মানিকগঞ্জ: বাউল শিল্পীদের জন্য বোধহয় এখন আর এই দেশ নয়। তাঁদের ওপর বরাবর হামলার ঘটনা ঘটছে।
বাউলশিল্পী আবুল সরকারের মুক্তির দাবিতে মানিকগঞ্জ শহরে অবস্থানরত বাউলদের ওপর রবিবার হামলা চালিয়েছে কথিত ‘তৌহিদী জনতা’।
সকাল ১০টার দিকে শহরের শহীদ মিনারের পাশে বাউলরা অবস্থান নিলে এই হামলা চালানো হয়।
আসলে এরা জঙ্গী চেনে, বাউল চেনে না। ঘটনার পর থেকেই শহরে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
লেখক তসলিমা নাসরিন এইসব ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।
ভেরিফাইড ফেসবুকে তিনি বেশ কিছু কথাই লিখেছেন:
“বাংলার আধ্যাত্মিক জগতে বাউল হলো উদার এবং মানবতাবাদী এক দর্শন। বাউলদের কাছে ধর্ম কোনও প্রতিষ্ঠান নয়; ধর্ম মানব আর মানবতার ভেতরের গভীর অনুসন্ধান।
শরীর, মন ও প্রেম—এ তিনের মিলনে তাঁরা ঈশ্বরকে খুঁজে পান। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, যাঁরা মানবমুক্তির কথা বলেন, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দাঁড়ান, নারীর স্বাধীনতা ঘোষণা করেন—বাংলার ইতিহাসে সেই বাউলরাই সামাজিক, রাজনৈতিক আর ধর্মীয় বৈরিতার শিকার।
বাংলার বাউলদের ওপর নিপীড়ন শুধুমাত্র ধর্মের বিরোধের কারণে নয়; এটি পিতৃতন্ত্র, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, জাতীয়তাবাদ, এবং গ্রামীণ সামাজিক নিয়ন্ত্রণ—এই সবকিছুর সম্মিলিত ফল।
বাউলধারা মূলত ১৬–১৭শ শতকে সুফিবাদ, বৈষ্ণব সহজিয়া, নাথপন্থা এবং তান্ত্রিক দেহতত্ত্বের মিলনে গড়ে ওঠে। রক্ষণশীল সমাজ বাউলধারাকে বিপজ্জনক বলে মনে করে, কারণ বাউলরা পুরুষতান্ত্রিক ধর্মীয় আচার প্রত্যাখ্যান করে, আল্লাহ-ভগবানকে শরীরের ভেতরে, মানুষের ভেতরে খোঁজে, মসজিদ-মন্দিরের কর্তৃত্ব মানে না, নারী ও পুরুষকে একত্রে সাধনার সহযাত্রী মনে করে।
ধর্মীয় লজ্জা-ট্যাবু, যৌনতা ও দেহতত্ত্বকে আধ্যাত্মিকতার অংশ ঘোষণা করে। এই দর্শন হিন্দু পুরোহিত ও মুসলিম মৌলবী উভয়ের কর্তৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
ফলে প্রথম থেকেই সামাজিক বয়কট, হামলা, সাধনালয় ভাঙচুর, নারী বাউলের ওপর নির্যাতন– এসব শুরু হয়। চৈতন্যোত্তর বৈষ্ণব সমাজ ও মুসলিম শরিয়তবাদী শক্তি—দু’পক্ষই বাউলদের সন্দেহ ও ঘৃণার চোখে দেখত।
১৮–১৯শ শতকে ব্রিটিশরা বাউলদের “heterodox religious sect” বলে চিহ্নিত করে। তারা বাউলদের দেখত এক ধরনের “সামাজিক ব্যতিক্রম”, “প্রায়-অরাজক” গোষ্ঠী হিসেবে।
এই সময় বাউলদের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠে:
জমিদারদের দমন, হিন্দু-মুসলিম উভয় ধর্মীয় রক্ষণশীলদের চাপ, গ্রামীণ সম্প্রদায়ের বয়কট, নারী বাউলের ওপর যৌন সহিংসতা।
১৯৪৭–১৯৭১ সালে ইসলামি জাতীয়তাবাদের ছায়ায় বাউল নিপীড়ন চলে।
পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের পর ইসলামকে জাতীয় পরিচয়ের কেন্দ্রে স্থাপন করা হয়। এর ফলে বাউলরা হয়ে ওঠে “বিধর্মী” বা “অবিশ্বাসী”।
এই সময় বাউল মেলাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। বাউল গানকে আড়ালে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
সহজিয়া-দেহতত্ত্বের চর্চাকে “অশ্লীলতা” বলে দমন করা হয়। গ্রামে গ্রামে মৌলবিরা বাউলদের থানা পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায়। বাউলদের স্বাধীনতাবাদী দর্শন পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় মতাদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল।
১৯৭১ এর পর বাংলাদেশে নতুন উদ্যমে বাউল নিপীড়ন শুরু হয়।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে।
কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সামরিক শাসন, রাজনৈতিক ইসলামের উত্থান, মাদ্রাসা-ভিত্তিক রক্ষণশীলতা, গ্রামীণ ধর্মীয় নেতাদের বাড়তি ক্ষমতা–এসবের কারণে বাউলরা আবারও টার্গেটে পরিণত হয়।
২০০০-এর পর বাউলদের ওপর হামলা ভয়াবহভাবে বেড়ে যায়। শুরু হয় বাউলদের চুল কেটে দেওয়া, প্রকাশ্যে মারধর করা, বাউল মেলা ভাঙচুর করা, নারীবাউলদের গণহামলা করা, লালনের মাজারে হামলা করা, স্থানীয় মসজিদের ঘোষণা করা “বাউল গান হারাম”।
এই সময়েই মৌলবাদী শক্তিগুলো গ্রামাঞ্চলে দখল প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তাদের প্রথম আক্রমণের লক্ষ্য—বাউল, কারণ তাঁরা ধর্মীয় ব্যবসার প্রকৃত প্রতিপক্ষ।
ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠী বাউলদের বহু যুগ যাবত নির্যাতন করছেন। কারণ
বাউল দর্শনে প্রার্থনা নেই, ধর্মীয় নেই, মধ্যস্বত্বভোগী পুরোহিত/মৌলবী নেই, গ্রন্থকেন্দ্রিকতা নেই। অতএব ধর্মীয় কর্তৃত্ব ব্যবস্থা বাউলদের টিকে থাকতে দিতে চায় না।
পিতৃতান্ত্রিক সমাজকে চ্যালেঞ্জও করা হয়। বাউলরা নারীকে সমান সহচরী
আধ্যাত্মিক সঙ্গী মনে করে। নারীর স্বাধীনতা, দেহতত্ত্ব, যৌনতা—এসব বিষয়ে তারা মুক্তভাবে কথা বলে। এটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজে অসহনীয়। অবশ্য সব বাউলই যে নারীর সমানাধিকার মেনে চলে, তা নয়। কিছু পুরুষ বাউল নারী বাউলের ওপর কর্তৃত্ব করে।
সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদের বিরোধিতা করেন বাউলরা। তাঁরা ধর্ম বর্ণের বিভেদ আর জাতপাত প্রথা মানেন না। তাঁদের কাছে সমগ্র মানুষ জাত এক জাত। তাঁরা জাতের পার্থক্য করেন না। এটি সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ভিত্তিকেই নষ্ট করে।
গ্রামীণ বাংলাদেশে বাউলরা প্রান্তিক, দরিদ্র, সংগঠনহীন। তাঁদের ওপর হামলা হলে রাষ্ট্র আমলাতান্ত্রিকভাবে উদাসীন থাকে। আইনের প্রতিকার সহজ নয়”।
তিনি লিখেছেন, মৌলবাদী রাজনীতির জন্য বাউলরা প্রথম লক্ষ্য। মৌলবাদীরা জানে—বাউলের দর্শন যদি ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে ধর্মীয় হুমকি-রাজনীতি ব্যর্থ হবে।
তাই তারা বাউলদের নির্মূল করতে চায়।
গত দুই দশকে কয়েকজন বাউলকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। নারী বাউলের ওপর গণহামলা হয়েছে। বাউল মেলা বন্ধ করার ফতোয়া জারি করা হয়েছে। গ্রামীণ বাউলদের ঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
ইউটিউব-ফেসবুকে বাউল গান নিষিদ্ধের দাবি জানানো হয়েছে। লালন শাহের মাজারে চরমপন্থীরা হামলা করেছে। বাউলরা আজও নিরাপদ নয়।
বাউলরা অস্ত্র নয়, গান দিয়ে প্রতিরোধ করেন। তাঁদের দর্শনই তাঁদের শক্তি। তাঁরা ধর্মের রাজনীতি চান না, তাঁরা মানুষের জয়গান করতে চান। তারা শাস্ত্রের নয়, অভিজ্ঞতার দাম দেন, তাঁরা আচান চান না, তাঁরা প্রেন চান। ঘৃণা চান না, সমতা চান।
বাংলাদেশে যখনই অসহিষ্ণুতা বেড়েছে, তখনই বাউলের গান মানুষকে মুক্তির পথ দেখিয়েছে। বাংলাদেশে বাউলদের ওপর অত্যাচার কেবল ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার ইতিহাস নয়; এটি ক্ষমতার ইতিহাসও বটে।
যেখানে ধর্মীয় চরমপন্থা, পুরুষতন্ত্র, সাম্প্রদায়িকতা, রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা, সামাজিক ভীতুতা–সব মিলিয়ে একটি প্রান্তিক উদার গোষ্ঠীর ওপর নির্যাতন চালানো হয়। যদিও তাঁরা মুক্তচিন্তার প্রতীক, মানবতার প্রতীক।
বাংলাদেশ যতদিন মৌলবাদ, জিহাদবাদ আর জঙ্গিবাদের অস্তিত্ব থাকবে, ততদিন বাউলদের ওপর নির্যাতন চলবে”।
