হায়রে নিরীহ গরু! তোমাকে নিয়ে কত রাজনীতি! হে গরু তোমার গোশত খাওয়া নিয়ে কতকিছু ঘটে যায় শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ‘ মেটিকুলাস ডিজাইনের ষন্ডা’ ড. মুহাম্মদ ইউনুসের উস্কানিতে!

কারণ এর আগে এই বাংলায় আমরা মুসলমানরা গরু খেয়েছি। তবে এমন উস্কানিমূলক কাজ করিনি। গত চব্বিশের জুলাই-আগষ্টে আমেরিকান ডিপষ্টেটের খেলা আর ইউনুসের মেটিকুলাস ডিজাইনের ফলে এ অঞ্চলে যে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়িয়েছে তা আমার কাছে সেই চেরেনোবিলের পারমানবিক বিষ্ফোরণের চেয়েও বেশি ক্ষতিকর মনে হয়।

কারণ এখানে সাম্প্রদায়িক বিভেদ থাকলেও অতি উচ্চমাত্রায় ছিলনা। আবার বিভেদ থাকলেও একধরনের সহনশীলতা ও সম্প্রীতিবোধও কমবেশি ছিল। কিন্তু চব্বিশের ‘ইসলামী জঙ্গী-সেনা ক্যু’ এর পর থেকে যেভাবে সাম্প্রদায়িকতার দূষণ ছড়াচ্ছে তা আর বাংলাদেশ থেকে যাবে বলে মনে হয়না।

কারণ স্কুলগামী ছোট্ট শিশুটি থেকে শুরু করে কিশোর-তরুণ-যুবা ও পরিণত বয়স্ক সবার মধ্যে এই ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বিষটি ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে।

যতই আমাদের রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আর জাতি-ধর্ম-বর্ণ-পাহাড়ি-অপাহাড়ি নির্বিশেষে সবার একই নাগরিক অধিকার বলে পালিশ দেয়ার চেষ্টা করুন না কেন। বিশ্বাস ও চেতনায় যে ফাটল ধরেছে তা কি আর জোড়া লাগানো যাবে?

ওই যে কথায় কথায় লোকজনে উদাহরণ দেয়- ‘মন ভাঙ্গা আর মসজিদ ভাঙ্গা সমান কথা।’ কারন মসজিদতো ইবাদতের জায়গা, পবিত্র জায়গা। তেমনি মনটাও অনেক নরম ও পবিত্র। সেই মন যদি একবার কারো ওপর থেকে বিশ্বাস-আস্থা তুলে নেয় তা কি আর জোড়া লাগবে?

মসজিদের অপমান হলে যেমন আমাদের মুসলমানদের মনে প্রচন্ড কষ্ট হয় ঠিক তেমনি অন্য ধর্মের মানুষদের মনে তার বিশ্বাসে আঘাত দিলে তেমনই কষ্ট হয়।

আমরা মুসলমানরা ভুলে যাই- “লাকুম দ্বীনুকুম ওয়ালি ইয়াদীন” (لَكُمْ دِينُكُمْ وَلِيَ دِينِ)। এটি পবিত্র কুরআনের ১০৯ নম্বর সূরা ‘আল-কাফিরুন’-এর শেষ (৬ নম্বর) আয়াত।

এর সহজ বাংলা অর্থ: “তোমাদের ধর্ম তোমাদের জন্য এবং আমার ধর্ম আমার জন্য”। যা মানুষের স্বাধীনভাবে নিজ ধর্ম পালনের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “সাবধান! যে ব্যক্তি কোনো চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমের প্রতি জুলুম করবে, তার অধিকার খর্ব করবে, তার ক্ষমতার বাইরে তাকে বোঝা চাপাবে কিংবা তার অনুমতি ছাড়া তার কাছ থেকে কিছু নেবে— কিয়ামতের দিন আমি নিজেই তার বিরুদ্ধে বাদী হব।”(আবু দাউদ)।

পবিত্র কুরআন-হাদীসে যেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে এসব কথা সেক্ষেত্রে আমরা কি করছি সমাজে-রাষ্ট্রে ?

বাংলাদেশের দুটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মীয় অনুভূতি, উপাসনালয়ের মর্যাদা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্যের ঘটনায় নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

একটি ঘটনা ঘটেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে কেন্দ্রীয় মন্দির সংলগ্ন এলাকায় গরুর মাংসের খিচুড়ি রান্নার আয়োজন নিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ জানান।

অন্যদিকে, এ ঘটনাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলা বিতর্কের পর মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে কথিত আপত্তিকর মন্তব্য করার অভিযোগে সাময়িক বহিষ্কারের মুখে পড়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সৈকত হালদার। তবে দুটি ঘটনার স্থান ও প্রেক্ষাপট আলাদা এবং সৈকত হালদারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত চলমান।

আপনাদের নিশ্চয়ই অজানা নয়- গত ১২ অক্টোবর রাতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মন্দিরের কাছাকাছি গরুর মাংসের খিচুড়ি রান্নার আয়োজন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০২১–২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা। অভিযোগ ওঠে, রান্নার চুলা তৈরিতে মন্দিরের ইট ব্যবহার করা হয়েছিল।

বিষয়টি জানাজানি হলে সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীরা আপত্তি জানান এবং নিরপেক্ষ তদন্ত ও ক্যাম্পাসের ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবিতে প্রতিবাদ ও মানববন্ধন করেন।

ঘটনাটি নিয়ে সমালোচনা তৈরি হলে আয়োজক শিক্ষার্থীরা দুঃখ প্রকাশ করেন।

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁরা দাবি করেন, ব্যবহৃত ইটগুলো মন্দিরের বলে তাঁরা জানতেন না। বিষয়টি জানার পর ইট সরিয়ে ক্যানটিন থেকে আনা লোহার চুলা ব্যবহার করেন বলেও জানান তাঁরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক আজম জানান, সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের ডেকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে এবং পুরো বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলা বিতর্কের মধ্যে আলোচনায় আসেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ২০২১–২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সৈকত হালদার।

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা নিয়ে একটি ফেসবুক পোস্টের মন্তব্যের ঘরে ধর্মীয় অনুভূতি ও উপাসনালয়কে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি মন্তব্যের একপর্যায়ে তাঁর বিরুদ্ধে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে আপত্তিকর ও অবমাননাকর মন্তব্য করার অভিযোগ ওঠে।

১৩ অক্টোবর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অভিযোগের ভিত্তিতে সৈকত হালদারকে সাময়িকভাবে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয় এবং বিষয়টি তদন্তের জন্য চার সদস্যের কমিটি গঠন করে।

অর্থাৎ, সৈকত হালদার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নন; তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তকে সেই পরিচয় ও প্রেক্ষাপটেই বিবেচনা করা জরুরি।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—ধর্মীয় উপাসনালয়ের মর্যাদা রক্ষা, ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধা এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিরপেক্ষতা—সব ক্ষেত্রেই কি একই রকম গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে?

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মন্দিরের কাছে রান্নার আয়োজন ও মন্দিরের ইট ব্যবহারের অভিযোগের তদন্ত যেমন স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন, তেমনি সৈকত হালদারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে চূড়ান্তভাবে দোষী বলা যেমন ঠিক নয়, তেমনি কোনো উপাসনালয়ের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার অভিযোগকেও উপেক্ষা করা উচিত নয়।

ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখতে হলে সব ধর্মের মানুষের উপাসনালয়, বিশ্বাস ও অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখাতে হবে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতিটি পদক্ষেপ হওয়া উচিত তথ্য, প্রমাণ ও ন্যায়সংগত তদন্তের ভিত্তিতে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার তদন্তে কী সিদ্ধান্ত আসে এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সৈকত হালদারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্তে কী পাওয়া যায়—এখন সেদিকেই নজর থাকবে।

শিক্ষক ও সমাজ বিশ্লেষক নাহিদ আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন-

“ যারা বিদেশে পড়াশোনা করেছেন, দয়া করে উত্তর দেবেন বিদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসে এভাবে পশু জবাই করার ঘটনা কি কখনো দেখেছেন? কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরে এভাবে পশু জবাই করে খাওয়াকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া হয় কি?

বাংলাদেশের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে পশু জবাইয়ের ঘটনাটি সামনে আসার পর প্রশ্ন জাগে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আমরা আসলে কী ধরনের সংস্কৃতি তৈরি করছি?

বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ডিগ্রি অর্জনের জায়গা নয়; এটি জ্ঞান, যুক্তিবোধ, নৈতিকতা, সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধ চর্চার কেন্দ্র। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ কেমন হবে, তার মধ্য দিয়েই বোঝা যায় সেই প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের কী ধরনের মূল্যবোধ শেখাচ্ছে।

মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও সাংস্কৃতিক চর্চা নিয়ে ভিন্নতা থাকতেই পারে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, যেকোনো স্থানে যেকোনোভাবে পশু জবাই করাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে হবে। ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক পরিচয়ের দোহাই দিয়েও জনপরিসরের নিয়মনীতি, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, প্রাণীর প্রতি ন্যূনতম দায়িত্ববোধ এবং অন্যের স্বাচ্ছন্দ্যের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

আমরা কি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসকে জ্ঞানচর্চা ও মুক্তবুদ্ধির পরিবেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই, নাকি সেখানে যা খুশি তা করার অধিকারকেই সংস্কৃতি বলে প্রতিষ্ঠা করতে চাই?

আরও বড় প্রশ্ন হলো, প্রাণীর প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন? প্রাণী কি কেবল মানুষের ভোগের বস্তু, নাকি তারও যন্ত্রণা অনুভব করার ক্ষমতা আছে, যার প্রতি মানুষের নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে? একটি সভ্য সমাজে এই প্রশ্নগুলো নিয়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সেই আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জায়গা।

বিশ্ববিদ্যালয় যদি শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ও বিবেকের বিকাশ ঘটাতে না পারে, তাহলে শুধু ডিগ্রি দিয়ে আমরা কেমন সমাজ গড়ে তুলব?

বিদেশে পড়াশোনা করেছেন এমন ব্যক্তিদের কাছে জানতে চাই আপনাদের অভিজ্ঞতায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে এ ধরনের পশু জবাইয়ের ঘটনা কি দেখেছেন? আর বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণে কী ধরনের নীতিমালা থাকা উচিত? আমাদের বিতর্কটি কোনো ধর্ম বা সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নয়; বরং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ, নৈতিক দায়িত্ববোধ এবং প্রাণীর প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে।”

সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ও অত্যন্ত যৌক্তিক প্রতিবাদী অধ্যাপক কাবেরী গায়েন বলেছেন- “অথচ এই পশু জবাই এবং না-জবাই পক্ষের সকল শিক্ষার্থী মিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ল্যাব, যন্ত্রপাতি, লাইব্রেরির জন্য বইয়ের দাবি জানিয়ে মিছিল করলে কত শিক্ষার্থীসুলভই না হত! হত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসুলভ!! কিন্তু, সেটা তো হবার নয়।

জগন্নাথের শিক্ষার্থীরা যে দাবিতে রাস্তায় নেমেছেন, আদায় করেছেন এবং যেভাবে বাস্তবায়ন করেছেন তা শুধু অন্য ধর্মের প্রতি অবজ্ঞা এবং বিদ্রুপ নয়, বড় বেশি অ-শিক্ষার্থীসুলভ। আমার খারাপ লাগার জায়গা ঐখানেই। শুভবোধের শেষ দুর্গগুলো এভাবে ভেংগে গেলে আশা করার আর কিছু থাকে না।

অথচ, শুভবোধের জন্য ইচ্ছাই যথেষ্ট।
অপরদিকে বিএনপিপন্থী ও একসময়ে লালবদরের ঘোরতর একটিভিস্ট জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা বলেছেন- ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট গরুতে নয়, চিন্তায় !’

তিনি ২০২৪ এর পাঁচই আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন- “এক অদ্ভুত বুদ্ধিবৃত্তিক বাস্তবতা আবিষ্কার করছি। কোথাও গণবিবাহের প্রস্তাব, কোথাও গরুর মাংস রান্না নিয়ে সংঘাত, কোথাও পশু জবাই নিষিদ্ধ করে প্রশাসনিক বিজ্ঞপ্তি, আবার সেই নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে গরু নিয়ে মিছিল! ভাবছি, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রাধিকার আসলে কোথায়!?”

তিনি বলেন- “গণবিবাহ কিংবা গরুর মাংস খাওয়া নিয়ে আমার কোনো আপত্তি নেই। একজন নৃবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ও শিক্ষক হিসেবে জানি, খাদ্য কখনোই কেবল খাদ্য নয়। এর সঙ্গে সংস্কৃতি, ধর্ম, পরিচয়, ক্ষমতা এবং সামাজিক সম্পর্কের গভীর যোগ রয়েছে। ফলে খাদ্যকে কেন্দ্র করে সংঘাতও তুচ্ছ নয়; বরং এসব সংঘাতের মধ্য দিয়েই একটি সমাজের গণতান্ত্রিক পরিপক্বতা ও ক্ষমতার সম্পর্ক উন্মোচিত হয়।” এসব বলে তিনি বলেন- তবে একটি প্রশ্ন রাখতে চাই।

তার সেই প্রশ্নটি হলো- “বিশ্ববিদ্যালয়ে গরুর মাংস রান্না ও খাওয়ার স্বাধীনতা যদি আমরা সমর্থন করি, তাহলে অন্য কোনো শিক্ষার্থী আইন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ বিধি মেনে শূকরের মাংস রান্নার আয়োজন করতে চাইলে আমরা কি একই স্বাধীনতা স্বীকার করব? যাঁরা আজ খাদ্যাভ্যাসের স্বাধীনতার পক্ষে সোচ্চার, তাঁরা কি সেদিনও একই অবস্থানে দাঁড়াবেন?”

তিনি বলেন- “নিজের পছন্দের স্বাধীনতাকে সমর্থন করা উদারতা নয়। প্রকৃত উদারতার পরীক্ষা শুরু হয় তখনই, যখন অন্যের স্বাধীনতা আমার বিশ্বাস, রুচি কিংবা সংস্কৃতির সঙ্গে মেলে না। অবশ্যই স্বাধীনতা মানে সীমাহীন অধিকার নয়। অন্যের উপাসনাস্থলের মর্যাদা, ধর্মীয় অনুভূতি, জনস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার দায় সবার। কিন্তু সেই দায় ও নিয়ম সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং সংখ্যালঘু—সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় তো এমন একটি প্রতিষ্ঠান হওয়ার কথা, যেখানে একজন ধার্মিক, একজন নাস্তিক, একজন রক্ষণশীল কিংবা একজন প্রগতিশীল সমান মর্যাদায় সহাবস্থান করবেন। কেউ কারও বিশ্বাস গ্রহণ করতে বাধ্য নন; কিন্তু প্রত্যেকের সমান অধিকার স্বীকার করার নৈতিক দায় রয়েছে।”

অধ্যাপক রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধার মতে- “বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ সবাইকে একভাবে চিন্তা করতে শেখানো নয়; ভিন্নভাবে চিন্তা করেও কীভাবে একসঙ্গে বসবাস করতে হয়, সেটি শেখানো। অথচ আমাদের অনেক বিতর্কে যুক্তির চেয়ে পরিচয়, সহনশীলতার চেয়ে আধিপত্য এবং নীতির চেয়ে গোষ্ঠীগত আনুগত্য বড় হয়ে ওঠে। আমরা বৈষম্যহীনতার কথা বলি, কিন্তু নিজেদের বিশ্বাসের বাইরে অন্যের সমান অধিকার স্বীকার করতে দ্বিধা করি।

এদিকে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সামনে গবেষণার অর্থায়ন, একাডেমিক স্বাধীনতা, শিক্ষক নিয়োগের স্বচ্ছতা, শিক্ষার্থীদের আবাসন, শিক্ষার মান ও আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতার মতো মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে।

QS World University Rankings 2026-এ বাংলাদেশের সর্বোচ্চ অবস্থানে থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান ৬০০তম। র্যা ঙ্কিং অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয়ের উৎকর্ষের একমাত্র মানদণ্ড নয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক জ্ঞান উৎপাদনে আমাদের অবস্থান নিয়ে আত্মসমালোচনার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

সেখানে বিয়ের আয়োজন কিংবা গরু জবাইয়ের অনুমতিকে কেন্দ্র করে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতর্ক উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, তখন আমাদের অগ্রাধিকার ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কৃতি নিয়ে প্রশ্ন তোলাই স্বাভাবিক।”

তিনি বলেন- “ ভাই, গরু জবাই আর গণবিবাহের আয়োজন করে যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যা ঙ্কিং বাড়ত, তাহলে আমাদের এত দিনে বিশ্বসেরা দশে থাকার কথা! তবে সংকট কেবল র্যা ঙ্কিংয়ের নয়। সংকট আরও গভীরে—আমরা কি এমন এক শিক্ষিত প্রজন্ম তৈরি করছি, যারা নিজেদের অধিকার দাবি করতে জানে, কিন্তু অন্যের সমান অধিকার স্বীকার করতে শেখেনি?

বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি জ্ঞানের একটি প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে পারে; কিন্তু তা মানুষকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্তিবাদী, সহনশীল কিংবা ন্যায়পরায়ণ করে তোলে না।

পাঁচই আগস্টের পর আমরা নতুন বাংলাদেশ, বৈষম্যহীন সমাজ এবং মুক্তচিন্তার কথা বলেছি। কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন আর চিন্তার সংস্কৃতির পরিবর্তন এক বিষয় নয়। পুরোনো অসহিষ্ণুতার জায়গায় নতুন অসহিষ্ণুতা প্রতিষ্ঠা কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তি নয়। আধিপত্যকারীর পরিচয় বদলালেই আধিপত্যের কাঠামো বদলে যায় না।

বিশ্ববিদ্যালয় হবে জ্ঞানচর্চা, প্রশ্ন, বিতর্ক ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার জায়গা; সংখ্যাগরিষ্ঠের বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা কিংবা সংখ্যালঘুর পরিচয়কে প্রান্তিক করার প্রতিষ্ঠান নয়। মতভিন্নতা সেখানে সংকট নয়, জ্ঞান উৎপাদনের অপরিহার্য শর্ত। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি গরু, শূকর কিংবা বিয়ের নয়। প্রশ্নটি আমাদের নৈতিক সততা, বুদ্ধিবৃত্তিক পরিপক্বতা এবং স্বাধীনতার ধারণা নিয়ে। আমরা কি সত্যিই বৈষম্যহীন বিশ্ববিদ্যালয় চাই, নাকি কেবল বৈষম্য করার ক্ষমতাটি নিজেদের হাতে চাই ?”

সম্মানিত পাঠক, এই যে কুরআন-হাদীসে কি বলা হয়েছে সে ব্যাখ্যাও আমরা দেখলাম। তাছাড়া যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীদের বিষয় ও ঘটনা সেজন্য কয়েকজন শিক্ষক ও সমাজচিন্তকের বক্তব্য ও মতামতও আমলে নিলাম আমরা। এদের কেউ উদারপন্থী, কেউ বাম ঘরানার আবার কেউ চব্বিশের সেই তথাকথিত গণঅভ্যুত্থানের পক্ষের ও বিএনপিপন্থী শিক্ষক। এঁদের কেউই কিন্তু এভাবে অসভ্যের মত গরু কেটে অন্য ধর্মীয় নাগরিকদের অনুভূতিতে আঘাত দেয়াকে মেনে নেননি।

এসব দেখেশুনে প্রশ্ন জাগে- ইসলাম কি গরুর গোশত খাওয়ার মধ্যেই নিহিত ? ইসলাম কি অপর ধর্মের নাগরিকদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার শিক্ষা দিয়েছে ? আমাদের শিক্ষামন্ত্রী কোথায় ? ধর্মমন্ত্রী কোথায় ? তারা কি উটপাখির মত বালিতে চোখ ডুবিয়ে আছেন ?

এখনো বোধ হয় সময় আছে। একটু চেষ্টা করে দেখুন না প্লিজ-

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে, শিক্ষার্থীদেরকে অন্তত অশিক্সা-কুশিক্ষা-অন্ধত্ব ও গোঁড়ামী থেকে ফিরিয়ে আনুন। বিদ্বেষ-ঘৃনা-হিংসার পথ থেকে সরিয়ে আনা যায় কীনা দেখুন অন্তত চেষ্টাতো করুন । নাহলে যে সাম্প্রদায়িক ফ্রাঙ্কেনস্টাইন তৈরী হয়েছে ও হচ্ছে তা থেকে কিন্তু আপনারাও রেহাই পাবেন না। দেশ-জাতিতো নয়ই।

যে মুসলমানিত্ব রক্ষা না শো-আপ বা ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য ‘গরুতেই ইসলাম’ বলে চরম বোকামি করছে কিছু উগ্রবাদী গোষ্ঠী তারা কি সত্যিকার ভাবেই পবিত্র কুরআন-হাদীস পড়েছেন বা পড়ার চেষ্টা করেছেন? অপরের ধর্মকে খাটো করার যে চরম নিন্দনীয় কাজ তারা করেছে ও করছে তাতে করেতো বরং পবিত্র কুরআন-হাদীসেরই অপমান করা হচ্ছে। এদেরকে বোঝানোর জন্য কি এদেশে কোন শুভবুদ্ধিসম্পন্ন আলেম সমাজ নেই? এতই দৈন্যতা দেখা দিয়েছে?

# নুরুল ইসলাম আনসারি: লেখক, প্রাবন্ধিক।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *