মহাসমারোহে, আলোর রোশনাই, ঢাক-ঢোলের বাদ্য আর মাইক-সাউন্ডবক্সের শব্দের মধ্য দিয়ে বর্ণিল আকর্ষণীয় অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শেষ হলো হিন্দুদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা।

মনে হলো বাংলাদেশের অসহায় হিন্দুরা বেশ খুশী। তাদের চেয়ে বেশি খুশী বাংলাদেশের মুসলমানরা। তবে এসবের চেয়ে সবচেয়ে বেশি খুশী আর আনন্দে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। কারণ পূজার আগে দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিমা ভাঙচুর হলেও পূজার সময় তা হয়নি। সরকার ও মুসলিমরা প্রচণ্ড রকমের সচেতন ছিল।

এবারের দুর্গাপূজার রোশনাই অনেকটা তাই প্রমাণ করে।

মোদ্দাকথা দেশের সরকার-প্রশাসন ও মুসলিমরা যদি না চায় হিন্দুদের অনুষ্ঠানে বা তাদের ওপর কোন অত্যাচার হবেনা, তাহলে হবেনা। আর তারা যদি চায় হেন কোন শক্তি নেই ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে রক্ষা করে। আবার তাদের ইচ্ছাশক্তিতেই হিন্দুদের ওপর কেউ টোকাটিও দিতে পারবেনা। এটিই নিয়তি!

কিন্তু পূজা করাটি জরুরি নাকি চাকরি, সংসদসহ সরকার-রাষ্ট্রসহ সবক্ষেত্রে ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা জরুরী সে প্রশ্ন আজ দেখা দিয়েছে প্রবলভাবে। সেজন্য তা ঠিক করতে হবে সংখ্যালঘু হিন্দুসহ অন্য সম্প্রদায়কেও।
আর এবারের পূজার অন্যতম একটি বৈশিষ্ট হলো- দেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের বিভিন্ন স্থানের পূজামন্ডপ ঘুরে দেখেছেন।

সেখানকার হিন্দুদের সঙ্গে (অবশ্যই বিএনপি মনোভাবাপন্ন হিন্দু) কথা বলেছেন, মতবিনিময় করেছেন। টাকা পয়সাও দিয়েছেন কিছু পূজা উদযাপন পরিষদের ফান্ডে। এটিও একটি লোভনীয় দিক।

তবে আমার যদি ভুল না হয়ে থাকে তাহলে এটিই বোধ হয় বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম যে কোন প্রধানমন্ত্রী দুর্গাপূজার মন্ডপে গেছেন পরিদর্শনে। এই যে প্রধানমন্ত্রীর মন্ডপ পরিদর্শন তাতেই একশ্রেণীর হিন্দুরা আনন্দে গদগদ। কৃতজ্ঞতায় উদ্বেলিত।

তাদের আনন্দের আতিশয্য দেখে মনে হয়েছে- কোন অবতার নেমে এসেছিলেন তাদের পূজামন্ডপে।

২০২৬সালে বাংলাদেশের দুর্গাপুজা একাধিক কারণে ভিন্ন এবং প্রশংসনীয়। কিন্তু রাজনীতি মুক্ত নয়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুরা আপাতত সংখ্যায় বেশি, কিন্তু এপার বাংলা তথা বাংলাদেশে সেই হিন্দুরাই অত্যন্ত সংখ্যালঘু।

কিন্তু এবার সেই সংখ্যালঘুদের পূজায় সংখ্যাগুরু মুসলমানদের এত বেশি অংশগ্রহণ ছিল যে তা ভাবতেই অবাক হতে হয়। অবশ্য অনেক ধরনের ‘ফতোয়া’ ও দিয়েছে উগ্র ইসলামপন্থীরা। কিন্তু তাতে দমানো যায়নি এই শারদোৎসবে মুসলমানদের অংশগ্রহণের হার।

বাংলাদেশে ঢাকা-চট্টগ্রাম সহ বড় শহরগুলিতে অতীতেও পুজো মণ্ডপের ভিড় দেখে আমার ধারণা তরুণ বয়সি ছেলেমেয়েরা কমবেশি প্রতিবছরই পুজোয় আনন্দ উৎসবে মেতেছে।শুধু কিশোর-কিশোরী বা তরুণ তরুণী কেন খোদ জাতীয় সংসদের এমপি ব্যারিষ্টার রুমিন ফারহানা নিজে বলেছেন তিনি পুজোর কয়েকদিনে ভিন্ন ভিন্ন শাড়ি পড়বেন বলে শাড়ি কিনেছেন।

অবশ্য তার এই শাড়ি কেনা ও শাড়ি সজ্জিত হয়ে পূজামন্ডপ ঘুরে দেখাকে কেউ কেউ তার রাজনীতির অংশ হিসেবে দেখবেন।
হ্যাঁ তা দেখতে পারেন অনেকে। যেমনটি করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার দলের মন্ত্রী-সাংসদ-নেতারা। দেশের বিভিন্ন জায়গাতেই তারেক রহমান ও বিএনপি নেতাদের ছবি দিয়ে শারদীয়া উৎসবের শুভেচ্ছা জানিয়ে ব্যানার টানানোর ধুম পড়ে গিয়েছিল।

যেমনটি দেখেছি গত ২৫ অক্টোবর ও এর আগে বৌদ্ধ ধর্মীয় নাগরিকদের প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে নানা ব্যানার ও ফেষ্টুনে ছেয়ে গেছে বৌদ্ধ মন্দিরের আশপাশ এলাকা। মন্ত্রী-সাংসদ-মেয়র ও বিএনপি নেতারা বৌদ্ধদের ফানুস উড়িয়ে নিজেদের ধন্য মনে করেছেন।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নাগরিকগণ কৃতার্থ হয়েছেন বলেই মনে হয়েছে মন্ত্রী-সাংসদ-মেয়র-নেতাদের আগমনে ও অংশগ্রহণে। আবার এসব নেতারাও অনেকটা কৃতার্থ হয়েছেন যেন। তবে সেটি অনেকটা দয়া দাক্ষিণ্য দেখিয়ে। এ কথা সত্য যে, বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যাগুরু মানে ইসলাম সম্প্রদায়ের যে অবস্থা ও মনমানসিকতা তাতে এসব সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে কোন পাত্তা না দিলেও চলে।

অবশ্য তারা আবার বেশ জোরেশোরেই বলে থাকেন- একজন মুসলিমের যে অধিকার তেমনি একজন হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নাগরিকদেরও সমান অধিকার।

তবে তা যে কখনোই নয়, এবং বলার জন্য বলা তা যারা বলে থাকেন এবং যাদের উদ্দেশ্যে বলেন তারাও জানেন। কারণ তা যদি না হতো তাহলে সেই ১৯৭২ সালের সংবিধানকে পুরোপুরিভাবে বাস্তবায়ন করতো সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো যারা ক্ষমতায় ছিলেন বা আছেন এবং ক্ষমতার বাইরে থেকেও দেশটিকে একটি সত্যিকার গণতান্ত্রিক-মানবিক-বৈষম্যহীন-ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ ও রাষ্ট্রে পরিণত করতে চাইতেন।

এজন্য দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে গত ৫৫ বছরে যারাই ক্ষমতায় ছিলেন সেসব রাজনৈতিক দলগুলো কতটুকু সক্রিয় ছিলেন বা আন্তরিক ছিলেন বা আছেন তা মোটামুটিভাবে বাংলাদেশের জনগণ বুঝে গেছে। এক্ষেত্রে আওয়ামীরীগ-বিএনপি-জাতীয় পার্টি এমনকি কমিউনিষ্ট পার্টির ভূমিকাও আমরা দেখেছি।

মুখে তারা যত বাগাড়ম্বরই করুকনা কেন গণতন্ত্র-ধর্মনিরপেক্ষ-সমতা রক্ষার জন্য ভেতরে ভেতরে সবাই কিন্তু প্রচণ্ড ভয় পায় ‘ইসলাম’কে। কারণ এরা এই ‘ইসলাম’কে কখনো আধুনিক করতে পারবেনা বা চায়ওনা। সেই অন্ধকারের যুগেই থাকতে চায় এক্ষেত্রে।

রাজনৈতিক বিরোধ থাকলেও এই একটি বিষয়ে চরম ঐক্য তাদের। যদিও সে ঐক্য অলিখিত।কিন্তু তা বাংলাদেশের সংবিধানের চেয়েওে বড় এসব রাজনৈতিক দলের কাছে।

এরইমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমান পুজার কয়েক দিন আগে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে নেতাদের বলেছিলেন দুর্গা পূজা যাতে নির্বিঘ্নে হতে পারে সে ব্যাপারে দল এবং সরকারকে যথেষ্ট সক্রিয় থাকতে হবে। তিনি বলেছিলেন বিএনপি’র ক্ষমতায় আসার পেছনে হিন্দু সম্প্রদায় সহ সংখ্যালঘুদের বিশেষ অবদান রয়েছে। ফলে তাদের উৎসব যাতে নির্বিঘ্নে হয় সেই দায়িত্ব দল ও সরকারের।

এই বৈঠকের পরদিন ঘোষণা করা হয় দুটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। প্রথমটি হল সংখ্যালঘুদের উৎসব উপলক্ষে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে প্রদত্ত অর্থের পরিমাণ প্রধানমন্ত্রী নিজেই এক কোটি টাকা বাড়তি বরাদ্দ করেন। স্বভাবতই এই ঘোষণায় হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায় খুশি হয়। বৌদ্ধরা এই সময় তাদের প্রবারণা উৎসব পালন করে থাকে।

বৌদ্ধ ধর্মীয়দের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব প্রবারণা পূর্ণিমায় চট্টগ্রামের নন্দনকাননে বৌদ্ধ বিহারে ফানুস ওড়ানোর উৎসবে হাজারো মানুষের অংশগ্রহণ হয়।

চট্টগ্রামের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনসহ অন্য বিএনপি নেতা তা সাড়ম্বরে উদ্বোধন করেন।

 

তারেক রহমানের সরকারের দ্বিতীয় সিদ্ধান্তটি ছিল পূজার ছুটি। এখনও পর্যন্ত সরকারিভাবে পুজোয় সাধারণ ছুটি একদিন। অতীতে সব সরকারকেই ছুটি বাড়াতে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বারে বারে অনুরোধ করলেও কেউ কানে তোলেনি।

বিগত অন্তর্বর্তী সরকার প্রশাসনিক নির্দেশে একদিন বাড়তি ছুটি বরাদ্দ করেছিল। বিএনপি সরকার সেই বাড়তি ছুটির পরিমাণ দুদিন করেছে। সব মিলিয়ে পূজোর ছুটি ছিল তিন দিন।। এছাড়া বাংলাদেশ সরকারের সাপ্তাহিক ছুটি ধরলে পুজোর সময় এবার টানা পাঁচ দিন সরকারি-বেসরকারি অফিসকাছারি, আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল।

এবারের পূজায় নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ছিল দেখবার মত। পুজোর আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৩৬’টির মতো প্যান্ডেল ও প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ও ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত বিক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা ঘটেছে। তবে তেমন বড় কিছু ঘটেনি। সরকারের এই উদ্যোগে এটাও প্রমাণ হয় সংখ্যালঘুদের উৎসব বাংলাদেশের নিরাপদ নয়।

প্রধানমন্ত্রী ঢাকায় একাধিক পুজা মণ্ডপে গিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। গিয়েছিলেন ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরেও। তার পিতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা প্রয়াত খালেদা জিয়া তিনবার প্রধানমন্ত্রী হলেও ঢাকেশ্বরী মন্দিরে কখনও যাননি। তাদের পুত্র গেলেন। এইসব আয়োজনকে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়।

কেউ কেউ যেমন বলছেন সবটাই লোক দেখানো। এটিকে মূলত ব্র্যান্ডিং, ইমেজ বিল্ডিং, অর্থাৎ ভাবমূর্তি তৈরির কাজে লাগিয়েছে তারেক রহমানের বিএনপি ও তার সরকার।

অথচ এই দেশটিতে সংখ্যালঘু নিপীড়ন নির্যাতনের অভিযোগে যখন প্রতিবেশী রাষ্ট্র,আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশেষ করে মানবাধিকার সংস্থাগুলোও সরব ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে তখন তারেক রহমানের সরকার দুর্গা পুজায় সরকারি যে রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা, পৃষ্ঠপোষকতার নজির গড়েছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

ভারতের হাইকমিশনার সহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতেরা মণ্ডপ পরিদর্শন করে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। কলকাতা থেকে যে ইউটিউবাররা বাংলাদেশের পুজো দেখতে গিয়েছেন তাদের অভিজ্ঞতাও মোটের ওপর ভাল।

প্রকাশ্যে না হলেও এই প্রথম বিএনপি শীর্ষ স্তর থেকে স্বীকার করা হল যে বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যালঘু বিশেষ করে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা ধানের শীষে ভোট না দিলে জামায়াতে ইসলামীকে মোকাবিলা বিএনপি’র পক্ষে কঠিন ছিল। গত ত্রয়োদশ জাতীয় ইলেকশনে আওয়ামী লিগকে অংশ নিতে দেয়নি। তারা এখনো নিষিদ্ধ এ দেশে অফিসিয়ালি।

হিন্দুদের প্রায় অধিকাংশ নাগরিক মানে ভোটার বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানের দল আওয়ামীলীগ ও তার কন্যা শেখ হাসিনাকে কমবেশি সমর্থন জানিয়ে এসেছে। এটিতো অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে আওয়ামী লীগের আমলে হিন্দুসহ অন্য সংখ্যালঘুরা একেবারে নিশ্চিন্তে নাকডেকে ঘুমাতে পেরেছেন এমন দাবি করা যাবেনা।

তবে এটি মানতে হবে যে, বিএনপি সহ অন্য দলের সরকারের আমলে যে উদ্বেগ উৎকণ্ঠার মধ্যে সংখ্যালঘুদের কাটাতে হয়েছে আওয়ামী লীগের সময়ে তা তুলনামূলকভাবে কম ছিল।

তাছাড়া মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারি দল হিসেবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নাড়ির সম্পর্ক গড়ে উঠেছে ঐতিহাসিকভাবেই।

যে যাই বলুক না কেন, এটিতো নিখাদ সত্য যে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বিশেষ করে হিন্দুরা ধর্মীয় পরিচয়ের বাইরে মুক্তিযুদ্ধকে নিজেরা অস্তিত্বের সঙ্গে ধারন করেন। এর সঙ্গে জুড়ে আছে তাদের অস্তিত্ব সংকটের বিষয়টি যা একজন সংখ্যাগুরু অর্থাৎ মুসলিম নাগরিকের প্রয়োজন পড়ে না।

মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ থেকে অত্যাচারিত হয়ে যে এক কোটি শরণার্থী ভঅরতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল তার মধ্যে ৯৫ ভাগইতো ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের। মুসলিমদের সংখ্যাতো তেমন ছিলনা।

কারণটি হলো পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী সাধাণনত মুসলিমদেরকে তাদের শত্রু মনে করতো না। তাদের কাছে মুল শত্রু ছিল হিন্দুরা। এটিই কিন্তু বাস্তবতা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে কতজন শহীদ হয়েছেন তার কোন তালিকা কি সরকারিভাবে করা হয়েছে ? করা হয়নি। কারণ তাহলে দেখা যাবে সেক্ষেত্রে হিন্দুদের সংখ্যাই বেশি।

সুতরাং বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পেছনে হিন্দুদের আত্মত্যাগ ও অবদান বেশি প্রকাশ পেলে তা মুসলিমদের জন্য কিছুটা অপমানজনক হবে এমন চিন্তা থেকেই তা করা হয়নি।

এই যুক্তিটিকে কেউ সংকীর্ণ চিন্তাভাবনা হিসেবে আখ্যা দিতে পারেন। কিন্তু একটু গভীরভাবে ভেবে দেখতে বলি তাদেরকে। যদি ভাবেন যুক্তি দিয়ে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চরম বাস্তবতা দিয়ে তাহলে বুঝতে পারবেন।

কিন্তু প্রশ্ন জাগে বার বার- এই যে এত আত্মত্যাগের বিনিময়ে সংখ্যালঘুরা কী পেলেন? একটা জাতি বা সম্প্রদায়ের কি শুধুমাত্র বছরে পাঁচ-ছয়টি দিন আনন্দ উৎসবে কাটলেই চলে?

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পুজোর সময় যেসব অনুষ্ঠানে গেছেন সেখানে বার বারই বলেছেন- ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার। অথচ এই পুজোর আবহে এই বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের উদ্দেশ্যে ধেয়ে এসেছে দেশ থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি। হুমকি উপেক্ষা করে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীর চৈতালি চক্রবর্তী প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘুরে প্রচার করেছেন, আমাদের দেশ থেকে তাড়াতে হলে হত্যা করতে হবে। প্রাণ থাকতে আমরা এই দেশ ছাড়ব না।


জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে প্রদঅনমন্ত্রী তারেক রহমান সংখ্যালঘুদের সংগঠনগুলোর সঙ্গে মিলিত হয়ে কথা দিয়েছিলেন ক্ষমতায় আসলে তাদের নিরাপত্তা একশো ভাগ সুনিশ্চিত করবেন। কিন্তু তার সরকারের বিগত আট মাসের অভিজ্ঞতা কি তার প্রমাণ দিয়েছে?

বিএনপি সরকারের কোন পদক্ষেপই রাজনৈতিক সমীকরণের বাইরে নয়। তাঁর সরকারের বিগত আট মাসে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর নিপীড়ন নির্যাতনের ঘটনাগুলি অত্যন্ত পীড়াদায়ক শুধুমাত্র হামলার কারণে নয়, বরং অনেক বেশি হল প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার জন্য।

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ মাত্র মাস দুয়েক আগে সাংবাদিক সম্মেলনে তারেক রহমানের সরকারের প্রথম ছয় মাসে ৪৪ জন হিন্দু সম্প্রদায়িক সহিংসতা নিহত হয়েছেন। এই সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। ঐক্য পরিষদ জানায়, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন অর্থাৎ প্রথম ছয় মাসে সারা দেশে ২৫৭টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা তাঁদের নজরে এসেছে। এর মধ্যে ৪০টি ঘটনায় হত্যার শিকার ৪৪ জন।

সংগঠনের অভিযোগ, ওই ছয় মাসে নারী নির্যাতন, ধর্ষণ/গণধর্ষণের ঘটনা ঘটে ৫টি। অপহরণ, টাকা দাবি, নির্যাতনের ঘটনা হয় ১০টি। এছাড়া, হামলা, হত্যার হুমকি দেওয়ার ৪২টি ঘটনা ঘটেছে।

উপাসনালয়ে হামলা, প্রতিমা ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে ৬২টি। এছাড়া, উপাসনালয়ের জমি দখল/দখলের চেষ্টা ১৫টি, বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ ৪৭টি; কথিত ধর্মঅবমাননার অভিযোগে গ্রেফতার ও নির্যাতন ৯টি, জোর করে বাড়িঘর, জমি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখলের ঘটনা ঘটেছে ২১টি। অন্যান্য ঘটনা ৬টি।

সংবাদ সম্মেলনে বিগত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ৩১ ডিসেম্বর- এই ৫ মাস, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর অর্থাৎ ১২ মাস এবং চলতি বছরের প্রথম ৬ মাস, মোট ২৩ মাসের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়।

সংগঠনটি জানিয়েছে, এই সময়ে সংঘটিত মোট ২৯৬৩টি ঘটনার ৭৩.৭% সংঘটিত হয়েছে ৫ অগস্ট পরবর্তী ৫ মাসে। এ সময়কালটি ছিল ব্যাপক আকারের গণসহিংসতার পর্যায়। হামলার মূল লক্ষ্য ছিল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বসতবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় স্থাপনা।

সংবাদ সম্মেলনে ২০২৫ সালের ১২ মাস এবং ২০২৬ সালের প্রথম ৬ মাসের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার চালচিত্র তুলে ধরে বলা হয় হিংসার ঘটনা প্রায় একই রকম রয়েছে বলে ঐক্য পরিষদের অভিমত। তারা বলেছে, তুলনামূলকভাবে ২০২৬ সালে হত্যার শিকার, উপাসনালয়ে হামলা, প্রতিমা ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ, হামলা, হত্যার হুমকি, নির্যাতন, উপাসনালয়ের জমি দখল/দখলের চেষ্টা ২০২৫ সালের চেয়ে বেশি।

২০২৪, ২০২৫ ও ২০২৬ সালের ঘটনার চালচিত্র তুলে ধরে তুলনামূলক পর্যালোচনায় বলা হয়, মোট ঘটনার সংখ্যা পরবর্তী ১৮ মাসে কমলেও হত্যাকাণ্ড, নারী নির্যাতন, সম্পত্তি দখল এবং ধর্ম অবমাননার অভিযোগে হয়রানীর ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে অর্থাৎ সহিংসতা গণআক্রমণ থেকে লক্ষ্যভিত্তিক নির্যাতনে রূপান্তরিত হয়েছে| এটি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তার জন্যে একটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।

সংগঠনটি বলেছে, ২০২৬ সালের প্রথম ৬ মাসের তথ্যে দেখা গেছে যে, সহিংসতার সামগ্রিক সংখ্যা স্থিতিশীল থাকলেও প্রাণহানি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলার হার উদ্বেগজনকভাবে অব্যাহত রয়েছে| ধর্মীয় স্বাধীনতা ও উপাসনার অধিকারের উপর সরাসরি আঘাত হানা হয়েছে এ সময়। এসব ঘটনা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব ও নিরাপত্তার জন্যে দীর্ঘমেয়াদী হুমকি।

২০২৬ সালে প্রতিমাসে গড়ে হত্যা, উপাসনালয়ে হামলার হার ২০২৫ সালের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্পত্তি দখলের হার কিছুটা কমলেও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বিগত ২০২৪ সালের অগস্ট মাস থেকে ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত মোট ২৩ মাসে ২০৫৫টি ঘটনায় বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে বহু পরিবার জীবিকা হারিয়ে দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক সংকটে পড়েছে।

বিগত সরকারগুলির মতো তারেক রহমানের সরকারও পুজার সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেও সংখ্যালঘুদের মৌলিক দাবিগুলি সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতনভাবেই উদাসীন। কারন তারাও বাংলাদেশের অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মতই রাজনীতি করে। কথার ফুলঝুরিতেই ভরিয়ে দিতে চান তারা রাজনীতির ময়দান।

সংখ্যালঘুদের বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি পুনরুদ্ধারের আইন হলেও জমানা নির্বিশেষে তা কার্যকর হয়নি। কেউই এ ব্যাপারে আন্তরিক নন।

# ইশরাত জাহান: লেখিকা, প্রাবন্ধিক ও নারী অধিকার সংগঠক।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *