রাঙামাটি: সাজেক স্তব্ধ! স্তব্ধ পর্যটন ক্ষেত্র, ব্যবসা বাণিজ্য। পর্যটকদের মন খারাপ।
রাঙামাটির বাঘাইছড়ির সাজেক ভ্যালি পর্যটনকেন্দ্রে যাওয়ার সড়কে অবরোধ চলছেই। ষষ্ঠ দিনেও যান চলাচল স্বাভাবিক হয়নি।
সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের ডাকা এই কর্মসূচির কারণে স্থবির হয়ে পড়েছে পর্যটনকেন্দ্রটি।
আন্দোলনকারীদের পাঁচ দফা দাবির মধ্যে চারটি নিয়ে সমঝোতা হলেও গুরুত্বপূর্ণ একটি দাবির কোনো মীমাংসা হয়নি, ফলে অবরোধ চলছেই।
গতকাল মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকাল ৬টা থেকে সাজেক সড়কের মাচালংয়ের ১৪ কিলোমিটার এলাকা এবং বাঘাইহাটের হাজাছড়ার ১০ নম্বর এলাকায় টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধ পালন করেন আন্দোলনকারীরা। এতে সড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকে।
সাজেক থেকে জেএসএস-সন্তু লারমা গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার দাবিটির কোনো সমঝোতা হয়নি। ফলে বাকি চার দাবিগুলোতে ঐকমত্য হলেও অবরোধ প্রত্যাহারের পথ খুলছে না।
সব দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অবরোধ অব্যাহত থাকবে বলে ঘোষণা দিয়েছে সংগঠন দুটি।
মঙ্গলবার সকালের দিকে অবরোধকারীরা মাচালং ১৪ কিলো, ২ নম্বর কালভার্ট, গঙ্গারামের লাদু মনি বাজার, বাঘাইহাটের হাজাছড়া, ১০ নম্বর এলাকায় টায়ার জ্বালান আন্দোলনকারীরা। জরুরি সেবা ছাড়া কোনো যানবাহন চলাচল করতে দেখা যায়নি।
তবে কোনো সংঘাতের খবর পাওয়া যায়নি।
সংকট নিরসনে সোমবার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে খাগড়াছড়ি আসনের সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঁইয়া, রাঙামাটি আসনের সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠক করেন। পাঁচ দাবির মধ্যে চার দাবি প্রশাসন মেনে নেয়। তবে একটি দাবি নিয়ে একমত না হওয়ায় বৈঠকটি অমীমাংসিতভাবে শেষ হয়। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে– বৈঠক অব্যাহত।
সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা যৌথ এক বিবৃতিতে বলেন, জেএসএস সন্তু লারমা গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যরা সাজেকের গঙ্গারাম এলাকায় হামলার পরিকল্পনা নিয়েছে। এ পরিকল্পনায় তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
সাজেকের জনগণকে সশস্ত্র সন্ত্রাস ও নিরাপত্তা হুমকি থেকে রক্ষা করতে জেএসএস সন্তু গ্রুপের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, প্রায় দুই মাস ধরে জেএসএসের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়ে আসলেও প্রশাসন বরাবরই তা উপেক্ষা করে চলেছে। গঙ্গারাম এলাকায় যদি জেএসএস সন্তু গ্রুপের কোনো হামলার ঘটনা ঘটে, তাহলে এর দায়ভার সম্পূর্ণ প্রশাসনকে নিতে হবে।
এ বিষয়ে জেএসএসের কেন্দ্রীয় তথ্য ও প্রচার বিভাগের সহ-সম্পাদক সজীব চাকমা বলেন, জেএসএসকে যেসব বিষয়ে দোষারোপ করা হচ্ছে, তার কোনো ভিত্তি নেই। কিছু পকেট সংগঠনকে দিয়ে অবরোধের ডাক দিয়ে গ্রামবাসীদের সেখানে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে।
কৃত্রিম ইস্যু তুলে জনসাধারণকে ব্যবহার করে এলাকার পরিস্থিতি অস্থিতিশীল ও ঘোলাটে করার চেষ্টা করছে। এটা অন্দোলন নয়। এতে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নেই। জনগণ চায় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) সাজেক এলাকা থেকে চলে যাক।
সাজেক গত অধিকার রক্ষা কমিটি আজ ২৮ অক্টোবর সকালে ফেসবুকে এই বিষয়ে একটি পোস্ট দিয়ে আরো ব্যাখ্যা দিয়েছে।
সেখানে বলা হয়, ২৪ সালে সেনাবাহিনীর চাহিদা অনুযায়ী উপজেলা নির্বাচনকে লুটেনেওয়ার জন্য অস্ত্রধারী মুখোশদের বাঘাইহাট জোন ও বাঘাইহাট বাজারে নিয়েএসে এলাকার সাধারণ জনগণের উপরে নানান নির্যাতন চালিয়েছিল সেনারা।
পরে ১৮ জুন সাজেকবাসীর ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের মুখেপড়ে মুখোশরা বাঘাইহাট জোনথেকে জনতার উপর ব্রাশ ফায়ার করে মুখোশরা। এই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় বাসের হেলপার মোঃ নাইম,, এরপরে সেনারা মুখোশধারীদের বাঘাইহাট বাজার থেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।
এর কিছুদিনপরে ২১ জুলাই ২০২৪ তারিখে সেনারা জেএস এস সন্তুগ্ৰুপদের উদয়পুরথেকে গাড়িযোগে মাচালং ব্রীজপাড়া, ৬ নং পাড়া, ৭ নং হড়েন্দ্রপাড়া, কিজিং পাড়াসহ পর্যটনের রোধের বেশ কয়েকটি জাগায় বসিয়ে দিয়ে সাজেকের অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে ইউপিডিএফ এর সাথে বন্ধু যুদ্ধের নাটক সাজিয়ে সবসময় ব্ল্যাংফায়ার করে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল, এই ঘটনায় ২৪ জুলাই থেকে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাজেক পর্যটন বন্ধ ছিলো।
পরবর্তীতে সেনাবাহিনীরা জেএসএস সন্তুলারমার সাথে আলোচনা করে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সাজেক পর্যটন সড়ক নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা হলে ৬ সেপ্টেম্বর ২৪ থেকে পর্যটন খুলে যায়।
এবারেও ২০২৬ সালে সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় ঠিক একই কায়দায় জেএস এস সন্তুগ্ৰুপদের ৩১ আগস্ট ২০২৬ থেকে মাচালং এলাকার বিভিন্ন জাগায় এসে ইউপিডিএফের সাথে বন্দুক যুদ্ধের নাটক সাজিয়ে বিভিন্ন পাড়া গ্ৰামে ঢুকে ব্রাশ ফায়ার করে আতঙ্ক সৃষ্টি করা এবং গ্ৰামের মুরুব্বিদের মৃত্যুর হুমকি, মোবাইল কেড়ে নেয়া, নানাভাবে নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে।
এই ঘটনায় গত ২৯ সেপ্টেম্বর কম্সীতা ত্রিপুরার নামক একজন শিশুর গুলিবিদ্ধ হয়।
এরপর থেকে সাজেকবাসীরা ক্ষুব্ধ হয়ে জেএস এস সন্তু গ্ৰুপদের সাজেকথেকে সরিয়ে নেয়ার দাবি জানিয়ে নির্দিষ্টকালের জন্য সড়ক অবরোধের ঘোষণা দেয়, তা এখনো অব্যাহত রয়েছে। সাজেকবাসীর ৫ দফা ন্যায্য দাবি আদায় না হলে এই কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
