ঢাকা: বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া মারা গিয়েছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
তাঁর মৃত্যুর পর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং বই নিষিদ্ধ প্রসঙ্গ নতুন করে সামনে আনলেন নির্বাসিত লেখক তসলিমা নাসরিন।
সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া পোস্টে তিনি স্মরণ করালেন, কী ভাবে খালেদা জিয়ার শাসনকালেই তাঁর একের পর এক বই নিষিদ্ধ হয়েছিল এবং তাঁকে দেশছাড়া হতে হয়েছিল।
মঙ্গলবার সামাজিক মাধ্যমে তসলিমা লেখেন, তিনি (খালেদা জিয়া) একজন ধর্মনিরপেক্ষ, মানবতাবাদী, নারীবাদী, মুক্তচিন্তক লেখকের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার মামলা করে জিহাদিদের পক্ষ নিয়েছিলেন, গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি করেছিলেন। আর শেষ পর্যন্ত তাঁকে অন্যায় ভাবে নিজের দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।
তসলিমার দাবি, খালেদা জিয়ার শাসনকালে তাঁকে বাংলাদেশে ফিরতে দেওয়া হয়নি। সেই স্মৃতি তুলে ধরেই তিনি প্রশ্ন তোলেন – খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর কি অন্তত তাঁর নিষিদ্ধ বইগুলির উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে?
তাঁর বক্তব্য, যদি এই মৃত্যুর পরেও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত হয়, তাতেই তিনি সন্তুষ্ট।
তিনি আরো বহু কথা বলেছেন খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনাকে নিয়ে।
“বাংলাদেশে ধর্ম এবং অধর্ম পাশাপাশি চলে। ধর্ম বলতে আমি কিন্তু ভাল কিছু, আর অধর্ম বলতে খারাপ কিছু বোঝাতে চাইনি। বাংলাদেশের সমাজ প্রচণ্ড পুরুষতান্ত্রিক, প্রচণ্ড নারীবিদ্বেষী। এই সমাজে দুজন নারী শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন।
ইসলামে নারী নেতৃত্ব হারাম জানার পরও এই অধর্মটুকু বাংলার মানুষ জেনেশুনেই করেছিলেন। হাসিনা খালেদা ক্ষমতার শীর্ষে উঠেছিলেন, অবশ্য তাঁদের নিজের যোগ্যতায় নয়। শেখ হাসিনা দলের প্রধান হয়েছিলেন কারণ তাঁর পিতা প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবর রহমান রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন।
এবং খালেদা জিয়ার স্বামী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন। তাঁরা যদি নিহত না হতেন, তাহলে পরিবারের প্রতি সমবেদনা মানুষের এতটা জাগতো না, পরিবারের কাউকে ধরে এনে রাজনৈতিক দলের প্রধান তারা করতো না। যে কজন নারী রাজনীতিতে এসেছেন, এবং ভোটে জিতে সংসদে বসেছেন, একজন দুজন ছাড়া সবাই জনপ্রিয় পুরুষ-রাজনীতিকদের পরিবারের লোক”।
তসলিমা লেখেন, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, রওশন এরশাদ। তাঁরা পুরুষ-রাজনীতিবিদদের কারও মাতা, কারও কন্যা, কারও বধূ, কারও বোন। নারীরা ডাইনেস্টি পলিটিক্সের সুবিধে পেয়েছেন। বাংলাদেশে নারী পুরুষের অধিকার সমান, সে কারণে নারীরা পুরুষের মতোই রাজনীতির মাঠে নামেন– তা নয়।
বাংলাদেশের প্রধান দুই নেত্রীর এখন একজন মৃত, আরেক জন নির্বাসিত। কিন্তু ডাইনেস্টি পলিটিক্সের সমাপ্তি এখনও ঘটেনি। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পুত্র তারেক জিয়া প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছেন। তারেক জিয়ার পর অনেকে বলছেন রাজনীতিতে আসবেন তারেক জিয়ার কন্যা।
কেউ কেউ শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদকে রাজনীতিতে নামানোর চিন্তা করছেন। বাংলাদেশের লোকেরা পরিবারের লোকদেরই ক্ষমতার শীর্ষে দেখতে অভ্যস্ত। তারেক জিয়া মাদ্রাসা থেকে আলীম পাশ করেছেন। খালেদা জিয়া ছিলেন অষ্টম শ্রেণী।
আমি বলছি না, ক-অক্ষর-গোমাংস হলে তার রাজনীতি করার অধিকার নেই। অধিকার আছে, তবে দেশের ক্ষমতায় শুধু শোভা বর্ধন করার জন্য বসে তো কোনও লাভ হয় না। সুস্থ রাজনীতি করা, রাষ্ট্রকে সভ্য করা, সমাজকে শিক্ষিত করার উদ্দেশ্য তো থাকতে হবে রাজনীতিকদের।
পরিবারের লোকেরা এতকাল ধরে ক্ষমতায় থেকে কী ঘোড়ার ডিম করেছেন? ভারতবিরোধিতা করা, সংবিধানকে খৎনা করা, রাষ্ট্রধর্ম আনা, ধর্ম ব্যবসায়ীদের নানা সুযোগ দেওয়া, সমাজকে পেছনে টানা, মসজিদ মাদ্রাসা গড়ে মানুষকে ধর্মান্ধ বানানো, জিহাদি জঙ্গির উৎপাদন বাড়ানো ছাড়া ভাল কিছু করেছেন? ভালই যদি করতেন, দেশের তবে এই হাল কেন? দেশ থেকে প্রগতিশীল, মুক্তচিন্তকরা চলে যাচ্ছেন কেন সভ্য দেশে? কেন সংখ্যালঘুরা ভয়ে পালাচ্ছে”? প্রশ্ন করেন তিনি।
এই পারিবারিক রাজনীতি অবসানের কথা বলেন তসলিমা। বলেন, রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ লোকদের ক্ষমতায় বসানো বন্ধ হোক।
আরো বলেন , “মুক্তচিন্তায়, বাক স্বাধীনতায়, সেক্যুলারিজমে, নারীর সমান অধিকারে, মানবাধিকারে, ধর্মমুক্ত রাজনীতিতে বিশ্বাস করা বুদ্ধিদীপ্ত রাজনীতিকদের আগমন ঘটুক বাংলাদেশের রাজনীতির জগতে”।
