সুনামগঞ্জ: বাউল গান আমাদের লোকায়ত সংস্কৃতির এক অমূল্য রত্ন। এই বাউল গান জামাত, মৌলবাদীদের দু-চক্ষের বিষ।

বাউলের আঁতুড়ঘর সুনামগঞ্জেই এবার বাধাগ্রস্ত হলো লোকসংস্কৃতির স্বাভাবিক প্রকাশ। নারী শিল্পীদের অংশগ্রহণের ওপর আপত্তি তুলে, ষড়যন্ত্র করে সুনামগঞ্জে একটি বাউল গানের আসর বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

মূলত আপত্তি নারী এবং বাউল দুটোতেই। না ওরা বাউল দেখতে পারে, না বাউল!

বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের হাতিয়া-রাধানগর গ্রামে এই অনুষ্ঠানটি হওয়ার কথা ছিল। তবে নারী শিল্পীদের গান পরিবেশনের বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে স্থানীয় দুইজন ব্যক্তি থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। তারপরেই আয়োজনটি বাতিল করা হয়।

অনুষ্ঠানে অন্য শিল্পীদের সঙ্গে নীলা ও তানিশা নামের দুই নারী শিল্পীর গান গাওয়ার কথা ছিল। যুক্তরাজ্যপ্রবাসী স্থানীয় বাসিন্দা শওকত আলী অনুষ্ঠানটির পৃষ্ঠপোষকতা করছিলেন। কয়েক দিন ধরে এলাকায় এ আয়োজনের প্রচারও চলছিল।

যারা অভিযোগ করেছেন তাঁরা তো নারী নিয়ে বেলেল্লাপনা করেন বলে অনেকেই অভিযোগ করেছেন। সে বেলা?

জানা গিয়েছে, বুধবার দিরাই থানায় লিখিত আবেদন করেন স্থানীয় বাসিন্দা আতাহার আলী রাহাত ও কামরুল হাসান মিটু।

তা নারী শিল্পীরা গান গাইলে কী বেলেল্লাপনা হয়ে যায়? বেলেল্লাপনা আর শিল্প বোঝে জামাতি!?

আবেদনে তাঁরা নারী শিল্পীদের দিয়ে গান পরিবেশনের আয়োজন নিয়ে আপত্তি জানান এবং সম্ভাব্য অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে পদক্ষেপ নিতে বলেন।

আবেদনকারীরা তাঁদের আবেদনে উল্লেখ করেন, হাতিয়া গ্রামটি দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও ইসলামী ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত। গ্রামে একটি আলিম মাদ্রাসা, একজন আল্লাহর ওলির মাজার এবং অনেক আলেম-ওলামার বসবাস রয়েছে।

তাঁদের দাবি, নারী শিল্পীদের দিয়ে গান পরিবেশনের পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

এলাকার ধর্মীয় ঐতিহ্য, সামাজিক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখা এবং অপ্রীতিকর ঘটনা, সংঘাত ও সহিংসতা এড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তাঁরা।

ধর্ম আর সংস্কৃতিকে এই হতচ্ছাড়ারা গুলিয়ে নিয়ে আজকে দেশটার এই হাল করেছে।

জানা যায়, আয়োজকদের ওপর নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করা হলে একপর্যায়ে বাধ্য হয়েই অনুষ্ঠানটি স্থগিত বা বন্ধ ঘোষণা করতে হয়।

সাংস্কৃতিক কর্মীদের মতে, আবহমানকাল থেকেই বাংলার বাউল সাধনায় নারী ও পুরুষের সমান অংশগ্রহণ রয়েছে। বাউল দর্শনে লিঙ্গভেদের কোনো স্থান নেই; রাধা-কৃষ্ণের প্রেম বা মরমি ভাবনার প্রকাশে নারী শিল্পীদের কণ্ঠ সমানভাবে সমাদৃত।

কিন্তু সম্প্রতি কিছু এলাকায় একশ্রেণির ধর্মান্ধ ও সংকীর্ণ মানসিকতার মানুষের হস্তক্ষেপে লোকসংস্কৃতির এই মুক্তধারা বারবার হোঁচট খাচ্ছে।

এ ঘটনায় স্থানীয় সচেতন মহল ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি হয়েছে।

তাদের দাবি, লোকসংস্কৃতি ও বাউল ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে এ ধরনের মৌলবাদী ও অসহিষ্ণু আচরণের বিরুদ্ধে সমাজ ও প্রশাসনকে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়াতে হবে। কিন্তু সেই লক্ষণ তো মোটেও দেখা যাচ্ছে না।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *