ঢাকা: কোথাও বেড়াল মারা হচ্ছে, কোথাও কুকুর, কোথাও বিষ খাইয়ে জীবন্ত, মায়াবী কবুতরগুলোকে মেরে ফেলা হচ্ছে!
১০৮ টি কবুতরকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। কথায় বলে না কচুগাছ কাটতে কাটতে মানুষ কাটা শেখে? এরা হয়েছে তেমনি।
লেখক তসলিমা নাসরিন এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ করেছেন।
“মানুষের মস্তিস্ক অন্যান্য প্রাণীর মস্তিস্ক থেকে উন্নত হতে পারে, মানুষ চিন্তা করতে পারে, যুক্তি দিতে পারে, বুদ্ধি খাটিয়ে সমস্যা সমাধান করতে পারে, ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করতে পারে।
মানুষ কথা বলতে পারে, বই লিখতে পারে, সঙ্গীত রচনা করতে পারে, ছবি আঁকতে পারে। এরকম নানা কিছু মানুষ পারে, যেসব অন্যান্য প্রাণী মানুষের মতো এত ভাল পারে না।
কিন্তু অন্য কোনও প্রাণী মানুষের মতো বদ আর বর্বর নয়। এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত”।
৮ টি কুকুর ছানাকে মারা হয়েছে। এই ঘটনায় সান্ত্বনা কীভাবে দেয়?
তসলিমা লিখেছেন:
“কুকুর আমাদের বন্ধু, সঙ্গী, নিরাপত্তা রক্ষী এবং পথপ্রদর্শক হিসেবে প্রায় চল্লিশ হাজার বছর ধরে আমাদের অর্থাৎ মানুষের সঙ্গে বাস করছে।
কুকুরের পূর্বপুরুষ নেকড়ের প্রথম গৃহায়ন হয় তখনই। যে নেকড়েরা হিংস্র নয়, আকারে ছোট, মানুষ তাদেরই বিশ্বাস করেছে, এবং কাছে রেখেছে। দু’তরফেই লাভ তো কিছু হতোই।
১৫ হাজার বছর আগে মানুষকে শিকারে সাহায্য করতো কুকুর। শিকার বনে জঙ্গলে লুকিয়ে থাকলে মানুষ দেখতে পেতো না, কুকুর গন্ধ পেয়ে শিকারের কাছে পৌঁছে যেতে পারতো। মানুষের সুবিধে হতো শিকার করতে।
পাখি শিকার করার পর কুকুরই দৌড়ে আহত পাখিকে শিকারীর কাছে পৌঁছে দিত। মানুষকে নানা বিপদ থেকে কুকুর বাঁচিয়েও আনতো।
মানুষকে কত হাজার বছর ধরে খাবার জোগাড় করতে সাহায্য করেছে, কত হাজার বছর মানুষকে রক্ষা করেছে, নিরাপত্তা দিয়েছে। কুকুররা তখন থেকেই গৃহপালিত।
মানুষের উচ্ছিষ্ট খেয়ে বেঁচেছে। তখন তারা আর নেকড়েও নয়, জঙ্গলে ফিরে যাওয়ার সুযোগও নেই।। তারা মানুষের রক্ষক হিসেবে লোকালয়ে থেকে গেল। দু’শো বছর আগে পোষা কুকুরের প্রথা শুরু হয়েছে।
কুকুরের কিছু প্রজাতিও উদ্ভাবন করা হয়েছে । আধুনিক সার্চ, রেসকিউ, পুলিশ ও সার্ভিস কুকুরের ব্যবহার তো অনেক আগেই শুরু হয়েছে।
আজকাল মানসিক থেরাপির জন্যও কুকুর ব্যবহৃত হয়। এখন তো কুকুরকে রোগ শনাক্তকরণের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। পেটে বা ফুসফুসে ক্যান্সার হলে প্রস্রাব বা শ্বাসের গন্ধ শুঁকেই কুকুর ধরিয়ে দিতে পারে অসুখ।
প্রস্রাবের গন্ধ শুঁকে প্রস্টেট ক্যান্সারও ধরতে পারে। রক্তে সুগারের মাত্রা বেশি হলেও গন্ধ শুঁকে ডায়বেটিস বুঝতে পারে কুকুর। কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে সংক্রামক রোগ থাকলেও শরীর শুঁকে শনাক্ত করতে পারে।
প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত কুকুর মানুষের এপিলেপ্সি বা স্ট্রোক হওয়ার আগের সংকেত শনাক্ত করতে পারে।
মানুষের তুলনায় কুকুরের ঘ্রাণশক্তি প্রায় ১ লক্ষ থেকে ১ কোটি গুণ বেশি শক্তিশালী। কুকুরের নাকে ৩০ কোটি ঘ্রাণ-রিসেপ্টর থাকে। মানুষের নাকে থাকে মাত্র ৫০–৬০ লাখ রিসেপ্টর।
কুকুরের নাকে মানুষের তুলনায় ৫০ গুণ বেশি রিসেপ্টর আছে। কুকুরের মগজে ঘ্রাণ বিশ্লেষণের অংশ মানুষের চেয়ে ৪০ গুণ বড়।
মানুষকে চল্লিশ হাজার বছর ধরে নানাভাবে সেবা করছে কুকুর, আর নানাভাবে নিরাপত্তা দিচ্ছে কুকুর। শুধু কুকুরপ্রেমী ধনীর বাড়িতে কুকুরেরা আদর যত্ন পায়।
বেশির ভাগ কুকুরই পথে ঘাটে অনাহারে অত্যাচারে বেঁচে থাকে। অত্যাচার করে মানুষই”।
