রাঙামাটি: রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকে পাঁচ দফা প্রস্তাব গ্রহণ করেছে সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত বিশেষ কার্বারি সম্মেলন।

“পরিস্থিতি অস্থিতিশীল ও সংঘাতময় রেখে সাজেকে সেটলার পুনর্বাসনের ষড়যন্ত্র রুখো” শ্লোগানে রাঙামাটির সাজেকে বিশেষ কার্বারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) দুপুরে সাজেক কার্বারী এসোসিয়েশন এই সম্মেলনের আয়োজন করে।

সম্মেলনে গত ২২ অক্টোবর উজোবাজারে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা, নির্যাতন, ভাঙচুর, লুটপাট ও গুলিবর্ষণের ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ-সহ ৫ দফা প্রস্তাবনা গ্রহণ এবং দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়।

এই সম্মেলনে সাজেকের প্রত্যেক গ্রামের কার্বারী এবং বিশিষ্ট জনেরা অংশগ্রহণ করেন।

সাজেক কার্বারী এসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমার সভাপতিত্বে ও সদস্য প্রবীন চাকমার সঞ্চালনায় সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন কার্বারী উপদেষ্টা কমিটির জ্যোতি লাল চাকমা, সাজেক কার্বারী এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক বিনয় চাকমা ও সদস্য সুপতি চাকমা।

সম্মেলনে সভাপতির বক্তব্যে নতুন জয় চাকমা বলেন, “সাজেকের জনগণ সব সময় শোষণ, নিপীড়নের শিকার হয়ে আসছে। ২০০৮ ও ২০১০ সালে সাজেকের পাহাড়িদের ওপর হামলা করে উচ্ছেদের চেষ্টা করা হয়েছে। সে সময় হামলায় শত শত ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, তিন জনকে খুন ও আরও অনেককে জখম করা হয়েছে। যার মূল লক্ষ্য ছিল সাজেকে সেটলার পুনর্বাসন করা।

প্রায় ১৬ বছর নীরব থাকলেও আবারো নতুন করে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। সাজেকে স্কুল, কলেজ ও বাড়িঘর নির্মাণে বাধা দেয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে জেএসএসের সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সহায়তা করে মাচলং ও এর আশেপাশে নিয়ে এসে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছে।”

তিনি আরো বলেন, “গত ২২ অক্টোবর সাজেকবাসীর উপর আবার হামলা করা হয়েছে। ঐদিন সাজেকবাসী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ অবরোধ পালন করছিলেন। কিন্তু হঠাৎ বিনা উস্কানিতে আন্দোলনকারীদের উপর লাঠিপেটা শুরু করা হয় এবং গুলি করা হয়। এতে কমপক্ষে ৭০ জন আহত হন। এছাড়া উজোবাজারে দোকান ও বাড়িঘরে ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়।

সাজেকের চলমান সংকট নিরসনের লক্ষ্যে গত ২৬ অক্টোবর উজোবাজারে সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারী এসোসিয়েশনের সাথে সরকারের প্রতিনিধি দলের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

কিন্তু সরকারি প্রতিনিধি দল সাজেকবাসীর মূল দাবি পূরণের প্রতিশ্রুতি দিতে ব্যর্থ হওয়ায় বৈঠকটি সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয় বলে তিনি জানান।

সকল প্রকার অন্যায় ও সন্ত্রাসী তৎপরতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।

জ্যোতিলাল চাকমা বলেন, “সাজেকে আমাদের টিকে থাকতে হলে লড়াই সংগ্রাম করতে হবে। সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারী এসোসিয়েশনের উত্থাপিত পাঁচ দফা দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে।”

সম্মেলনে গৃহীত ৫ দফা প্রস্তাবনা: আমরা “কোড আনকোড” তুলে ধরছি:

১) “বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিকের শান্তিপূর্ণভাবে ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সভা-সমাবেশসহ আন্দোলনের কর্মসূচি পালন করার অধিকার রয়েছে। তাই ২২ অক্টোবরের হামলা হলো সাজেকবাসীর গণতান্ত্রিক অধিকারের উপর নগ্ন হস্তক্ষেপ। আমরা উক্ত হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।

২) আমরা সাজেকবাসীর পক্ষে সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারী এসোসিয়েশনের উত্থাপিত পাঁচ দফা দাবির প্রতি সমর্থন এবং চলমান আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করছি। আমরা একই সাথে সাজেকের জনগণকে এই আন্দোলনে সামিল হওয়ার জন্য এবং সাজেকের বাইরে পার্বত্য চট্টগ্রামের ও দেশের প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দল, সংগঠন ও ব্যক্তিগণকে সাজেকবাসীর এই ন্যায্য আন্দোলনকে সমর্থন দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছি।

৩) দেশের অপরাপর অঞ্চলের নাগরিকদের মতো সাজেকবাসীরও সন্ত্রাসমুক্ত গণতান্ত্রিক পরিবেশে নিরাপদে বসবাস করার অধিকার রয়েছে। আমরা এই পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।

৪) শান্তিপূর্ণ অবরোধ-সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার কারণে গত ২৪ অক্টোবর সাজেকের ডিপুপাড়ায় এসএসসি পরীক্ষার্থী ঝর্ণা চাকমাকে গ্রেফতারের চেষ্টার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে প্রশাসনের কাছে তার নিশ্চয়তা দাবি করছি।

৫) সাজেক কলেজের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করতে ও পাঠদানে বাধা প্রদান থেকে বিরত থাকতে প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি”!

সম্মেলনে নতুন জয় চাকমা পাঁচ দফা প্রস্তাবনা উত্থাপন করলে উপস্থিত কার্বারি ও সমাজের প্রতিনিধিরা হাত তুলে তাতে সমর্থন জানান।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *