ঢাকা: মহীয়সী নারী বেগম রোকেয়া সম্বন্ধে বেশ কিছু কথা বলেছেন লেখক তসলিমা নাসরিন। দুজনেই নারীবাদী লেখক।
তবে তসলিমা নাসরিন তাঁর জমানো ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন ফেসবুক পোস্টে।
তিনি যা লিখেছেন তা হুবহু তুলে ধরা হলো:
“বেগম রোকেয়ার ছবি দেখেছে এতকাল বাঙালি মুসলমান। ফুলস্লিভ ব্লাউজ পরা, স্লিভলেস নয়, ছোটহাতা নয়, তার ওপর মাথায় ঘোমটা । রক্ষণশীল নানি দাদিদের মতো। বাঙালি মুসলিম ভেবেছিল বেগম রোকেয়া পর্দার পক্ষে, ইসলামের পক্ষে, পুরুষতন্ত্রের পক্ষে। কারণ পর্দানসীন নারী সাধারণত সেটাই হয়।
ইদানীং কিছু কৌতূহলী জিহাদি পড়তে শুরু করেছে বেগম রোকেয়ার বই। দেখছে, ওমা, যে তসলিমাকে তারা ঘৃণা করে, যার মুণ্ডু কাটার জন্য ছুরিতে আজ ৩৫ বছর ধরে শান দিয়ে রেখেছে, রোকেয়া তো সেই তসলিমার মতো করেই কথা বলেছিলেন!
রোকেয়াও ধর্ম আর পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে লিখেছিলেন!! তাহলে তিনি মুখ বুজে থাকা নামাজ রোজা করা, তসবিহ পড়া অন্তঃপুরবাসিনী নন!! তাহলে তাঁকে যে মাথায় তুলে মুসলমানেরা নেচেছে, তার কী হবে”!
প্রসঙ্গত, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক রোকেয়াকে মুরতাদ ঘোষণা করেছেন। সে বিষয়েও কথা বললেন তসলিমা!
“বাহ, এতদিনে মোল্লা জাতের টনক নড়েছে। রোকেয়াও তসলিমার মতো মুরতাদ এবং কাফের! আমি অনেক আগেই বলেছিলাম, আজকের জিহাদিরা বেগম রোকেয়ার জমানায় যদি থাকতো, তাঁকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলতো।
জিহাদিরা এখন সমস্বরে বলছে, রোকেয়া ছিল সেযুগের তসলিমা! রোকেয়া ছিল দেশের প্রথম তসলিমা! এক বিন্দু মিথ্যে নয় কথাটা। তবে এই সত্যটা আবিষ্কার করতে তাদের দীর্ঘ সময় লেগেছে। অথবা সত্যটা তারা জানতোই, তবে রোকেয়াকে বাতিল করার মোক্ষম সময় তারা মনে করেছে জিহাদি জঙ্গি সমর্থিত সরকারের আমলই।
রোকেয়া বেঁচে থাকাকালীন ধর্ম ও পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে তাঁর লড়াই সম্পর্কে মৌলবাদীরা একেবারে যে জানতো না, তা নয়। জানতো, এবং কলকাতায়, যে শহরে রোকেয়ার মৃত্যু হয়েছিল, সেই শহরের কবরস্থানে তাঁকে কবর দিতে দেয়নি তারা, দাফন করতে বা জানাজা পড়তে দেয়নি।
রোকেয়ার লাশ নিয়ে কাকপক্ষী যেন না জানে, এমনভাবে কলকাতার বাইরে সোদপুরের কাছে পানিহাটি নামের একটি জায়গায় রাতের অন্ধকারে গঙ্গার তীরে কবর দিয়েছিল তাঁর কয়েকজন আত্মীয়।
জিহাদিরা, মোল্লা মৌলবীরা, মৌলবাদী পুরুষতান্ত্রিকেরা তসলিমাকে সহ্য করে না। রোকেয়াকেও সহ্য করার কোনও যুক্তি নেই। তারা জেনে যাচ্ছে সে আমলে ঘোমটা পরাটা আর ফুলস্লেভ ব্লাউজ পরাটা ছিল মুসলিম সমাজের রীতি। রোকেয়ার পোশাক যতটা পুরুষতন্ত্রে বিশ্বাসীর পোশাক, ততটাই ধর্মহীন নারীবাদীর পোশাক”।
“মোদ্দাকথা তসলিমা এ যুগের একজন আলোকিত নারীবাদী, রোকেয়ার যুগে রোকেয়া ছিলেন একজন আলোকিত নারীবাদী”। নিজেই নিজের কথা বললেন তসলিমা নাসরিন।
“তসলিমা পুরুষতন্ত্র এবং ধর্মের বিরদ্ধে লড়াই করেছে, রোকেয়াও তাই করেছেন। নারীবিদ্বেষী ধর্মব্যবসায়ীরা তসলিমাকে যেমন ছুড়ে ফেলেছে, রোকেয়াকেও একদিন ছুড়ে ফেলবে, এ আমি জানতাম”।
“এতকাল তো বলে এসেছেন, তসলিমা খারাপ, রোকেয়া ভাল। তসলিমা মুরতাদ, রোকেয়া স্কুল খুলেছেন, তসলিমা নাস্তিক, রোকেয়া মুসলমান”!
