চট্টগ্রাম: রাইটস অ্যান্ড রিস্কস অ্যানালাইসিস গ্রুপ (RRAG) আজ প্রকাশিত তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে, নির্বাচনী সহিংসতার নামে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায় সংখ্যাগরিষ্ঠ উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে, বিশেষ করে অগ্নিসংযোগ ও হত্যার শিকার হচ্ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে ৩১ জানুয়ারি ২০২৬-এর মধ্যে চট্টগ্রাম জেলার মিরসরাই ও রাউজান এবং পিরোজপুর ও সিলেটে অন্তত ১৬ জন হিন্দুর বাড়িঘর, মন্দির ও সম্পদ পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে সাতটি ঘটনাই ঘটেছে গত এক সপ্তাহে।

যাদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছেন চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের তপন ধর, প্রয়াত অমিও ধর, কানু নাথ, অশোক ধর, অনুপ ধর এবং মৃদুল সাহা; রাউজানের সুখ শীল, অনিল শীল, বিমল তালুকদার, রুবেল দাস, সাধন বড়ুয়া, সোনা পাল ও কামিনী মোহন পাল; পিরোজপুরের এক সাহা পরিবার এবং সিলেটের বিকাশ রঞ্জন দেব।

হামলাকারীদের কর্মপদ্ধতি ব্যাখ্যা করে RRAG-এর পরিচালক সুহাস চাকমা বলেন, “পরিকল্পিতভাবে মন্দির, বসতবাড়ি এবং খড়ের গাদায় আগুন দেওয়া হয়েছে।

এমনকি ভেতরে মানুষ থাকা অবস্থায় হিন্দু ও বৌদ্ধদের ঘরের দরজা বাইরে থেকে আটকে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা জীবন্ত পুড়ে মারা যায়। চট্টগ্রাম অঞ্চলের মিরসরাই ও রাউজানেই সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর সবচেয়ে বেশি অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।”

সুহাস চাকমা আরও যোগ করেন, “৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে ১ জানুয়ারি ২০২৬-এর মধ্যে অন্তত ১৭ জন সংখ্যালঘু হিন্দুকে লক্ষ্যবস্তু করে হত্যা করা হয়েছে।

এর আগেও রানা প্রতাপ বৈরাগী, শান্ত চন্দ্র দাস, যোগেশ চন্দ্র রায় এবং সুবর্ণা রায়ের মতো বেশ কয়েকজনকে গলা কেটে ‘তালিবানি কায়দায়’ হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া চঞ্চল চন্দ্র ভৌমিককে তার কর্মস্থল গ্যারেজে ঘুমন্ত অবস্থায় আগুন ধরিয়ে হত্যা করা হয়।”

নিহত সংখ্যালঘু হিন্দুরা হলেন:

চঞ্চল চন্দ্র ভৌমিক (২৩ জানুয়ারি ২০২৬), সমীর দাস ও প্রলয় চাকি (১১ জানুয়ারি ২০২৬), জয় মহাপাত্র (১০ জানুয়ারি ২০২৬), মিঠুন সরকার ও শরৎ মণি চক্রবর্তী (৬ জানুয়ারি ২০২৬), রানা প্রতাপ বৈরাগী (৫ জানুয়ারি ২০২৬), খোকন চন্দ্র দাস (৩১ ডিসেম্বর ২০২৫), বাজেন্দ্র বিশ্বাস (২৯ ডিসেম্বর ২০২৫), অমৃত মণ্ডল (২৪ ডিসেম্বর ২০২৫), দিপু চন্দ্র দাস (১৮ ডিসেম্বর ২০২৫), শান্ত চন্দ্র দাস (১২ ডিসেম্বর ২০২৫), যোগেশ চন্দ্র রায় ও সুবর্ণা রায় (৭ ডিসেম্বর ২০২৫) এবং প্রান্তোষ কর্মকার ও উৎপল সরকার (২ ডিসেম্বর ২০২৫)।

যদিও প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ বারবার সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর এসব হামলার পেছনে কোনো ধর্মীয় কারণ থাকার কথা অস্বীকার করেছেন।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ড. ইউনূস বলেছিলেন যে, একটি ধারণা প্রচলিত আছে যে বেশিরভাগ হিন্দু ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারকে সমর্থন করত, তাই যারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে ছিল (হিন্দুরা), তারা হামলার শিকার হয়েছে।

এছাড়া ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে তিনি উল্লেখ করেন যে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের ওপর ৬৪৫টি ঘটনা ঘটেছে, তবে “এর সিংহভাগই সাম্প্রদায়িক নয়, বরং অপরাধমূলক প্রকৃতির।”

এ প্রসঙ্গে সুহাস চাকমা বলেন, “কর্তৃপক্ষের এই অস্বীকার ইসলামিক ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের আরও উৎসাহিত করেছে।

নির্যাতনের ভয়ে ভুক্তভোগীরা অনেক সময় নিজেদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাকে ‘দুর্ঘটনা’ হিসেবে বর্ণনা করতে বাধ্য হন, যদিও তাদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করা হয়েছে অথবা তাদের সর্বস্ব পুড়িয়ে নিঃস্ব করা হয়েছে।”

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *