ঢাকা: একসময় পহেলা বৈশাখ মানেই ছিল নতুন খাতা খোলা, পুরোনো হিসাবনিকেশ মিটিয়ে নতুন করে ব্যবসা শুরুর আনন্দঘন আয়োজন—হালখাতা।

কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে ঐতিহ্যবাহী হালখাতা এখন প্রায় বিলুপ্ত। নেই সেই আনন্দ। নেই পয়লা বৈশাখে নতুন জামা পড়ার আনন্দ।

এই হালখাতার ইতিহাস আছে। আজ সব ইতিহাস মৌলবাদীর কোপে অস্তমিত।

আবুল কালাম মঞ্জুর মোরশেদ সম্পাদিত ‘নববর্ষ ও বাংলার লোক-সংস্কৃতি’ বইয়ের ‘বাংলা নববর্ষ: ঐতিহ্যে ও স্মৃতিতে’ পাঠ্যে কাজী ফজলুর রহমান উল্লেখ করেছেন, “মহাজন, পাইকার, বড় কোম্পানি নতুন বছরের হিসাব রাখার জন্য নতুন খাতায় দেনা-পাওনা, বেচা-কেনার হিসাব লেখা শুরু করত। বেশ লম্বা খাতা, লাল কাপড়ের মলাট, লালু সুতার বাঁধন খুলে হিন্দু ব্যবসায়ীরা হয়ত লিখত শ্রী শ্রী গণেশয় নম। মুসলিম ব্যবসায়ী শুরু করত ‘বিসমিল্লাহ’ লিখে।”

“সকাল থেকে শুরু হয়ত খদ্দের, খাতক, ছোট খুচরা প্রত্যশায়ীদের আগমনের পালা। গত বছরের পাওনাটা একেবারে শোধ করা না গেলেও যা যা পারে সাধ্যমত দিয়ে তার পুরাতন দেনার ভার লাঘব করতো। পাইকার মহাজন তাদের আপ্যায়ন করতো মিষ্টি দিয়ে, যাবার সময় বাড়ির জন্য মিষ্টির পোঁটলা হাতে তুলে দিত। অনেকে আসত বাড়ির ছেলে পুলেকে সাথে নিয়ে। আমিও এমন হালখাতায় গেছি আমার পিতার সাথী হয়ে। টাকা-পয়সার ব্যাপারটা আসল উদ্দেশ্য হলেও তার কথাবার্তা উহ্যই থাকতো। হিসাব পত্র নিয়ে বিরোধ বাঁধতো না, নতুন করে দরাদরি হতো না। আর্থিক সম্পর্কের অতিরিক্ত যে একটা মানবিক সম্পর্কও আছে দুই পক্ষের মাঝে সেটাই প্রাধান্য পেত।”

পয়লা বৈশাখ মানেই নতুন বছর, নতুন আশা আর নতুন হিসেবের শুরু। এই নতুন শুরুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুরনো অথচ আজও প্রাসঙ্গিক একটি ঐতিহ্য— ‘হালখাতা’।

হালখাতা শুধু ব্যবসার খাতা খোলা নয়, এর মধ্যে লুকিয়ে আছে সম্পর্ক, বিশ্বাস আর সংস্কৃতির অনন্য গল্প।

‘হালখাতা’ শব্দটি এসেছে ‘হাল’ (নতুন/বর্তমান) এবং ‘খাতা’ (হিসেবের বই) থেকে। অর্থাৎ, পুরনো দেনা-পাওনা মিটিয়ে নতুন করে হিসেবের খাতা খোলার প্রথাকেই বলা হয় হালখাতা। সাধারণত পয়লা বৈশাখে ব্যবসায়ীরা এই রীতি পালন করেন।

‘গ্রাহকই ভগবান’—এই ভাবনাটাকেই আরও একবার মনে করিয়ে দেয় হালখাতা প্রথা।

তবে এই বছর তো পয়লা বৈশাখ হচ্ছে কোনোরকমে। মঙ্গল শোভাযাত্রা হয়ে গেছে বৈশাখী শোভাযাত্রা। আগামি বছর তা থাকবে কিনা সন্দেহ আছে।

হালখাতারও তাই দশা।

বাংলা ১৪৩২ বঙ্গাব্দের শেষ দিকে এসে চারদিকের কাণ্ডকীর্তি দেখে মনে হচ্ছে, বেশিদিন আর টিকবে না বাঙালি সংস্কৃতি।

যেভাবে বাঙালির জীবন থেকে পয়লা বৈশাখ তার জৌলুস হারাচ্ছে তাতে বাংলা ক্যালেন্ডারের অস্তিত্ব আদৌ থাকবে কি না তাও সন্দেহ।

১৪৩২ বঙ্গাব্দের পয়লা বৈশাখে দোকানে হালখাতাও দেখা যায়নি। আনন্দ তো দূরের কথা। এবারের বৈশাখের প্রথম দিনে এদিক -সেদিক ঘুরেও কোন দিকে মেলাটেলা চোখেও পড়বে না। হায়রে পয়লা বৈশাখ!

পয়লা বৈশাখ উদযাপনের সমারোহকে কী করে আরও বর্ণময় করা যায় তা তো ভেবে দেখা উচিৎ সরকারের।

দুঃখ হলেও সত্য যে, একটা সময়ে পয়লা বৈশাখে ভোর থেকে পাড়ায় পাড়ায় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করার চল ছিল, বহু দিন আগেই তা গত হয়েছে। সেদিন বাঘে খেয়েছে।

অথচ প্রভাতফেরি ও হালখাতার মতো বাংলা নববর্ষের দু’টি পরিচিত উদযাপন প্রায় উঠে যাওয়ায়, বাঙালি পয়লা বৈশাখকে ভুলতে বসেছে।

আসলে বাঙালি বাংলাদেশি হয়ে নিজ সংস্কৃতি ভুলে পর সংস্কৃতিতে মজেছে। তাদের এখন পাকিস্তানের গান বাজনা পছন্দ, রবীন্দ্রসঙ্গীত নয়।

বাংলা নববর্ষের দিন শোভাযাত্রা হয় বটে, গানে নৃত্যে আবৃত্তিতে বাংলা সংস্কৃতিকে তুলে ধরা হয় বটে, কিন্তু তা সংখ্যায় খুব বেশি নয়।

পয়লা বৈশাখে এইযে ঘরের দুয়ারে আমপাতা, গাঁদাফুল লাগানো হয়, এত সুন্দর পরিবেশ! সে বাংলা আর নেই।

আজ পয়লা বৈশাখ বছর ঘুরে আসে, কিন্তু টের পাই না। আর দোকানে দোকানে সেদিনের মতো সাজিয়ে লক্ষ্মী গণেশের পুজো, হালখাতা উদযাপন যেন আজ কল্পনা ছাড়া কিছুই নয়। বড় দুঃখ হয়!

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *