ঢাকা: নিজের দেশ মানে হলো মায়ের হাতে দেয়া গরম ভাতের মতো। নিজের দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে মানুষ কি থাকতে পারে বাইরে বাইরে? অথচ এইভাবেই বছরের পর বছর কাটিয়ে ফেলছেন লেখক তসলিমা নাসরিন।
তিনি সম্প্রতি একটি পোস্টে লিখেছিলেন, তাঁর তিনটে জীবন। অর্থাৎ একটা বাংলাদেশের, একটা ভারতের, একটা আমেরিকার। যদিও আমেরিকা তিনি যাতায়াত করছেন তবে বসবাস করেন ভারতে এখনো।
নিজের দেশে ফিরতে চেয়ে প্রত্যেক সরকারকেই তিনি আকুতি জানিয়েছেন। খোলা চিঠির দিয়েছেন। কিন্তু কোনো সরকারের পক্ষ থেকেই হ্যাঁ উত্তর আসেনি।
খালেদা জিয়া, বিগত সরকারপ্রধান শেখ হাসিনাকেও তিনি এক কাতারে ফেলেছেন বহুবার যেহেতু তাঁকে দেশে যাবার অনুমতি দেয়া হয়নি।
বারবার সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট ও খোলা চিঠির মাধ্যমে তিনি দেশে ফেরার কথা বলেছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, নিজের শিকড়ে ফিরতে চান। যেমন সবাই চায়! যদিও অনুমতি পেলে আদৌ তিনি যাবেন কিনা, তা নিয়ে তো সন্দেহ আছেই। তবে নিজের দেশে ফেরার অধিকার সবার আছে।
‘ভারতকে ভালোবাসি বলেই এখানে রয়েছি… আমাকে ভারতে থাকতে দিলে কৃতজ্ঞ থাকব’ — ভারতে রেসিডেন্স পারমিটের মেয়াদ বাড়ানো নিয়ে এভাবেও সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি পোস্ট দিয়ে শাহকে ট্যাগ করেছিলেন লেখক।
এভাবেই আছেন ভারতে। ভারত তাঁকে ফেলেনি।
লেখালিখির কারণে বাংলাদেশে তাঁর বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি হলে ১৯৯৪ সালে নিজের ভিটে ছাড়েন লেখক। বাংলাদেশ ছেড়ে ইউরোপ বেশ কয়েক বছর থাকেন। তারপর ২০০৪ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত তাঁর ঠিকানা হয় কলকাতা।
লেখার কারণে বাংলাদেশের মৌলবাদীদের নজরে পড়ে যান তিনি। এবং তাঁর বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি হয়, মাথার মূল্য ঘোষণাও হয়।
একটা সময়ে ছিলেন জয়পুরে। পরে দিল্লিতে থাকতে শুরু করেন।
ইউনূসকেও খোলা চিঠি দিয়েছিলেন তসলিমা নাসরিন।
‘লজ্জা’ উপন্যাস লেখার জন্যই বাংলাদেশ ছাড়তে হয়েছিল তসলিমাকে। সেই উপন্যাস ‘নিষিদ্ধ’ করা হয় বাংলাদেশে। এই সঙ্গেই ১৯৯৪ সালের অগস্ট মাসে দেশ থেকে ‘বের করে’ দেওয়া হয় তাঁকে।
সেই সময়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন খালেদা জিয়া। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে বাংলাদেশে ফেরার জন্য একাধিকবার আবেদন করেছিলেন তসলিমা। কিন্তু তাঁকে সেই অনুমতি দেওয়া হয়নি।
ফেসবুকে লেখা পোস্টে তসলিমা জানিয়েছিলেন, সম্ভবত ২০০৫ সালের ফ্রান্সের দোভিলে একটি অনুষ্ঠানে খাবার টেবিলে তাঁর সঙ্গে কথা হয় ইউনূসের। সেই সময়ে দেশে ফিরে আসার জন্য তসলিমাকে বলেছিলেন ইউনূস। তাঁকে যে দেশে ফিরতে দেওয়া হয় না সেই কথাও ইউনূসকে জানান তসলিমা।
ওই পোস্টে তসলিমা লিখেছেন, ইউনূস তাঁকে বলেছিলেন, ‘যেতে দেয় না আবার কী? ওটা তো আপনার দেশ, আপনার দেশে আপনার যাওয়ার, থাকার অধিকার আপনার জন্মগত। আপনাকে বাধা দেওয়ার রাইট কোনও সরকারের নেই।’
তাঁর পাসপোর্ট রিনিউ করা হয়নি। তারপরেও ‘দেশের মেয়েকে’ নিজের দেশে ফিরে আসার জন্য বলেছিলেন ইউনূস।
তসলিমা জানান, তিনি যাতে বাংলাদেশে ফিরতে পারেন সেই চেষ্টা ইউনূস করবেন বলে কথা দিয়েছিলেন। ইউনূস কী আদৌ সেই চেষ্টা করেছিলেন সেটাও জানতে চেয়েছেন তসলিমা।
ইউনূস তাঁকে দেশে ফেরার কথা বলতে ভয় পাচ্ছেন বলেও দাবি করেন তসলিমা। তাঁকে সাহায্য করলে ‘নতুন জিহাদি বন্ধুরা’ তাঁর মতই ইউনূসের মাথাও কেটে দেবে বলেও মন্তব্য করেছেন তসলিমা।
এবার নির্বাচিত সরকার এসেছে। ক্ষমতায় বিএনপি। তাঁর আবারো প্রশ্ন:
‘বাংলাদেশের লোকেরা ব্যস্ত মোস্তফা ফারুকির দেশত্যাগে অনুমতি না থাকা নিয়ে। হোয়াট এবাউট আমার দেশে ফেরা? অনুমতি আছে নাকি নেই’?
এত বছর পর এখন কি তিনি দেশে আসতে পারবেন? দেশ কি তাঁকে গ্রহণ করবে? দেশ বললে ভুল হবে, দেশের মৌলবাদী গোষ্ঠী! মৌলবাদী, জঙ্গীগোষ্ঠীর উপদ্রব এই দেশে আরো বেড়েছে।
তসলিমা কোনো অপরাধ করেননি। তারপরেও একজন বাঙালি লেখককে বাংলা থেকেই বিতারণ করা হলো, এটা লজ্জার! যে দেশে লেখক, কবি, সাহিত্যিক, গায়ক, সংস্কৃতিবান মানুষরা থাকবেন না সেই দেশ কি উন্নতি করবে? জঙ্গীবাদে ভরে যাবে না?
