প্রয়াত কবি শামসুর রাহমানের একটি কবিতা বার বার মনে পড়ছে।
বর্তমান বাংলাদেশের ক্ষতবিক্ষত মানবতা, গণতন্ত্রের ধ্বংসস্তুপ দেখে তাঁকেই মনে পড়ে খুব করে।
কবিতাটির কিয়দংশ তুলে ধরলাম পাঠকদের জন্য।
তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা
– শামসুর রাহমান
তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা,
তোমাকে পাওয়ার জন্যে
আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায় ?
আর কতবার দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন ?
তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা,
সাকিনা বিবির কপাল ভাঙলো,
সিঁথির সিঁদুর গেল হরিদাসীর।
তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা,
শহরের বুকে জলপাইয়ের রঙের ট্যাঙ্ক এলো
দানবের মত চিৎকার করতে করতে
তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা,
ছাত্রাবাস বস্তি উজাড় হলো। রিকয়েললেস রাইফেল
আর মেশিনগান খই ফোটালো যত্রতত্র।
তুমি আসবে ব’লে, ছাই হলো গ্রামের পর গ্রাম।
তুমি আসবে ব’লে, বিধ্বস্ত পাড়ায় প্রভূর বাস্তুভিটার
ভগ্নস্তূপে দাঁড়িয়ে একটানা আর্তনাদ করলো একটা কুকুর।
তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা,
অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিলো পিতামাতার লাশের উপর।
তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা, তোমাকে পাওয়ার জন্যে
আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়?
আর কতবার দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন?…….
বাংলাদেশে হেন কোন দিন নেই যেদিন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ওপর হামলা হচ্ছেনা। খুন, ছিনতাই, বাড়িঘরে হামলা, লুটপাট-ডাকাতি, বাড়িতে আগুন দেয়া এসব যেন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আগে শুধু খুন করা হতো। কিন্তু ইদানীং মুসলমাদের মধ্যে জিঘাংসা এত বেড়েছে যে তারা শুধু হিন্দুদের খুন করেও শান্তিতে নেই। কখনো গাছে ঝুলিয়ে আগুন দিচ্ছে, আবার কখনো গায়ে পেট্রোল বা দাহ্য বস্তু ঢেলে আগুন দিয়ে নির্মমভাবে পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানাচ্ছে বাংলাদেশী চরম সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন ইসলামপন্থীদের মধ্যে।

আর নির্বাচনী প্রচার প্রচারনা বা আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের তারিখ যতই ঘনিয়ে আসছে ততই যেন এই মধ্যযুগীয় বর্বরতা আরো বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু এ জন্য জঙ্গী ইউনুস সরকারের কোন খেয়াল নেই।
এসব হত্যা-নিপীড়নকে তারাই প্রকারান্তরে প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে হিন্দুদের তাড়িয়ে দিতে পারলেই যেনো এসব মুসলমানের শান্তি। অবশ্য যে হারে বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর অত্যাচার-নিপীড়ন-হুমকি-ধামকি চলছে তাতে খুব বেশিদিন হয়তো আর হিন্দুরা এদেশে থাকতে পারবেনা।
জানিনা কবি শামসুর রাহমান বেঁচে থাকলে এই জঙ্গী জংলী শাসনের বাংলাদেশ দেখে তিনি কি বলতেন।
তবে বাংলাদেশের হিন্দুদের এ চরম আতংকজনক পরিস্থিতিতে এখানে যারা মানবতার ব্যবসা বাণিজ্য করে ইতিমধ্যেই ব্যাপক ডলার ইনকাম করেছেন তাদের কিন্তু হৃদয় কাঁপছেনা আর।
অথচ এসব মানবতার ব্যবসায়ীরা বিগত সরকারের সময় এত বেশি সোচ্চার ছিলেন যে ভাবতেই ঘৃণা হচ্ছে। তখন তারা প্রতিনিয়ত দেশের মানুষের মানবাধিকার-গণতন্ত্র-বাকস্বাধীনতা প্রচন্ড রকমের খর্ব হচ্ছে, মানবতা ভূলুন্ঠিত হয়ে গেছে ইত্যাদি ইত্যাদি গালিগালাজে ভরিয়ে তুলতেন।
আর সেই সাথে এসব মানবতার ব্যবসায়ীদের পেট্রোডলার দানকারি দেশ-প্রতিষ্ঠানগুলো থেকেও তাদের সাথে গলা মিলিয়ে-গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে শুনতাম। কিন্তু তারা সবাই এখন বরফশীতল নিদ্রামগ্ন! হায়রে মানবতার ব্যবসায়ীরা!! ধিক তোমাদের।
এ্যমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল না কি যেন আছে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা তারাতো পান থেকে চুন খসলেই বিগত আমলে গেল গেল মানবতা গেল!গণতন্ত্র গেল! বাকস্বাধীনতা গেল বলে বিশ্বব্যাপী শোরগোল পাকিয়ে তুলতো।
কোথায় গেল সেসব মানবাধিকার সংগঠন ?
বাংলাদেশের টাউট ফটোগ্রাফার শহীদুলতো গাজা’র মানবিকতা রক্ষায় যে গাজাযাত্রা ( নাকি গাঁজায় বুঁদ হয়ে) করে নাটক দেখালেন তা তার সমর্থিত ‘ প্রতারক বিশ্বে ’ নিশ্চয়ই ব্যাপক সমাদৃত হয়েছে! কি বলেন আপনারা? সেই শহীদুলের খবর কি এখন? আসলে সেতো হচ্ছে মার্কিন ডিপষ্টেট, ইউনুসের মেটিকুলাস ডিজাইন ও পাক-তুরষ্কের পোষ্য দালাল।
![]()
ওই যে “অধিকার” নামে বাংলাদেশে একটি এনজিও আছে। সেই বিশাল মানবাধিকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক আদিলুর রহমান এখন একেবারে নিরব। কারন তিনিতো আবার এই জঙ্গী ইউনুস সরকারের প্রভাবশালী উপদেষ্টা। সাদা চুলের এই উপদেষ্টা আদিলুর রহমান, তার ডাক নাম নাকি শুভ্র। এই হলো তার শুভ্রতার নমুনা। অথচ বিগত সরকারের সময় কত শত মানবাধিকার হরনের নিউজ ও পরিসংখ্যান তার এই ‘মানবাধিকারের দোকান’ থেকে প্রকাশিত হয়েছে।
মাত্র কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করি পাঠকদের স্মরণে রাখার জন্য।
১।নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় চরসিন্ধুর বাজারে মণি চক্রবর্তী নামে এক হিন্দু ধর্মাবলম্বী ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে কুপিয়ে খুন করা হয়েছে গত ৫ জানুয়ারি রাত ১১ টার দিকে। নিহত মণি চক্রবর্তী শিবপুর উপজেলার সাধারচর ইউনিয়নের মদন ঠাকুরের ছেলে। ৪০ বছর বয়সী এ মুদি ব্যবসায়ী দীর্ঘদিন ধরে চরসিন্দুর বাজারে মুদির দোকান চালিয়ে আসছিলেন। তাঁকে হত্যার কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেনি পুলিশ।

২।একই রাতে অর্থাৎ ৫ জানুয়ারি যশোরের মনিরামপুরে রানা প্রতাপ বৈরাগী নামের একজন বরফ কল ব্যবসায়ীকে ডেকে নিয়ে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। ব্যবসার পাশাপাশি তিনি স্থানীয় একটি পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন বলে জানা গেছে।

সোমবার সন্ধ্যায় মনিরামপুর উপজেলার মনোহরপুর ইউনিয়নের কপালিয়া বাজারে এ ঘটনা ঘটে। নিহত এই ব্যক্তি নড়াইল থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক বিডি খবর’ নামে একটি পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন বলে বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে।
তবে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় হত্যা, ধর্ষণ ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের তিনটি মামলা রয়েছে বলে পুলিশের বরাত দিয়ে জানিয়েছে। ব্যাপারটি এমন যে- মামলা থাকলেই তাকে খুন করা যায়েজ!
৩।এর আগে গত ১৮ ডিসেম্বর রাতে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে ময়মনসিংহের ভালুকার জামিরদিয়া এলাকায় ‘পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস বিডি লিমিটেড কোম্পানির’ শ্রমিক ২৮ বছর বয়সী দিপু দাসকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর তার লাশ গাছের ডালের সঙ্গে বেঁধে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

এ পৈশাচিক হত্যাকান্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে কানাডার সংসদেও আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু তাতেও কিচ্ছু হয়নি শান্তিতে নোবেল কিনে নেয়া ড. ইউনুসের।
ময়মনসিংহ জেলার তারাকান্দা উপজেলার মোকামিয়া কান্দা গ্রামের রবি চন্দ্র দাসের ছেলে দিপু দুই বছর ধরে এই কোম্পানিতে কাজ করছিলেন।
৪।এই দিপুকে হত্যার রেশ কাটতে না কাটতেই ১৩ দিনের মাথায় ৩১ ডিসেম্বর শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলায় ব্যবসায়ী খোকন চন্দ্র দাসকে ছুরিকাঘাতের পর শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন দেওয়া হয়।

তিনদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর শনিবার সকাল ৮টার দিকে জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। এই খোকনের কি দোষ ছিল জানা যায়নি।
৫। গত ২০২৫ এর ২ ডিসেম্বর মঙ্গলবার রাতে আনুমানিক সাগে ৭ টার দিকে নরসিংদীর রায়পুরায় প্রাণতোষ সরকার (৪২) নামে এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা।

উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চল বাঁশগাড়ির দিঘলিয়াকান্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে এ ঘটনা ঘটে। নিহত প্রাণতোষ সরকার উপজেলার বাঁশগাড়ি গ্রামের সাধন সরকারের ছেলে। তিনি বাঁশগাড়ি বাজারে জুয়েলারি ব্যবসা করতেন।
নিহতের পরিবারের সদস্যরা জানান, সে রাতে বাড়িতে অবস্থান করছিলেন প্রাণতোষ সরকার। এ সময় প্রাণতোষের সাথে কথা বলার জন্য দুইজন লোক তাকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায়।
পরে তারা দিঘলিয়াকান্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে প্রাণতোষকে নিয়ে গুলি করে। এ সময় প্রাণতোষ মাটিতে লুটিয়ে পড়লে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়। পরে স্বজনরা তাকে উদ্ধার করে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নিয়ে এলে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহতের ভাইয়ের স্ত্রী হেনা রানী সরকার বলেন, দুইজন লোক এসে আমার দেবরকে ডেকে নিয়ে স্কুল মাঠে যায়। এদের একজনের মুখ খোলা থাকলেও আরেকজনের মুখ বাঁধা ছিল।
৬।ময়মনসিংহের ভালুকা এলাকায় গত ২৯ ডিসেম্বর একটি গার্মেন্টস কারখানার ভেতর একই প্রতিষ্ঠানের অপর এক আনসার সদস্যের শটগানের গুলিতে নিহত হন ব্রজেন্দ্র বিশ্বাস (৪২)। তারা উভয়েই ওই কারখানার নিরাপত্তার দায়িত্বে নিযুক্ত ছিলেন।

খেয়াল করুন, গল্পটি ফাঁদা হয়েছে এভাবে- ঘটনার সময় ব্রজেন্দ্র বিশ্বাস সহকর্মী নোমান মিয়ার সঙ্গে কারখানার ভেতর বসেছিলেন। হঠাৎই নোমানের হাতে থাকা শটগান থেকে গুলি বেরিয়ে যায়। গুলিটি ব্রজেন্দ্র বিশ্বাসের বাঁ পায়ে লাগে, মুহূর্তের মধ্যেই প্রচুর রক্তক্ষরণ শুরু হয়।
সহকর্মীরা দ্রুত তাকে ভালুকা উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্ত নোমান মিয়া (২২) পেশায় তিনিও একজন আনসার সদস্য। তিনি সুনামগঞ্জ জেলার তাহেরপুর এলাকার বালুটুরি বাজারের বাসিন্দা ও লুৎফুর রহমানের পুত্র। ঘটনার পরপরই তাকে আটক করা হয়েছে।
প্রশ্ন হলো পায়ে শটগানের গুলি লাগলে এত রক্তক্ষরণ হয়? আর তার সহকর্মীরা যদি দ্রুতই তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতেন তাহলে কি এই মৃত্যুর ঘটনা ঘটতো? আর গুলিও কি হঠাৎ বের হয়েছে না পরিকল্পিতভাবেই এই হত্যাকান্ড করা হয়েছে হিন্দু বলে?
৭। গত ২৪ ডিসেম্বর রাজবাড়ি জেলায় পাংশা উপজেলার হোসেনডাঙ্গা গ্রামে অমৃত মন্ডল নামে এক হিন্দু যুবককে মব সৃষ্টি করে গনপিটুনি দিয়ে খুন করা হয়েছে।

পুলিশ বলছে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপের অভিযোগকে ঘিরে গণপিটুনিতে অমৃত মন্ডলের মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয়ভাবে যিনি ‘সম্রাট’ নামে পরিচিত ছিলেন বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
তবে জঙ্গী পেট্রোনাইজার ড. ইউনুসের ইন্টোরিম সরকার মব সৃষ্টি করে হত্যার ঘটনাটিকে গার্মেন্টস কর্মী দীপু দাসের মত করে স্বীকার করেনি।
উল্টো সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে- এটি সাম্প্রদায়িক হামলা নয়। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, ২৯ বছর বয়সি অমৃত মণ্ডল দীর্ঘদিন ধরেই এলাকায় নানা অপরাধের সাথে যুক্ত ছিলেন।
তার বিরুদ্ধে পাংশা থানায় অন্তত দুটি মামলা ছিল, যার মধ্যে একটি খুনের মামলাও রয়েছে। ব্যাপারটি এমন যে, কারো বিরুদ্ধে মামলা বা অভিযোগ থাকলেই তাকে হত্যা করা একেবারেই আইনসিদ্ধ এই বাংলাদেশে !!
এহেন পরিস্থিতিতে দেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা তীব্রতর আকারে অব্যাহত থাকায় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী শঙ্কিত বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ।
কিন্তু বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সবচাইতে বড় এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহনযোগ্য এই মানবাধিকার সংগঠনটি এই ক্রান্তিলগ্নে কোন সভা সমাবেশ , প্রতিবাদী মানব বন্ধন না করে একটিমাত্র বিবৃতি দিয়ে তাদের দায়বদ্ধতা শেষ করেছে মনে হয়।
৬ জানুয়ারি মঙ্গলবার সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব কথা জানানো হয়। এতে বলা হয়, “ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই সাম্প্রদায়িক সহিংসতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে চলেছে।
গত ডিসেম্বর মাসে কমপক্ষে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৫১টি। এর মধ্যে হত্যা ১০টি, চুরি ও ডাকাতি ১০টি, বাড়িঘর-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান-মন্দির ও জমিজমা দখল, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ ২৩টি।

ধর্মীয় অবমাননা ও র’র দালালের মিথ্যা অভিযোগে আটক ও নির্যাতন ৪টি, ধর্ষণ চেষ্টা ১টি, দৈহিক নির্যাতন ৩টি।
চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহেও সহিংসতার ধারা অব্যাহত রয়েছে।
এর মধ্যে ২ জানুয়ারি লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে সত্যরঞ্জন দাসের ৯৬ শতক জমির ধান জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে, ৩ জানুয়ারি শরীয়তপুরে কুপিয়ে ও শরীরে আগুন দিয়ে ব্যবসায়ী খোকন চন্দ্র দাসকে হত্যা করা হয়েছে।
একই দিন ভোরে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার আমুচিয়া ইউনিয়নের চার নম্বর ওয়ার্ডের মিলন দাসের বাড়ির সবাইকে জিম্মি করে সেখানে ডাকাতি করা হয়েছে।
একই রকমের ঘটনা ঘটেছে একই দিন কুমিল্লার হোমনার সানু দাসের ঘরে যেখান থেকে ১০ ভরি স্বর্ণালংকার, ১২ ভরি রূপা ও ২০ হাজার টাকা লুট করে নেয়া হয়েছে।
৪ জানুয়ারি শুভ পোদ্দার নামে এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে মুখ বেঁধে তার দোকান থেকে প্রায় ৩০ ভরি স্বর্ণালংকার লুট করা হয়েছে।
একই দিন ঝিনাইদহের কালিগঞ্জে ৪০ বছরের এক হিন্দু বিধবা নারীকে ধর্ষণ করে তাকে গাছের সাথে বেঁধে মাথার চুল কেটে দিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে।

কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্নপূর্ণা দেবনাথ নির্বাচন সংশ্লিষ্ট যথাযথ দায়িত্ব পালনের কারণে তার বিরুদ্ধে ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর ও ইস্কনের সদস্যের ট্যাগ লাগিয়ে তাকে তার দায়িত্ব থেকে অপসারণের দাবি তুলেছে ধর্মান্ধ দুর্বৃত্তরা।

(পাঠক খেয়াল করুন ঐক্য পরিষদের মত একটি বৃহৎ মানবাধিকার সংগঠন জামায়াতে ইসলামীর নাম নিতে ভয় পেয়েছে)।
ঐক্য পরিষদের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, একই দিন দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার বাড়েয়া গ্রামের সন্তোষ কুমার রায়ের বাড়িতে চাঁদাবাজি করতে গিয়ে স্থানীয় এনসিপি নেতা এম. এ. তাফসীর ও তার সহযোগী মঞ্জুরুল আলম পুলিশের হাতে আটক হয়েছে।
৫ জানুয়ারি যশোরের মনিরামপুরের বরফকল ব্যবসায়ী ৩৭ বছর বয়স্ক রানা প্রতাপ বৈরাগীকে দুর্বৃত্তের দল তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে ডেকে নিয়ে প্রকাশ্যে গুলি করে ও গলা কেটে হত্যা করেছে।
একই দিন নরসিংদীর পলাশে মুদী দোকানী মণি চক্রবর্তীকে ছুরিকাঘাতে নির্মমভাবে হত্যা করেছে দুষ্কৃতকারীরা। এরকম লোমহর্ষক ঘটনা এরই মধ্যে আরো অনেক ঘটেছে সারা দেশে যার সম্পূর্ণ তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার তীব্রতায় গভীর ক্ষোভ, উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা প্রকাশ করে বলেছে এসব ঘটনায় সারা দেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী ভবিষ্যতের অজানা আশঙ্কায় ভয়ে ভীত হয়ে পড়েছে। আগামী সংসদ নির্বাচনে নির্ভয়ে, নির্বিঘ্নে ভোটদানে সংখ্যালঘুরা ইতিমধ্যে শঙ্কিত হয়ে পড়েছে।
পরিষদ মনে করে আগামী নির্বাচনে পছন্দের প্রার্থীকে ভোটদানে জোরপূর্বক বিরত রাখার জন্যে সাম্প্রদায়িক দুর্বৃত্তমহল এসব ঘৃণ্য কার্যকলাপ অব্যাহতভাবে সারা দেশে চালিয়ে যাচ্ছে। অনতিবিলম্বে তা রোধে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের প্রতি পরিষদ জোর দাবি জানিয়েছে।
গত কয়েক সপ্তাহে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় সংখ্যালঘু হিন্দুদের লক্ষ্য করে একাধিক গণহিংসার ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। রাজবাড়িতে অমৃত মণ্ডল নামে এক হিন্দু যুবককে গুজব ছড়িয়ে হত্যা করা হয়। ময়মনসিংহে দীপুকে ‘ধর্ম অবমাননা’র অভিযোগ তুলে পিটিয়ে মারে জনতা।
ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এই ঘটনাগুলি আলাদা নয়। গত দেড় বছরে বাংলাদেশে একের পর এক ঘটনায় হিন্দুদের হত্যা, গণপিটুনি, ছুরিকাঘাত, ভয় দেখানো এবং কোথাও কোথাও পুরো হিন্দু গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
কিন্তু প্রতিবারই বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার হয় এগুলিকে বিচ্ছিন্ন ছোটখাটো অপরাধ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছে, নয়তো দাবি করেছে, এগুলি আসলে আওয়ামি লিগ সমর্থকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ।”
এরমধ্যে গত ৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীষ্টান ঐক্য পরিষদ, পুজা উদযাপন পরিষদের কয়েকজন নেতা ১৭ বছর লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে পলাতক থেকে দেশে ফেরা তারেক রহমানের সাথে দেখা করেছেন।
সেখানে নাকি বিএনপির এখনকার সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারি তারেক রহমান তাদেরকে বলেছেন, বিএনপি যদি ক্ষমতায় আসতে পারে তাহলে তারা নাকি একটি মানবিক-গণতান্ত্রিক-অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তুলবেন।

প্রশ্ন হলো- বিএনপিতো এর আগেও তিন তিনবার ক্ষমতায় ছিল, তখন তারা কি এসব বাস্তবায়ন করেছিলো?
২০০১ এর ১ অক্টোবর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে পরে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার দেশে হিন্দুদের ওপর কেমন অত্যাচার-নির্যাতন-খুন-ধর্ষণ-জ্বালাও-পোড়াওয়ের মত নির্মম পাশবিক দুঃসহ পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল তা কি দেখা করতে যাওয়া হিন্দু নেতারা ভুলে গেছিলেন ?!
# রাকীব হুসেইন: লেখক, প্রাবন্ধিক।
