ঢাকা: রাজধানীর উপকণ্ঠের তুরাগ নদী থেকে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর (বিএএফ) সাবেক কর্মকর্তার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে।

মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে উত্তরার একটি রেস্তোরাঁয় তাঁর অবস্থান এবং অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের মাধ্যমে তাঁর ওপর নজরদারি করার একটি ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

গত ২৮ অক্টোবর (বুধবার) তুরাগ নদী থেকে সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সৌরির (২৮) মরদেহ কচুরিপানা দিয়ে ঢাকা অবস্থায় উদ্ধার করে বাংলাদেশ রিভার পুলিশ।

এর আগে ২৭ অক্টোবর রাতে উত্তরার একটি রেস্তোরাঁয় এক বন্ধুর সঙ্গে রাতের খাবার খেতে গিয়ে আর বাড়ি ফেরেননি তিনি।

জানা গেছে, ২৭ অক্টোবর রাতে ‘দ্বীপ’ নামের এক বন্ধু তাহসিফের উত্তরার বাসায় যান এবং তাঁর মোটরবাইকটি বেসমেন্টে পার্ক করে তাহসিফকে নিচে ডাকেন।

তাহসিফের নিজস্ব মোটরসাইকেলটি নষ্ট থাকায়, তাঁরা দুজনে প্রথমে উত্তরা সেন্ট্রাল স্টেশনের কাছের একটি গ্যারেজে গিয়ে সেটি মেরামত করেন।

এরপর রাত আনুমানিক ৮টা ৫০ মিনিটে তাঁরা উত্তরার রাজউক শপিং মলের একটি রেস্তোরাঁয় প্রবেশ করেন। রাত ৮টা ৫৫ মিনিটে তাহসিফ তাঁর ডেবিট/ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে খাবারের বিল পরিশোধ করেন। তাঁরা টেবিলে বসার পরপরই—রাত ৮টা ৫৮ মিনিটের ঠিক আগে—চারজন যুবক ওই রেস্তোরাঁয় প্রবেশ করে।

যুবকরা তাহসিফ ও দ্বীপের টেবিলের দিকে তাকিয়ে ঠিক পাশের টেবিলে গিয়ে বসে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি রেস্তোরাঁর স্থায়ী সিসিটিভি ক্যামেরার নয়, বরং কোনো একজন ব্যক্তির হাতে থাকা মোবাইল বা ডিভাইসে ধারণ করা।

ভিডিওটা দেখে স্পষ্ট বোঝা যায়, কেউ একজন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাহসিফ ও দ্বীপের গতিবিধির ওপর নজর রাখছিলেন।
ধারণা করা হচ্ছে, ভিডিও ধারণকারী ব্যক্তিরা তাহসিফ রেস্তোরাঁয় পৌঁছানোর আগেই সেখানে অবস্থান করছিলেন।

বন্ধু দ্বীপের ভূমিকা নিয়েও সন্দেহ দেখা দিয়েছে। কারণ, দ্বীপই তাহসিফকে ওই নির্দিষ্ট রেস্তোরাঁয় বসার প্রস্তাব দিয়েছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অন্য একটি ভিডিওতে দেখা যায়, তাহসিফ ও দ্বীপ রেস্তোরাঁ থেকে বের হওয়ার আগেই ওই চার যুবক সেখান থেকে চলে যায়।

ধারণা করা হচ্ছে, শ্বাসরোধ বা অন্য কোনো উপায়ে হত্যার পর তাঁর মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।

২৮ অক্টোবর রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফ তাঁর মাকে বার্তা পাঠিয়ে জানিয়েছিলেন যে তিনি বাড়ি ফিরছেন। ধারণা করা হচ্ছে, বন্ধু দ্বীপের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ফেরার পথে মধ্যরাতের পর কোনো এক সময়ে তিনি হত্যাকারী বা অপহরণকারীদের কবলে পড়েন।

২৯ অক্টোবর তাহসিফের মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে এবং ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা প্রতিবেদনটি বিশ্লেষণ করছেন। তবে মরদেহ উদ্ধারের দুই দিন পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত এই ঘটনায় কোনো আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করা হয়নি।

পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদন অনুযায়ী, তার বুক, পেট, পিঠ, দুই পা ও গোপনাঙ্গে কোনো দৃশ্যমান বাহ্যিক আঘাত বা জখমের চিহ্ন পাওয়া যায়নি।

তাঁর নাক দিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল এবং পেট কিছুটা ফোলা ছিল। চোখ ও মুখ বন্ধ ছিল, হাত দুটি মুষ্টিবদ্ধ এবং বাহু মাথায় বাঁকানো অবস্থায় পাওয়া গেছে।

উদ্ধারের সময় তার গায়ে কালো রঙের ফুল-স্লিভ কাবলি শার্ট এবং সাদা পায়জামা ছিল। হাতে ঘড়ি এবং পকেটে একটি আইফোন ও সিগারেটের প্যাকেট পাওয়া যায়, যার মাধ্যমে তার পরিচয় নিশ্চিত করা হয়।

পুলিশ ঘটনাটিকে একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বা হোমিসাইড ধরে নিয়ে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *