মহিউদ্দিন চৌধুরীর রাজনৈতিক মতের বিরোধীতাকারিরাও এই আন্দোলনে কিন্তু মহিউদ্দিনকে সমর্থন দিয়েছিলেন।

তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও কিন্তু এ নিয়ে মহিউদ্দিন চৌধুরীর প্রচন্ড রকমের বিরোধ ও দূরত্ব তৈরী হয়েছিল। কিন্তু মহিউদ্দিন চৌধুরী তার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। এমনকি এ নিয়ে তিনি ( মহিউদ্দিন) সর্বোচ্চ আদালতে মামলা করে জিতেছিলেন। পাশাপাশি তীব্র গণ আন্দোলনকেও আদালত বিবেচনায় নিয়েছিলেন।

চট্টগ্রাম বন্দর তথা চট্টগ্রামের অধিকার আদায়ে, চট্টগ্রামে উন্নয়নে ও স্বার্থ রক্ষায় সত্যিকারভাবে এমন একজন লড়াকু রাজনীতিবিদ অঅর জন্ম নেয়নি চট্টগ্রামে। আর জন্ম নেবে বলেও আশা নেই।

কারণ রাজনীতি যখন ব্যবসা আর নিজস্ব স্বার্থ রক্ষায় ব্যবহৃত হয় তখন স্বাভাবিকভাবেই সে আশার করা দুরুহ। আমরা ঢাকায় বসেই কিন্তু চট্টগ্রামে মহিউদ্দিন চৌধুরীর এ আন্দোলনকে প্রত্যক্ষ করেছিলাম।

কিন্তু এবার আমেরিকার তাবেদার সুদী ইউনুস ও তার সুযোগ্য (!) রাজনৈতিক তাবেদারি ধারাবাহিকতা রক্ষার উত্তরাধিকার বিএনপি নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বেশ ভালোভাবেই চট্টগ্রাম বন্দরের নিজস্ব টাকায় তৈরী অত্যন্ত লাভজনক টারমিনাল এনসিটি বিনা বাধায় দিয়ে দিলো বিদেশিদের কাছে।

এখন কিন্তু কিছু লোকদেখানো বিবৃতি ও আন্দোলন ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ছেনা। কারন যারা এসব বিবৃতি ও আন্দোলণ করছে এরা সবাই গত চব্বিশে আওয়ামীলীগ সরকার পতনের আন্দোলনে ‘ডলারখেকো’র ভূমিকা রেখেছে।

তবে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের এই অত্যন্ত লাভজনক ও সংবেদনশীল স্থাপনা (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি বাংলাদেশে ব্যাপক রাজনৈতিক বিতর্ক, জন অসন্তোষ এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব নিয়ে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

সমালোচক, বন্দর ব্যবহারকারী এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন এই চুক্তিকে দেশবিরোধী এবং দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকিস্বরূপ বলে তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে।

এই ইজারা চুক্তির প্রেক্ষাপট, এর পেছনে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও তারেক রহমানের ভূমিকা, ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এবং শেখ হাসিনা সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার নেপথ্য যোগাযোগ রয়েছে বলেই মনে করেন অনেকে।

চট্টগ্রাম বন্দর ইজারা বিতর্ক নিয়ে ইউনূস-তারেক অক্ষের জাতীয় স্বার্থবিরোধী নীতি ও ভূ-রাজনৈতিক দাসত্বের চালচিত্রটি একটু দেখি আমরা।

২০২৬ সালের ৮ অক্টোবর ঢাকার বিনিয়োগ ভবনের সামনে কথিত বামপন্থি ও বন্দর রক্ষা কমিটির বিক্ষোভ এবং পুলিশের লাঠিপেটার মধ্যেই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান ঈসা কাজিম এই ১৫ বছর মেয়াদি চুক্তি সই করেন।

চুক্তি অনুযায়ী, ডিপি ওয়ার্ল্ড এনসিটি ও ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ডের পরিচালনা, ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করবে। সরকার বা বন্দর কর্তৃপক্ষ মাত্র ৬০০ কোটি টাকা অগ্রিম ফি পাবে এবং ডিপি ওয়ার্ল্ড ১৫ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

সমালোচকদের মূল প্রশ্ন হলো, যেখানে দেশীয় অপারেটররা সফলভাবে এবং অত্যন্ত লাভজনক উপায়ে এই টার্মিনাল পরিচালনা করে আসছিল এবং দেশীয় একাধিক প্রতিষ্ঠান আরও বেশি বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছিল, সেখানে তাদের প্রস্তাব আমলে না নিয়ে কেন তড়িঘড়ি করে একটি বিদেশি সংস্থাকে এই দায়িত্ব দেওয়া হলো?

বন্দর ব্যবহারকারী এবং অর্থনীতিবিদদের মতে, ডিপি ওয়ার্ল্ড বৈশ্বিক কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ১০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করলেও, বাংলাদেশের এই কৌশলগত সম্পদ তাদের হাতে তুলে দেওয়ার মাধ্যমে দেশের নিজস্ব সক্ষমতা ধ্বংস করা হচ্ছে এবং জাতীয় রাজস্বের একটি বড় অংশ বিদেশে পাচার হওয়ার পথ সুগম করা হচ্ছে।

২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারকে ‘ইসলামী-জঙ্গী-সেনা ক্যু’ এর মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করার পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়।

সমালোচক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দীর্ঘদিনের দাবি, ড. ইউনূসকে বাংলাদেশের ক্ষমতায় বসানোর পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ডিপ স্টেট’ (Deep State) এবং ওয়াশিংটনের নীতি নির্ধারকদের সরাসরি হাত ছিল। ইউনূস সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মার্কিন এজেন্ডা বাস্তবায়নে মরিয়া হয়ে উঠেছে।

২০২৫ সালের মে মাসে চট্টগ্রাম বন্দর পরিদর্শনের সময় ড. ইউনূস নিজেই ঘোষণা দিয়েছিলেন যে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি কোম্পানির হাতে ছেড়ে দেওয়া হবে। বন্দর ব্যবহারকারীদের আপত্তি সত্ত্বেও তিনি মার্কিন ও পশ্চিমা ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রাখতে এই প্রক্রিয়া এগিয়ে নেন।

যদিও ডিপি ওয়ার্ল্ড সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিষ্ঠান, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক লজিস্টিকস চেইনে মার্কিন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবেই এই ইজারা সম্পন্ন হয়েছে বলে মনে করা হয়।

সমালোচকদের আশঙ্কা, এনসিটি ইজারা দেওয়ার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়া পর্যায়ক্রমে কক্সবাজারের মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ এবং অন্যান্য কৌশলগত স্থাপনা পশ্চিমা ও মার্কিন শক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ হস্তগত হওয়ার পথ উন্মুক্ত করবে।

এই জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তির পেছনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পাশাপাশি বিএনপির পর্দার আড়ালের সমর্থন ও দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা হচ্ছে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তারেক রহমান এবং বিএনপি নেতারা ওয়াশিংটন ও পশ্চিমা দেশগুলোর সুনজরে থাকার জন্য যেকোনো শর্ত মানতে প্রস্তুত বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।

ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারেক রহমানের সমর্থকরা একে স্বাগত জানিয়েছেন। সমালোচকরা বলছেন, অতীতে দেশের স্বার্থ বিকিয়ে না দেওয়ার যে নীতি আওয়ামী লীগ সরকার বজায় রেখেছিল, বিএনপি ও তারেক রহমান ক্ষমতায় যাওয়ার লোভে তার সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান নিয়েছেন।

মিয়ানমারে করিডোর দেওয়ার বিষয়ে মার্কিন আগ্রহ এবং বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা ব্যবহার করে আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তারের যে নকশা ওয়াশিংটন তৈরি করেছে, তারেক রহমান ও ড. ইউনূস সেই ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ বা সুক্ষ্ম নকশার ক্রীড়নকে পরিণত হয়েছেন।

একে কার্যত আমেরিকার কাছে দেশের সার্বভৌমত্ব বন্ধক দেওয়ার সামিল এবং নব্য ‘দাসত্ব’ হিসেবে দেখছেন দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর শাসনামলে বারবার দেশের সার্বভৌমত্ব এবং কৌশলগত সম্পদ রক্ষার ওপর জোর দিয়েছিলেন। সেন্ট মার্টিন দ্বীপে মার্কিন ঘাঁটি স্থাপনের প্রস্তাব এবং বঙ্গোপসাগরে বিদেশি শক্তির আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টার বিরুদ্ধে তিনি কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। দেশের লাভজনক বন্দরগুলো একক কোনো বিদেশি শক্তির হাতে তুলে না দিয়ে জাতীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার নীতি গ্রহণ করেছিলেন তিনি।

বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার এই দৃঢ় জাতীয়তাবাদী অবস্থানই তাঁর পতনের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মার্কিন ডিপ স্টেট, ড. ইউনূসের আন্তর্জাতিক লবি এবং দেশের ভেতরের জামায়াত-শিবির ও চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর সমন্বয়ে একটি সুপরিকল্পিত ছক তৈরি করা হয়।

২০২৪ সালের আগস্টের ঘটনাবলী কোনো সাধারণ গণ-অভ্যুত্থান ছিল না, বরং তা ছিল একটি সূক্ষ্ম সামরিক ও রাজনৈতিক অভ্যুত্থান (মেটিকুলাস ডিজাইন), যার মূল লক্ষ্য ছিল শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করে এমন একটি পুতুল সরকার বসানো যারা মার্কিন ও পশ্চিমা ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ এবং আঞ্চলিক করিডোর সুবিধা নিশ্চিত করবে।

চট্টগ্রাম বন্দরের এই ইজারা চুক্তির বিরুদ্ধে বন্দর রক্ষা কমিটি, শ্রমিক ইউনিয়ন এবং বামপন্থি দলগুলো তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলেছে। বন্দর ব্যবহারকারীদের মতে, এই চুক্তির ফলে স্থানীয় হাজার হাজার বন্দর শ্রমিক ও কর্মচারী কর্মসংস্থানের ঝুঁকিতে পড়বেন।

শ্রমিক অসন্তোষের কারণে বন্দরে কনটেইনার জট তৈরি হলে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য তথা সামগ্রিক অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়বে। দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন বা হৃদপিণ্ড বলা হয় চট্টগ্রাম বন্দরকে। এর নিয়ন্ত্রণ বিদেশি রাষ্ট্রায়ত্ত বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে গেলে সংকটের সময় দেশ ব্ল্যাকমেইলের শিকার হতে পারে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ড এর সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ মেয়াদ ১৫ বছর। কিন্তু এর পেছনে রয়েছে আমেরিকা। এর ফলে ধীরে ধীরে নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে বাংলাদেশী নিরাপত্তার প্রতি অনীহা দেখিয়ে বিদেশী নিরাপত্তাবাহিনী মানে আমেরিকান সশস্র বাহিনীও মোতায়েন হতে পারে। বিচিত্র কিছু হবেনা তাতে।

ফলে কৌশলগত অর্থনৈতিক সম্পদ বিদেশি নিয়ন্ত্রণের অধীনে চলে যাবে নিশ্চিতভাবে।
এক্ষেত্রে আমেরিকার তাবেদার সুদখোর ও প্রচন্ড ক্ষমতালোভী ড.ইউনূস সরকারের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক।

প্রধান উপদেষ্টা থাকার সময়ে এবং তার ক্ষমতার শেষ সময়ে ও তার সরাসরি নির্দেশে এবং মার্কিন সমর্থনে তড়িঘড়ি করে চুক্তি সাক্ষরিত হয়। যে চুক্তি এখনকার তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের সাহস নেই বাতিল করার। বরং এই সরকার পারলে আরো কিভাবে নতজানু হয়ে নিজের চেয়ারটি ঠিক রাখবে সেজন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা করছে।

আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি ও মিয়ানমার করিডোর ইস্যুতে দাসত্বমূলক অবস্থানে রয়েছে এখনকার বিএনপি সরকার। এই সরকারের দাসত্বের কারনে তারা পশ্চিমা ডিপ স্টেটের এজেন্ডা বাস্তবায়নে একান্ত অনুগত ভৃত্যের মতই আচরণ শুরু করেছে। এর ফলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব চরম সংকটে রয়েছে। অথচ এই বিএনপিই কীনা দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য বড় বড় কথা বলেছিল ও বলছে!

বিএনপির নেতৃত্বাধীন অথা তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি ক্ষমতার লোভে মার্কিন ও পশ্চিমা নীতিকে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ সমর্থনই শুধু করছেনা বরং নতজানু হয়ে আছে।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং তারেক রহমানের বিএনপির মৌন ও প্রত্যক্ষ সমর্থনে চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়া বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী এক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।

যে দেশের অর্থনীতি পুরোপুরি বৈদেশিক বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল, সেই দেশের প্রধান বন্দরের নিয়ন্ত্রণ বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার নেপথ্যের ভূ-রাজনৈতিক চক্রান্ত এখন ড. ইউনূস ও তারেক রহমানের জাতীয় স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জনগণের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে মাতারবাড়ি, সেন্ট মার্টিনসহ দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও বহিরাগত শক্তির নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে, যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে চরম দীর্ঘমেয়াদী সংকটে ফেলবে।

এসব কিছু দেখে চট্টগ্রামের সেই প্রতিবাদী, চট্টলপ্রেমী এ বিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর কথাটি মনে পড়ে যাচ্ছে। কয়েকবার অবশ্য তাঁর সঙ্গে আলাপ ও রাজনৈতিক আন্দোলনে চট্টগ্রামে থেকে তা দেখার ও বোঝার সৌভাগ্য আমার হয়েছে।

তাই বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে- তার মত একজন প্রতিবাদী-দেশপ্রেমী নেতার বড্ড প্রয়োজন আজকে চট্টগ্রাম বন্দর, চট্টগ্রামের উন্নয়ন তথা বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষায়। কারণ চট্টগ্রাম বন্দর বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে। আদৌ কি তেমন কোন আন্দোলন আর গড়ে উঠবে চট্টগ্রাম বন্দরকে নিয়ে?

# রাকীব হুসেইন: লেখক, প্রাবন্ধিক।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *