ঢাকা: দেশের বিনোদন অঙ্গনে, বর্তমানে তুমুল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে, ছোট পর্দার অভিনেতা জাহের আলভী, তাঁর প্রয়াত স্ত্রী আফরা ইভনাথ খান ইকরা এবং অভিনেত্রী ইফফাত আরা তিথি।
তাঁদের ঘিরে তৈরি হয়েছে বিতর্ক। আলভীর স্ত্রী ইকরার মৃত্যুর পর থেকেই সামাজিকমাধ্যমে নানা অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ এবং ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা তীব্র হয়ে উঠেছে।
আলভী তাঁর নিজের স্ত্রী সন্তান থাকার পরেও অন্য নারী নিয়ে বেলেল্লাপনায় মেতেছিলো। জানা গেছে, আলভী নাকি তিথিকে বিয়েও করেছে।
মাঝখান থেকে আলভী ও ইকরার সন্তান ভুক্তভোগী হলো। মা হারা হলো বাচ্চাটা।
লোকজন বলছে, এমন বাবা থাকার চাইতে না থাকাই ভালো।
যাই হোক, এই ঘটনা তথা ইকরার মৃত্যুতে পুরুষতান্ত্রিকতার ছাপ দেখেছেন তসলিমা নাসরিন।
ঘটনাটির শেকড়ে গিয়ে বর্ণনা দিলেন নারীবাদী লেখক তসলিমা নাসরিন।
“ফেসবুক ছেয়ে গেছে ইকরার জন্য কান্নাকাটিতে। শোক, সহানুভূতি, আবেগ—সবকিছু যেন একদিকে ঢালাওভাবে ঢেলে দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে অন্যদিকে তিথির বিরুদ্ধে ঘৃণা, গালাগাল, এমনকি তাকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করার আহ্বান পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে।
প্রশ্ন হচ্ছে—কেন ইকরার জন্য এত প্রেম, আর তিথির জন্য এত ঘৃণা?
কারণটা খুব সহজ, এবং একই সঙ্গে খুব নির্মম।
ইকরা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বানানো “আদর্শ নারী”র ছাঁচে পুরোপুরি ফিট করে।

ইকরা শিক্ষিত ছিল, কিন্তু স্বনির্ভর ছিল না। সে চাকরি করেনি, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেনি। সে ছিল স্বামীর ওপর নির্ভরশীল, সংসারী, ঘরোয়া। স্বামীর সুখ-দুঃখ, ইচ্ছা-অনিচ্ছার মধ্যেই সে নিজের জীবনকে গুটিয়ে রেখেছিল। স্বামীকে নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসতো, স্বামীর জন্য রান্না করতো, অপেক্ষা করতো, তাকে খুশি রাখার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করতো।
সে স্বামীকে একটি পুত্রসন্তানও দিয়েছে—যা এই সমাজে এখনও নারীর একটি বড় “সাফল্য” বলে ধরা হয়। সে সন্তানের লালন-পালন করেছে, আদর্শ মায়ের ভূমিকায় থেকেছে, অন্য মেয়েদেরও সেই একই আদর্শের কথা শিখিয়েছে।
এই সমাজে “ভাল মেয়ে” বলতে যা বোঝায়—ইকরা ছিল তার নিখুঁত প্রতিমূর্তি।
এতটাই স্বামীকে ভালোবাসতো যে, যখন জানতে পারলো স্বামী তাকে আর ভালোবাসে না, অথবা অন্য কাউকে বিয়ে করতে চায়, তখন নিজের জীবনকেই মূল্যহীন মনে করলো। যেন তার অস্তিত্বের কোনও আলাদা অর্থ নেই—স্বামী ছাড়া তার জীবন নেই।
সে নিজেকে ভালোবাসেনি।
সে নিজের জীবনকে মূল্য দেয়নি।
সে নিজের জন্য বাঁচেনি।
সে বেঁচেছিল স্বামীর জন্য, আর শেষ পর্যন্ত স্বামীর জন্যই প্রাণ দিয়েছে।
পুরুষতান্ত্রিক সমাজে আদর্শ নারীর সংজ্ঞা ঠিক এটাই।
এই কারণেই ইকরার জন্য এত কান্না।
কারণ এই সমাজ সেই নারীকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে, যে নিজের জীবন, স্বাধীনতা, স্বপ্ন—সবকিছু বিসর্জন দেয় একজন পুরুষের পায়ের কাছে।
কিন্তু ইকরা যদি অন্যরকম হতো?
যদি সে স্বামীর সংসারে বশংবদ ভৃত্যের মতো না থাকতো?
যদি স্বামীর পরকীয়ার খবর পেয়ে ডিভোর্স দিয়ে বেরিয়ে আসতো?
যদি মাথা উঁচু করে বলতো—“আমি নিজে বাঁচবো”?
যদি একটা চাকরি জোগাড় করতো, স্বনির্ভর হতো, নিজের জীবন নতুন করে গড়ে নিতো?
যদি স্বামীকে ভুলে গিয়ে অন্য কাউকে ভালোবাসতো?
তাহলে কি আজ এই একই মানুষগুলো তার জন্য কাঁদতো?
না, কাঁদতো না।
বরং বলতো—“এ মেয়ে চরিত্রহীন”, “স্বামীকে ধরে রাখতে পারে না”, “আজকালকার মেয়েরা খুব খারাপ হয়ে গেছে।”
কারণ এই সমাজ নারীর আত্মমর্যাদাকে ভালোবাসে না।
এই সমাজ ভালোবাসে নারীর আত্মবিসর্জনকে।
এবার আসা যাক তিথির কথায়।
তিথি কাজ করে।
নিজের টাকা উপার্জন করে।
স্বনির্ভর।
সে ঘরের বাইরে যায়, একা চলাফেরা করে, পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে কাজ করে, এমনকি কাজের প্রয়োজনে দেশের বাইরেও যায়।
তার আগে একটি বিয়ে হয়েছিল, সেটি ভেঙেছে। সে ডিভোর্স নিয়েছে—এবং এরপরেও সে জীবন থামিয়ে রাখেনি।
সে আবার প্রেম করেছে।
কেউ কেউ বলছে সে তার প্রেমিকের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কেও জড়িয়েছে।
অর্থাৎ তিথি বিশ্বাস করে—
“আমার শরীর, আমার সিদ্ধান্ত।”
এই জায়গাটাই সমাজের চোখে তার সবচেয়ে বড় অপরাধ।
কারণ পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর শরীর তার নিজের নয়—
তার শরীর পরিবারের, সমাজের, স্বামীর।
এই সমাজের কাছে “ভাল মেয়ে” সেই, যে নিজের শরীর, ইচ্ছা, স্বাধীনতা—সবকিছুকে তালাবদ্ধ করে রাখে।
তিথি সেটা করেনি।
তাই তিথি সমাজের চোখে “আদর্শ নারী” নয়।
তাই তাকে বলা হচ্ছে—চরিত্রহীন, বারোভাতারি, স্লাট।
এখানেই আসল সত্যটা লুকিয়ে আছে।
আদর্শ নারী আর “স্লাট”—এই দুইয়ের মধ্যে ব্যবধান আসলে খুব বেশি নয়।
ব্যবধান মাত্র এক সুতো।
যে নারী নিজের জীবন পুরুষের পায়ের কাছে সমর্পণ করে, সে “আদর্শ নারী”।
আর যে নারী নিজের জীবন নিজের হাতে তুলে নেয়, সে “স্লাট”।
একই নারীও মুহূর্তের মধ্যে এই দুই পরিচয়ের মধ্যে যাতায়াত করতে পারে।
যে নারী সারাজীবন স্বামীর সেবা করেছে, যদি একদিন সে বলে—
“এবার আমি নিজের জন্য বাঁচবো”—
সেই মুহূর্তেই সমাজ তাকে “খারাপ মেয়ে” বানিয়ে ফেলতে পারে।
এই পুরো ব্যাপারটিতে একটি জিনিস খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে—
মেরুদণ্ড।
যতক্ষণ নারী ঝুঁকে থাকে, ততক্ষণ সে লক্ষ্মী মেয়ে।
যেই সে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে শেখে,
ঠিক সেই মুহূর্তেই সে হয়ে যায় সমাজের চোখে “খারাপ মেয়ে”।
পুরুষতন্ত্র আসলে নারীর চরিত্র বিচার করে না।
সে বিচার করে নারীর আনুগত্য।
আর সেই বিচারেই
ইকরা হয়ে ওঠে পূজিত,
আর তিথি হয়ে ওঠে ঘৃণিত”।
